দক্ষিণ চীন সাগর

দক্ষিণ চীন সংলগ্ন সাগর

দক্ষিণ চীন সাগর হল পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের একটি প্রান্তিক সাগর। এটি প্রায় ৩৫,০০,০০০ বর্গ কিমি (১৪,০০,০০০ বর্গ মাইল) এলাকা জুড়ে উত্তরে দক্ষিণ চীনের তীর (নামের কারণ), পশ্চিমে ইন্দোচীন উপদ্বীপ, পূর্বে তাইওয়ান ও উত্তর-পশ্চিম ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ (প্রধানত লুসোন, মিন্দোরো এবং পালাওয়ান) এবং দক্ষিণে বোর্নিও, পূর্ব সুমাত্রা ও বাঙ্কা বেলিতুং দ্বীপপুঞ্জ দ্বারা পরিবেষ্টিত। এটি তাইওয়ান প্রণালী হয়ে পূর্ব চীন সাগর, লুসোন প্রণালী হয়ে ফিলিপাইন সাগর, পালাওয়ানের চারপাশের প্রণালীর মাধ্যমে সুলু সাগর (যেমন মিন্দোরোবালাবাক প্রণালী), সিঙ্গাপুর প্রণালী হয়ে মালাক্কা প্রণালী এবং কারিমাতাবাঙ্কা প্রণালী হয়ে জাভা সাগরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। থাইল্যান্ড উপসাগরতনকিনের উপসাগরও দক্ষিণ চীন সাগরের অংশ। রিয়াউ দ্বীপের দক্ষিণে অগভীর জলভাগ নাতুনা সাগর নামেও পরিচিত।

দক্ষিণ চীন সাগর
Mar de China Meridional - BM WMS 2004.jpg
দক্ষিণ চীন সাগরের উপগ্রহ চিত্র
দক্ষিণ চীন সাগর দক্ষিণ চীন সাগর-এ অবস্থিত
দক্ষিণ চীন সাগর
দক্ষিণ চীন সাগর
দক্ষিণ চীন সাগর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া-এ অবস্থিত
দক্ষিণ চীন সাগর
দক্ষিণ চীন সাগর
দক্ষিণ চীন সাগর এশিয়া-এ অবস্থিত
দক্ষিণ চীন সাগর
দক্ষিণ চীন সাগর
South China Sea.jpg
দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তর-পূর্ব অংশ
স্থানাঙ্ক১২° উত্তর ১১৩° পূর্ব / ১২° উত্তর ১১৩° পূর্ব / 12; 113
ধরনসাগর
যার অংশপ্রশান্ত মহাসাগর
নদীর উৎস
অববাহিকার দেশসমূহ
পৃষ্ঠতল অঞ্চল৩৫,০০,০০০ বর্গকিলোমিটার (১৪,০০,০০০ মা)
দ্বীপপুঞ্জList of islands in the South China Sea
ট্রেঞ্চManila Trench
জনবসতি

দক্ষিণ চীন সাগর অসাধারণ অর্থনৈতিকভূ-কৌশলগত গুরুত্বের একটি অঞ্চল। বিশ্বের সামুদ্রিক নৌ পরিবহনের এক-তৃতীয়াংশ সাগরটির মাধ্যমে সংগঠিত হয়, প্রতি বছর ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বাণিজ্য বহন করে।[১] বিশ্বাস করা হয়, যে সাগরটির সমুদ্রতলের বিশাল খনিজ তেলপ্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ নীচে রয়েছে।[২] এতে লাভজনক মৎস্যও রয়েছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লক্ষ লক্ষ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সম্মিলিতভাবে বেশিরভাগ ছোট জনবসতিহীন দ্বীপ, দ্বীপপুঞ্জ (কেস এবং শোলস), রিফ/এটলস এবং শত শত সংখ্যক সমুদ্রসীমার সমন্বয়ে বেশ কয়েকটি দ্বীপপুঞ্জের গুচ্ছ নিয়ে গঠিত দক্ষিণ চীন সাগর দ্বীপপুঞ্জ বিভিন্ন দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতিদ্বন্দ্বী দাবির অধীনে রয়েছে। এই দাবিসমূহ দ্বীপ ও সাগরের জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন নামের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়।

