অটো ফন বিসমার্ক

জার্মান সাম্রাজ্যের স্থপতি ও ১৮৭১-১৮৯০ পর্যন্ত এর প্রথম চ্যান্সেলর ছিলেন।
(Otto von Bismarck থেকে পুনর্নির্দেশিত)

অটো ফন বিস্‌মার্ক (জার্মান: Otto von Bismarck) (১লা এপ্রিল, ১৮১৫, শ্যোনহাউসেন, আল্টমার্ক, প্রুশিয়া - ৩০শে জুলাই, ১৮৯৮, ফ্রিডরিশরু, হামবুর্গ-এর কাছে) জার্মান সাম্রাজ্যের স্থপতি ও ১৮৭১-১৮৯০ পর্যন্ত এর প্রথম চ্যান্সেলর ছিলেন। তার পূর্ণ নাম অটো এডুআর্ড লেওপোল্ড, ফুর্স্ট (রাজপুত্র) ফন বিসমার্ক, গ্রাফ (কাউন্ট) ফন বিসমার্ক-শ্যোনহাউসেন, হের্‌ৎসগ (ডিউক) ফন লাউয়েনবুর্গ (Otto Eduard Leopold, Fürst von Bismarck, Graf von Bismarck-Schönhausen, Herzog von Lauenburg)। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তিনি রক্ষণশীল ছিলেন, কিন্তু বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি চাতুর্যের পরিচয় দেন। বিশেষ করে ১৮৭১ সালের পরে তিনি কতগুলি মিত্ররাষ্ট্রসংঘ গড়ে তোলেন এবং বেশ কিছু কূটনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ইউরোপে শান্তি নিশ্চিত করে সেখানে জার্মানির নিজস্ব স্থান প্রতিষ্ঠিত করেন।

অটো ফন বিস্‌মার্ক

বিসমার্ক গ্যোটিঙেন ও বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়েন। পড়া শেষ করে তিনি প্রুশীয় প্রশাসনে যোগ দেন এবং আখেন শহরে একজন বিচারকার্যীয় প্রশাসক হন। তার কাজের পদ্ধতি গতানুগতিক না হওয়ায় সিনিয়রদের বিরাগভাজন হন এবং ২৪ বছর বয়সে প্রশাসন থেকে ইস্তফা দেন। ১৮৪৭ সালে তিনি প্রুশিয়ার আইনসভা ডিয়েটের সদস্য হন। ১৮৫১ সালে ফ্রাংকফুর্ট আম মাইনের জাতীয় আইনসভাতে তিনি প্রুশিয়ার প্রতিনিধিত্ব করে আলোচনায় আসেন। ১৮৫৯ সালে তাকে রাশিয়াতে রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয়। ১৮৬২ সালের মার্চে তাকে ফেরত আনা হয় এবং এবার ফ্রান্সে রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয়। ১৮৬২ সালে তিনি বার্লিনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফেরত আসেন। তিনি প্রাশিয়ার নেতৃত্বে জার্মানিকে একত্রিত করার কাজে মনোনিবেশ করেন। ১৮৬৬ সালে যুদ্ধে তিনি অস্ট্রিয়াকে পরাজিত করেন এবং জার্মানি থেকে দেশটিকে বিচ্ছিন্ন করে দেন। ১৮৭০ সালের ১৯শে জুলাই ৩য় নেপোলিয়ন প্রুশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে দক্ষিণের জার্মান রাষ্ট্রগুলি উত্তরের জার্মান রাষ্ট্রগুলির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। যুদ্ধে জার্মানদের বিজয়ের পর তারা রাজনৈতিকভাবে একতাবদ্ধ হয়ে জার্মান সাম্রাজ্যের জন্ম দেয়।

