প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির

বৌদ্ধ ভিক্ষু

প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির (দেবনাগরী: प्रज्ञानन्द महास्थविर) (জন্ম কুলমান সিংহ তুলাধর) (২ মে ১৯০০ – ১১ মার্চ ১৯৯৩) হলেন একজন নেপালি বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং নেপালে থেরোবাদী বৌদ্ধধর্মের পুনর্জাগরণের অন্যতম নেতা। চতুর্দশ শতকের পর তিনিই সর্বপ্রথম ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে কাঠমান্ডুতে ভিক্ষুদের হলুদ রঙের পোশাক পরিধান করেন।[১][২]

প্রজ্ঞানন্দের মুর্তি, শ্রী কীর্তী বিহার, কীর্তিপুর

প্রজ্ঞানন্দ বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেন এবং নেপাল ভাষায় ধর্মীয় সাহিত্য লিখে প্রকাশ করেন, যার উভয়টিই তৎকালীন স্বৈরাচারী রাণা শাসক কর্তৃক অবদমিত বা নিষিদ্ধ ছিল। এ কারণে তিনি নেপাল থেকে নির্বাসিত হন।[৩][৪] প্রজ্ঞানন্দ আধুনিক নেপালের প্রথম সঙ্ঘনায়কও ছিলেন।[৫][৬]

প্রাথমিক জীবন

সম্পাদনা

প্রজ্ঞানন্দ কাঠমান্ডুর ইতুম বাহাল এলাকায় কবিরাজ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হর্ষ বীর সিংহ এবং তার মা মোহন মায়া তুলাধর। প্রজ্ঞানন্দের প্রদত্ত নাম ছিল কুলমান সিংহ তুলাধর। তিনি কাঠমান্ডুর দরবার হাই স্কুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। বিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পর তিনি আয়ুর্বেদের ওপর উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করে ভেষজ ঔষধ বিক্রির পৈতৃক পেশা গ্রহণ করেন।[৫]

সন্ন্যাসব্রত

সম্পাদনা

কুলমান সিংহ ১৬ বছর বয়সে তিব্বতের লাসায় গমন করেন এবং ব্যবসায় নিযুক্ত হন।[৭] তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং সফলতার সাথে ব্যবসা পরিচালনা করতে থাকেন। সেই সময় তিনি একটি তিব্বতীয় বৌদ্ধ বিদ্যালয়ে মহাপ্রজ্ঞা নামক একজন নেপালি বৌদ্ধ ভিক্ষুর সংস্পর্শে আসেন। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণের জন্য তাকে নেপাল থেকে বহিষ্কার করা হয়। মহাপ্রজ্ঞার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে গৃহত্যাগ করে তিব্বতীয় শিক্ষানবিশ ভিক্ষু হিসেবে প্রবেশ করেন এবং কর্মশীল নাম ধারণ করেন।

পরবর্তীতে কর্মশীল এবং মহাপ্রজ্ঞা শিগাতসেতে যান এবং প্রায় এক বছর একটি গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকেন। আকাঙ্ক্ষিত বস্তু লাভে ব্যর্থ হয়ে উভয়ে ভারতের কুশীনগরে গমন করে এবং ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে উভয়ে থেরবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে পুনরায় যোগদান করেন।[৮] মহাপ্রজ্ঞা পরবর্তীতে বৌদ্ধ ঋষি মহাপ্রজ্ঞা নামে পরিচিত হন।

১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে কর্মশীল পুনরায় নেপালের প্রথম থেরবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে প্রত্যাবর্তন করেন। এক বছর পর তিনি বার্মায় গমন করেন। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পূর্ণ পৌরোহিত্য লাভ করেন এবং প্রজ্ঞানন্দ নাম ধারণ করেন।[১][৯] কাঠমান্ডুতে ফিরে এসে প্রজ্ঞানন্দ কিন্দু বহার একটি মঠে বসবাস করতে থাকেন, যেখানে তিনি নিয়মিত ধর্মীয় বক্তব্য প্রদান করতেন।[১০] তার বক্তৃতা শুনতে আসা লোকের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকলে, তা সরকারের ক্রোধের কারণ হয়ে ওঠে।

নির্বাসন

সম্পাদনা

রাণা রাজতন্ত্র ভিক্ষুদের বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার এবং নেপাল ভাষার প্রকাশ বন্ধ করতে নির্দেশ দেয়। ভিক্ষুরা সেই নির্দেশ অমান্য করলে ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ জুলাই তাদের নেপাল থেকে বহিষ্কার করা হয়।[১১] প্রজ্ঞানন্দ, ধম্মালোক মহাস্থবির, কুমার কাশ্যপ মহাস্থবিরসহ আটজন নির্বাসিত ভিক্ষু নেপাল ত্যাগ করে ভারতে গমন করেন। সারনাথে তারা "ধর্মোদয় সভা" নামে একটি বৌদ্ধ ধর্মীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে।[১২][১৩]

