তাওরাত

ইহুদীদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ।
(তোরাহ থেকে পুনর্নির্দেশিত)

তাওরাত হচ্ছে ইহুদীদের ঐশী ধর্মগ্রন্থ। এটি হিব্রু ভাষায় লিখিত। হিব্রুতে এর নাম তথা তোরাহ্‌। তোরাহ্‌ শব্দের অর্থ "আইন", "নিয়ম", বা "শিক্ষণীয় উপদেশ"। এটি ৫ টি পুস্তকের সমন্বয়ে গঠিত। তাই তাওরাতকে অনেকে মুসা নবীর "পঞ্চ পুস্তক" বলা হয়ে থাকে।[১] ইসলাম অনুযায়ী “তাওরাত” আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদের পূর্ববর্তী নবী মুসার উপর অবতীর্ণ একটি আসমানি কিতাব যা ৬ রমজান তারিখে অবতীর্ণ হয়েছিল। ইহুদীদের মধ্যে প্রচলিত তাওরাত হযরত ঈসা এর ৪৫৪ বছর পূর্বে লিখিত হয়েছে এবং মুসা (আ.) আর ১১২৫ বছর পরে রচিত হয়েছে বলে বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে।[২]

তোরাহ হাতে প্রার্থনারত ইহুদী ধর্মের লোকজন

তাওরাত ইহুদীদের ধর্মীয় রীতি-বিধির ভিত্তি ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তাওরাত মূলত তাদের ধর্মগ্রন্থ তানাখের প্রথম অংশকে বোঝালেও সার্বিকভাবে “তোরাহ” বলতে ইহুদিদের লিখিত ও মৌখিক শিক্ষা, যেমন মিশনাহ, তালমুদ, মিদ্রাশ, ইত্যাদি ধর্মীয় অনুশাসনমূলক গ্রন্থকে একসাথে ইঙ্গিত করে। সিনাগগে গিয়ে প্রার্থনার সময় তাওরাত থেকে পাঠ করা হয়ে থাকে।

ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিমরা এই তিন ধর্মাবলম্বীরা মনে করে “তাওরাত” হলো মুসা নবীর নিকটে প্রেরিত ঈশ্বরের সরাসরি ঐশী বাণী বা আসমানী কিতাব। খ্রিস্টান পণ্ডিতরা তোরাহকে হিব্রু বাইবেলের প্রথম পাঁচ গ্রন্থ পুরাতন বাইবেল হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। ইসলামী পণ্ডিতরা বিশ্বাস করেন মূল তাওরাত ও বর্তমানে লভ্য তাওরাত অভিন্ন নয়।

ব্যুৎপত্তি এবং নামসমুহসম্পাদনা

হিব্রু শব্দ "তোরাহ" মূল শব্দটি ירה (ইউরহা) থেকে এসেছে, যার অর্থ দাড়ায় "নির্দেশনা তথা শিক্ষার জন্য"। এছাড়াও বিভিন্ন অনুবাদে “তোরাহ্‌” শব্দের অর্থ হচ্ছে শিক্ষা, উপদেশমালা, নির্দেশাবলী, সর্বজন গ্রাহ্য নিয়মনীতি, ব্যাবস্থাপনা ইত্যাদি।

রাব্বাইয়ানিক ইহুদীবাদের লিখিত নিয়মনীতি ও মৌখিক নিয়মনীতি বোঝানোর জন্য "তোরাহ্‌" শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইহুদী ধর্ম পালন এবং ধর্মীয় শিক্ষার প্রচার ও প্রসার করার "তোরাহ" মূলগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। খ্রিস্টান পণ্ডিতরা তোরাহকে হিব্রু বাইবেলের প্রথম পাঁচ গ্রন্থ পুরাতন বাইবেল হিসেবে উল্লেখ করেন।[৩]

সুচিপত্রসম্পাদনা

মহান সৃষ্টিকর্তা প্রভুর দ্বারা এই মহাবিশ্বের সৃষ্টির বিবরণ দিয়ে তোরাহ শুরু হয়, তারপর আদম থেকে নূহ নবী পর্যন্ত বংশ-তালিকা ও মহা প্লাবনের ঘটনাক্রম বর্ণনা করা হয়, এর সাথে রয়েছে ইব্রাহিম নবীর বংশের বিবরণ এবং ইসরাইল জাতির সুচনালগ্ন ও প্রাচীন মিশর দেশে পুনর্বাসনের কাহিনী, এবং সিনাই উপত্যকায় তোরাহ্‌ নাযিলের কাহিনী। মিশর দেশ থেকে মুক্ত হয়ে কানান দেশে ইসরাইল জাতির ফিরে আসা এবং মুসা নবীর মৃত্যুর ঘটনার বিবরণ দিয়ে তোরাহ গ্রন্থটির উপসংহার টানা হয়।[৪]

 
রূপার তৈরি তোরাহ বাক্স

হিব্রু ভাষায় তোরাহ র পাঁচটি বইয়ের নিজস্ব নাম দিয়ে শুরু হয়েছে; ইংরেজি ভাষায় ব্যবহৃত প্রত্যেকটি নাম প্রাচীন গ্রিসের ভাষা থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়। তাওরাত-এর মধ্যে হিব্রু বাইবেল-এর প্রথম পাঁচটি বই পড়ে। এই পঞ্চ পুস্তকের নাম নিম্নরূপ।

