ধাত্রীদেবতা হল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত একটি উপন্যাস। রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ এই উপন্যাসটি[১] ১৯৩৪ সালে বঙ্গশ্রী পত্রিকায় জমিদারের মেয়ে নামে ছোটো আকারে প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯৩৯ সালে ধাত্রীদেবতা নামে পরিবর্ধিত আকারে উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় শনিবারের চিঠি পত্রিকায়। এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য এক ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বংশকে কেন্দ্র করে সমকালীন ভারতের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন ও পরিবর্তন। সমালোচক শিশির কুমার দাশের মতে, এই উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য হল "ব্যক্তিগত আদর্শবাদ, পারিবারিক সংঘাত ও বৃহত্তর সামাজিক জীবনের সহিত ব্যক্তিজীবনের সমন্বয়"।[২] অধ্যাপক অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়ের মতে, যে সব উপন্যাসে "বাস্তব অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে লেখক জীবনচিত্র আঁকেন, তা থেকে একটি ভাব বা আইডিয়ায় পৌঁছে যান", তার অন্যতম উদাহরণ হল ধাত্রীদেবতা[৩]

ধাত্রীদেবতা
ধাত্রীদেবতা প্রচ্ছদ.jpg
ধাত্রীদেবতা উপন্যাসের করুণা প্রকাশনী সংস্করণের প্রচ্ছদ
লেখকতারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
কাজের শিরোনামজমিদারের মেয়ে
প্রচ্ছদ শিল্পীকমল আইচ
দেশব্রিটিশ ভারত
ভাষাবাংলা
ধরনআঞ্চলিক উপন্যাস
প্রকাশিত১৯৩৯
প্রকাশককরুণা প্রকাশনী, কলকাতা
পৃষ্ঠাসংখ্যা২২৪
আইএসবিএন৯৭৮-৮১-৮৪৩৭-৪০২-৫

কাহিনি-সারাংশসম্পাদনা

ধাত্রীদেবতা উপন্যাসের নায়ক শিবনাথ এক ক্ষয়িষ্ণু জমিদারের পুত্র। শৈশবে পিতৃহীন শিবনাথ বড়ো হয় তার মা ও পিসীমার কাছে। শিবনাথের মা স্নেহপ্রবণা, শান্ত, সহিষ্ণু ও কঠোর চরিত্রের মানুষ; অন্যদিকে শিবনাথের পিসীমা স্নেহশীলা হলেও উদ্ধত, কর্তৃত্বাকাঙ্ক্ষী ও অধৈর্য্য স্বভাবের মহিলা। শিবনাথের উপর তার পিসীমার এক ধরনের আধিপত্যপ্রবণ টান ছিল। পিসীমার প্ররোচনাতেই বিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাপ্ত করার আগেই শিবনাথ বিবাহ করে জনৈক ধনীর ভাগ্নী গৌরীকে। গ্রামে কলেরা মহামারী দেখা দিলে তা প্রতিরোধের কাজে সাহায্য করার সময় শিবনাথের সঙ্গে সুশীল ও পূর্ণ নামে দুই রাজনৈতিক কর্মীর আলাপ হয়। তারা শিবনাথকে চিহ্নিত করে রাখে তাদের ভাবী সহিংস আন্দোলনের একটি যন্ত্র হিসেবে। এদিকে গৌরীর প্রতি শিবনাথের ভালোবাসা তার পিসীমার চক্ষুশূল হয়ে ওঠে। শেষপর্যন্ত গৌরীকে তার মামার সঙ্গে কলকাতায় চলে আসতে হয়। সেখানে এসে গৌরী এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেয়। এরপর শিবনাথও কলকাতায় এসে কলেজে ভর্তি হয়। সেখানে সুশীল ও পূর্ণ তাকে টেনে নেয় নিজেদের দলের কাজে। তাদের দলের এক কর্মী মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অহিংসার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিল এবং নিজের হেফাজতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটি ধ্বংস করে ফেলেছিল। দলের নির্দেশে পূর্ণ তাকে হত্যা করলে শিবনাথ গভীরভাবে মর্মাহত হয়ে পড়ে। এদিকে শিবনাথের মা মারা যান। গৌরীকে শিবনাথের সঙ্গে পুনর্মিলিত হওয়ার সুযোগ করে দিতে তার পিসীমাও কাশী চলে যান। ঘটনাচক্রে শিবনাথ তাদের জমিদারির এক প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে দরিদ্র গ্রামবাসীদের উন্নতির কাজে আত্মনিয়োগ করে। তারপর অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেফতার হয় শিবনাথ। তার পিসীমা গৌরীর সঙ্গে পুনর্মিলিত হলেন এবং দু’জনে একসঙ্গে কারাগারে শিবনাথের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। দু’জনকে একসঙ্গে দেখে শিবনাথও খুশি হল। সে তার পিসীমাকে বলল, যে ভালোবাসা ও যত্ন দিয়ে তিনি তাকে মানুষ করেছেন, ঠিক তেমন করেই যেন তার ছেলেকেও করেন।

বৈশিষ্ট্য ও রচনাশৈলীসম্পাদনা

ধাত্রীদেবতা তারাশঙ্করের প্রায়-আত্মজৈবনিক উপন্যাস। ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবারের সমস্যা, নব্য ব্যবসায়ী শ্রেণির উত্থান, সাধারণ মানুষের সংগ্রাম, কর্তৃত্বপ্রবণ নারী ও পুরুষ চরিত্র, এক সহৃদয় জমিদারের চরিত্র ও এক সন্ন্যাসী চরিত্র, বিপরীত রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী ও পরস্পর-বিবদমান রাজনৈতিক কর্মীবৃন্দ, খরা, কলেরা ও দুর্ভিক্ষ−তারাশঙ্করের উপন্যাসের সকল বৈশিষ্ট্যই এই উপন্যাসে উপস্থিত। রচনাভঙ্গিটি পরিচ্ছন্ন ও সুবিন্যস্ত। গৌরী ব্যতীত সকল চরিত্রের ক্রমবিকাশে একটি যুক্তিসঙ্গত পারম্পর্য লক্ষিত হয়। কাহিনিবিন্যাসে কোথাও হঠাৎ চমক দেওয়ার প্রয়াস নেই। খরা ও মহামারীর চিত্রণ অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও মর্মস্পর্শী। ভাষাও সুষম ও সমৃদ্ধ। দেশ ও দেশবাসীর জীবনের বৃহৎ প্রেক্ষাপটে রচিত এই উপন্যাসে তারাশঙ্কর নিজের সময়ের কথাই লিপিবদ্ধ করেছেন। এই নিরিখে ধাত্রীদেবতা ছিল তাঁর পরবর্তী মহাকাব্যধর্মী উপন্যাসগুলির প্রস্তুতিপর্ব। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, লেখক হিসেবে তারাশঙ্কর ছিলেন অত্যন্ত খুঁতখুঁতে। নিজের রচনা বারংবার পুনর্লিখন ও তাতে পরিবর্তন-সাধন ছিল তাঁর স্বভাবজ। কিন্তু ১৯৩৯ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশের পর এই উপন্যাসে আর কোনও পরিবর্তন আনেননি।[৪]

