ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা

ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা (স্পেনীয়: Federico García Lorca) আধুনিক স্প্যানিশ সাহিত্যের অন্যতম কবি। তিনি একাধারে একজন কবি, নাট্যকার ও মঞ্চ পরিচালক ছিলেন। তিনি প্রজন্ম ২৭-এর(কবিদের সম্মিলনে গড়ে ওঠা সংগঠন, যারা ইউরোপিয়ান বিপ্লব স্প্যানিশ সাহিত্যে আনার চেষ্টা করে) একজন সদস্য হিসেবেই মূলত বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পান। তার রচিত অসংখ্য রচনা ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের পাঠকদের কাছে এবং ধীরে ধীরে তার কাব্য-সাহিত্য প্রতিষ্ঠা লাভ করে স্বতন্ত্র এক ধারায়। স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের শুরুর দিকে জাতীয়বাদী কর্মিরা তাকে হত্যা করে, তার লাশ আর কখনও পাওয়া যায়নি। তাকে স্পেনে 'জনগণের কবি' বলে ডাকা হয়। [১]

ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা
Federico García Lorca. Huerta de San Vicente, Granada.jpg
১৯১৪ সালে লোরকা
জন্ম
ফেদেরিকো দেল সাগরাদো কোরাসোন খেসুস গারসিয়া লোরকা

(১৮৯৮-০৬-০৫)৫ জুন ১৮৯৮
ফুয়েন্তে বাকেরোস , গ্রানাডা, আন্দালুসিয়া, স্পেন
মৃত্যু১৯ আগস্ট ১৯৩৬(1936-08-19) (বয়স ৩৮)
জাতীয়তাস্পেনীয়
পেশানাট্যকার, কবি, থিয়েটার পরিচালক
আন্দোলনপ্রজন্ম ২৭
পিতা-মাতাফেদেরিকো গারসিয়া রদ্রিগেজ
ভিসেন্তা লোরকা রোমেরো
স্বাক্ষর
Federico García Lorca signature.svg

জন্ম ও বাল্যকালসম্পাদনা

লোরকা ১৮৯৯ সালের ৫ জুন স্পেনের প্রাচীন ঐতিহ্যময় শহর গ্রানাডা থেকে পাঁচ মাইল দূরে আন্দালুসিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন ।[২] তার পিতা ছিলেন একজন জমিদার আর মা ছিলেন স্কুল শিক্ষক, মূলত পিয়ানো বাজানো শেখাতেন। তাই খুব ছোটবেলায় সঙ্গীতের হাতেখড়ি হয় লোরকার। সেই সুবাদে জনপ্রিয় গানগুলো গাইতে পারতেন শৈশবে।[২] ভগ্ন স্বাস্থ্যের কারণে খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না, তাই বেশিরভাগ সময় কাটত বাড়ির আঙ্গিনায় আর পড়ার টেবিলে। দৈহিক পরিশ্রমে অপারগ ছিলেন বলে লোরকার নিকট স্বপ্নের জগতটা বেশ বড় হয়ে উঠে। স্পেনের পলস্নী জীবন, ষাঁড়ের লড়াই, প্রেম, জিপসিদের রোমান্টিক জীবন, লোকসঙ্গীত, লোকনৃত্য সবকিছু সম্পর্কেই সম্যক একটি ধারণা পেয়েছিলেন তিনি।[২] ১৯০৫ সালে তারা চলে আসেন বালদেরুবিয়ো শহরে। সেখান থেকে ১৯০৯ সালে গ্রানাডা শহরের উপকণ্ঠে উয়ের্তা দে সান বিসেন্তেয় গিয়ে বসবাস শুরু করেন। লোরকার বয়স তখন ১১। যেসব জায়গায় লোরকা বসবাস করেছেন সর্বত্র প্রকৃতির সান্নিধ্য পেয়েছেন। পরবর্তীতে তার শিল্পচিন্তা ও লেখালেখিতে এর গভীর প্রভাব পড়েছিল।[৩]