আদি পুস্তকসম্পাদনা

মৌলিক সৃষ্টির ইতিহাস বর্ণনা করার মধ্য দিয়ে আদিগ্রন্থের শুরু হয়, প্রথম মানব আদম থেকে শুরু করে নুহ নবী পর্যন্ত বংশতালিকা ও ঘটনার বিবরণ এখানে উল্লেখ করা হয় (অধ্যায় ১-১১)। এছাড়াও এক-ইশ্বরবাদের তিন পিতৃপ্রজন্ম যথাক্রমে ইব্রাহিম, ইসহাক এবং ইয়াকুব (ইসরাইল), এবং চার মাতৃপ্রজন্ম যথাক্রমে সারাহ, রেবেকা এবং লেহ ও রাখেল এর সময়কার ঘটনাবলি সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়। এখানে সৃষ্টিকর্তা প্রভু এই প্রজন্মকে কানান দেশের অধিকারী করার জন্য প্রতিজ্ঞা করেন, কিন্তু জেনেসিসের শেষের দিকে ইয়াকুব পুত্র ইউসুফ মিশর দেশে বসবাস করতে থাকেন এবং মিশরীয় জাতিকে মহা দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা করেন, তারপর তিনি সেখানকার রাজ সভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন (অধ্যায় ১২-৫০)।

যাত্রাপুস্তকসম্পাদনা

মুসা নবী কর্তৃক ইসরাইলের জাতিকে মিশর দেশের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে সিনাই উপত্যকা পর্যন্ত নিয়ে আসার ঘটনা দিয়ে যাত্রাগ্রন্থের শুরু হয় (অধ্যায় ১-১৮)। তারপর কীভাবে ইসরাইলের লোকেরা ঈশ্বরের আদেশ মেনে নেয়, নিজেদেরকে শত্রু থেকে রক্ষা করে, মুসা নবী সরাসরি প্রভুর কাছ থেকে তোরাহ্‌ লাভ করেন এবং নিজ জাতিকে এর নিয়মনীতি শিক্ষা দেন এ বিষয়ে বিশদ বর্ণনা করা হয় (অধ্যায় ১৯-২৪)। এছাড়াও ইসরাইলের জাতি স্বর্ণ দিয়ে গোবাছুর তৈরি করে সর্বপ্রথম তোরাহ-র নিয়ম ভঙ্গ করে এ বিষয়ে এখানে উল্লেখ আছে (অধ্যায় ৩২-৩৪)। ইহুদী ধর্মের জন্য কিভাবে পবিত্র উপাসনার স্থান নির্মাণ করতে হবে এ বিষয়ে ভালোভাবে বর্ণনা করার মধ্য দিয়ে এক্সোডাস/যাত্রাগ্রন্থ শেষ হয় (অধ্যায় ২৫-৩১;৩৫-৪০)

লেবীয় পুস্তকসম্পাদনা

ইসরাইলের জাতি কিভাবে পবিত্র উপাসনার স্থান ব্যবহার করবে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়ার মধ্য দিয়ে লেবীয়-গ্রন্থ শুরু হয় (অধ্যায় ১-১০)। পবিত্র-অপবিত্র বস্তু সম্পর্কে ধারণা প্রদান (অধ্যায় ১১-১৫), যার মধ্যে আছে কিভাবে পশু উতসর্গ করতে হবে, প্রায়শ্চিত্ত করার নিয়মাবলি (অধ্যায় ১৬), এবং বিভিন্ন মানবিক নৈতিকতা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করার নিয়মনীতি বর্ণনা করা হয় (অধ্যায় ১৭-২৬)।

গণনাপুস্তকসম্পাদনা

ইসরাইলের জাতি সিনাই উপত্যকায় নিজেদেরকে জাতি হিসেবে দৃঢ় ও সংঘবধ্য করার কাহিনী (অধ্যায় ১-৯), সিনাই উপত্যকা থেকে কেনান দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার কাহিনী গণনাগ্রন্থে উল্লেখ করা হয় (অধ্যায় ১০-১৩)। মিশর দেশ থেকে মুক্ত হয়ে প্রায় ৪০ বছর মরু প্রান্তরে ঘুরে বেড়ানোর জন্য ইসরাইল জাতির নিজেদের মধ্যে নানারকম অবিশ্বাস জন্ম নেয়, কারণ তারা তখন পর্যন্ত কেনান দেশে প্রবেশ করতে পারেনি। মুসা নবীর জীবদ্দশায় তারা কানান দেশ লাভ করতে পারেনা, পরবর্তীকালে তারা কেনান দেশে প্রবেশ করার সুযোগ লাভ করে (অধ্যায় ১৪-৩৫)।

দ্বিতীয় বিবরণসম্পাদনা

দ্বিতীয় বিবরণ গ্রন্থ হচ্ছে মুসা নবী কর্তৃক বর্ণীত নির্দেশনাসমূহ। এখানে বলা হযয়েছে ইসরাইলের জাতি যেন কখনো মূর্তি পূজা না করে, কানান দেশের রাস্তা যেন অনুসরণ না করে এবং ঈশ্বরের নাম যেন উৎখাত না করে। এখানে মুসা নবী ইসরাইলের জাতিকে সৎ পথে পরিচালনা করার জন্য বিভিন্ন আদেশ ও নিয়মনীতি প্রণয়ন করে (অধায় ১-২৮)। ড্যুটারনমি/নির্দেশনা-গ্রন্থ এর শেষভাগে মুসা নবী পর্বত থেকে প্রতিশ্রুত ভুমি দেখতে পান ও মারা যান। জীবনের শেষ ভাগে এসে মুসা নবী জশুয়া কে ইসরাইলের নেতৃত্ব প্রদান করেন যাতে তারা কানান দেশের অধিকারী হতে পারে (অধ্য়ায় ২৯-৩৪)।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

আরও দেখুনসম্পাদনা

বহিঃসংযোগসম্পাদনা