ঢাকার নায়েব নাজিম

ঢাকা বা জাহাঙ্গীর নগরের প্রধান মুঘল রাজনৈতিক প্রশাসক

ঢাকার নায়েব নাজিম, দাপ্তরিক ভাবে জাহাঙ্গীর নগরের নায়েব নাজিম ছিলেন ১৮শ এবং ১৯শ শতকের মাঝামাঝি ঢাকা বা জাহাঙ্গীর নগরের প্রধান মুঘল রাজনৈতিক কর্মকর্তা যা বর্তমান বাংলাদেশের রাজধানী। এটি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলা দখলের সময় নামিক পদমর্যাদা সহ মুঘল বাংলার রাজনৈতিক অনুক্রমের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দপ্তর ছিলো।

মুঘল সাম্রাজ্যের সুবাহ বাংলার ঢাকার (জাহাঙ্গীরনগরের) নায়েব নাজিম
Asiatic Society Bangladesh.jpg
ঢাকার নায়েব নাজিমদের শেষ বাসভবন নিমতলী কুঠি-এর বেঁচে থাকা প্রবেশপথ
বাসভবনইসলাম খানের দুর্গ
বড় কাটরা
নিমতলী কুঠি 
নিয়োগকর্তাবাংলার নবাব (১৭১৭-১৭৭৯)
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (১৭৭৯-১৮৪৩)
গঠন১৭১৭
প্রথমখান মুহাম্মদ আলী খান
সর্বশেষগাজীউদ্দীন হায়দার
বিলুপ্ত১৮৪৩

নায়েব নাজিমগণ মুর্শিদাবাদে অবস্থিত বাংলার নবাবের প্রতিনিধি ছিলেন। রাজস্ব সংগ্রহ, মুঘল সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর বিষয়সমূহ এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাসহ পূর্ব বাংলার শাসনাদেশের জন্য নায়েব নাজিমরাই দায়ী ছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের পরবর্তী সময়ে, নায়েব নাজিমরা ইংরেজি সংস্কৃতি দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন; সাবলীল ইংরেজি ভাষায় কথা বলতেন এবং পশ্চিমা শিল্পকর্ম সংগ্রহ করতেন। ঊনিশ শতকের নায়েব নাজিম নুসরাত জংকে একজন ইংরেজপ্রেমিক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।

মুঘল ভারতের একটি শীর্ষস্থানীয় আর্থিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসাবে ঢাকার অবস্থান নায়েব নাজিমের কার্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছিল। নায়েব নাজিমগণ প্রথমে ইসলাম খানের দুর্গ এবং বড় কাটরায় বাস করতেন। নিমতলী কুঠি ছিল তাদের সর্বশেষ সরকারী বাসস্থান।[১]

নায়েব নাজিমদের শাসন এবং আমল নিয়াবত নামে পরিচিত ছিলো।[২] নিয়াবত আমলে ঢাকা ছিল সুবাহ বাংলার উপরাজধানী। নায়েব নাজিমদের পদমর্যাদা এবং সমতুল্যতাকে লেফটেন্যান্ট গভর্নরের অবস্থানের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। ১৯০৫-১৯১১ সাল পর্যন্ত স্বল্পস্থায়ী পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকার রাজনৈতিক বিশিষ্টতা পুনরুজ্জীবিত হওয়া অবধি ১৮৪৩ সালে নায়েব নাজিমের কার্যালয়ের বিলুপ্তির পরে বাংলার শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক শহর হিসাবে ঢাকার পতন ঘটে।

ইতিহাসসম্পাদনা

প্রধানমন্ত্রী মুর্শিদকুলী খান ঢাকার রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত করার পর ১৭১৬ থেকে ১৭১৭ সালের মধ্যে নায়েব নাজিমের পদ তৈরি করা হয়। সম্রাট ফররুখ সিয়ার মুর্শিদকুলী খানকে বাংলার সুবেদার হিসেবে নিয়োগদান করেছেন।

