ক্লোরোফিল

রাসায়নিক যৌগ

ক্লোরোফিল বা পত্রহরিৎ হচ্ছে একধরনের সবুজ রঞ্জক পদার্থ যা সায়ানোব্যাকটেরিয়ায় এবং উদ্ভিদশৈবালের ক্লোরোপ্লাস্টে পাওয়া যায়। ক্লোরোফিল শব্দটি গ্রিক শব্দ থেকে নেয়া হয়েছে, χλωρός, chloros ("সবুজ") and φύλλον, phyllon ("পাতা"),[২] তাই ক্লোরোফিলের শব্দগত অর্থ সবুজ পাতা। ক্লোরোফিল একটি অতি প্রয়োজনীয় জৈব অণু যা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং উদ্ভিদকে সূর্যালোক থেকে শক্তি সংগ্রহে সাহায্য করে। ক্লোরোফিল তড়িৎচুম্বকীয় বর্ণালীর নীল ও লাল অংশ থেকে অধিক আলো শোষণ করে।[৩] ১৮১৭ সালে জোসেফ নিয়েনাইমে কাভেন্তো এবং পিয়েরে জোসেফ পেল্লেতিয়ের (Pelletier) সর্বপ্রথম ক্লোরোফিল আবিষ্কার করেন।[৪]

Animation depicting nearly four years worth of SeaWiFS ocean chlorophyll concentration.
এই পত্রহরিৎ মানচিত্রগুলি প্রতি মাসে সমুদ্রের জলের প্রতি ঘনমিটারে মিলিগ্রাম পত্রহরিৎ দেখায়। যেসব স্থানে পত্রহরিৎ পরিমাণ খুবই কম, তথা ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের সংখ্যা খুবই কম, সেই স্থান নীল। যেসব জায়গায় পত্রহরিৎ -এর ঘনত্ব বেশি, তথা অনেক ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন, সেই স্থান হলদে। পর্যবেক্ষণগুলি নাসার অ্যাকোয়া স্যাটেলাইটে থাকা মডারেট রেজোলিউশন ইমেজিং স্পেকট্রোরেডিওমিটার (এমওডিআইএস) থেকে এসেছে। ভূমি গাঢ় ধূসর, এবং যে স্থানগুলিতে এমওডিআইএস সমুদ্রের বরফ, মেরু অন্ধকার বা মেঘের কারণে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি সেগুলি হালকা ধূসর। সর্বোচ্চ পত্রহরিৎ ঘনত্বের স্থান, যেখানে ক্ষুদ্র পৃষ্ঠ-নিবাসিত সমুদ্রের উদ্ভিদ বেশি, তা ঠান্ডা মেরু জলে বা জায়গায় থাকে কিংবা যেখানে সমুদ্রের স্রোত ভূপৃষ্ঠে ঠান্ডা জল নিয়ে আসে, যেমন বিষুবরেখার চারপাশে এবং মহাদেশের তীরে। ঠান্ডা জল নিজে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনকে উদ্দীপিত করে না। পরিবর্তে, শীতল তাপমাত্রার জল সাধারণত সমুদ্রের গভীর থেকে পৃষ্ঠের উপরে উঠে আসা জল হয়ে থাকে, যা উপরে উঠে আসার সাথে সাথে সমুদ্র পৃষ্ঠে তৈরি হওয়া পুষ্টিও বহন করে। মেরু জলে, শীতের অন্ধকার মাসগুলিতে যখন উদ্ভিদগুলি বেড়ে উঠতে পারে না তখন পৃষ্ঠের জলে সেসকল পুষ্টি জমা হয়। বসন্ত এবং গ্রীষ্মে যখন সূর্যালোক ফিরে আসে, উদ্ভিদগুলি তখন উচ্চ ঘনত্বে বৃদ্ধি পায়।[১]

অবস্থানসম্পাদনা

প্রধানত পাতার মেসোফিল কলার কোষে ক্লোরোপ্লাস্ট নামে একধরনের অঙ্গাণু থাকে। ক্লোরোপ্লাস্টের থাইলাকয়েড পর্দার মধ্যে ক্লোরোফিল থাকে। পূর্বের কোয়ান্টোজোম মতবাদ এখন বিজ্ঞানীরা বর্জন করেছেন।

