মৃত্যুক্ষুধা কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি উপন্যাস। উপন্যাসটি সওগাত পত্রিকায় ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাস থেকে ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাস পর্যন্ত ‍ধারাবাহিক ভাবে মুদ্রিত হয়। গ্রন্থাকারে এটি ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে (১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দ) প্রকাশিত হয়। [১][২] বলা হয়েছে “মৃত্যুক্ষুধা“ কাজী নজরুলের ইসলামের “কালজয়ী” উপন্যাস। আরো বলা হয়েছে এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সাম্যবাদী চেতনার উপন্যাস।[৩]

মৃত্যুক্ষুধা
লেখককাজী নজরুল ইসলাম
দেশভারত
ভাষাবাংলা
বিষয়সমাজবাস্তবতা
ধরনউপন্যাস
প্রকাশনার তারিখ
১৯৩১
মিডিয়া ধরনমুদ্রিত গ্রন্থ
পূর্ববর্তী বইবাঁধন-হারা 
পরবর্তী বইকুহেলিকা 

ইতিহাসসম্পাদনা

কাজী নজরুল ইসলাম মূলত কবি ও গীতিকার হলেও জীবদ্দশায় কিছু গদ্য তিনি লিখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ছোটগল্প, দীর্ঘগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, কলাম, অভিভাষণ বিভিন্ন মাধ্যমে উপস্থাপনযোগ্য নাটক ও নাট্যরচনা। তিনি বাঁধন-হারা, মৃত্যুক্ষুধাকুহেলিকা তিনটি উপন্যাসের রচয়িতা। এছাড়াও তিনি বেশ কয়েকটি ছোটগল্প রচনা করেছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৬ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এ সময় ৪৯ বাঙালি পল্টনে হাবিলদার হিসাবে কর্মরত অবস্থায় তিনি প্রকাশ করেন বাউণ্ডেলের আত্মকথা। এটি একটি আত্মজৈবনিক উপাখ্যান। ১৯১৯-২০ পর্বে প্রকাশিত হয় ব্যথার দানরিক্তের বেদন গ্রন্থ দুটির গল্পগুলি। অনেক পরে প্রকাশিত হয় চারটি গল্প নিয়ে শিউলিমালা এবং বনের পাপিয়া‘রাজবন্দীর চিঠির পত্রের আকারে একটি কাহিনী।[৪][৫]

বাঁধন-হারা তার প্রথম উপন্যাস যা মোসলেম ভারত পত্রিকার প্রথম সংখ্যা থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল এবং পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় শ্রাবণ ১৩৩৪ (১৯২৭)। এটি একটি পত্রোপন্যাস। “মৃত্যুক্ষুধা” তার দ্বিতীয় উপন্যাস। এটি বৈশাখ ১৩৩৭ (১৯৩০ খ্রি.) প্রথম প্রকাশিত হয়। কুহেলিকা তার সর্বশেষ উপন্যাসোম রচনা ১৩৩৪ (১৯২৭) সালে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থাকারে প্রকাশের আগেেএটি নওরোজ পত্রিকার পাঁচটি সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। [৬]

“মৃত্যুক্ষুধা” কবি নজরুলের কাহিনী বাস্তব অভিজ্ঞতাপ্রসূত। ১৯২৬ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত নজরুল পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগরে বাস করতেন। এখানকার চাঁদসড়কের পাশে বিরাট চত্বরওয়ালা একতলা বাংলো প্যাটার্নের একটি বাড়িতে তিনি অবস্থান করতেন। “মৃত্যুক্ষুধা” উপন্যাসের পটভূমিতে রয়েছে ঐ বাড়ি, ওমান কাথলি পাড়া এবং কলতলার পারিপার্শ্বিকতা। উপন্যাসটির প্রথমাংশ কৃষ্ণনগরে এবং শেষাংশ কলকাতায় অবস্থানকালে লিখিত। কৃষ্ণনগরের সংক্ষিপ্ত জীবনে নিদারুণ দুঃখ-কষ্ট এবং দুঃসাধ্য কৃচ্ছ্রসাধন ছিল কবি নজরুলের নিত্যসঙ্গী। তাই দারিদ্রের চিত্র, সাম্য ও বিপ্লবীচেতনা এ উপন্যাসের রূপকল্পের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত।[৭]

