মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী

মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০) ছিলেন ইসলামী চিন্তাবিদ, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও সাংবাদিক। মুসলিম যুগের চট্টগ্রামের সরকারি নাম ইসলামাবাদের নামানুসারেই তিনি নিজের নাম ইসলামাবাদী রাখেন।

মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী
মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী.jpg
জন্ম২২শে আগস্ট ১৮৭৫
মৃত্যু২৪শে অক্টোবর ১৯৫০
জাতীয়তাভারতীয় বাঙালী
নাগরিকত্ব ব্রিটিশ ভারত (১৮৭৫-১৯৪৭)
 পাকিস্তান (১৯৪৭-১৯৫০)
পেশাকবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ
রাজনৈতিক দলভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, কৃষক প্রজা পার্টি, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ

জন্ম ও শিক্ষাজীবনসম্পাদনা

মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ২২শে আগস্ট ১৮৭৫ সালে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার(বর্তমান চন্দনাইশ উপজেলার) বরমা-আড়ালিয়া(চড়) গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন।

কর্মজীবনসম্পাদনা

তিনি সোলতান (পত্রিকা) (১৯০১), হাবলুল মতিন (১৯১২), মোহাম্মদী (১৯০৩), কোহিনুর (১৯১১), বাসনা (১৯০৪) এবং আল এছলাম পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন।

পরবর্তী জীবন এবং মৃত্যুসম্পাদনা

১৯৩০ সালে তিনি চট্টগ্রামের কদমমোবারক মুসলিম এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন। ঐ সময়ে তিনি কংগ্রেসের অহিংস নীতির প্রতি আস্থা হারান এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি সমর্থন দান করে ফরোয়ার্ড ব্লকে যোগদান করেন। তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কালে ভারত ছাড় আন্দোলনে যোগদান ও আজাদ হিন্দ ফৌজের কার্যক্রমের প্রতি সক্রিয়ভাবে সমর্থন করা। সে সময় তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজকে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় বিপ্লবী কেন্দ্র স্থাপন করেন। নেতাজী যখন আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ দখল করে ভারতের ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা উড়িয়ে ‘দিল্লি চলো’ শ্লোগান তুলে এগিয়ে চলছিলেন ভারতের দিকে ঐ সময় মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর সাথে পরিচয় ঘটে বেংগল ভলান্টিয়ার্স এর সুবোধ চক্রবর্তীর। সুবোধের সাথে আলাপ করে মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী এত বেশি মুগ্ধ হন যে শেষ বয়সে একটা ঝুঁকি নেবার জন্য রাজি হয়ে পড়েছিলেন। সুবোধকে সঙ্গে নিয়ে তিনি চলে আসেন চট্টগ্রামের দেয়াঙ পাহাড়ে। চট্টগ্রামের পাহাড়-পর্বত ডিঙ্গিয়ে আরাকানের পথ ধরে আবারও নেতাজীর সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার লক্ষ্যে যখন পথ চলছিলেন তখন সীমান্ত এলাকায় ছিল সতর্ক পাহারা। আজাদ হিন্দ ফৌজ দখলে থাকার কারণে সতর্কতা যেন সীমাহীন হয়ে পড়েছিল।

মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী বীরকণ্ঠে তার সহচরকে বলছিলেন, আমার জীবনের মাত্র কয়েকদিন বাকি, এই চরম ঝুঁকি নিতে আমার অসুবিধেও নেই। তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ঝুঁকি নিলেন, শ্যালক মোর্শেদকে নিয়ে একেবারে ফকির সেজে নেতাজীর সাথে তিনি সাক্ষাৎ করেছিলেন। ব্রিটিশ গুপ্তচরেরা তখন মওলানার সমস্ত বিপ্লবী কার্য টের পায়। সে কারণে তার শহরস্থ বাড়ি, তৎকালীন পটিয়ার (বর্তমান চন্দনাইশ) বাড়ি, সীতাকুন্ডের বাড়ি, কলকাতার বাসভবনে ইংরেজ সার্জেন্টের নেতৃত্বে বিপুল সৈন্যের মাধ্যমে তল্লাশি চালানো হয়। ঐ সময় মওলানাকে চট্টগ্রাম শহর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ব্রিটিশ সরকার মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু প্রভৃতি নেতার সাথে মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীকেও দিল্লির লালকিল্লায় বন্দী করে রাখেন। অতঃপর তাকে সেখান থেকে পাঞ্জাবের ময়াওয়ালী জেলে স্থানান্তর করেন। সেখানকার জেলের ছাদের বিমের সঙ্গে রজ্জু দিয়ে ৬৫ বছর বয়স্ক মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর দু’পা বেঁধে মাথা নিচের দিকে ঝুলিয়ে রেখে তার উপর অশেষ নির্যাতন চালানো হয়েছিল গোপন তথ্য জানার জন্য।[১] মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানীর শিক্ষক। তিনি কদম মোবারক মুসলিম এতিম খানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পটিয়ার দেয়াঙ পহাড়ে তিনি ইসলামী আরবী বিশ্ব বিদ্যালয়ের জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। বর্তমানে তিনি কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদের কবরস্থানে শায়িত আছেন।

সাহিত্য কর্মসম্পাদনা

মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী সফললভাবে সাহিত্য চর্চা ও রচনা করেছেন। সাহসিকতায় ভরপুর ছিল তার রচনা। ইসলামি সভ্যতা ও গণমানুষের অধিকার নিয়ে লিখেছেন। লিখেছেন কবিতা ও গল্প। লেখালেখি করেছেন একাধিক ভাষায়। বাংলা, আরবি ও ফারসি তার লেখালেখির প্রিয় ভাষা। ইসলামি সংস্কৃতি ও ইতিহাস নিয়ে তার অবধান অপরিহার্য। তেমনি দেশীয় ও বৈশ্বিক সংস্কৃতি ও ইতিহাসেও অবদান কম রাখেননি। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন কলম দিয়ে, মাঠে নেমে আন্দোলন করেছেন। উনি ৪২ টির মতো গ্রন্থ রচনা করেন। সেগুলোর মধ্যে ১. ভারতে মুসলিম সভ্যতা। ২. সমাজ সংস্কার ৩. ভূগোল শাস্ত্রে মুসলমান ৪. ইসলাম জগতের অভ্যুত্থান ৫. ভারতে ইসলাম প্রচার ৬. সুদ সমস্যা ৭. ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলমানদের অবদান (৩ খণ্ডে) ৮. ইসলামী শিক্ষা ৯. কোরআন ও বিজ্ঞান ১০. আত্মজীবনী ইত্যাদি উল্লেযোগ্য।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

বহি:সংযোগসম্পাদনা

বাংলাপিডিয়ায় মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী