এলু আধুনিক সিংহলি এবং ধিবেহী ভাষার প্রাচীনতম রূপ। এই ভাষাটি সিংহলের কোনো কোনো স্থানে 'হিলু', 'হেলা' বা 'হেলু' নামেও পরিচিত। আনুমানিক খ্রিস্টীয় ৭০০ থেকে ১৪০০ পর্যন্ত এই ভাষা প্রচলিত ছিলো। পালি ভাষা বিশারদ টমাস উইলিয়াম রিস ডেভিডস এলু-কে "সিংহলের প্রাকৃত" রূপে উল্লেখ করেছেন।[১] সিংহলে দুটি ভাষা বিদ্যমান- ১। সিংহলী (সীহল) ভাষা, এটি আর্যগোষ্ঠীর ভাষা; এটি বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, গুজরাটির মতো ভারতের আদি আর্য ভাষা (বৈদিক সংস্কৃত) থেকে উদ্ভূত। এবং ২। দ্রাবিড়-গোষ্ঠীর তামিল ভাষাপশ্চিম ভারত (লাট, বা লাড়<লাল>, অর্থাৎ দক্ষিণ সিন্ধুপ্রদেশ ও গুজরাত) হতে ঐ অঞ্চলের প্রাকৃত ভাষাকে নিয়ে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রকের দ্বিতীয়ার্ধ হতে ভারতীয় আর্যভাষী ঔপনিবেশিকেরা লঙ্কা দ্বীপে গিয়ে বসবাস করতে শুরু করে। লঙ্কা দ্বীপে বা সিংহলে এই ভারতীয় আর্যভাষা পরিবর্তন-ধর্ম অনুসারে এবং নতুন পরিবেশের প্রভাবে বিশিষ্ট পথে চলতে থাকে। দীর্ঘ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বৈদিক সংস্কৃত পশ্চিম ভারতের প্রাকৃত বা লাট প্রাকৃতের রূপ লাভ করে। অতঃপর তা খ্রীস্ট জন্মের অব্যবহিত পূর্ব হতে খ্রিস্টীয় সপ্তম-অষ্টম শতকের মধ্যবর্তী সময়ে সিংহলী প্রাকৃতের রূপ ধারণ করে। এরপর তার নাম হয় সিংহলী অপভ্রংশ যার লোক-প্রচলিত নাম নাম 'এলু'। আনুমানিক ১৫০০ খ্রীস্টাব্দের পর হতে তা আধুনিক বা নব্য সিংহলীর রূপ ধারণ করে।[২] এলু নামের ব্যুৎপত্তি এইভাবে হওয়া সম্ভবঃ ' সিংহল > সীহলো > সীহলু > হিঅলু > হেলু > এলু'- এই শব্দের 'ল' হলো মূর্ধণ্য 'ল', যা বৈদিক সংস্কৃতে ও কোনো কোনো প্রাকৃতে বিদ্যমান ছিলো, এবং এখনও পাঞ্জাবী, সিন্ধী, রাজস্থানী, গুজরাতী, মারাঠি ও ওড়িয়াতে এই 'ল'-এর অস্তিত্ব আছে।

এলু
হিলু, হেলু, হেলা
অঞ্চলশ্রীলঙ্কা
যুগসিংহলিধিবেহী
ভাষা কোডসমূহ
আইএসও ৬৩৯-৩

এলুর নিদর্শনসম্পাদনা

সিংহলের প্রাকৃতের প্রাচীনতম নিদর্শন ব্রাহ্মীলিপিতে লেখা খ্রীস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের কতকগুলিতে শিলালিপিতে পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে খ্রিস্টীয় পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকের সিংহলী প্রাকৃতের কোনো বই মেলেনি, কেবল সিগিরিয়া পাহাড়ের গায়ে আঁচড়-কাটা কতকগুলি ছোটো ছোটো কতকগুলি কবিতা পাওয়া যায়। পরে এই প্রাকৃত যখন এলুর রূপ ধারণ করে, তখন থেকে এই এলুতে রচিত কিছু গদ্য পুস্তক পাওয়া যায়। ' দম-পিয়-অটু-ব-গ্যাটপদ-সন্নয়' - ধর্মপদ গ্রন্থের শব্দের টীকা- খ্রিস্টীয় দশম শতকে লিখিত এলুর সর্বপ্রাচীন উপলবদ্ধ পুস্তক। বুদ্ধদেবের শিক্ষাবিষয়ক গ্রন্থ 'অমা-রতুব' (অমৃত স্রোত) রাজা প্রথম অগগবোধি বা অগ-বো-র সময়ে লিখিত, এইধরনের ইতিকথা আছে, বৌদ্ধ ধর্ম ও ইতিহাস সংক্রান্ত আরও কতকগুলি বই এলুতে পাওয়া যায়। 'সিদত-সঙ্গরাব' এলু ভাষায় রচিত প্রাচীনতম ব্যাকরণ। ধীরে ধীরে এলু পঞ্চদশ শতক হতে আধুনিক সিংহলীতে রূপান্তরিত হতে শুরু করে এবং সেইসাথে এলুর কিছু লক্ষ্যনীয় বৈশিষ্ট্য পরিস্ফূট হয়। যেমন - ব্যাপকভাবে সংস্কৃত বা আদি আর্য-ভাষার ধ্বনি বিলোপ, ধ্বনি পরিবর্তন ও স্বরধ্বনির লোপ ঘটতে দেখা যায়। যেমন- 'হস্ত > অৎ ; দন্ত > দৎ ; বোধি > বোহি > বই > বো ; ঘৃত > গিয় > গী ; সিংহ > সী, ' ইত্যাদি। আধুনিক সিংহলীতে আজকাল প্রচুর সংস্কৃত, (তৎসম) ও পালি শব্দ ব্যবহৃত হয় ; এর ফলে শুদ্ধ এলুর ব্যবহার হ্রাস পেয়েছে।

পালি ও সংস্কৃতের সাথে এলুর সম্পর্কসম্পাদনা

প্রকৃতই এলু একটি প্রাকৃত ভাষা হওয়ার কারণে পালি প্রভৃতি প্রাকৃতের সাথে এর নিবিড় যোগ। এলুর শব্দভাণ্ডারের একটা বড় অংশের সঙ্গে পালির হুবহু মিল, যে কারণে বিভিন্ন শব্দগত ও রূপগত পরিবর্তন অতি সহজে পালি বা সংস্কৃত থেকে এলু নিজের করে নিতে পেরেছে। তাই কখনও কখনও এলু ভাষার কোনো শব্দ প্রকৃতই তা প্রাচীন প্রাকৃত থেকে এসেছে না সংস্কৃত ভাষা থেকে এসেছে তা বোঝা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

আরও দেখুনসম্পাদনা

  • ও ডি বি এল- সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়
  • Linguistic history of the Indian subcontinent
  • Sir Henry Yule, A. C. Burnell, William Crooke (2006), A glossary of colloquial Anglo-Indian words and phrases, Asian Educational Services, p. 344, আইএসবিএন ০-৭০০৭-০৩২১-৭

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Rhys Davids, Thomas William (2007). Buddhist India. T. W. Press. আইএসবিএন ৯৭৮-১৪০৬৭৫৬৩২৬.
  2. ভারতকোষ, দ্বিতীয় খণ্ড, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, কোলকাতা।