পুণ্যাহ

রাজস্ব আদায়ের প্রায় বিলুপ্ত বার্ষিক উৎসব।
আরও দেখুন: বাংলা নববর্ষ এবং পহেলা বৈশাখ

পুণ্যাহ বাংলার রাজস্ব আদাযের বার্ষিক বন্দোবস্তের একটি উৎসব। এই উৎসব বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত। এটি ছিলো রাজস্ব আদায় এবং বন্দোবস্ত সংক্রান্ত বিষযের প্রাক-ব্রিটিশ সময়ের পদ্ধতি। যে ব্যবস্থায় সরকার কর্তৃক সকল জমিদার, তালুকদার, ইজারাদার এবং অন্যান্য রাজস্ব প্রদানকারী ব্যক্তিদের বছরের নির্দিষ্ট দিনে একটি অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণের মাধ্যমে পূর্ববর্তী বছরের রাজস্ব আদায় এবং নতুন বছরের বন্দোবস্ত প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো।[১]

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পুণ্যাহ উৎসব বাংলা নববর্ষের সমার্থক হিসেবে প্রতি বছর বাংলা বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ বৈশাখ মাসের ১ তারিখে নিয়মিতভাবে পালন হয়ে আসছে। ১৯৫০ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিলোপ সাধরনের পাশাপাশি পুণ্যাহ উৎসবের বিলুপ্ত ঘটে। তবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি যেমন নৌকা বাইচ, মেলা, পুতুল নাচ, এবং নববর্ষ উদ্যাপন ইত্যাদি এখনও পালিত হচ্ছে। পরবর্তীতে বাংলাদেশের অভ্যুদয় বাংলা নববর্ষে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং বর্তমানে তা পূর্ব বঙ্গে এবং পশ্চিম বঙ্গে জাঁকজমকভাবে পালিত হয়ে থাকে।[১]

ইতিহাসসম্পাদনা

নওয়াব দরবার পরিচালিত এই অনুষ্ঠানে যেসকল ব্যক্তিগণ নওয়াবকে সন্তুষ্ট করতে পারতো তাদেরকে সম্মানসূচক খিলাত বা পোশাক দান করা হতো। এইভাবে জমিদারগণ ও অন্যান্য ভূস্বামীগণ তাদের রায়ত বা প্রজাবর্গকে নিযে পুণ্যাহ অনুষ্ঠান পালন করতেন। রায়তগণ বিগত বছরের বকেয়া রাজস্ব পরিশোধ করতেন এবং নতুন বছরের বন্দোবস্ত গ্রহণ করতেন। রায়তগণ জমিদারের কাঁচারিতে একত্রিত হয়ে জমিদার অথবা তার নাযেবের নিকট থেকে পান বা পানপাতা গ্রহণ করতেন। এ উপলক্ষে নৃত্য, সঙ্গীত, যাত্রা, মেলা, গবাদি পশুর দৌঁড়, মোরগযুদ্ধ এবং বিভিন্ন বিনোদনমূলক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। মুগল আমলে পুণ্যাহ উৎসবের কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ছিলো না। যখন থেকে এই উৎসব রাজস্ব বন্দোবস্ত এবং রাজস্ব সংগ্রহের সাথে যুক্ত হলো, তখন থেকেই পুণ্যাহ উৎসবের তারিখ নির্ধারিত করা হলো। মূলত প্রধান ফসল তোলার সমযকে সাধারণভাবে এই উৎসবের জন্যে নির্ধারিত করা হতো। এ বিষযে মুর্শিদকুলী খান একটি নতুন রীতি প্রচলন করেন। এই রীতি অনুসারে চৈত্র মাসে (বাংলা সনের শেষ মাস, এর অনুরূপ ইংরেজি সালের মাস হলো মার্চ-এপ্রিল) ফসল তোলা শেষ হওয়ার পর পুণ্যাহ উৎসব পালন করা হতো। উৎসব শেষে সংগৃহীত রাজস্ব ভারতের দিল্লিতে প্রেরণ করা হতো। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসল উৎপাদন হ্রাস পেলে পুণ্যাহ উৎসবেই রাজস্ব মওকুফের সিদ্ধান্ত গৃহীত হতো। পুণ্যাহ বলতে সমস্ত রাজস্বের আদায়কে বোঝাত না; অনাদায়কৃত রাজস্ব মওকুফ কিংবা ভবিষ্যতের জন্য স্থগিত করারর ব্যবস্থাও এই উৎসবে করা হতো। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে রায়তগণ বকেয়া রাজস্ব মওকুফ পেতো। এছাড়াও, চাষাবাদের জন্যে তাদেরকে তাকাবি বা ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করা হতো, পুণ্যাহ উৎসবে সে সকল ঋণের লেনদেনও সমপন্ন করা হতো।[১][২]