১৮৭১ সালের মধ্যে প্রুশিয়ান আধিপত্য সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে, বিসমার্ক একটি শান্তিপূর্ণ ইউরোপে জার্মানির অবস্থান বজায় রাখতে দক্ষতার সাথে ক্ষমতার কূটনীতির ভারসাম্য বজায় রেখেছিলেন। ইতিহাসবিদ এরিক হবসবামের মতে, ''বিসমার্ক ১৮৭১ সালের পর প্রায় বিশ বছর বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক দাবা খেলায় অবিসংবাদিত বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ছিলেন, [এবং] ক্ষমতার মধ্যে শান্তি বজায় রাখার জন্য একচেটিয়াভাবে এবং সফলভাবে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।" [১] যাইহোক, আলসেস-লোরেন (এলসাস-লথ্রিংজেন) এর সাথে তার সংযুক্তি ফরাসি জাতীয়তাবাদ এবং জার্মানোফোবিয়াকে নতুন জ্বালানী দেয়। [২]

বিসমার্ক ছিলেন নতুন জার্মান সাম্রাজ্যের নায়ক। তাকে চ্যান্সেলর উপাধি দেয়া হয়। তিনি জার্মানির প্রশাসনে সংস্কার সাধন করেন। গোটা জার্মানির জন্য এক মুদ্রা, একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এবং একই দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইনের প্রবর্তন করেন। তিনি ১৮৭৮ সালে বার্লিন কংগ্রেসের সভাপতিত্ব করেন এবং বৃহৎ শক্তিগুলির মধ্যস্থতাকারী হিসবে পরিচয় লাভ করেন। ১৮৭৯ সালে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের সাথে মিত্রতার বন্ধন স্থাপন করেন। অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে সমাজতন্ত্রবিরোধী হলেও বিসমার্কই ইউরোপের প্রথম নেতা হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন এবং শ্রমিকদের জন্য দুর্ঘটনা, অসুস্থতা ও বার্ধক্যসংক্রান্ত বীমার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু ১৮৯০ নাগাদ তার নীতিগুলির বিরোধীর সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং ঐ বছর মার্চে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন। জীবনের শেষ বছরগুলি তিনি আত্মজীবনী রচনায় কাটিয়ে দেন। তার বিখ্যাত উক্তি ছিল "The great questions of the day are not decide by speeches and majority votes,but by blood and iron."

চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পাদনা

▪১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দের ১লা এপ্রিল বিসমার্ক জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম অটো এডওয়ার্ড লিওপোল্ড ভন বিসমার্ক। জার্মানির অন্তর্গত ব্রান্ডেনবার্গ প্রদেশের স্কয়েনহ্সেন জমিদার ভবনে বিসমার্ক ভূমিষ্ঠ হন।

▪গটিনজেন্ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন ও ইতিহাস শিক্ষায় প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন।

▪ভাষায় বিসমার্কের প্রভূত অধিকার জন্মেছিল। আইন, সাহিত্য, ইতিহাসে তিনি সবিশেষ ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিলেন।

▪হেগেলের দর্শনশাস্ত্র তাঁর চিত্তে কোনরূপ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।

▪ইতিহাস পাঠে বিসমার্কের প্রভূত আনন্দ পেতেন।

▪বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় ডক্টর অফ ল উপাধি লাভ করেন।

▪খ্রিস্ট ধর্মের প্রতি বিশ্বাস ছিল বলে তিনি রাষ্ট্রবিপ্লব ও সমাজতন্ত্রতার পক্ষপাতী হতে পারেননি। তিনি একদিন বলেছিলেন, "আমি খ্রিস্টান না হলে সাধারণ তন্ত্রের উপাসক হতাম।"

▪তিনি যুদ্ধের পক্ষপাতী ছিলেন বটে কিন্তু যুদ্ধে তার নেশা ছিল না।

রাজতন্ত্র সম্বন্ধে বিসমার্কসম্পাদনা

আমাদের রাজার ক্ষমতা অপরিসীম, তাঁর রাজত্ব কোন নির্দিষ্ট নিয়মের অধীন নয়। প্রজার অনুগ্রহের ফলে আমাদের দেশের রাজা সিংহাসন অধিকার করেন নি। ভগবানের আশীর্বাদেই তিনি প্রাশিয়ার রাজদণ্ড পরিচালনা করছেন। আমাদের অসীম ক্ষমতাশালী, ভগবানের দ্বারা নির্বাচিত, মহামান্য রাজা স্বেচ্ছা-প্রণোদিত হয়ে আমাদের কতিপয় স্বত্ব প্রদান করেছেন, এরূপ দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল।

খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী রাজ্য সম্বন্ধে বিসমার্কসম্পাদনা

যে রাজ্যের মূলে ধর্মের সংস্রব নেই, তা কখনও স্থায়ী হতে পারে না। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের রাজগণ তাদের নামের পশ্চাতে প্রায়ই লিখে থাকেন ভগবানের আশীর্বাদে। আমি উহা শূন্যগর্ভ বাক্য বলে মনে করি না। আমার তখনই মনে হয়, মর্ত্যধামে ভগবান রাজার হস্তে প্রজা পালনের জন্য যে ন্যায়দন্ড অর্পণ করেছিলেন, নৃপতিগণ সেই দণ্ড ধারণের সময় ভগবানের দান শপথ সহকারে গ্রহণ করছেন, স্বীকারোক্তিস্বরূপ ভগবানের আশীর্বাদ এই বাক্যটি ব্যবহার করে থাকেন। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, খ্রীষ্টের উপদেশের অনুভূতিই রাজ্যের চরম উদ্দেশ্য। ইহুদিদের সাহায্যে আমাদের সে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে না। রাজ্যের মূলভিত্তি ---- খ্রিস্টধর্ম যদি আমাদের রাজ্য থেকে ক্রমশ অন্তর্হিত হয়, তাহলে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। খ্রিস্টধর্ম থেকেই আমাদের দেশের রাজবিধান উদ্ভূত হয়েছে, সুতরাং ভদ্রমহোদয়গণ, খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের অনিষ্টসাধন করবেন না।

ধর্ম সংস্কারসম্পাদনা

প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিক সম্প্রদায় এই দুই সংমিশ্রণে বিসমার্ক একটা নতুন সম্প্রদায় গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বিসমার্ক দু'বার চেষ্টা করেও কৃতকার্য হতে পারেননি। প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মাবলম্বী রাজনীতিকের দ্বারা এটা কখনও সংঘটিত হতে পারেনি। বিসমার্কের এই ধর্ম সমন্বয়ের চেষ্টার ফলে গভর্মেন্টের সাথে জার্মানির ধর্ম সম্প্রদায়ের অত্যন্ত মনোমালিন্য জন্মায়। গভর্নমেন্ট বেতন দিয়ে যে সকল ধর্মযাজক নিয়োগ করতেন বিপক্ষগণ তাদেরকে এক ঘরে করে রাখতেন। ছাত্ররা তাদের বক্তৃতা শ্রবণ করতে পেত না। জনসাধারণ সে সকল ধর্ম মন্দিরে পূজা অর্চনা করতে পারত না। এমনকি সামরিক বিভাগেও এই মনোমালিন্যের প্রভাব সঞ্চারিত হয়েছিল। ধর্ম সম্প্রদায়ের সাথে বিরোধ ক্রমশই দেশ মধ্যে পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়ল। রিচস্টাগে নূতন আইন প্রণয়নের প্রস্তাব হল। এই বিধি বলে জার্মানি থেকে জেসুইটস ধর্মাবলম্বীদের বিতাড়িত করা হবে। নূতন বিধানমতে রাজা বা গভর্মেন্ট পুরোহিতের শিক্ষক নিয়োগ সম্বন্ধে বহু ক্ষমতা লাভ করলেন। যে জাতিতে জার্মান নন এমন কোন ব্যক্তির ধর্মযাজক রূপে নিযুক্ত হতে পারবেন না। আর যিনি ধর্মযাজক হবেন তাকে প্রাশিয়ার গভারমেন্ট এর দ্বারা পরিচালিত বিদ্যালয়ে শিক্ষা লাভ করতে হবে। তারপর বিবাহ সম্বন্ধে আইন পাকাপাকি হয়ে গেল। প্রত্যেক ধর্মযাজককে বিবাহ করতে হবে। এইরূপে রোমান ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের প্রভাব জার্মানি থেকে তিরোহিত করার উদ্যোগ হল।

