কেরামতিয়া মসজিদ ও মাজার

মোঘল আমলের শেষের দিকের মসজিদ, রংপুর

কেরামতিয়া মসজিদ ও মাজার মোঘল আমলের শেষের দিকের একটি মসজিদ, রংপুর শহরের কাচারি বাজারের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত।[১]

কেরামতিয়া মসজিদ ও মাজার
কেরামতিয়া মসজিদ ও মাজার, রংপুর।.jpg
কেরামতিয়া মসজিদ ও মাজার, রংপুর
ধর্ম
অন্তর্ভুক্তিসুন্নি ইসলাম
অবস্থান
অবস্থানমুন্সিপাড়া, সিটি, রংপুর
পৌরসভারংপুর
স্থাপত্য
ধরনমসজিদ
স্থাপত্য শৈলীদেশীয স্থাপত্য
ধারণক্ষমতা৩,০০+ সালাত আদায়কারী একসাথে সালাত আদায় করতে পারে

ইতিহাসসম্পাদনা

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ভারতের জৈনপুর থেকে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইসলাম প্রচারের জন্য বাংলাদেশের রংপুরে আগমন করেছিলেন বিখ্যাত সুফি ও দরবেশ শাহ কারামত আলী জৌনপুরী (রহ.)। তার উদ্যোগে ও প্রচেষ্টায় রংপুর ও আশপাশে অনেক স্থানে গড়ে ওঠে অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকা ও সেবাকেন্দ্র। সে ধারাবাহিকতায় রংপুর কাচারি বাজারের অদূরে নির্মাণ করা হয় এই মসজিদ ও মাদ্রাসা। তার নামানুসারেই তার প্রতিষ্ঠিত এই মসজিদের নাম রাখা হয় কারামতিয়া মসজিদ। তবে স্থানীয় উচ্চারণে কেরামতিয়া মসজিদ নামেই প্রসিদ্ধ। ১২ জুন, ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে (১৮ মহররম, ১২১৫ হিজরি) ভারতের জৈনপুরে জন্মগ্রহণকারী এই মহান সাধক ৩০ মে, ১৮৭৩ বঙ্গে পরলোক গমন করেন। মৃত্যুর পর এই মসজিদের সামনেই তাকে সমাহিত করা হয়। [২][১] মসজিদটির সার্বিক বিষয় জেলা প্রশাসন রংপুর নিয়ন্ত্রণ করে।

পুরাতন মসজিদের বর্ণনাসম্পাদনা

উল্লিখিত মসজিদটি আয়তাকার । এর ভিতরের পরিমাপ ৪২ ফিট x ১৩ ফিট। পূর্ব ও পশ্চিম দেয়ালের প্রশস্ততা ৩ ফিট ৩ ইঞ্চি, উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালের প্রশস্ততা ২ ফিট ১০ ইঞ্চি। সম্ভবতঃ আধুনিকায়ন ও সংস্কার হেতু পরিমাপের  ক্ষেত্রে  কিছুটা বৈসাদৃশ্য  পরিলক্ষিত  হয়। সমতল ভূমি থেকে মসজিদের উচ্চতা ১৮ ফিট।

মসজিদটি  তিনটি (উঁচু) গোলাকার গম্বুজ বিশিষ্ট। গম্বুজগুলো অষ্টকোনা ড্রামের উপর ভর করে নির্মিত। প্রতিটি গম্বুজের  নিম্নাংশে মারলন অলংকরণ রয়েছে এবং গম্বুজের মধ্যে প্রস্ফুটিত পদ্মফুলের উপরে কলসমোটিফ ফিনিয়াল বা চূড়া স্থাপিত করা হয়েছে।

মসজিদটির প্রতিটি কোণে অষ্টভূজাকৃতি স্তম্ভ রয়েছে যার উপরে শোভা পাচ্ছে কিউপলা। এছাড়াও নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে বিভিন্ন খিলনাকৃতি ও প্যানেলের অলংকরণের পাশাপাশি ব্যান্ডের উপস্থিতিও  লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও মিহরাব,খিলান ও প্রধান প্রবেশদ্বারের উভয় পাশে অষ্টকোণাকৃতি স্তম্ভেও সন্নিবেশ দেখা যায় যার শীর্ষভাগে কিউপলা স্থাপিত রয়েছে। অপরদিকে উভয় খিলানের এবং পূর্বদিকের অপর দু’প্রবেশদ্বারের ও উল্লিখিত দরজার (উত্তর ও দক্ষিণ কোণে অবস্থিত) উভয়দিকে  ক্ষীণ স্তম্ভ (বিলা্স্টার) মূল দেওয়ালের সাথে যুক্ত দেখা যায়। এ স্তম্ভগুলোর উপরিভাগ পত্র পল্লব দ্বারা সুশোভিত এবং নিম্নাংশ কলসাকৃতির।