১১ থেকে ১৬—এই ছয় বছর লোরকা পিয়ানো শেখেন আন্তোনিয়ো সেগুরা মেসা নামের এক সংগীতশিক্ষকের কাছে। মেসা লোরকার মধ্যে সংগীতজ্ঞ হওয়ার বাসনা জাগিয়ে তোলেন। পরে তার বন্ধুত্ব হয় সুরকার মানুয়েল দে ফাইয়ার সঙ্গে। আর তখন থেকে স্প্যানিয় লোকগীতি হয়ে ওঠে তার ধ্যানজ্ঞান। [৩]

শিক্ষাজীবনসম্পাদনা

ছোটবেলায় অসুস্থতার কারণে পড়াশোনায় কিছুটা অনিয়মিত হয়ে পড়েন লোরকা। স্কুলশিক্ষা সমাপ্তির পর ১৯১৫ সালে লোরকা গ্রানাডা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন আইনসাহিত্য বিষয়ে। তবে সব প্রতিকূলতা উৎরে শেষপর্যন্ত তিনি আইনে স্নাতক করতে সক্ষম হন।

কর্মজীবনসম্পাদনা

গ্রাডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময়ে তার মনে জাগে ভ্রমণের আকাঙ্ক্ষা। ১৯১৬-১৭ সালব্যাপী তিনি স্পেনের উত্তরে কাস্তিয়া, লেয়োন ও গালিথিয়া ঘুরে বেড়ান দন ফের্নান্দো দে লোস রিয়োস নামের এক অধ্যাপকের সঙ্গে। এ অধ্যাপক তাকে লেখালেখিতে উৎসাহিত করেন। সে সময় তিনি লিখেন ভ্রমণবৃত্তান্ত ইমপ্রেসিয়োনেস ই পাইসাহেস বা মানচিত্র ও ভূদৃশ্যাবলি। এটিই তার প্রথম প্রকাশিত বই (১৯১৮)। [৪] এর প্রকাশনায় অর্থ জুগিয়েছেন তার পিতা স্বয়ং।

১৯১৯ সালে লোরকা মাদ্রিদে চলে যান। সেখানে কাটিয়ে দেন পরবর্তী ১৫টি বছর। তার নতুন স্থান রেসিদেনসিয়া দে এস্তুদিয়ান্তে। এর সুবাদে তিনি মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে থাকেন। এবার তার পাঠের বিষয় আইন ও দর্শন। কিন্তু কিছুদিন পরেই হাঁপিয়ে ওঠেন। পাঠ্যক্রমভুক্ত বিধিবদ্ধ পাঠে তার আর মন বসে না। বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিয়ে তিনি আত্মনিয়োগ করেন শিল্পচর্চায়। মগ্ন থাকেন অভিনয়, কবিতাপাঠ ও প্রাচীন লোকগীতি সংগ্রহে। এ সময় এল মালেফিসিয়ো দে লা মারিপোসা বা প্রজাপতির দুরভিসন্ধি নামে একটি নাটক লিখে ফেলেন। ১৯২০ সালে সেটি মঞ্চস্থ হলে ঢি ঢি পড়ে যায়। কারণ, নাটকটি ছিল প্রচলিত ঘরানার বাইরে। এটি রচিত পোকামাকড়ের জীবন নিয়ে, মূলত একটি তেলাপোকা ও একটি প্রজাপতির মধ্যে ভালোবাসার কাহিনি। পরের বছর প্রকাশিত হয় তার লোককাহিনিভিত্তিক লিব্রো দে পোয়েমাস বা কবিতার বই। এতে এসেছে ধর্মীয় বিশ্বাস, একাকিত্ব ও প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গ।