গল্প সংক্ষেপসম্পাদনা

বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ। তৎকালিন দারিদ্র্য, ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে কানিীর বিকাশ। উপন্যাসের পটভূমি কৃষ্ণনগরের চাঁদসড়কের বস্তি এলাকা। এ এলাকায় বাস করে একটি দরিদ্র মুসলিম পরিবার। এ পরিবারে আছে রোগগ্রস্ত বৃদ্ধ মা, তিন পুত্রবধূ যাদের সকলেই বিধবা, আর তাদের সন্তানাদি। আর আছে তিন পুত্রবধূর একমাত্র দেবর প্যাঁকালে। সে সদ্য যুবক। বয়স আঠারো-উনিশ। পরিবারের লোকলোক সংখ্যা অনেক। সবার ভরণপোষণের ভার প্যাঁকালের ওপর ন্যস্ত। কুর্শি খ্রিষ্টান হলেও প্যাঁকালের ভালোবাসার জন্য ব্যাকুল। সেজন্য বিধবা-রূপসী ভ্রাতৃজায়া মেজ-বউয়ের বিয়ের প্রস্তাব তার কাছে অতি তুচ্ছ। কুর্শিকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় প্যাঁকালে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে।

সপরিবার মেজ-বৌয়ের মুসলিম থেকে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ। অন্যদিকে রুবি আনসারকে ভালোবাসলেও রুবির পিতা তাকে বিয়ে দেয় আইসিএস পরীক্ষার্থী মোয়াজ্জেমের সঙ্গে এমন একটি প্রেমের কাহিনী। মোয়াজ্জেমের মৃত্যুর পর বিধবা রুবির জীবনে নেমে আসে সমাজের সকল বিধিনিষেধ। নারী জীবনের দুবির্ষহ অন্ধকার এবং সমাজের বাস্তবচিত্র এই উপন্যাসে তুলে ধরা হয়। কৃষ্ণনগরের চাঁদসড়ক। এ সড়কের বস্তি

এর পর শুরু হয় আনসার ও রুবির পর্ব। দেশপ্রেমিক সমাজকর্মী ও সংসার-বিরাগী আনসার এসে আশ্রয় গ্রহণ করে লতিফা ওরফে বুচির বাসায়। লতিফার স্বামী স্থানীয় কোর্টের নাজির। পরে কৃষ্ণনগরের জেলা-ম্যাজিস্ট্রেটের তরুণী কন্যা সদ্য-বিধবা রুবির সঙ্গে শৈশব প্রণয়ের স্মৃতি আনসারের মনে উদয় হয়। যদিও রুবি-আনসারের পুনরায় সাক্ষাৎ ঘটেছে উপন্যাসের শেষাংশে। মাঝখানে কয়েক বছর দু'জনের সাক্ষাৎ হয়নি। কারণ রুবির অমতে তার বিয়ে হয়েছিল অর্থলোভী এক যুবকের সঙ্গে। তাদের সংসার টিকে ছিল মাত্র এক মাস। বাইরের সাজসজ্জা ও আচরণ রুবির বিধবাসুলভ হলেও মনে প্রাণে সে আনসারকেই স্বামী বলে মানে। আনসার রাজবন্দি হয়ে রেঙ্গুন চলে যায়, সেখানে ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হবার আশায় ওয়ালটেয়ারে যায়। এ সংবাদ শোনামাত্র অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে যাত্রা করে রুবি।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

বহিঃসংযোগসম্পাদনা