মুঘল সাম্রাজ্যের দরবারের প্রতিপত্তি কার্যত হ্রাস পাওয়ায় মুর্শিদকুলী খান সুবেদারের অবস্থানকে পুরুষানুক্রমিক নবাব উপাধি দিয়ে প্রতিস্থাপন করেছিলেন। সাবেক রাজধানী ঢাকায়, তিনি পূর্ব বাংলার প্রশাসনের জন্য প্রতিনিধি হিসেবে নায়েব নাজিমদের অভিষেক করেন। নায়েব নাজিমের কর্মকেন্দ্ররূপে জাহাঙ্গীরনগরের (ঢাকা) সূচনাকালের নায়েব নাজিম ছিলেন খান মুহম্মদ আলী খান (১৭১৭), ইতিশাম খান (১৭২৩-১৭২৬), ইতিশাম খানের এক পুত্র (১৭২৬-১৭২৭) এবং মির্জা লুৎফুল্লাহ্ ওরফে দ্বিতীয় মুর্শিদকুলী খান (১৭২৮-১৭৩৩)। সরফরাজ খানের আমলে, ঢাকার দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছিল।[২] আলীবর্দী খান বাংলা ও বিহারের নবাব হলে তিনি তাঁর সর্বজ্যেষ্ঠ ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা নওয়াজিশ মুহম্মদ খানের (ঘসেটি বেগমের স্বামী) উপর জাহাঙ্গীরনগরের নিয়াবত ন্যস্ত করেন। তিনি তাঁর প্রতিনিধি হোসেন কুলী খান (১৭৪০-১৭৫৪) এবং মুরাদ আলী খানের মাধ্যমে জাহাঙ্গীরনগরের শাসনকার্য পরিচালনা করেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলার আমলে জসরত খান ছিলেন জাহাঙ্গীরনগরের নায়েব নাজিম যিনি দুই মেয়াদে এ পদে বহাল ছিলেন। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। সংক্ষিপ্ত স্থগিতাদেশের পরে, জসরত খান ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সহায়তায় ১৭৪৮ সাল অবধি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। মুহাম্মদ রেজা খান ১৭৬৩, ১৭৭৫ এবং ১৭৭৯ সালে জসরত খানের শাসনে ব্যাঘাত ঘটান। জসরত খানের মৃত্যুর পরে তাঁর তিন নাতি হাশমত জং (১৭৭৯-১৭৮৫), নুসরত জং (১৭৮৫-১৮২২) এবং শামসুদ্দৌলা (১৮২২-১৮৩১) এ পদের অধিকারী ছিলেন।[৩] ১৭৬৫ থেকে ১৮২২ সাল পর্যন্ত তাঁরা ছিলেন ক্ষমতাহীন। ১৮২২ থেকে ১৮৪৩ সাল পর্যন্ত তাঁরা ছিলেন নিছক পদবি ও সামান্য ভাতার অধিকারী। ১৭৯৩ সাল থেকে নায়েব নাজিম পরিবারকে "ঢাকার নায়েব নাজিম" নামক নামিক রাজকীয় উপাধির সাথে উত্তরবেতন (পেনশন) দেওয়া হয়েছিল। এই নামিক পদটি ১৮৪৩ সালে দাপ্তরিক ভাবে বিলুপ্ত হয়।[৪] গাজীউদ্দীন হায়দার ছিলেন সর্বশেষ নায়েব নাজিম।[২] নিম্নোক্ত তালিকাটি ঢাকার নায়েব নাজিমদের[৫]:

  • খান মুহাম্মদ আলী খান (১৭১৭)
  • ইতিশাম খান (১৭২৩–১৭২৬)
  • ইতিশাম খানের এক পুত্র (১৭২৬–১৭২৭)
  • মির্জা লুতফুল্লাহ তাবরিজি (মুর্শীদকুলী খানের নাত-জামাতা (১৭২৮–১৭৩৪)
  • সরফরাজ খান (১৭৩৪–১৭৩৯)
    • গালিব আলী খান (১৭৩৪–১৭৩৮)
    • মুরাদ আলী খান (১৭৩৮–১৭৩৯)
  • আবদুল ফাত্তাহ খান (১৭৩৯–১৭৪০)
  • নওয়াজিশ মুহম্মদ খান (১৭৪০–১৭৫৪) (আলীবর্দী খানের জামাতা)
    • হোসেন কুলী খান (১৭৪০–১৭৫৪)
    • মুরাদ দৌলত (১৭৫৪–১৭৫৫)
  • জসরত খান (১৭৫৫–১৭৬২ এবং ১৭৬৫–১৭৭৮)
    • মোহাম্মদ আলী (১৭৬২–১৭৬২)
    • মোহাম্মদ রেজা খান (১৭৬৩–১৭৬৫)
  • হাশমত জং সৈয়দ মোহাম্মাদ (জসরত খানের জ্যেষ্ঠ নাতি) (১৭৭৯–১৭৮৫)
  • নুসরাত জং (জসরত খানের দ্বিতীয় নাতি) (১৭৮৫–১৮২২)
  • শামসুদ্দৌলা (জসরত খানের তৃতীয় নাতি) (১৮২২–১৮৩১)[৩]
  • জালালউদ্দীন মুহাম্মাদ কামরুদ্দৌলা (শামসুদ্দৌলার এক পুত্র) (১৮৩১–১৮৩৪)
  • গাজীউদ্দীন হায়দার (কামরুদ্দৌলার এক পুত্র) (১৮৩৪–১৮৪৩)

ব্রিটিশ আমলের ঢাকার নায়েব নাজিমগণ পশ্চিমা সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তারা ইংরেজি ভাষা শিখেছিলেন এবং পশ্চিমা শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। চালর্স ডয়লী বলেছেন যে, নুসরাত জংয়ের দরবার কক্ষ ইংল্যান্ডের মুদ্রিত ছবি ও চিত্রকর্মে ভরপুর ছিল। নুসরত জঙ্গ ছিলেন ইতিহাস ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে সুপন্ডিত ব্যক্তি এবং তিনি সাবলীল ইংরেজি বলতে পারতেন।[২] নুসরাত জং ছিলেন সর্বাপেক্ষা দীর্ঘস্থায়ী নায়েব নাজিম।[৬]

নিয়াবত আমলে ঢাকার ব্যবসা ও বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়। ঢাকা থেকে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির রপ্তানি চারগুণ বৃদ্ধি পায়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নায়েব নাজিমগণ ঢাকার ধনী আর্মেনীয় সম্প্রদায় এবং মারোয়াড়ি মহাজনদের উপর নির্ভর করতেন। মুসলিম শাসিত শহরটিতে হিন্দু বণিক শ্রেণীর বসবাস ছিল। শহরটিতে ওলন্দাজ, ফরাসি, ইংরেজ এবং পর্তুগিজ কারখানা ছিল।