ভূতত্ত্বসম্পাদনা

 
ভিয়েতনামের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে মুই নে গ্রাম হতে দক্ষিণ চীন সাগরে সূর্যাস্তের' দৃশ্য

সাগরটি একটি ডুবে যাওয়া মহীসোপানের উপরে অবস্থিত; সাম্প্রতিক বরফ যুগের সময় বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠ শত শত মিটার নিচে ছিল এবং বোর্নিও এশীয় মূল ভূখণ্ডের অংশ ছিল।

দক্ষিণ চীন সাগর প্রায় ৪৫ মিলিয়ন বছর আগে উন্মুক্ত হয়েছিল, যখন দক্ষিণ চীন থেকে "বিপজ্জনক স্থল" ছিন্ন হয়েছিল। সমুদ্রতলদেশ প্রসারণ প্রক্রিয়া প্রায় ৩০ মিলিয়ন বছর আগে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যা দক্ষিণ-পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়েছিল, যার ফলে ইংরেজি "ভি" অক্ষরের আকৃতির অববাহিকা আমরা আজ দেখতে পাচ্ছি। সম্প্রসারণ প্রায় ১৭ মিলিয়ন বছর আগে বন্ধ হয়ে যায়।[৩] বেসিন গঠনে টেকটনিক এক্সট্রুশনের ভূমিকা নিয়ে যুক্তি অব্যাহত রয়েছে। পল ট্যাপোনিয়ার ও তার সহকর্মীরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে ভারতের সাথে এশিয়ার সংঘর্ষের ফলে এটি ইন্দোচীনকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ঠেলে দেয়। ইন্দোচীন ও চীনের মধ্যে আপেক্ষিক বিভক্ততার ফলে দক্ষিণ চীন সাগর উন্মুক্ত হয়।[৪] এই দৃষ্টিভঙ্গি ভূতাত্ত্বিকদের দ্বারা বিতর্কিত,[কে?] যারা ইন্দোচীনকে মূল ভূখণ্ড এশিয়ার তুলনায় অনেক দূরে সরিয়ে নিয়েছে বলে মনে করেন না। পিটার ক্লিফ্টের টনকিন উপসাগরে সামুদ্রিক ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, রেড নদী চ্যুতি কমপক্ষে ৩৭ মিলিয়ন বছর আগে সক্রিয় ও দক্ষিণ-পশ্চিম দক্ষিণ চীন সাগরের অববাহিকা গঠনের কারণ ছিল, যা এক্সট্রুশন সাগরের গঠনে একটি ভূমিকা পালন করে। উন্মুক্ত হওয়ার পরে দক্ষিণ চীন সাগর মেকং নদী, লাল নদীপার্ল নদী দ্বারা বিতরণ করা বিশাল পরিমাণ পলির সংগ্রহস্থল হয়ে ওঠে। এই বদ্বীপসমূহের মধ্যে বেশ কয়েকটি খনিজ তেল ও গ্যাসের মজুদে সমৃদ্ধ।

সম্পদসম্পাদনা

দক্ষিণ চীন সাগর ভূ-রাজনৈতিক অর্থে জলভাগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত সামুদ্রিক পথ, যখন পণ্য সম্ভারের (টন) পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের বার্ষিক বাণিজ্যিক নৌ বহরের ৫০% এরও বেশি মালাক্কা প্রণালী, সুন্দা প্রণালীলম্বক প্রণালী অতিক্রম করে। মালাক্কা প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন ১.৬ মিলিয়ন ঘনমিটার (১০ মিলিয়ন ব্যারেল) অপরিশোধিত খনিজ তেল প্রেরণ করা হয়, যেখানে ২০ শতকের মাঝামাঝি সময়ের তুলনায় অনেক কম হলেও নিয়মিত জলদস্যুতার খবর পাওয়া যায়।