প্রকারভেদসম্পাদনা

ক্লোরোফিল অণুর গঠন অনুসারে ক্লোরোফিল পাঁচ প্রকারের হয়, যথা: ক্লোরোফিল-a, ক্লোরোফিল-b, ক্লোরোফিল-c1, ক্লোরোফিল-c2, ক্লোরোফিল-d, ক্লোরোফিল-eক্লোরোফিল-f। উন্নত সবুজ উদ্ভিদ ও সবুজ শৈবালে ক্লোরোফিল-a ও ক্লোরোফিল-b, সামুদ্রিক শৈবালে ক্লোরোফিল-c1 ও ক্লোরোফিল-c2, সায়ানোব্যাক্টেরিয়াতে ক্লোরোফিল-d ও ক্লোরোফিল-f থাকে। এছাড়া সাহায্যকারী রঞ্জক পদার্থ হিসাবে ফাইকোসায়ানিন, ফাইকোএরিথ্রিন পাওয়া যায়, ব্যাক্টেরিয়াতে উপস্থিত ক্লোরোফিলকে ব্যাক্টেরিও-ক্লোরোফিল বলে।

রাসায়নিক গঠনসম্পাদনা

রাসায়নিক গঠন অনুসারে ক্লোরোফিল কার্বন (C), হাইড্রোজেন (H), অক্সিজেন (O), নাইট্রোজেন (N) ও ম্যাগনেসিয়াম (Mg) লোহা (Fe) নিয়ে গঠিত। এগুলোর অভাব দেখা দিলে ক্লোরোফিলের সংশ্লেষণ ব্যাহত হয়ে পড়ে। ক্লোরোফিলের রাসায়নিক গঠনে দেখা যায় এটি পরফাইরিন (porphyrin) যৌগ। এই পরফাইরিন চারটি পাইরল (pyrrole) বলয় বৃত্তাকারে পরস্পর যুক্ত হয়। কেন্দ্রে একটি ম্যাগনেসিয়াম (Mg++) আয়ন থাকে। একটি ফাইটল জাতীয় শৃঙ্খল চতুর্থ পাইরল বলয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ক্লোরোফিল-a তে দ্বিতীয় পাইরল বলয়ে -CH3 গ্রুপ থাকে এবং ক্লোরোফিল-b তে ওই স্থানে -CHO গ্রুপ থাকে।
বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখা যায়, আলোকের সাতটি বর্ণের মধ্যে ক্লোরোফিল-a এবং ক্লোরোফিল-b, নীল, বেগুনি এবং লাল অংশগুলি বেশি মাত্রায় শোষণ করে। আলোকের সবুজ অংশ শোষিত হয় না। ক্লোরোফিল রঞ্জক বর্ণালীর লাল এবং নীল অংশ বেশি শোষণ করে বলে এই দুই অংশকে ক্লোরোফিল রঞ্জকের শোষণ বর্ণালী বলে। এথেকে বোঝা যায় যে সালোকসংশ্লেষে ক্লোরোফিল প্রধান রঞ্জক হিসাবে কাজ করে । ক্লোরোফিল-a অণু 410 nm এবং 660 nm তরঙ্গদৈর্ঘ্যযুক্ত আলো এবং ক্লোরোফিল-b অণু 452 nm এবং 642 nm তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করতে পারে। ক্লোরোফিল-b থেকে ক্লোরোফিল-a বেশি আলো শোষণ করে । আবার ক্লোরোফিল-b এর নীল আলো শোষণ করার ক্ষমতা ক্লোরোফিল-a থেকে বেশি।

চিত্রশালাসম্পাদনা

তথ্যসুত্রসম্পাদনা

  1. Chlorophyll : বৈশ্বিক মানচিত্র. Earthobservatory.nasa.gov. Retrieved on 2014-02-02.
  2. "chlorophyll"Online Etymology Dictionary 
  3. Chlorophyll molecules are specifically arranged in and around photosystems that are embedded in the thylakoid membranes of chloroplasts. Two types of chlorophyll exist in the photosystems: chlorophyll a and b. Speer, Brian R. (১৯৯৭)। "Photosynthetic Pigments"UCMP Glossary (online)University of California Museum of Paleontology। ২০১০-০৬-১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১০-০৭-১৭  |কর্ম= এ বহিঃসংযোগ দেয়া (সাহায্য)
  4. Delépine, Marcel (সেপ্টেম্বর ১৯৫১)। "Joseph Pelletier and Joseph Caventou"Journal of Chemical Education28 (9): 454। ডিওআই:10.1021/ed028p454বিবকোড:1951JChEd..28..454D 

বহিঃসংযোগসম্পাদনা