ম্যাজেলান প্রণালী

ম্যাজেলান প্রণালী (স্পেনীয়: Estrecho de Magallanes, ইংরেজি: Strait of Magellan) হল দক্ষিণ চিলির একটি নাব্য সমুদ্রপথ। এটি উত্তরে দক্ষিণ আমেরিকার মূল ভূখণ্ডকে দক্ষিণে তিয়ের্‌রা দেল ফুয়েগো থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। এই প্রণালীটি আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক যোগাযোগের রাস্তা হিসাবে বিবেচিত হয়। আধুনিক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, অভিযাত্রী এবং অন্যান্যরা অনেকবার এই প্রণালী অতিক্রম করেছে।

ম্যাজেলান প্রণালী
Chile.estrechodemagallanes.png
দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ প্রান্তে ম্যাজেলান প্রণালী
অবস্থানম্যাগালেনেস অঞ্চল, চিলি
স্থানাঙ্ক৫৩°২৮′ দক্ষিণ ৭০°৪৭′ পশ্চিম / ৫৩.৪৬৭° দক্ষিণ ৭০.৭৮৩° পশ্চিম / -53.467; -70.783স্থানাঙ্ক: ৫৩°২৮′ দক্ষিণ ৭০°৪৭′ পশ্চিম / ৫৩.৪৬৭° দক্ষিণ ৭০.৭৮৩° পশ্চিম / -53.467; -70.783
ধরনপ্রণালী
অববাহিকার দেশসমূহ আর্জেন্টিনা  চিলি
সর্বাধিক দৈর্ঘ্য৫৭০ কিমি (৩৫০ মা)
ন্যূনতম প্রস্থ২ কিমি (১.২ মা)
ম্যাজেলান প্রণালীর উপগ্রহ চিত্র

এর আবিষ্কারক, পর্তুগিজ অভিযাত্রী ফার্ডিনান্ড ম্যাগেলান এই প্রণালীর নাম রেখেছিলেন এস্ত্রেচো ডি টোডোস লস সান্তোস ("সমস্ত প্রণালীর সেরা প্রণালী")। ম্যাজেলান অনুসন্ধানের অর্থদাতা, পঞ্চম চার্লস, তাঁকে সম্মান জানাতে নামটি পরিবর্তন করে ম্যাজেলান প্রণালী রেখেছিলেন।[১]

এই যাত্রাপথ প্রায়ই সংকীর্ণ এবং অনিশ্চিত বাতাস এবং স্রোতের কারণে এই পথে চলাচল করা কঠিন। এই পথে সামুদ্রিক নাবিক থাকা এখন বাধ্যতামূলক। এই প্রণালীটি ড্রেক জলপথের থেকে ছোট এবং কিছুটা নিরাপদ।[২] পানামা খাল নির্মাণের আগে, আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে যোগাযোগের জন্য কয়েকটি সমুদ্রপথের মধ্যে বিগ্‌ল প্রণালী এবং এই প্রণালী ছিল।

ইতিহাসসম্পাদনা

আদিবাসী মানুষসম্পাদনা

হাজার বছর ধরে আদিবাসী আমেরিকানরা ম্যাজেলান প্রণালীতে বসবাস করে আসছে।[৩] কাওস্কার উপজাতি প্রণালীর উত্তরের উপকূলের পশ্চিম অংশে বাস করত। কাওস্করের পূর্ব দিকে ছিল তেহুয়েলচেরা, যাদের বসবাস উত্তরে পাতাগোনিয়া পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল। তেহুয়েলচের দক্ষিণে প্রণালীর অপর পারে সেলক'নাম জনজাতি বাস করত, যারা তিয়ের্‌রা দেল ফুয়েগোর পূর্বদিকের বেশিরভাগ অংশে জুড়ে বাস করত। সেলক'নামের পশ্চিমে ছিল ইয়াঘান জনজাতি, যারা তিয়ের্‌রা দেল ফুয়েগোর দক্ষিণতম অঞ্চলে বাস করত।[৪]

এই অঞ্চলে সমস্ত উপজাতি যাযাবর শিকারী সংগ্রাহক। তেহুয়েলচে এই অঞ্চলের একমাত্র অ-সামুদ্রিক জনজাতি ছিল; তারা মাছ ধরত এবং শীতের সময় উপকূল জুড়ে শামুক জাতীয় খাদ্য সংগ্রহ করত। তারা গ্রীষ্মে শিকার করার জন্য দক্ষিণ আন্দিজে চলে আসত।[৫]

উনিশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত এই অঞ্চলের উপজাতিরা ইউরোপীয়দের সম্মুখীন হয়নি, এরপরে ইউরোপীয়দের সংক্রামক অসুস্থতায় আদিবাসীদের জনসংখ্যার বিশাল অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।[৬]

ইউরোপীয়দের আবিষ্কারসম্পাদনা

ম্যাগেলানের আগে অভিযানসম্পাদনা

১৫৬৩ সালে, আন্তোনিও গালভাও জানিয়েছিলেন যে এই প্রণালীর অবস্থানকে পূর্বেকার পুরানো তালিকাগুলিতে ড্রাগনের লেজ (ড্রাকো কোলা) বলে উল্লেখ করা হয়েছিল:[ক]