অঞ্চলের মালিকানার দাবিসম্পাদনা

বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র দক্ষিণ চীন সাগরের উপর প্রতিযোগিতামূলক আঞ্চলিক দাবি করেছে। এই ধরনের বিরোধকে এশিয়ার সবচেয়ে সম্ভাব্য বিপজ্জনক বিন্দু হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী চীন (পিআরসি) ও প্রজাতন্ত্রী চীন (আরওসি, যা সাধারণত তাইওয়ান নামে পরিচিত) প্রায় সমগ্র সমুদ্রভাগকেই নিজেদের বলে দাবি করে, যা তাদের দাবিসমূহকে সীমানা "নাইন-ড্যাশ লাইন" নামে নির্ধারণ করা, যা উক্ত অঞ্চলের কার্যত অন্য সব রাষ্ট্রের দাবির সঙ্গে করে। প্রতিযোগিতামূলক দাবির মধ্যে রয়েছে:

চীন ও ভিয়েতনাম উভয়ই তাদের দাবির বিচারের ক্ষেত্রে জোরালো হয়েছে। চীন ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম প্রত্যেকে ১৯৭৪ সালের আগে প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জের কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণ করেছিল। ১৯৭৪ সালে একটি সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ফলে ১৮ জন চীনা ও ৫৩ জন ভিয়েতনামী মারা যায় এবং সেই সময় থেকে চীন সম্পূর্ণ প্যারাসেল নিয়ন্ত্রণ করে। স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জ একটি নৌ-সংঘর্ষমূলক স্থান হয়েছে, যেখানে ১৯৮৮ সালের মার্চ মাসে জনসন সাউথ রিফের দক্ষিণে ৭০ জনের বেশি ভিয়েতনামী নাবিক নিহত হয়েছিল। বিতর্কিত দাবিদাররা নিয়মিত নৌবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের খবর দেয়।

সাধারণভাবে আসিয়ান এবং বিশেষ করে মালয়েশিয়া নিশ্চিত করতে আগ্রহী ছিল, যে দক্ষিণ চীন সাগরের মধ্যে আঞ্চলিক বিরোধ যেন সশস্ত্র সংঘর্ষে পরিণত না হয়। যেমন, অঞ্চলটির ওপর সার্বভৌমত্বের সমস্যা মীমাংসা না করে যৌথভাবে এলাকার উন্নয়ন ও মুনাফা সমানভাবে ভাগ করে নেওয়ার দাবিতে ওভারল্যাপিং দাবির ক্ষেত্রে যৌথ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। এটি বিশেষত থাইল্যান্ড উপসাগরের ক্ষেত্রে সত্য। সাধারণত, চীন দ্বিপক্ষীয়ভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী দাবির সমাধান করতে পছন্দ করে,[৫] অপরদিকে কিছু আসিয়ান রাষ্ট্র বহুপাক্ষিক আলোচনা পছন্দ করে,[৬] কারণ তারা বিশ্বাস করে যে তারা বৃহৎ চীনের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সুবিধাবঞ্চিত এবং অনেক রাষ্ট্র কর্তৃক একই ভূখণ্ডের প্রতিযোগিতামূলক দাবীসমূহ শুধুমাত্র বহুপাক্ষিক আলোচনা মাধ্যমে কার্যকরভাবে সমাধান করা যায়।[৭]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. [১] ChinaPower, August 4, 2017.
  2. A look at the top issues at Asian security meeting Associated Press, Robin McDowell, July 21, 2011.
  3. Trần Tất Thắng, Tống Duy Thanh, Vũ Khúc, Trịnh Dánh, Đào Đình Thục, Trần Văn Trị and Lê Duy Bách (২০০০)। Lexicon of Geological Units of Viet Nam। Department of Geology and Mineral of Việt Nam। 
  4. Jon Erickson; Ernest Hathaway Muller (২০০৯)। Rock Formations and Unusual Geologic Structures: Exploring the Earth's Surface। Infobase Publishing। পৃষ্ঠা 91আইএসবিএন 978-1-4381-0970-1 
  5. "Direct bilateral dialogue 'best way to solve disputes'" 
  6. Resolving S.China Sea disputes pivotal to stability: Clinton archived from the original on 2010-07-27)
  7. Wong, Edward (ফেব্রুয়ারি ৫, ২০১০)। "Vietnam Enlists Allies to Stave Off China's Reach"দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস 

বহিঃসংযোগসম্পাদনা