তৃতীয় সোমেশ্বর (আইএএসটি: Someśvara; শা. ১১২৭ – ১১৩৮ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন একজন পশ্চিম চালুক্য রাজা। ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের পুত্র ও উত্তরসূরি[১] তৃতীয় সোমেশ্বর ১১২৬[২] অথবা ১১২৭[১] খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন।

রাজা তৃতীয় সোমেশ্বরের প্রাচীন কন্নড় অভিলেখ, বল্লিগাবি, কর্ণাটক, ১১২৯ খ্রিস্টাব্দ

তৃতীয় সোমেশ্বর ছিলেন চালুক্য বংশের তৃতীয় রাজা যাঁর নামকরণ করা হয়েছিল হিন্দু দেবতা শিবের নামানুসারে। তিনি শৈবধর্মের প্রসারে এবং শৈব মঠগুলিকে প্রচুর জমি দান করেছিলেন।[৩][৪] এই মঠগুলি ভারতীয় উপদ্বীপ বেদন্যায় প্রভৃতি হিন্দু দর্শন চর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।[৩] ১১৩৮ খ্রিস্টাব্দে তৃতীয় সোমেশ্বেরের মৃত্যু ঘটলে তাঁর পুত্র জগদেকমল্ল সিংহাসনে আরোহণ করেন।[৫]

সোমেশ্বর ছিলেন একজন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, পণ্ডিত ও কবি।[১] তিনি মানসোল্লাস নামে একটি সংস্কৃত বিশ্বকোষতুল্য গ্রন্থ রচনা করেন। এই বইটি থেকে রাষ্ট্রনীতি, প্রশাসন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্যোতিষ, ছন্দশাস্ত্র, ঔষধবিজ্ঞান, খাদ্য, স্থাপত্য, চিত্রকলা, কাব্য ও সংগীত সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তথ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস এই গ্রন্থটি।[৫][৬] সংস্কৃত ভাষায় তিনি নিজ পিতা ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের একটি অসম্পূর্ণ জীবনী রচনা করেন। গ্রন্থটির নাম বিক্রমাঙ্কাভ্যুদয়[১] পাণ্ডিত্যের জন্য তিনি “সর্বদ্ন্যভূপ” (সর্বজ্ঞ রাজা) ও “ভূলোকমল” (সকল জীবের অধিপতি যে রাজা) উপাধি অর্জন করেন।[৫]

মানসোল্লাস

সম্পাদনা

তৃতীয় সোমেশ্বর সংস্কৃত ভাষায় মানসোল্লাস (সংস্কৃত: मानसोल्लास, অর্থাৎ "চিত্ত প্রফুল্লকারী"[২]) বা অভিলাষার্থ চিন্তামণি (অর্থাৎ ইচ্ছাপূর্ণকারী পরশমণি) নামে একটি বিশ্বকোষতুল্য গ্রন্থ রচনা করেন।[৭] এই গ্রন্থে বিভিন্ন বিষয় (১০০টি বিষয়[৭]) অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে একটি রাজ্য অধিগ্রহণের উপায়, সেই রাজ্য প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি ও রাজকীয় বিনোদন। এছাড়াও এই গ্রন্থে ভারতীয় শিল্প, স্থাপত্য, খাদ্যাভ্যাস, অলংকার, খেলাধুলা, সংগীত ও নৃত্য সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়।[৬] সেই সঙ্গে আছে রাজার প্রিয় খাবারগুলির রন্ধনপ্রণালী, যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ভাত, সবজি, মাংস ও মিষ্টান্ন। দুধের মিষ্টি ছাড়াও গোলামু, পান্তুয়াঘরিকার মতো ভাজা মিষ্টিরও রন্ধনপ্রণালী এতে বর্ণিত হয়েছে।[৮]

বিক্রমাঙ্কাভ্যুদয়

সম্পাদনা

১৯২৫ সালে আবিষ্কৃত বিক্রমাঙ্কাভ্যুদয় গ্রন্থটি হল তৃতীয় সোমেশ্বর রচিত একটি ঐতিহাসিক নথি। এটি তাঁর পিতার জীবনীর আকারে রচিত।[১] প্রথম অধ্যায়ে কর্ণাটকের ভূগোল ও জনগোষ্ঠীর বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়, দ্বিতীয় অধ্যায়ে ব্যাখ্যাত হয়েছে পশ্চিম চালুক্য সাম্রাজ্যের রাজধানী কল্যাণের বিশালতা।[১] সুদীর্ঘ তৃতীয় অধ্যায়টিতে ধৃত হয়েছে চালুক্যদের ইতিহাস। এই অধ্যায়ের সূচনায় একটি কিংবদন্তি কাহিনির উল্লেখ পাওয়া যায়; এবং অধ্যায়টি শেষ হয়েছে তৃতীয় সোমেশ্বের পিতা ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের রাজত্বের ষোড়শ বর্ষে তাঁর ‘দ্বিগ্বিজয়’ শুরুর মধ্য দিয়ে।[৯] যদিও শেষ অধ্যায়টি অসম্পূর্ণ, কারণ এটির সমাপ্তি অংশটি আকস্মিক: "সেদিন ব্রাহ্মণ ও ভদ্রনারীগণ…"[৯]

তথ্যসূত্র

সম্পাদনা
  1. A Textbook of Historiography, 500 B.C. to A.D. 2000 by E. Sreedharan, p.328-329, Orient Blackswan, (2004) আইএসবিএন ৮১-২৫০-২৬৫৭-৬
  2. Snodgrass 2004, পৃ. 452।
  3. Prabhavati C. Reddy 2014, পৃ. 99-101।
  4. "नऊशे वर्षांपूर्वीचा शिलालेख जत तालुक्यात प्रकाशात"Loksatta (মারাঠি ভাষায়)। ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১। সংগ্রহের তারিখ ২৮ মার্চ ২০২১ 
  5. Kincaid ও Parasanisa 1918, পৃ. 32-33।
  6. Banerji 1989, পৃ. 238।
  7. Prakash 2005, পৃ. 302।
  8. Krondl, Michael (২০১১)। Sweet Invention: A History of Dessert। Chicago Review Press। পৃষ্ঠা 41–42। 
  9. Sreedharan2004, পৃ. 328।

গ্রন্থপঞ্জি

সম্পাদনা
পূর্বসূরী
ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য
পশ্চিম চালুক্য
১১২৬–১১৩৮
উত্তরসূরী
দ্বিতীয় জগদেকমল্ল