১৭৬৬ সালে, ইংরেজদের দীউয়ানি লাভের পর, প্রথম পুণ্যাহ উৎসব অনুষ্ঠিত হয় মুর্শিদাবাদ কোর্টে ইংরেজদের রাজনৈতিক আবাসস্থল মতিঝিলে। লর্ড ক্লাইভ এ উৎসবের সভাপতিত্ব করেন। তিনি এর প্রতি বিশেষ গুরূত্ব আরোপ করেছিলেন এবং প্রতিবছর এ উৎসব পালনের পক্ষে ছিলেন। তবে কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স ফোর্ট উইলিয়ম সরকারকে এ পুণ্যাহ উৎসব পালন না করার নির্দেশ দেন।[১][২]

ধরণসম্পাদনা

প্রধানত দুই ধরনের পুণ্যাহ উৎসবের প্রচলন ছিলো: সদর এবং মফস্বল।[১]

সদরসম্পাদনা

একে কেন্দ্রীয় পুণ্যাহ বলেও অভিহিত করা হতো। কেন্দ্রীয় পুণ্যাহ এমন এক ধরনের উৎসব যেখানে, জমিদার এবং অন্যান্য ভূস্বামিগণ উৎসব চলাকালীন বাংলার দীউয়ানের বাসভবনে অংশগ্রহণ করতেন। এবং সেখান থেকেই উৎসব পরিচালনা করেতন।[১]

মফস্বলসম্পাদনা

মফস্বল পুণ্যাহ উৎসব প্রধানত জমিদারের কাঁচারিতে অনুষ্ঠিত হতো। এ উৎসবে জমিদার এবং প্রজাবর্গের অংশগ্রহণ সত্ত্বেও, সমস্ত জমির স্থায়ী বন্দোবস্ত না থাকায় এ রীতি ক্ষীণভাবে প্রচলিত ছিলো। কারণ সমস্ত জমির স্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল না। কিছু শর্তে খাস জমি ইজারদারদেরকে দেওয়া হয়েছিল। খাস জমির বন্দোবস্তের জন্য জোতদার এবং ইজারাদারদের নিয়ে পুণ্যাহ উৎসব পালন করা হতো। এরূপ পুণ্যাহ উৎসব পূর্বে যেমন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হতো সেভাবে না হয়ে কালেক্টরেট দফ্তরে অনুষ্ঠিত হতো। জমিদারগণ পুণ্যাহ উৎসব চালু রেখেছিল। তারা বরং ব্যাপকভাবেই উৎসব পালন করতেন। ব্যাপকভাবে উৎসব পালন জমিদার ও প্রজাবর্গের মধ্যে স্বাতন্ত্রের চিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়।[১]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. বিলকিস রহমান (সম্পাদক)। "পুণ্যাহ"। [[বাংলাপিডিয়া]]ঢাকা: এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশ  ইউআরএল–উইকিসংযোগ দ্বন্দ্ব (সাহায্য)
  2. আসাদুজ্জামান স্বপ্ন। "ঐতিহ্যবাহী পুণ্যাহ উৎসব"। somriddhobangladesh.com। সংগ্রহের তারিখ জুন ২৫, ২০১৪ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]

বহিঃসংযোগসম্পাদনা