অর্থনীতিসম্পাদনা

জার্মান সাম্রাজ্যে বিনাশুল্কে বাণিজ্যের প্রসার বন্ধ করার জন্য বিসমার্ক প্রানপণ চেষ্টা করতে লাগলেন। ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে লৌহ-ব্যয়-সমস্যা গুরুতর হয়ে উঠল। লোহা অপরিমিতরূপে সঞ্চিত হওয়ায় ইংল্যাণ্ডে তার দাম হ্রাস পায়। লৌহজাত দ্রব্যে জার্মানি ভরে গেল। দ্রব্য নির্মাণ করতে যে অর্থ ব্যয় হয়েছিল তারও কম মূল্যে বিক্রি হতে লাগল। এর ফলে বহু কল কারখানার কাজ বন্ধ করতে হল। কারখানার স্বত্বাধিকারীরা সর্বস্বান্ত হয়ে পথে দাঁড়ালেন। শ্রম-শিল্পীরাও বেকার অবস্থায় কালযাপন করতে লাগল। ব্যবসার এইরূপ অবস্থা দেখে বহু ব্যক্তি রিচষ্টাগে আবেদন করল যে প্রচলিত আইন সংশোধিত হোক। শুধু লোহা নয়, অন্যান্য শ্রমশিল্প সম্বন্ধেও অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠল। রাশিয়ায় রেলপথ বিস্তার হাওয়ায় তত্রত্য শস্য সম্ভার জার্মানিতে নিয়ে আসা হচ্ছিল। তাতে দেশজাত শস্যের বিক্রয়াধিক্য কমে গেল। কৃষককুল প্রমাদ গুনল। বিসমার্ক দেখলেন বাণিজ্য শুল্ক রহিত করায় দেশের লোক ক্রমশঃ নিঃস্ব হয়ে পড়ছে, অথচ গভর্মেন্টের অর্থাগম হচ্ছে না। অধিকন্তু জার্মানির অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে, কিন্তু জার্মানজাত দ্রব্যাদি ইউরোপ, ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় কোন স্থান অধিকার করতে পারছে না। শিল্পীবাণিজ্যের এইরূপ অবস্থা দর্শনে বিসমার্ক বললেন, "বাণিজ্য শুল্ক রহিত করায় আমরা ক্রমশঃ মৃত্যুমুখে অগ্রসর হচ্ছি।" সুতরাং বাণিজ্য-শুল্ক প্রবর্তিত হল।

রেলপথ সংস্কারসম্পাদনা

বিসমার্ক দেখলেন বাণিজ্যের উন্নতি ও সংস্কার করতে গেলে রেলপথের উন্নতি অত্যাবশ্যক। জার্মানিতে অনেকেই রেলপথ খুলেছিলেন। বিসমার্ক সমগ্র রেলপথ গবর্নমেন্টের দ্বারা পরিচালিত করবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু  বিভিন্ন রাজ্যের অন্তর্গত রেলপথ গবর্নমেন্টের দ্বারা পরিচালিত করতে আপত্তি করল। শুধু প্রাশিয়ায় বিসমার্কের নীতি-অনুসারে সমগ্র রেলপথ রাজকোষের অর্থে সরকারের অধীনে আসল। বেসরকারি রেলপথ প্রাশিয়ার মধ্যে আর রইল না। তখন রেলের মাশুল কমে গেল, তদ্দ্বারা দ্রব্যাদি আমদানি রপ্তানি করতে ব্যবসায়ীদের সুবিধা হল। এতে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ক্রমশঃ উন্নতির পথে অগ্রসর হল, ঐশ্বর্যও বাড়তে লাগল।