মূল্যায়নসম্পাদনা

রবীন্দ্রনাথের প্রতিক্রিয়াসম্পাদনা

তারাশঙ্করের ধাত্রীদেবতা পাঠ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩৯ সালের ২২ অক্টোবর একটি চিঠিতে তারাশঙ্করকে লেখেন, "বইয়ের প্রথম অর্দ্ধেক অংশে তোমার হাতের নৈপুণ্য উজ্জ্বলভাবেই প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু যেখানেই তোমার গল্পের জন্যে উচ্চ মঞ্চ গড়ে তুললে সেখানেই সে স্বস্থানচ্যূত স্বভাবভ্রষ্ট হয়ে পড়ল। মনে হোলো এ অংশটা যেন অনুরূপা দেবীর লেখা। একশ্রেণীর পাঠকের কাছে তুমি পুরস্কার পাবে। কিন্তু সেই পুরস্কার তোমার যোগ্য হবে না। তোমার এই লেখাটিকে পরিমাণে বড়ো করতে গিয়ে সম্মানে ছোট করেছ আমার এই অভিমত ক্ষোভের সঙ্গে তোমাকে জানাতে হোলো।"[৫] এই চিঠির প্রত্যুত্তরে সেই বছরই ২৬ অক্টোবর তারিখে তারাশঙ্কর লেখেন, "আমার বইখানি সম্বন্ধে যা লিখেছেন – সে আমি গুরুদেবতার উপদেশ বলেই মাথায় নিয়েছি। …মনে মনে ভেবে দেখলাম শেষের দিকে শিবনাথের মনের চিন্তার রূপ দিতে গিয়ে গল্পের উপর গুরুত্ব আরোপের চেষ্টার মধ্যে objectivity ক্ষুণ্ন হয়েছে ও সস্তা হয়েছে। বড় উপন্যাস রচনায় এই আমার হাতেখড়ি। ভবিষ্যতে আপনার উপদেশ মনে রেখে কাজ করব।"[৬]

রবীন্দ্রনাথের প্রভাবসম্পাদনা

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক অরুণকুমার মুখোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথের গোরা (১৯১০) উপন্যাসের সমাপ্তির সঙ্গে ধাত্রীদেবতা-র সমাপ্তির "আশ্চর্য মিল" লক্ষ্য করেছেন। তাঁর মতে, এই মিল "কাকতালীয় নয়। ‘ভারতবর্ষ’ নামটিকে ঘিরে যে ঐতিহ্য, মানবতাবাদ, অধ্যাত্মবাদী সংস্কার ও দেশপ্রেম, তারাশংকর তারই শিল্পী। রবীন্দ্রনাথের ভারত-ভাবনা বনাম জীবনধর্মী কাহিনী, এ দুয়ের টানাপোড়েনে গড়ে উঠেছে ‘গোরা’ উপন্যাস। ব্যক্তিবিশেষকে ভারতবর্ষ একমাত্র ও চূড়ান্ত বলে গণ্য করে না, এবং বিশেষের মধ্যে নির্বিশেষেরই প্রকাশ, একথা গোরা বলেছে। এ উপন্যাসে ‘বৃহৎ ভাবের কাছে আত্মসমর্পণ’ অনায়াসলক্ষণীয়। তারাশংকরের প্রধান উপন্যাসনিচয় সম্পর্কে এইসব সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য।"[৭] গবেষক ও অধ্যাপক ড. সমরেশ মজুমদারও মনে করেন, ধাত্রীদেবতা-র নায়ক শিবনাথ রবীন্দ্রনাথের গোরা চরিত্রটির উপলব্ধির উত্তরাধিকার বহন করছে; যদিও তিনি এও বলেছেন যে গোরার বোধশক্তির বিশালতাকে স্পর্শ করার ক্ষমতা শিবনাথ চরিত্রটির মধ্যে নেই। সেই সঙ্গে ধাত্রীদেবতা-য় লেখকের যে মানবপ্রেমিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিস্ফুট হয়েছে তার উৎসও রবীন্দ্রনাথের চিন্তাধারা বলে ড. মজুমদার উল্লেখ করেছেন।[৮]