লোরকার ওপর ফ্লামেঙ্কো ও যাযাবর সংস্কৃতির প্রভূত প্রভাব পড়েছিল। এ জন্য তাদের কথা ঘুরেফিরে এসেছে তার লেখায়। ফ্লামেঙ্কো সংস্কৃতির প্রসারে ১৯২২ সালে তিনি প্রথম ‘কান্তে হোন্দো’ বা ‘গভীর গান’ উৎসব আয়োজন করেন। স্পেনের বিখ্যাত ডিপ সং গায়ক ও পিয়ানোবাদকেরা তাতে অংশ নেন। তিনি বিশ শতকের তৃতীয় দশকের শুরুর দিকে যেসব কবিতা লিখেছেন, তাতে গভীর গানের আদল খুঁজে পাওয়া যাবে। লোরকা ‘সাতাশের প্রজন্ম’ নামে একটি আভাঁ গার্দ শিল্পীসংঘে যোগ দেন। এই সংঘে ছিলেন সালভাদর দালি ও লুইস বুনুয়েলের মতো জাঁদরেল শিল্পীরা, যাঁরা তাকে পরাবাস্তববাদ ও প্রতীকবাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এ দুই শিল্পদর্শনের আশ্রয়ে তার কবিতা হয়ে ওঠে সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনাময়, নান্দনিকতায় গূঢ়। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় তার কানসিয়োনেস বা গীতিমালা। ১৯২৮ সালে আলোর মুখ দেখে রোমান্সেরো হিতানো বা জিপসি গাথা। এ বই তাকে খ্যাতির তুঙ্গে নিয়ে যায়।

কবিতার পাশাপাশি চলে তার নাট্যচর্চা। তার দ্বিতীয় নাটক মারিয়ানা পিনেদা ১৯২৭ সালে বার্সেলোনায় মঞ্চস্থ হলে বিপুল প্রশংসা কুড়ায়। পরের নাটক লা সাপাতেরা প্রোদিহিয়োসা বা মুচির আশ্চর্য বিবি একটি প্রহসন। তাতে চিত্রিত নারীর প্রতি গোপন প্রণয় ও স্খলনের কাহিনি।

লোরকা ১৯২৯ সালে নিউইয়র্কে পাড়ি জমান। ঘুরে বেড়ান হার্লেম ও ভের্মন্টে। তিনি কলাম্বিয়া স্কুল অব জেনারেল স্টাডিজে ভর্তি হন। বিষয় ইংরেজি। কিন্তু অধিকাংশ সময় ব্যস্ত থাকেন লেখালেখি নিয়ে। কিছুদিন কিউবার হাভানাতেও কাটান। নিউইয়র্কে বসে তিনি যে কবিতাগুলো লেখেন, সেসব সংকলিত হয় পোয়েতা এন নুয়েভা ইয়র্ক বা নিউইয়র্কের কবিতা গ্রন্থে। বইটি অবশ্য প্রকাশিত হয় তার মৃত্যুর পরে। এই গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলোতে নাগরিক যন্ত্রণা ও একাকিত্ববোধ তীব্র হয়ে ফুটে উঠেছে। ‘নিউ ইয়র্ক’ কবিতায় তিনি লেখেন (দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় অনূদিত নিউ ইয়র্কে কবি থেকে): ‘এক ফোঁটা হাঁসের রক্তের/ বহুগুণিতাঙ্কের নিচটাতে,...কোমল রক্তের এক নদী।/যে নদী গান গেয়ে বয়ে চলে/ মহল্লার যত শয্যাঘর একে একে পিছে ফেলে/ পিছে ফেলে নিউইয়র্কের যত নকল ভোরের/ সিমেন্ট, বাতাস, টাকাকড়ি।’ তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন ওয়াল স্ট্রিট ক্র্যাশ এবং এর ফলে উদ্ভূত অর্থনৈতিক মন্দা। তার মনে পুঁজিবাদের প্রতি ঘৃণা জন্ম নেয়। ধীরে ধীরে তিনি সমাজতন্ত্রের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।

১৯৩০ সালে সেকেন্ড স্প্যানিশ রিপাবলিক ঘোষিত হলে লোরকা দেশে ফিরে আসেন। সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে নাট্যবিষয়ক সংস্থা ‘বাররাকা’র পরিচালক পদে নিয়োগ দেন, যার কাজ সাধারণ জনগণের জন্য নাটক প্রণয়ন ও প্রদর্শন। তিনি গ্রামেগঞ্জে গিয়ে বিনামূল্যে নাটক দেখাতে থাকেন। নিজে নাটক পরিচালনা করেন এবং তাতে অভিনয় করেন। বাররাকারতত্ত্বাবধানে স্প্যানীয় ক্লাসিকগুলো দেখানো হয়; লোরকার নিজের নাটকগুলোও স্থান পায়, বিশেষ করে তার ট্র্যাজেডিত্রয়—বোদাস দে সাংগ্রে বা রক্তবিবাহ, ইয়েরমা ও লা কাসা দে বেরনার্দা আলবা বা বেরনার্দা আলবার বাড়ি। কাব্যগুণে সমৃদ্ধ এই নাটকগুলোতে ধ্বনিত হয় বুর্জোয়া সমাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। তিনি শ্রেণি, নারী ও যৌনতার প্রসঙ্গ উত্থাপন করে ট্যাবুশাসিত সমাজের মৌনতা ভেঙে দেন এবং সাধন করেন এক সামাজিক বিপ্লব। তার শেষ কাব্যগ্রন্থ সোনেতোস দে আমোর অস্কুরো বা তামসিক প্রেমের সনেট সমকামী ভালোবাসাকে ঘিরে নিষেধের বেড়াজাল চুরমার করে দেয়।

লোরকার সাহিত্যচিন্তাসম্পাদনা

লোরকার ১৮ বছরের কবিতা রচনার মধ্যে ৪ টি ধারায় ভাগ করা হয়:

১. প্রস্তুতির ও প্রাথমিক বছরগুলো (১৯১৮-১৯২৭)
২. জিপসি বালাদ (১৯২৬-২৮)
৩. নিউইয়র্কে লেখা কবিতা (১৯২৯-৩০)
৪. তার পরের কবিতা (১৯৩১-৩৬)

এর মধ্যে মৌলিক ও মূল্যবান হচ্ছে জিপসি বালাদ এবং নিউইয়র্কের কবিতা। মোটা দাগে জিপসি বালাদের মধ্যে লোরকা গীতলতা এবং চিত্রকল্প ব্যবহার করে ঐতিহ্যগত লোকজ লোরকা নতুনত্ব ভরিয়ে দিলেন। নিউইয়র্কে লেখা কবিতাগুলোয়, যা পরে পোয়েতা এন নুয়েভা ইয়র্ক (নিউইয়র্কের কবিতা) কাব্য গ্রন্থে প্রকাশিত হয়, তিনি চিত্রকল্প এবং কোলাজ এমন ভাবে বিচ্ছিন্ন আবার একই সঙ্গে সংগ্রথিত করেছেন যে এগুলো পরাবাস্তববাদী অভিধা প্রাপ্ত হয়ে উঠেছে।

গার্সিয়া লোরকার হত্যাসম্পাদনা

১৯৩৬ সালে স্পেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। লোরকা তখন তার নিজগৃহ ‘কায়েহোনেস দে গারসিয়া’তে অবস্থান করছিলেন। ফ্রাঙ্কোর সৈন্যরা তাকে তুলে নিয়ে যায় এবং বন্দী করে রাখে। ১৯ আগস্ট ঘাতকেরা তাকে কবরস্থানে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। তার লাশ গুম করে ফেলা হয়। তার মৃতদেহ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

নিষিদ্ধকরণসম্পাদনা

উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মসম্পাদনা

লোরকার জীবনভিত্তিক রচনাসম্পাদনা

আরও দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, স্পেনের গৃহযুদ্ধ: পঞ্চাশ বছর পরে, দেজ প্রকাশনা, কলকাতা, ১৮ জুলাই, ১৯৮৮, পৃষ্ঠা-১৫৪।
  2. "স্পেনের জনগণের কবি গার্সিয়া লোরকা"দৈনিক জনকণ্ঠ। জুন ৮, ২০১০। সংগ্রহের তারিখ আগস্ট ৩, ২০১৮ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  3. বিনয় বর্মন (নভেম্বর ৭, ২০১৬)। "জেনে রেখো আমি এখনও মরিনি"দৈনিক প্রথম আলো 
  4. মনির তালুকদার (আগস্ট ২০, ২০১৭)। "এক মহান বিপ্লবীর গল্প"। সাপ্তাহিক একতা। 

আরো পড়ুনসম্পাদনা

বহিঃসংযোগসম্পাদনা