এ মসজিদের প্যারাপেট বা ছাদের  কিনারায় মারলন অলংকরণ লক্ষ্য করা যায়। প্রধান প্রবেশদ্বারগুলো চারকোনা খিলনাকৃতি এবং প্রতিটি প্রবেশদ্বারের উভয় দিকে পিলাস্টারের সন্নিবেশ রয়েছে।

প্রতিটি প্রবেশদ্বারে মিহরাব ও খিলানের অভ্যন্তরীণ অংশের  (ফ্রেনটনের) উপরিভাগে মারলন অলংকরণের সাথে লতাপাতা জড়ানো ফুলের নকশা দিয়ে সুশোভিত করা হয়েছে । এ মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ দেওয়ালে অবস্থিত কথিত দরজার কাঠামো পরিলক্ষিত  হয়। সম্ভবতঃ এগুলো আলো বাতাস প্রবেশ ও বেরুবার জন্যই পথ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। এ দরজার কাঠামোগুলোর কিছু অংশ মসজিদের মূল দেওয়ালের বর্ধিত অভ্যন্তরীণ উভয় ক্ষেত্রে  উদগত দেখা যায় এবং শীর্ষদেশে মারলন অলংকরণ  লক্ষ্য করা যায়।

এ মসজিদের প্রতিটি গোলাকার গম্বুজের (অভ্যন্তরীণ) নিচে সারিবদ্ধভাবে মারলন অলংকরণ দেখা যায় এবং গম্বুজগুলো স্কুইন্স ও পেনডেনটিভ (ঝুলন্ত) খিলানের আর্চের উপর ভর করে সুকৌশলে নির্মিত। এ মসজিদটির গঠন মোঘল আমলের শেষের দিকের মসজিদের মতো। তাই এটা ঐ সময়ে নির্মিত হয়েছিল বলে রংপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থে উল্লখ আছে।[১][৩][৪][৫]

নতুন মসজিদের বর্ণনাসম্পাদনা

পরবর্তীতে মসজিদের সম্প্রসারণ করা হলে মাওলানা কারামত আলী জৈনপুরী (রহ.)-এর মাজারটিও মসজিদের মূল অবকাঠামোর ভেতরে চলে আসে। বর্তমানে মসজিদের পূর্ব দিকে বারান্দার একটু আগ দিয়ে একটি দেওয়ালঘেরা কক্ষের ভেতরে তার ও তার সহধর্মিণীর কবর অবস্থিত। মাওলানা কেরামত আলী জৈনপুরী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করার জন্য প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন এখানে আসেন। শুক্রবার এই মসজিদে প্রচুর লোক সমাগম ঘটে। তিনতলা এই মসজিদের ভেতরে কয়েক হাজার মুসল্লি এক সঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। নারীদের জন্যও নামাজ পড়ার সুব্যবস্থা রয়েছে এই মসজিদে।[৬][১]

যোগাযোগসম্পাদনা

রংপুরের জিরোপয়েন্টের কাছারি বাজার এলাকা থেকে মাত্র ১০০ গজ দক্ষিণে মুন্সিপাড়া। এ পাড়ারই এক বিশাল মাঠের পাশে কেরামতিয়া জামে মসজিদ(Keramotia Masjid Majar ) অবস্থিত। পাশেই শ্যামাসুন্দরী খাল। ঢাকার মহাখালী, কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর এবং গাবতলী থেকে রংপুরগামী বেশ কয়েকটি বিলাস বহুল এসি ও নন এসি বাস রয়েছে। এসব বাসের ভাড়া ৫শ’ টাকা থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে। এছাড়া কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে রংপুর এক্সপ্রেস সোমবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টায় রংপুরের উদ্দেশে ছেড়ে আসে। রংপুরে ট্রেন ভাড়া ২শ’ থেকে ৭শ’ টাকা। ঢাকা থেকে রংপুর আসতে সময় লাগবে সাড়ে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা। ট্রেনে লাগবে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা।[৭]

আরও দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. পরিষদ, সম্পাদনা (২০০০)। রংপুর জেলার ইতিহাস। রংপুর: রংপুর জেলা প্রশাসন। পৃষ্ঠা ৪৬২–৪৬৩। 
  2. "রংপুরে ঐতিহ্যের নিদর্শন কেরামতিয়া মসজিদ"www.shomoyeralo.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৭-০৫ 
  3. "রংপুর জেলা" |ইউআরএল= এর মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য)http (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৭-০৫ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  4. "My Tour BD"mytourbd.com। ২০২১-০৭-০৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৭-০৫ 
  5. "রংপুরে ঐতিহ্যের নিদর্শন কেরামতিয়া মসজিদ"www.shomoyeralo.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৭-০৫ 
  6. "রংপুরে ঐতিহ্যের নিদর্শন কেরামতিয়া মসজিদ"www.shomoyeralo.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৭-০৫ 
  7. "রংপুর জেলা" |ইউআরএল= এর মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য)http (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৭-০৫ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]