পাক-পাঞ্জাতন এর অর্থ পবিত্র পাঁচজন। আহ্‌লে বাইতের চারজন অর্থাৎ হযরত ফাতিমা , উনার স্বামী হযরত আলী এবং দুই পুত্র হযরত হাসান হযরত হোসাইন এবং রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম এই পবিত্র পাঁচজনকে একত্রে বলা হয় পাক-পাঞ্জাতন। পাক-পাঞ্জাতনের হাকীকত হতেই অন্যান্য নবী-রাসূল সাহাবীগণ ও ওলীগণসহ সমগ্র মাখলূক সৃষ্টি করা হয়। রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ, যেহেতু আহ্‌লে বাইত তাঁর থেকে পৃথক নন, অবিচ্ছিন্ন, সেহেতু পাক-পাঞ্জাতনও সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ।[১][২]

পাক-পাঞ্জাতনের সদস্যবৃন্দসম্পাদনা

  1. মুহাম্মাদ
  2. হযরত ফাতিমা যোহরা
  3. আলী
  4. হযরত হাসান
  5. হযরত হোসাইন

পাক-পাঞ্জাতন সম্পর্কে কুরআনের আয়াতসম্পাদনা

  • কুরআন শরীফে আল্লাহ্‌ তা'আলা বলেন,
হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌নে আব্বাস এই আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে নবীজী -এর নিকট আরয করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ্‌! হে মহান আল্লাহ্‌র রাসূল -আপনার নিকট-আত্মীয়দের ভালবাসা আমাদের উপর ওয়াজিব হয়ে গেছে। আপনার নিকট-আত্মীয় কারা? রাসূলুল্লাহ্‌ বললেন, “আলী, ফাতিমা, হাসান ও হোসাইন আমার নিকট আত্মীয়।” —তাফসীরে কবীর।
  • কুরআন শরীফে আল্লাহ্‌ তা'আলা বলেন,
হযরত আয়শা বলেন, “একদা ভোরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একখানা কালো বর্ণের পশমী নকশী কম্বল গায়ে দিয়ে বের হলেন। এমন সময় হাসান ইব্‌নে আলী সেখানে এলেন, তিনি তাঁকে কম্বলের ভিতর ঢুকিয়ে নিলেন, তারপর হোসাইন এলেন, তাঁকেও হাসানের সাথে ঢুকিয়ে নিলেন, তারপর ফাতেমা এলেন তাঁকেও ভিতরে ঢুকিয়ে নিলেন। তারপর আলী এলেন, তাঁকেও এর ভিতর ঢুকিয়ে নিলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্‌ কুরআনের উক্ত আয়াতটি পাঠ করেন। —মুসলিম, মেশকাত।
কোন কোন রেওয়াতে এরূপ রয়েছে যে, উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করার পর তিনি বললেনঃ “হে আল্লাহ্‌! এরাই আমার আহ্‌লে বাইত।” —ইব্‌নে জরীর।

