প্রধান মেনু খুলুন

তালহা ইবনে উবাইদিল্লাহ

(তালহা থেকে পুনর্নির্দেশিত)

তালহা ইবনে উবাইদিল্লাহ (আরবি: طلحة بن عبيدالله‎‎) (মৃত্যু ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম আটজন ব্যক্তির অন্যতম। তিনি মুহাম্মদ (সা) এর একজন ঘনিষ্ঠ সাহাবি ছিলেন। উহুদের যুদ্ধউটের যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য তিনি অধিক পরিচিত।[১]

তালহা
تخطيط اسم طلحة بن عبيد الله.png
আশারায়ে মুবাশশারা, জায়াদ - উদার
জন্মআনুমানিক ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দ
মক্কা
মৃত্যু৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দ
সম্মানিতইসলাম
যার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেনমুহাম্মদ

জন্ম ও প্রাথমিক জীবনসম্পাদনা

৬৫৬ সালের ৭ ডিসেম্বর মৃত্যুর সময় তালহার বয়স ছিল চান্দ্র সন অনুযায়ী ৬৪ বছর। ফলে তার জন্মসাল ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ধরা হয়।[২] তার পিতার নাম উবাইদুল্লাহ এবং মাতার নাম সা’বা। আরবের বিখ্যাত কুরাইশ বংশে তার জন্ম। তিনি ছিলেন তাইম শাখার সন্তান। আবু বকরও (রা) ছিলেন তাইম কনিলার লোক। সা’বা ছিলেন বিখ্যাত সাহাবী আলা ইবনুল হাদরামীর বোন।[১]

ইসলাম গ্রহণসম্পাদনা

মাত্র ১৫ বছর বয়সে তালহা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। আবু বকরের (রা) আহবানে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি একবার ব্যবসার করতে সিরিয়া যান। সেখানে বাজারের মধ্যে এক খ্রিস্টান ধর্ম যাজক তাকে আরবের নবী মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। ধর্মযাজকের মুখে মুহাম্মদের (সা) নাম শুনে তালহা বিস্মিত হয়ে যান। তিনি মক্কায় ফিরে জানতে পারেন আবু বকর (রা) নবী মুহাম্মদের (সা) ধর্ম গ্রহণ করেছেন। তাই বিস্তারিত জানতে তিনি আবু বকরের (রা) বাড়িতে যান। আবু বকরের কাছ ইসলাম সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে তিনি মুগ্ধ হয়ে যান এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। আবু বকরের (রা) হাতে ইসলাম গ্রহণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ।[১]

ইসলাম গ্রহণের পরের জীবনসম্পাদনা

তালহার মা চেয়েছিলেন তার পুত্র গোত্রের নেতা হোক। যখন তিনি জানতে পারলেন যে তালহা গোত্রীয় ধর্ম পরিত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে, তখন তিনি খুব কষ্ট পেলেন এবং তালহাকে নানা ভাবে ইসলাম ত্যাগ করতে বুঝাতে লাগলেন। কিন্তু কিছুতেই তালহা ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করলেন না। এরপর শুরু হলো তার ওপর অকথ্য নির্যাতন। তাকে ও আবু বকরকে (রা) এক রশিতে বেঁধে নির্যাতন করা হয়েছিলো। তাই তাদের দুইজনকে একত্রে “কারীনান” বল হয়।[১]

যুদ্ধে অংশগ্রহণসম্পাদনা

তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ বিভিন্ন যুদ্ধে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছেন।