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হওয়ার পর ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রজ্ঞানন্দসহ আটজন সন্ন্যাসী নেপালে ফিরে আসেন এবং পুনরায় থেরোবাদী বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার শুরু করেন। প্রজ্ঞানন্দ ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে বলম্বুতে তার প্রতিষ্ঠিত প্রণিধিপূর্ণ মহাবিহারে প্রচুর সময় ব্যয় করেন। ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে রাণা শাসকদের পতনের পর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে,[১৪] নেপালে থেরোবাদী বিশ্বাস আরও প্রতিষ্ঠা পায়। প্রজ্ঞানন্দ আধুনিক নেপালের প্রথম সঙ্ঘনায়ক হিসেবে ঘোষিত হন।[৫]

প্রজ্ঞানন্দ নেপাল ভাষা, নেপালি, হিন্দি, তিব্বতী, বাংলা, পালি এবং বার্মিজ ভাষায় সাবলীল ছিলেন।[১৫] প্রজ্ঞানন্দ বৌদ্ধ ধর্ম সংক্রান্ত ১৯টি বই প্রকাশ করেন এবং একটি নাটক রচনা করেন। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে নগমে দীর্ঘায়ু রাজকুমার নামে নাটকটি মঞ্চায়িত হয়।[১৬] এছাড়াও প্রজ্ঞানন্দ একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী ছিলেন, এবং পৌভা নামে একটি পট অঙ্কন করেন। তিনি ললিতপুরে মৃত্যুবরণ করেন।

২০০১ খ্রিষ্টাব্দে নেপালের ডাক সেবা বিভাগ প্রজ্ঞানন্দের চিত্র সংবলিত একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। এছাড়া কীর্তিপুরের নগর মণ্ডপ শ্রী কীর্তি বিহারে প্রজ্ঞানন্দের একটি মুর্তি স্থাপন করা হয়।[১৭]

আরও দেখুন

সম্পাদনা

তথ্যসূত্র

সম্পাদনা
  1. LeVine and Gellner (2005), p. 45.
  2. "Theravada Buddhism in Modern Nepal"। Lumbini Nepalese Buddha Dharma Society (UK)। ২০০৮। ৪ আগস্ট ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১১ মে ২০১২ 
  3. Lienhard, Siegfried (1992). Songs of Nepal: An Anthology of Nevar Folksongs and Hymns. New Delhi: Motilal Banarsidas. আইএসবিএন ৮১-২০৮-০৯৬৩-৭. Page 4.
  4. Bajracharya, Phanindra Ratna (2003). Who's Who in Nepal Bhasha. Kathmandu: Nepal Bhasa Academy. আইএসবিএন ৯৯৯৩৩-৫৬০-০-X. Page 32.
  5. Sujano, Phra S. M. (মে ২০০৯)। "Who is Who in Buddhism in Nepal"Journal of the Lumbini Nepalese Buddha Dharma Society (UK)। সংগ্রহের তারিখ ১২ মে ২০১২  Page 10.
  6. Vandya, R. B. (১৯৭৮)। Sanghanayaka Ven. Pragnananda Mahasthabir: A Concise Biography। Chandra Devi Shakya, Ratna Devi Shakya। সংগ্রহের তারিখ ২৪ জুন ২০১৩ 
  7. Vandya, R. B. (৩০ মার্চ ১৯৯৩)। "The end of a glorious chapter"। The Kathmandu Post 
  8. LeVine and Gellner (2005), p. 43.
  9. "A Short History of Theravada Buddhism in Modern Nepal"। Ananda Kuti Vihar। ১৯৮৬। ১০ জুলাই ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১১ মে ২০১২ 
  10. Tuladhar, Soongma (২০০৭)। "Following the Footprints of Dharmachari Guruma"। Tuladhar, Lochan Tara। Dharmachari Guruma। Kathmandu: Nirvanamurti Vihara। পৃষ্ঠা 68। আইএসবিএন 978-99946-2-982-4 
  11. Moss, Richard (৪ নভেম্বর ১৯৯০)। "The Return of Theravada Buddhism to Nepal"। Bangkok Post 
  12. LeVine and Gellner (2005), p. 48.
  13. Mahasthavir, Bhikkhu Dharmaloka (1999). A Pilgrimage in China. Kathmandu: Bhikkhu Aniruddha Mahasthavir. Pages 124–125.
  14. Brown, T. Louise (1996). The Challenge to Democracy in Nepal: A Political History. Routledge. আইএসবিএন ০৪১৫০৮৫৭৬৪, 9780415085762. Page 21.
  15. Vandya, R.B. (১৯৯৫)। Mahasthavir, Bhikshu Sudarshan, সম্পাদক। Pragyananda Commemorative Volume। Lalitpur: Pragyananda Smriti Grantha Prakashan Samiti। পৃষ্ঠা 21। 
  16. Maharjan, Shiva Lal (১৯৯৫)। "Nagamay Tadhikamha Bhante"। Mahasthavir, Bhikshu Sudarshan। Pragyananda Commemorative Volume। Lalitpur: Pragyananda Smriti Grantha Prakashan Samiti। পৃষ্ঠা 275–276। 
  17. Reed, David and McConnachie, James (2009). The Rough Guide to Nepal. Rough Guides. আইএসবিএন ১৮৫৮২৮৮৯৯১, p. 211.

আরও পড়ুন

সম্পাদনা