পাক-পাঞ্জাতন সম্পর্কে হাদীসসম্পাদনা

  • হযরত সাদ ইব্‌নে আবূ ওয়াক্কাস বলেন, যখন ‘সূরা আল ইমরান’ আয়াত (৩:৬১) নাযিল হল, তখন রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম হযরত আলী, ফাতিমা, হাসান এবং হোসাইনকে ডাকলেন এবং বললেন, “ইয়া আল্লাহ্‌! এরা সকলে আমার আহ্‌লে বাইত” —মুসলিম মেশকাত।[৫]
  • হযরত যায়দ ইব্‌নে আরকাম বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমি তোমাদের মাঝে এমন জিনিস রেখে যাচ্ছি যদি তোমরা তা শক্ত করে ধরে রাখ, তবে আমার পর তোমরা আর কখনও গুমরাহ হবে না। এর মধ্যে একটি আরেকটি অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। একটি হল আল্লাহ্‌র কিতাব উহা একটি লম্বা রশি সদৃশ্য। যা আসমান হতে যমীন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ। আর দ্বিতীয়টি হল, আমার আহ্‌লে বাইত। এ দুটি বস্তু কখনও বিচ্ছিন্ন হবে না। অবশেষে এরা হাউযে কাউসারে আমার সাথে মিলিত হবে। সুতরাং ওদের সাথে কিরূপ আচরণ করছে তৎপ্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখবে।” —তিরমিযী, মেশকাত।
  • হযরত জাবির বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেছি, তিনি বিদায় হজ্জে আরাফার দিন তাঁর ‘কাসওয়া’ নামক উষ্ট্রীর উপর সওয়ার অবস্হায় ভাষণ দান করেছেন। আমি শুনেছি তিনি ভাষণে বলেছেন, “হে লোক সকল! আমি তোমাদের মাঝে এমন জিনিস রেখে যাচ্ছি তোমরা যদি তা শক্তভাবে ধরে রাখ, তবে কখনও গুমরাহ হবে না। তা হল, আল্লাহ্‌র কিতাবআমার আহ্‌লে বাইত।” —তিরমিযী, মেশকাত।
  • হযরত ইব্‌নে আব্বাস হতে বর্ণিত আছে, মহানবী বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমার বংশধরদের (আহ্‌লে বাইতের) উপর দরুদ না পড়ে শুধু আমার উপর দরুদ পড়লো, আল্লাহ্‌পাক তার দরুদ কবূল করবেন না।” —দারে কুতনী, বায়হাকী।
  • রাসূলুল্লাহ্‌ বলেছেন, “নিশ্চয়ই আলী কুরআনের সাথে ও কুরআন আলীর সাথে।” —মুসতাদরাক আলাস সাহিহাইন লিল হাকিম
  • হযরত ইব্‌নে আব্বাস বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা আল্লাহ্‌কে মহব্বত কর। কেননা তিনি তোমাদের রিযিকের মাধ্যমে অনুগ্রহ করে থাকেন। আমাকে ভালবাস, যেহেতু আমি আল্লাহ্‌র হাবীব। আর আমার মহব্বতে আমার আহ্‌লে বাইতকে মহব্বত কর।” — তিরমিযী, মেশকাত।
  • হযরত আলী থেকে বর্ণিত, মহানবী বলেছেন, “যে ব্যক্তি আলী , ফাতিমা , হাসান এবং হোসাইন -কে ভালবাসে, সে আমাকে ভালবাসে। যে ব্যক্তি তাঁদের সাথে বিদ্বেষভাব পোষণ করে, সে আমার সাথে বিদ্বেষ ভাব রাখে।” —মাজহারে হক।
  • হযরত যায়দ ইব্‌নে আরকাম বৰ্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম হযরত আলী, ফাতেমা, হাসান ও হোসাইন সম্পর্কে বলেছেন, “যে কেউ ওদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে, আমি তাদের শত্রু। পক্ষান্তরে যে তাঁদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে, আমি তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করব।” —তিরমিযী, মেশকাত।
  • হযরত মিসওয়ার ইব্‌নে মাখরামা হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “ফাতিমা আমার (দেহেরই) একটি টুকরা, যে তাঁকে রাগান্বিত করবে, সে নিশ্চয়ই আমাকে রাগান্বিত করবে।” —মুয়াত্তা, মেশকাত।
  • অপর এক রেওয়ায়েতে আছে, “আমাকে সেই বস্তুই অস্থির করে যেই বস্তু ফাতিমাকে পেরেশানীতে ফেলে এবং সেই জিনিসই আমাকে কষ্ট দেয়, যা তাঁকে কষ্ট দেয়।” —মুয়াত্তা, মেশকাত।
  • হযরত হুবশী ইব্‌নে জুনাদাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আলী আমা হতে, আর আমি আলী হতে। আমার পক্ষ হতে কেউ দায়িত্ব পালন করতে পারবে না, আমি অথবা আলী ব্যতীত।” —তিরমিযী, আহমদ, মেশকাত।
  • হযরত যায়দ ইব্‌নে আরকাম বৰ্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমি যার বন্ধু, আলীও তার বন্ধু।” —তিরমিযী, আহমদ, মেশকাত।
  • হযরত উম্মে সালমা বৰ্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ্‌ বলেছেন, “কোন মুনাফিক আলীকে মহব্বত করে না, কোন মুমিন আলীর প্রতি হিংসা রাখে না।” —আহমদ, তিরমিয়ী, মেশকাত।
  • হযরত উম্মে সালমা অপর একটি হাদীসে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি আলীকে গালি দিল, সে যেন আমাকেই গালি দিল।”—আহমদ, মেশকাত।
  • হযরত উসামা ইব্‌নে যায়দ বলেন, একদা এক প্রয়োজনে রাতের বেলায় আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লামের খেদমতে গেলাম। তখন নবীজী এমন অবস্হায় বের হলেন যে, তিনি চাঁদর দ্বারা গায়ের সাথে কি একটি জিনিস জড়িয়ে রেখেছেন কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি সে জিনিসটি কি। অতঃপর যখন আমি প্রয়োজন সেরে তাঁর নিকট হতে অবসর হলাম, তখন জিজ্ঞেস করলাম, চাঁদরের ভিতর আপনি কি জিনিস জড়িয়ে রেখেছেন? তখন তিনি চাঁদরখানা সরিয়ে ফেললে দেখলাম হাসান ও হোসাইন দু’জন দুই উরুতে বসে রয়েছেন। অতঃপর তিনি বললেন, “এরা দু’জন আমার পুত্র, আমার তনয়ার পুত্র। হে আল্লাহ্‌! আমি এদের দু’জনকে ভালবাসি, আপনিও তাঁদের ভালবাসুন।” —তিরমিযী, মেশকাত।
  • বুখারীর এক রেওয়ায়েতে আছে, হযরত রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “হাসান ও হোসাইন এরা দুইজন দুনিয়াতে আমার দু’টি সুগন্ধি পুষ্প বিশেষ।”
  • হযরত যায়দ ইব্‌নে আরকাম বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম মক্কা-মদীনার মধ্যবর্তী ‘খোম’ নামক জলাশয়ের নিকট দাঁড়িয়ে আমাদের নিকট ভাষণ দান করলেন। প্রথমে আল্লাহ্‌র হামদ্‌ ও সানা বর্ণনা করলেন। এরপর ওয়ায ও নসীহত করলেন। তারপর বললেন, “আম্মাবাদ, সাবধান! হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আমি একজন মানুষ, অচিরেই আমার নিকট আল্লাহ্‌র দূত (মালিকুল মউত) আসবে, তখন আমি আমার রব্বের আহবানে সাড়া দেব। আমি তোমাদের মাঝে দু’টি মূল্যবান সম্পদ রেখে যাচ্ছি। তার মধ্যে প্রথমটি হল আল্লাহ্‌র কিতাব এর মধ্যে রয়েছে হেদায়েত ও নূর। অতএব তোমরা আল্লাহ্‌র কিতাবকে খুব শক্তভাবে আঁকড়ে ধর এবং দৃঢ়তার সাথে এর বিধি-বিধান মেনে চল।” আল্লাহ্‌র কিতাবের নির্দেশাবলী কঠোরভাবে মেনে চলার জন্য খুব বেশি উদ্ধুদ্ধ ও উৎসাহিত করলেন। তারপর বললেন, “আর দ্বিতীয়টি হল, আমার আহ্‌লে বাইত। আমি তোমাদেরকে আমার আহ্‌লে বাইত সম্পর্কে আল্লাহ্‌র তরফ হতে বিশেষভাবে নসীহত করছি। আমি তোমাদের আমার আহ্‌লে বাইত সম্পর্কে বিশেষ নসীহত করছি।” —মুসলিম, মেশকাত।
  • হযরত আবূ যর গিফারী হতে বর্ণিত আছে, তিনি কাবা ঘরের দরজা ধরে বললেন, “আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, “সাবধান! আমার আহ্‌লে বাইত হল তোমাদের জন্য নূহ (আ)-এর নৌকার মত, যে এতে আরোহণ করবে, সে রক্ষা পাবে। আর যে তা হতে পশ্চাতে থাকবে, সে ধ্বংস হবে।” —আহমদ, মেশকাত।[১]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. শায়েখ আলাউদ্দীন খান আল ক্বদমী(মা. আ.) (২০০১)। খোশ আমদেদ ইমাম মাহ্‌দী 
  2. শায়েখ আলাউদ্দীন খান আল ক্বদমী(মা. আ.) (১৯৯৬)। মা’রিফাত ও দীদার-এ-ইলাহী 
  3. কুরআন ৪২:২৩
  4. কুরআন ৩৩:৩৩
  5. কুরআন ৩:৬১