ক্ষমতাসম্পাদনা

নায়েব নাজিমের বার্ষিক রাজস্ব ১ মিলিয়ন রাজকীয় রুপি ছিল, এ পরিমাণ অর্থ সেই যুগে খুব বেশি ছিল।[৭] একজন নায়েব নাজিমের কর্তব্যগুলি ছিল ন্যায়বিচার প্রণয়ন, বাণিজ্য পেশাজীবীদের তত্ত্বাবধান, বিদ্রোহী প্রজাদের চিহ্নিতকরন এবং শাস্তি প্রদান, রাজস্ব সংগ্রহ ও কোষাগারে জমা করা এবং সামরিক ঘাঁটি, দুর্গ এবং নৌবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। প্রশাসনিক ব্যয়ের জন্য, ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট এবং অন্যান্য জেলাগুলির রাজস্ব বরাদ্দ করা হয়েছিল। নৌবাহিনীর নৌযান ও কর্মীদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নদী পাড়ের সম্পত্তি নায়েব নাজিমদের মালিকানাধীন ছিলো। তবে, এসব সম্পত্তি ব্রিটিশরা ধীরে ধীরে জব্দ করেছিল। ১৭৫৭ সালে বাংলা দখলের পরও ১৭৯০ সাল পর্যন্ত ঢাকার নায়েব নাজিমদের রাজস্ব ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ছিল। বক্সারের যুদ্ধে মুঘলদের পরাজয়ের ফলে, নায়েব নাজিমদের ক্রিয়াকলাপ বহুলাংশে হ্রাস পায়।[২] ১৭৯০ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস নায়েব নাজিমদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বিলুপ্ত করেন। ১৭৯৩ সালে ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে হস্তান্তরিত হয়। পরবর্তী সময়ে নায়েব নাজিমগণ ভারতে কোম্পানি শাসনের অধীনে মুঘল আভিজাত্যের প্রতীক হিসাবে নামমাত্র পদবী ধারণ করেছিলেন।[২] ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর সমস্ত মুঘল পদসমূহ স্থায়ীভাবে বিলুপ্ত করা হয় যা ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যেকে রাজকীয় উপনিবেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার সূচনা করে।

বাসভবনসম্পাদনা

নায়েব নাজিমগণ ইসলাম খানের কিলা বা দুর্গে (বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার প্রাঙ্গনে অবস্থিত) বাস করতেন। কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পর কোম্পানির কর্মচারীরা দুর্গটি দখল করে নিলে নায়েব নাজিমরা বাসস্থান পরিবর্তন করে বড় কাটরা প্রাসাদে চলে যান। ১৭৬৬ সালে নিমতলী কুঠি নির্মিত হলে নায়েব নাজিম জসরত খান ঐ প্রাসাদে উঠে আসেন।[১][২]

রীতিনীতিসম্পাদনা

নায়েব নাজিমগণ মধ্যযুগীয় অলঙ্কার ও আড়ম্বরপূর্ণ বেশভূষা পরিধান করতেন। তারা সেরা মসলিন এবং রেশমের পোশাক পরতেন, হুক্কা পান করতেন, পোলো খেলতেন, শিকার ভ্রমণে বেড়াতে যেতেন এবং হারেম পালন করতেন। নায়েব নাজিমগণ প্রতিবছর জাঁকজমকপূর্ণ ঈদ শোভাযাত্রা বের করতেন।[৮]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Waqar A Khan। "Soolteen Sahib Of Dhaka"The Daily Star (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৮-২২ 
  2. ইসলাম, সিরাজুল (২০১২)। "নায়েব নাজিম"ইসলাম, সিরাজুল; করিম, কেএম। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ (দ্বিতীয় সংস্করণ)। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ 
  3. Allen, Basil Copleston (১৯১২)। Dacca : Eastern Bengal District Gazetteers (ইংরেজি ভাষায়)। Concept Publishing Company। আইএসবিএন 9788172681944 
  4. ইসলাম, সিরাজুল (২০১২)। "নওয়াব"ইসলাম, সিরাজুলবাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ (দ্বিতীয় সংস্করণ)। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ 
  5. Mamoon, Muntassir (২০১০)। Dhaka: Smiriti Bismiritir Nogori। Anannya। পৃষ্ঠা 143–144। 
  6. M H Haider। "Man And His Manuscript"Star Weekend (ইংরেজি ভাষায়)। The Daily Star। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৮-২২ 
  7. Golam Rabbani (১৯৯৭)। Dhaka: From Mughal Outpost to Metropolis। Upl। পৃষ্ঠা 14–19। আইএসবিএন 978-984-05-1374-1 
  8. "Eid in Paintings"The Independent। Dhaka। ২০১৬-০৭-০১। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-০৮-২২