কইমব্রার ডিউক, পিটার এমন একটি মানচিত্র নিয়ে এসেছিলেন যাতে বিশ্বের সমস্ত সমুদ্রপথের বর্ণনা ছিল। ম্যাজেলান প্রণালীকে ড্রাগনের লেজ বলা হত; এবং সেই মানচিত্রে উত্তমাশা অন্তরীপ এবং আফ্রিকা উপকূল দেখানো ছিল। ... ফ্রান্সিসকো ডি সৌসা তাভারেস আমাকে বলেছিলেন যে ১৫২৮ সালে, শিশু ডি ফার্নান্দো তাঁকে একটি মানচিত্র দেখিয়েছিল যেটি আলকোবাকার কার্টোরিওতে পাওয়া গিয়েছিল, সেটি আরও ১২০ বছর আগে তৈরি হয়েছিল, যার মধ্যে উত্তমাশা অন্তরীপ থেকে ভারতের সমস্ত নাব্য পথ দেখানো ছিল।[৯]

এটি থেকে বোঝা যায়, যে ইউরোপীয়রা প্রথম আমেরিকা "আবিষ্কার" করার আগেই ম্যাজেলান প্রণালীর কথা মানচিত্রে উল্লেখ করা ছিল। ফলস্বরূপ, দাবিটি সন্দেহজনক হিসাবে বিবেচিত হয়েছে।[৭][খ]

ম্যাগেলানসম্পাদনা

পঞ্চম চার্লসের এক কর্মচারী ফার্ডিনান্ড ম্যাগেলান ছিলেন একজন পর্তুগিজ অভিযাত্রী এবং নাবিক। তিনি ১৫২০ সালে প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে তাঁর বিশ্বব্যাপী পরিবাহী ভ্রমণের সময় এই প্রণালীতে অভিযান করেছিলেন।[১০][১১] ১৫১৮ সালের ২২শে মার্চ, ভালাদোলিড থেকে এই অভিযানের আয়োজন করা হয়েছিল। ম্যাগেলানকে নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন জেনারেল এবং সমস্ত আবিষ্কার করা অঞ্চলের শাসক ঘোষণা করা হয়েছিল, ও ম্যাগেলান এবং তাঁর ব্যবসায়িক সহযোগী রুই ফ্যালিরোকে বিশেষ অধিকার দেওয়া হয়েছিল। নৌবহরটি "আর্মদা দে লাস মলুকাস" বা "মলুকাসের নৌবহর" নামে পরিচিত হয়েছিল। ২০শে সেপ্টেম্বর, ১৫১৯ সালে পাঁচটি জাহাজ নিয়ে অভিযাত্রী বহরটি সানলুকার ডি বারামেদা থেকে যাত্রা শুরু করেছিল।[১২]

ছবিতে ম্যাজেলান প্রণালীসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

পাদটীকাসম্পাদনা

  1. "For some decades a group of scholars in Latin America has been claiming that this so‐called 'Dragon's Tail' peninsula is really a pre‐Columbian map of South America. In this paper, the cartographical and place‐name evidence is examined, showing that the identification has not been proved, and that perceived similarities between the river and coastal outlines on this 'Dragon's Tail' peninsula and those of South America are fortuitous."[৭][৮]
  2. See also: Pre-Columbian trans-oceanic contact theories, Exploration of North America, Waldseemüller map, Madoc, and Norse colonization of North America

উদ্ধৃতিসম্পাদনা

  1. Crum, Haley। "The Man Who Sailed the World"Smithsonianmag.comSmithsonian Institution। সংগ্রহের তারিখ ২৩ অক্টোবর ২০১৯ 
  2. "Straight Of Magellan – Map & Description"। worldatlas.com। অক্টোবর ১৯, ২০১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ অক্টোবর ১৯, ২০১৯ 
  3. "Fell's Cave (9000–8000 B.C.)"metmuseum। The Metropolitan Museum of Art। সংগ্রহের তারিখ ২৩ অক্টোবর ২০১৯ 
  4. "Genomic insights into the origin and diversification of late maritime hunter-gatherers from the Chilean Patagonia"ncbi। National Center for Biotechnology Information। সংগ্রহের তারিখ ২৩ অক্টোবর ২০১৯ 
  5. Espinoza, María Cecilia। "RIGHTS-CHILE: A 'New Deal' for Indigenous Groups"ipsnews। Inter Press Service। সংগ্রহের তারিখ ২৩ অক্টোবর ২০১৯ 
  6. Benson, Andrew; Aeberhard, Danny (১৫ নভেম্বর ২০১০)। The Rough Guide to Argentina (4th সংস্করণ)। Rough Guides। পৃষ্ঠা 501আইএসবিএন 978-1848365216 
  7. Richardson, William A.R. (২০০৩)। "South America on Maps before Columbus? Martellus's 'Dragon's Tail' Peninsula"। Imago Mundi55: 25–37। ডিওআই:10.1080/0308569032000097477 
  8. de Zurara, Prestage এবং Beazley 2010, পৃ. cxiv।
  9. Galvaão ও Hakluyt 2004
  10. "Ferdinand Magellan, Discovery of the Strait of Magellan"Encyclopædia Britannica। সংগ্রহের তারিখ অক্টোবর ১৮, ২০১৯ 
  11. Ponce এবং অন্যান্য 2016
  12. Murphy ও Coye 2013

গ্রন্থপঞ্জীসম্পাদনা

আরো পড়ুনসম্পাদনা

বহিঃসংযোগসম্পাদনা