বদর যুদ্ধে অবদানসম্পাদনা

বদর যুদ্ধ ২ হিজরির ১৭ রমজান (১৭ মার্চ ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ) মদিনার মুসলিম ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে সংঘটিত হয়। ইসলামের ইতিহাসে এটি প্রথম প্রধান যুদ্ধ। এতে জয়ের ফলে মুসলিমদের প্রতিপত্তি পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি লাভ করে। বদর যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর তুলনায় অমুসলিম বাহিনীর সেনা সংখ্যা ছিলো বহুগুণ বেশি। বদর যুদ্ধে তালহা প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নি। তার অবদান ছিলো পরোক্ষভাবে। যুদ্ধের সময় নবী মুহাম্মদ (সা) জানতে পারলেন যে একদল অমুসলিম মদীনার মুসলিমদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছে। তাদের বিষয়ে খোঁজ নিতে মুহাম্মদ (সা) তালহাকে পাঠিয়েছিলেন। সেই সময় বিভিন্ন কাজে আরো ৭ জন সাহাবীকে পাঠানো হয়েছিলো। তারা কেউই বদর যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধ না করলেও তাদের বদর যুদ্ধের যোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হয়। তারা সবাই যুদ্ধলব্ধ মালামালের ভাগ পেয়েছিলেন।[১]

উহুদের যুদ্ধে অবদানসম্পাদনা

উহুদের যুদ্ধ ৩ হিজরির ৭ শাওয়াল (২৩ মার্চ ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ) উহুদ পর্বতের সংলগ্ন স্থানে সংঘটিত হয়। মদিনার মুসলিম ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। এই দুই পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন যথাক্রমে মুহাম্মাদ (সা) ও আবু সুফিয়ান। উহুদের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর পরাজয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলো। তখন ১৪ জন সাহাবী মানব প্রাচীর তৈরী করে মুহাম্মদ (সা:) কে রক্ষা করেন। তাদের মধ্যে তালহা ছিলেন একজন। তালহার এক হাতে তলোয়ার ও অন্য হাতে বর্শা নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যান। এক পর্যায়ে আনসারদের বারো জন ও তালহা ছাড়া সবাই মুহাম্মদের (সা) কাছ থেকে ছিটকে পড়ে। তিনি পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। শত্রুবাহিনী তাকে ঘিরে ধরে। শত্রুদের আক্রমণে সব আনসার সাহাবী নিহত হন। এই সময় তালহা একাই বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে মুহাম্মদকে (সা) রক্ষা করেন। এই যুদ্ধে মুহাম্মদ (সা) আহত হয়েছিলেন, তার দাঁত ভেঙে গিয়েছিলো। উহুদের যুদ্ধে তালহা ব্যাপক ভাবে আহত হন। তার দেহে সত্তরের বেশি আঘাতের চিহ্ন ছিলো। এই কারণে তাকে জীবিত শহীদ বলা হয়। যুদ্ধে তালহার অবদানে খুশি হয়ে মুহাম্মদ (সা) তাকে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করেন।[১]

মক্কা বিজয়সম্পাদনা

নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) খ্রিস্টীয় ৬৩০ অব্দে বিনা রক্তপাতে মক্কা নগরী দখল করেন। ইতিহাসে এই ঘটনা মক্কা বিজয় নামে খ্যাত। খাইবার বিজয়ের পর মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি চলছিলো। এইসময় হাতিম বিন আবী বালতায়া মুসলিমদের সব খবর চিঠি লিখে শত্রুবাহিনীকে জানাতে মক্কায় একজন মহিলাকে প্রেরণ করলেন। এই ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে উক্ত মহিলাকে আটক করতে যে দলটি পাঠানো হয়েছিলো যুবাইর ছিলেন সেই দলের একজন সদস্য। মক্কা বিজয়ের দিন মুহাম্মদ (সা) মুসলিম বাহিনীকে ছোট ছোট অনেক দলে ভাগ করেন। সর্বশেষ ও ক্ষুদ্র দলে ছিলেন মুহাম্মদ (সা) নিজে। সেই দলের একজন ছিলেন তালহা। কা’বা ঘরে প্রবশের সময় মুহাম্মদের (সা) সাথে তালহা ছিলেন।[১]