শ্রীকান্ত উপন্যাসের সঙ্গে আত্মিক নৈকট্যসম্পাদনা

ড. সমরেশ মজুমদার ধাত্রীদেবতা-র সঙ্গে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্ত (১৯১৭-৩৩) উপন্যাসের একটি আত্মিক নৈকট্যও লক্ষ্য করেছেন। ড. মজুমদারের মতে, শরৎচন্দ্র ও তারাশঙ্কর উভয়েই "গ্রামীণ জীবনের কথাকার"। শরৎচন্দ্রের পটভূমি হুগলি জেলা ও তৎসন্নিহিত অঞ্চল হলেও তার গ্রামীণ প্রেক্ষিত বৃহত্তর বাংলার যে কোনও অঞ্চলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; অনুরূপভাবে তারাশঙ্কর রাঢ়ের বীরভূম জেলার জনজীবনকে তাঁর উপন্যাসে তুলে ধরলেও তার আবেদন বিশ্বজনীন। আলোচ্য উপন্যাস দু’টির ক্ষেত্রে শরৎচন্দ্র ও তারাশঙ্কর উভয়েই উপন্যাসের মূল উপাদান ও চরিত্রগুলিকে সংগ্রহ করেন তাঁদের নিজস্ব পারিপার্শ্বিক থেকে এবং নিজেরা হয়ে উঠেছেন উপন্যাসের নায়ক চরিত্র দু’টির (শ্রীকান্ত ও শিবনাথ) সমার্থক। তাছাড়াও স্বাধীনতা-পূর্ব যুগে শরৎচন্দ্র ও তারাশঙ্কর দু’জনেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; কিন্তু উভয়ের রাজনৈতিক চেতনায় দেশপ্রেমের অর্থ সভাসমিতি ও আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা প্রসারিত হয়েছিল সাধারণ দরিদ্র দেশবাসীর প্রতি গভীর মমত্ববোধে। শ্রীকান্তধাত্রীদেবতা উভয় উপন্যাসেই দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি এই মমত্ববোধ স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।[৯]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. কালের প্রতিমা: বাংলা উপন্যাসের পঁচাত্তর বছর (১৯২৩-১৯৯৭), অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০১৯ সংস্করণ, পৃ. ২৪২
  2. শিশিরকুমার দাশ (সংকলিত ও সম্পাদিত), সংসদ বাংলা সাহিত্যসঙ্গী, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ২০০৩, পৃ. ১০৭
  3. কালের প্রতিমা: বাংলা উপন্যাসের পঁচাত্তর বছর (১৯২৩-১৯৯৭), অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০১৯ সংস্করণ, পৃ. ৩১৪
  4. মেকার্স অফ ইন্ডিয়ান লিটারেচার: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (ইংরেজি), মহাশ্বেতা দেবী, সাহিত্য অকাদেমি, নতুন দিল্লি, ১৯৭৫ সংস্করণ, পৃ. ৩৮-৩৯
  5. "চিঠিপত্র: রবীন্দ্রনাথের চিঠি (৫)", রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সম্পাদনা: সুরজিৎ দাশগুপ্ত, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০১৫ সংস্করণ, পৃ. ১৬৫
  6. "চিঠিপত্র: রবীন্দ্রনাথকে লেখা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিঠি (৫)", রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সম্পাদনা: সুরজিৎ দাশগুপ্ত, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০১৫ সংস্করণ, পৃ. ১৬৯
  7. কালের প্রতিমা: বাংলা উপন্যাসের পঁচাত্তর বছর (১৯২৩-১৯৯৭), অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০১৯ সংস্করণ, পৃ. ১৬১
  8. "বাংলা আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস", ড. সমরেশ মজুমদার, প্রবন্ধ সঞ্চয়ন, সম্পাদনা: ড. সত্যবতী গিরি ও ড. সমরেশ মজুমদার, রত্নাবলী, কলকাতা, ২০০৬ সংস্করণ, পৃ. ১০৯৩
  9. "বাংলা আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস", ড. সমরেশ মজুমদার, প্রবন্ধ সঞ্চয়ন, সম্পাদনা: ড. সত্যবতী গিরি ও ড. সমরেশ মজুমদার, রত্নাবলী, কলকাতা, ২০০৬ সংস্করণ, পৃ. ১০৯২