দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার

বাংলা ভাষায় রূপকথার রচয়িতা,শিশু সাহিত্যিক এবং সংগ্রাহক

দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার (১৫ এপ্রিল, ১৮৭৭ - ৩০ মার্চ, ১৯৫৭, বাংলা ১২৮৪ - ১৩৬৩) বাংলা ভাষার রূপকথার প্রখ্যাত রচয়িতা এবং সাংগ্রহক। তার সংগৃহীত জনপ্রিয় রূপকথার সংকলনটি চারটি খণ্ডে প্রকাশিত। খণ্ডগুলো নাম ঠাকুরমার ঝুলি, ঠাকুরদাদার ঝুলি, ঠানদিদির থলে এবং দাদামাশয়ের থলে।

দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার

জন্ম ও পরিবারসম্পাদনা

দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার ১২৮৪ বঙ্গাব্দের ২রা বৈশাখ (১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দ) ঢাকা জেলার সাভার উপজেলায় উলাইল এলাকার কর্ণপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।[১] তার মাতার নাম কুসুমময়ী ও পিতার নাম রমদারঞ্জন মিত্র মজুমদার। ১৮৮৭ সালে দশ বছর বয়সে তাঁকে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি করে দেওয়া হয় ঢাকার কিশোরীমোহন উচ্চ বিদ্যালয়ে। পরে ১৮৯৩ সালে, কিশোরীমোহন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে দক্ষিণারঞ্জণকে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি করে দেয়া হয়। এ দুটি বিদ্যালয়ে থাকার সময় পড়ালেখায় ভালো করতে না পারায়, তাঁর পিতা টাঙ্গাইলে বোন (দক্ষিণারঞ্জনের পিসী) রাজলক্ষ্মী চৌধুরানীর কাছে রেখে টাঙ্গাইলের সন্তোষ জাহ্নবী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন। এই বিদ্যালয়ের বোর্ডিং-এ থেকে তিনি দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। বিদ্যালয়ের অধ্যয়ন শেষে পিতার সঙ্গে ২১ বৎসর বয়সে মুর্শিদাবাদে গিয়ে সেখানে পাঁচ বছর বাস করেন। এরপর ১৮৯৮ সালে মুর্শিদাবাদের বহরমপুর হাইস্কুলে প্রথম বিভাগে এনট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। এরপর কৃষ্ণনাথ কলেজে এফএ ক্লাসে ভর্তি হন।[২] দক্ষিণারঞ্জনের বাবা রমদারঞ্জন ১৯০২ সালে মারা যান। পিতার মৃত্যুর পর তিনি পিসিমা রাজলক্ষ্মীর কাছে টাঙ্গাইলে বসবাস শুরু করেছিলেন।

সাহিত্যকর্মসম্পাদনা

পিতার সাথে মুর্শিদাবাদে অবস্থানকালে 'সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা','প্রদীপ' প্রভৃতি পত্রিকাতে প্রবন্ধাবলি প্রকাশ করেন। পরে যখন পিতৃষ্বসার জমিদারির ভারপ্রাপ্ত হয়ে ময়মনসিংহে থাকতে শুরু করেন সেই সময় দশ বছর ধরে বাংলার লুপ্তপ্রায় কথাসাহিত্যের সংগ্রহ ও গবেষণা করেন। পরে এই সংগৃহীত উপাদানসমূহ ও ড. দীনেশচন্দ্র সেনের উপদেশনুযায়ী রূপকথা, গীতিকার, রসকথা ও ব্রতকথা - এই চারভাগে বিভক্ত করে পূর্ববঙ্গের পল্লি-অঞ্চলের লুপ্তপ্রায় বিপুল কথাসাহিত্যকে 'ঠাকুরমার ঝুলি','ঠাকুরদাদার ঝুলি','দাদামশায়ের থলে','ঠানদিদির থলে' প্রভৃতি গল্পগ্রন্থে স্থায়ী রূপদান করেছেন। ১৯০১ সালে দক্ষিণারঞ্জনের সম্পাদিত মাসিক ‘সুধা’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তার প্রথম গ্রন্থ ‘উত্থান’ কাব্য প্রকাশিত হয় ১৯০২ সালে। তিনি খুব ভালো ছবি আঁকতেন। নিজের বইয়ের ছবি এবং প্রচ্ছদগুলো সব সময় তিনি নিজেই আঁকতেন। দক্ষিণারঞ্জন ছিলেন একজন অসাধারণ দারুশিল্পীও। কাঠের শিল্পকর্মে পটু ছিলেন।[২] তিনি বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের সহ-সভাপতি ও উক্ত পরিষদের মুখপত্র 'পথ'-এর সম্পাদক ছিলেন এবং পরিষদের বৈজ্ঞানিক পরিভাষা-সমিতির সভাপতিরূপে বাংলায় বিজ্ঞানের বহু পরিভাষা রচনা করেন।[৩]

কাজসম্পাদনা

  • ঠাকুরমার ঝুলি (১৯০৭ সাল)
  • ঠাকুরদাদার ঝুলি (১৯০৯ সাল)
  • ঠানদিদির থলে (১৯০৯ সাল )
  • দাদামাশয়ের থলে (১০১৩ সাল)
  • খোকাবাবুর খেলা
  • আমাল বই
  • চারু ও হারু
  • ফার্স্ট বয় (১৯২৭ সাল)
  • লাস্ট বয়
  • বাংলার ব্রতকথা
  • সবুজ লেখা
  • আমার দেশ[৪]
  • সরল চন্ডী (১৯১৭),
  • পুবার কথা (১৯১৮)
  • উৎপল ও রবি (১৯২৮),
  • কিশোরদের মন (১৯৩৩),
  • কর্মের মূর্তি (১৯৩৩),
  • বাংলার সোনার ছেলে (১৯৩৫),
  • সবুজ লেখা (১৯৩৮),
  • পৃথিবীর রূপকথা (অনুবাদ গ্রন্থ)
  • চিরদিনের রূপকথা (১৯৪৭),
  • আশীর্বাদ ও আশীর্বাণী (১৯৪৮)

মৃত্যুসম্পাদনা

তিনি বাংলা ১৩৬৩ সালের ১৬ই চৈত্র (১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৩০ শে মার্চ) কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। [৩]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Help for Disability and Distress (HDD) কর্তৃক প্রকাশিত বই : সাভার ডিরেক্টরি (সাভার উপজেলার তথ্য সংবলিত বই); প্রকাশকাল: ডিসেম্বর, ২০১২ ইং
  2. "লোকসাহিত্যের দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার"প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৮-১০ 
  3. সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, আগস্ট ২০১৬ পৃষ্ঠা ২৮০, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৯৫৫-১৩৫-৬
  4. সেলিনা হোসেন ও নুরুল ইসলাম সম্পাদিত; বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান; পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণঃ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৭; পৃষ্ঠা-১৮৮, আইএসবিএন ৯৮৪-০৭-৪৩৫৪-৬