রিদ্দার যুদ্ধসম্পাদনা

৬৩২ সালে আবু বকর স্বঘোষিত নবী তুলায়হার একটি আক্রমণ থেকে মদিনাকে রক্ষার জন্য একটি সেনাদল গঠন করেন। এই সেনাদলে আলি ইবনে আবি তালিব, তালহা ইবনে উবাইদিল্লাহ ও যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা) সেনাদলের এক তৃতীয়াংশ করে দায়িত্ব পান।[৩]

প্রশাসনিক দায়িত্বসম্পাদনা

প্রথম খলিফা আবু বকরের (রা) আমলে তালহা ছিলেন খলিফার উপদেষ্টা। একইভাবে দ্বিতীয় খলিফা উমর (রা) তার কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণকরতেন। উমরের মৃত্যুর পর যে ৬ জন সাহাবীর মধ্য থেকে পরবর্তী খলিফা নির্বাচন করার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছিলো তাদের একজন ছিলেন তালহা। তৃতীয় খলিফা উসমানকে (রা) হত্যা করা হলে তিনি যুবাইরের সাথে আয়েশার (রা) দলে যোগ দেন এবং হত্যার বিচারের দাবি করেন। তিনি উটের যুদ্ধে আলী (রা) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।[১]

দানশীলতাসম্পাদনা

তালহার অন্যতম গুণ ছিলো তিনি প্রচুর দান করতেন। সম্পদ জমা করা তিনি পছন্দ করতেন না। তাই তাকে বলা হতো “দানশীল তালহা”। একবার হাদরামাউত থেকে তার কাছে প্রায় সত্তর হাজার দিরহাম এলো। এত গুলো টাকা পেয়ে তিনি বিমর্ষ হয়ে পড়েন। তিনি পরের দিনই সমস্ত টাকা দান করে দিলেন। একবার এক লোক এসে তার কাছে সাহায্য চাইলো। তিনি তাকে নিজের জমি বিক্রি করে ৩ লাখ দিরহাম দান করলেন।[১]

মৃত্যুসম্পাদনা

উটের যুদ্ধ চলাকালে একটি তীর এসে তার পায়ে বিদ্ধ হয়। ক্ষতস্থান থেকে রক্ত পড়া কোনভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছিলো না। তাই তিনি একজন দাসকে সঙ্গে নিয়ে বসরার দারুল ইলাসজ হাসপাতালে রওনা দেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষহরণে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। হিজরী ৩৬ সালে ৬৪ বছর বয়সে তিনি মারা যান।[১]

পরিবারসম্পাদনা

তালহা ৮ জন আলাদা মহিলার মাধ্যমে প্রায় ১৬ জন সন্তানের জনক।

  • আসাদ গোত্রের হাম্মা বিনতে জাহশ (বিয়ে ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ)
  1. মুহাম্মদ আল সাজ্জাদ, তিনি উটের যুদ্ধে মারা যান।
  2. ইমরান
  • খাওয়ালা বিনতে আল কা’দা, তিনি তামিম গোত্রীয় ছিলেন।
  1. মূসা
  • উম্মে খুলসুম বিনতে আবু বকর
  1. জাকারিয়া
  2. ইউসুফ, শৈশবেই মারা যান।
  3. আয়শা
  • সুদা বিনতে আকফ
  1. ইসা
  2. ইয়াহইয়া
  3. ইউনুস
  4. হুদ
  • আল জারবা বিনতে কাসামা
  1. উম্মে ইসহাক
  2. হারিস
  3. আব্দুল্লাহ
  4. জুবায়ের
  • মায়মুনা বিনতে আবুল আশ
  1. আল সাবা
  • আল ফারা বিনতে আলী
  1. সালিহ
  • অন্যান্য উপ-পত্নী
  1. মরিয়ম
  2. সারাহ
  3. হান্নাহ

আরও দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহআসহাবে রাসূলের জীবনকথা 
  2. Ibn Saad/Bewley vol. 3 p. 171.
  3. "Hazrat Abdullah bin Masud on strategic points to - Google সার্চ"। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-১২-১৬