উপনিবেশ বিস্তারসম্পাদনা

অতঃপর বিসমার্ক অন্যত্র জার্মান উপনিবেশ স্থাপনের মনসংযোগ করলেন। ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে জার্মান পরিব্রাজকগণ বিসমার্কের নিকট দক্ষিণ আফ্রিকায় উপনিবেশ স্থাপন করার প্রস্তাব করেছিলেন। তত্রত্য অধিবাসীগণ জার্মানদের সাদরে স্থান দান করবে। হয় স্যান্টলুসিয়া, নয় তো ডেলাগোয়া বে, এই উভয়ের এক স্থলে জার্মানির বন্দর স্থাপিত করে করলেই ব্যবসা-বাণিজ্য সুন্দররূপে চলবে। বিসমার্ক তখন এ প্রস্তাব গ্রহণ করেও বিশেষ উচ্চবাচ্য করেননি। কারণ, তিনি ভেবেছিলেন, আফ্রিকার নির্দিষ্ট স্থানে জার্মান উপনিবেশ স্থাপন করতে গেলে ইংল্যান্ডের সাথে গোলমাল বাধতে পারে। ইংরেজের সাথে তিনি বিবাদ করতে প্রস্তুত ছিলেন না। কিন্তু কিছুকাল পর অবস্থার পরিবর্তন ঘটল। জার্মান ঔপনিবেশিকগণ যেখানেই উপনিবেশ স্থাপনের বাসনায় গমন করতেন, ইংরেজ উপনিবেশ তার পাশেই। কাজেই উভয়ের মধ্যে বাকবিতণ্ডা উপস্থিত হতে লাগল। বিসমার্ক প্রথমত ভেবেছিলেন ইংরেজ কর্তৃপক্ষ জার্মান ঔপনিবেশিকগণকে যথেষ্ট সাহায্য করবেন ও উপযুক্ত আশ্রয় দেবেন। কিন্তু ইংল্যান্ডের ফিজি দ্বীপ অধিকারকালে বিসমার্ক বুঝলেন তাঁর এ আশা পরিপূর্ণ হবে না। অতঃপর বিসমার্ক ঔপনিবেশিকগণকে গভর্মেন্ট থেকে সাহায্য করবার ব্যবস্থা করে দিলেন।

সমাজতন্ত্র বিরোধী আইনসম্পাদনা

১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে বসন্তকালে জার্মান সম্রাটের প্রাণনাশের একটা ষড়যন্ত্র হয়েছিল। হোবেন্ নামক জনৈক চর্মকার যুবক বার্লিনের রাজপথে সম্রাটের উদ্দেশে গুলিবর্ষণ করেছিল। সমগ্র দেশবাসী এই লোমহর্ষক ব্যাপারে মহা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। যখন অনুসন্ধানে প্রকাশিত হল এই আততায়ী যুবক সোশালিস্ট বা সমাজতন্ত্রবাদী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত তখন জনসাধারণ আরও উত্তেজিত হয়ে উঠল। সকলেই জানতে পারল যে সমাজতন্ত্রবাদীদের মধ্যে উত্তেজনা মূলক কোন বক্তৃতার শ্রবণে এই যুবক সম্রাটের প্রাণ গ্রহণের চেষ্টা করেছিল। বিসমার্ক বহুদিন থেকেই সমাজতন্ত্রবাদীদের সন্দেহের নেত্রে দেখছিলেন। এই অবকাশে তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য বিসমার্ক উঠে পড়ে লাগলেন। একটা নতুন বিধান প্রণয়ন পূর্বক তিনি সমাজতন্ত্রবাদীদের বক্তৃতার পথ একেবারে বন্ধ করে দেবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু রিচষ্টাগে প্রস্তাব উপেক্ষিত হল। রক্ষণশীল দলের সভ্যগণ ব্যতীত এর পক্ষে কেউই ভোট দিল না। উক্ত ঘটনার দশ দিন পরে সম্রাটের জীবন গ্রহণের জন্য আবার একটা উপক্রম হল। নোবেল নামক জনৈক উচ্চশিক্ষিত যুবক রাজপথে সম্রাটকে লক্ষ্য করে গুলি নিক্ষেপ করেছিল। সম্রাট এ যাত্রা মস্তকে ও বাহুতে আহত হন। বিসমার্ক এই ঘটনা শ্রবণ মাত্রই বলে উঠলেন, "এবারে রিচষ্টাগ বিলুপ্ত হোক।" হলও তাই। নতুন পার্লামেন্টে নতুন সদস্য নির্বাচিত হল ও সোশালিস্ট সম্প্রদায়কে দমন করার জন্য নতুন উপায়, নতুন বিধান প্রচারিত হল। এবার আইন পাস হয়ে গেল। জার্মান সাম্রাজ্যের যে কোনো স্থানে সমাজতন্ত্রবাদীরা বক্তৃতা অথবা লিখিত প্রবন্ধ প্রচার করবেন পুলিশের সাহায্যে তাদেরকে সে নগর হতে বিতাড়িত করা হবে। এ সম্প্রদায়ের প্রচারিত সংবাদপত্র, পুস্তিকা অথবা গ্রন্থাদি সরকার দ্বারা বাজেয়াপ্ত হল। ভবিষ্যতে এই সম্প্রদায়ের কোন গ্রন্থাদি প্রচারিত হতে পারবে না এই মর্মে বিধান জারি হল। কঠোর বিধান প্রবর্তিত হওয়াতে সমাজতন্ত্রবাদীগণ সংগোপনে তাদের কার্য পরিচালনা করতে লাগলেন।

পার্লামেন্টে বিসমার্কসম্পাদনা

পার্লামেন্টের সদস্যবর্গের সাথে যাতে সদ্ভাব থাকে বিসমার্ক তার ব্যবস্থা করেছিলেন। সপ্তাহে একদিন পার্লামেন্টের যাবতীয় সদস্য তাঁর গৃহে সমবেত হতেন। সকলকেই তিনি নিমন্ত্রণ করতেন। বহু পল্লীবাসী যুবক-সদস্য এই বিচক্ষণ প্রভাবশালী রাজনীতিকের সাথে একাসনে বসে পান, ভোজন, আলাপ, আপ্যায়নে নিজেকে পরম সৌভাগ্যশালী বলে মনে করতেন।

ফৌজদারি আইনের কঠোরতাসম্পাদনা

বিসমার্কের মন্ত্রিত্বকালে একমাত্র দুর্বলতা ছিল ফৌজদারি কার্যবিধির কঠোরতা। রাজনীতির ক্ষেত্রে যারা তাঁর বিরুদ্ধ মতাবলম্বী ছিলেন তাদেরকে দমন করার জন্য তিনি অতি কঠোর বিধানসমূহের প্রচলন করেছিলেন। সংবাদপত্র সম্পাদকগণ অধিকাংশই প্রায় তাঁকে সম্পাদকীয় হস্তে আক্রমণ করতেন। অনেক সময় তারা অন্যায় পূর্বক বিসমার্কের অবলম্বিত নীতির নিন্দাবাদ করতেন। তিনিও তার প্রতিবাদে কখনও আলস্য করেননি। অনেক সময় তিনি অর্থ দানে কোন কোন সম্পাদককে বশীভূত করে নিজের কার্যের সমর্থন করাতেন। অনেক সময় মাঝে মাঝে প্রতিযোগী সম্পাদককে নানা অজুহাতে বিচারালয়ে আনয়ন করে তাকে দণ্ডিত করাতেন। গুপ্তহত্যার জন্য যারা চেষ্টা করত বা উক্ত প্রকার ষড়যন্ত্রে যারা লিপ্ত থাকত তিনি তাদের কখনও দয়া করতেন না। ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে জনৈক যুবক কিসিঞ্জার নগরে তাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল। ক্যাথলিক-সম্প্রদায়ের উত্তেজনা মূলক বক্তৃতা শ্রবণে সে তাঁর জীবননাশের চেষ্টা করেছিল বলে একরার করে।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Eric Hobsbawm, The Age of Empire: 1875–1914 (1987), p. 312.
  2. Hopel, Thomas (23 August 2012) "The French-German Borderlands: Borderlands and Nation-Building in the 19th and 20th Centuries" ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৩ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে