চিত্রবাণী হলো পূর্ব ভারতের প্রাচীনতম মিডিয়া প্রশিক্ষণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফরাসি কানাডিয়ান জেসুইট ধর্মযাজক গাস্তঁ রোবের্জ (১৯৩৫ -২০০৫) ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের ৫ অক্টোবর ভারতের চলচ্চিত্র জগতের মহান ব্যক্তিত্ব সত্যজিৎ রায়ের পূর্ণ সহযোগিতায় কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের এক্সটেনশন পরিষেবা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রথম পঁচিশ বৎসর এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটির প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক ছিলেন। সূচনাকাল থেকেই সত্যজিৎ রায় চিত্রবাণী সোসাইটির উপদেষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য ছিলেন। সমাজ সংযোগের উপর গাস্তঁ রোবের্জের লেখা পঁচিশটিরও বেশি বই চিত্রবাণী' র দর্শন ও শিক্ষার দিক নির্দিষ্ট করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক সামাজিক যোগাযোগ ক্ষেত্রে একটি স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে পরিগণিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে সোসাইটি হিসাবে নিবন্ধিত হয়।[১]

চিত্রবাণী
ইংরেজিতে নীতিবাক্যA Human Touch in Communication
প্রতিষ্ঠাতা(গণ)ফাদার গাস্তঁ রোবের্জ
প্রতিষ্ঠিত৫ অক্টোবর ১৯৭০
অবস্থান, ,
স্থানাঙ্ক২২°৩৩′৩২″ উত্তর ৮৮°২১′৩০″ পূর্ব / ২২.৫৫৮৯১৬° উত্তর ৮৮.৩৫৮২৩৩° পূর্ব / 22.558916; 88.358233
ঠিকানা৭৬, রফি আহমেদ কিদোয়াই রোড, কলকাতা ৭০০০১৬
ওয়েবসাইটhttp://www.chitrabani.net/about.php

প্রেক্ষাপটসম্পাদনা

পূর্ব ভারতের কলকাতায় ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে সত্যজিৎ রায়, চিদানন্দ দাশগুপ্ত, বংশী চন্দ্রগুপ্ত প্রমুখেরা ভারতে ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন শুরু করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করেন - কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে চলচ্চিত্র সহজলভ্য হয়। ভালো ছবি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে দর্শকের রুচি বৃদ্ধির প্রচেষ্টাও ছিল তাদের। কিন্তু অভাব ছিল সেসময়ের 'সিরিয়াস’ শিক্ষার্থীদের মিডিয়া নিয়ে সৃষ্টিশীল চিন্তাভাবনা বিনিময় করার উপযুক্ত স্থানের। গাস্তঁ রোবের্জ চেয়েছিলেন এমন একটা পরীক্ষামূলক কেন্দ্র গড়ে তুলতে যেখানে প্রতিভাবান আগ্রহী শিক্ষার্থীরা চলচ্চিত্র ও ফিল্ম-সংস্কৃতি উপর প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার পাশাপাশি রেডিয়ো,ফোটোগ্রাফি, শিক্ষামূলক টেলিভিশন নিয়ে সামাজিক সংযোগের এক বিস্তৃত পরিসর পাবে। সেসময় স্বল্পসংখ্যক উৎসাহী শিক্ষার্থী কেবলমাত্র আমেরিকান সেন্টার অথবা ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির ছোঁয়া পেতেন। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের ৫ অক্টোবর চিত্রবাণী প্রতিষ্ঠা সফল ও সম্ভব করল দুটো দিক - একাধারে ফিল্ম সোসাইটির আন্দোলন এবং অন্যদিকে পড়ুয়াদের সমাজ-সংযোগের পছন্দসই ক্ষেত্র বেছে পড়াশোনা, গবেষণা করার সুযোগ। প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক গাস্তঁ রোবের্জের ভাবনার ধ্রুবপদটি ছিল - অ্যা হিউম্যান টাচ ইন কমিউনিকেশন" অর্থাৎ সংযোগ হোক মানবিক, গণসংযোগমাধ্যমের ব্যবহার হোক মানুষের কল্যাণে। [২] দীপক মজুমদার,উৎপলকুমার বসু, শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, বীরেন দাসশর্মা'র মতো চলচ্চিত্রবেত্তারা যুক্ত হলেন চিত্রবাণী'র ফিল্ম স্টাডিজ়ের কোর্স— সিনেম্যাটোগ্রাফি, এডিটিং, সাউন্ড রেকর্ডিংয়ের পাঠ পরিচালনায়। সত্যজিৎ রায় ছিলেন অন্যতম মেন্টর হিসাবে। চিত্রবাণী'র শুরু করা এক্সটেনশন পরিষেবা তথা ফিল্ম স্টাডিজের পথেই কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে প্রতিষ্ঠা হয় এডুকেশনাল মাল্টিমিডিয়া রিসার্চ সেন্টার বা (ইএমআরসি ) ও সেই সঙ্গে মিডিয়া তথা কমিউনিকেশন স্টাডিজ়বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। [৩]

অর্জনসম্পাদনা

চিত্রবাণী ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতিতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাতাবরণ গড়ে তুলতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। প্রতিষ্ঠাকাল হতে বিভিন্ন সময়ের যে উদ্যোগ গ্রহণ করে ও সফলতা অর্জন করে তা নিম্নে বর্ণিত হল -

  • ১৯৭০- চলচ্চিত্র বিষয়ে শিক্ষার্থে নয় মাসে ফিল্ম স্টাডি গ্রুপের আয়োজন ও শংসাপত্র প্রদান। পরবর্তীতে ১৩৫ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে বারোটি সাপ্তাহিক বক্তৃতা প্রদানের আয়োজন এবং মুম্বইয়ের জেভিয়ার ইন্সটিটিউট অব কমিউনিকেশনে ভারতে প্রথম পদ্ধতিগত চলচ্চিত্র শিক্ষার ১৫ সপ্তাহের কোর্সের আয়োজন। চলচ্চিত্রের উপর পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন।
  • ১৯৭২ - অ-বাণিজ্যিকভিত্তিতে ফটোগ্রাফিক ডার্ক রুমের সুবিধা প্রদান।
  • ১৯৭৩ - সেন্ট জেভিয়ার’স কলেজে হাই স্কুলের ছাত্রদের জন্য প্রথম অ-বাণিজ্যিক ভাবে সাউন্ড রেকর্ডিংএর স্টুডিও র এবং পেশাদার শব্দ রেকর্ডিং স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করা হয়।
  • ১৯৭৪ - প্রথম স্থির চিত্র ফটোগ্রাফির উপর কোর্সের সূচনা
  • ১৯৭৮ - সামাজিক যোগাযোগের উপর ডিপ্লোমা কোর্সের সিলেবাস এবং বারো থেকে চব্বিশ মাসের প্রশিক্ষণ সূত্রপাত করা হয় এবং ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ২৫ জন শিক্ষার্থী ফটোগ্রাফ, ফিল্ম, ভিডিও এবং থিয়েটারে বিশেষজ্ঞের ডিপ্লোমা অর্জন করেন।
  • ১৯৮০ - ফিলিপাইনে ড. রমেন মজুমদারের তত্ত্বাবধানে রেডিও ভেরিটাস এশিয়ার বাংলা অনুষ্ঠান শুরু করে।
  • ১৯৮৪ - প্রথম দুই বৎসরের স্থির চিত্র ফোটোগ্রাফির কোর্স প্রণয়ন
  • ১৯৫-৮৬ - চিত্রবাণী সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে অডিও ভিজ্যুয়াল রিসার্চ সেন্টার (এভিআরসি) স্থাপন করে। ভারত সরকারের মানব সম্পদ উন্নয়নের মন্ত্রকের অধীন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের আর্থিক সহযোগিতায় চিত্রবাণী প্রশাসনিক অবকাঠামো গড়ে তলে।
  • ১৯৮৯- চিত্রবাণীর চলচ্চিত্র পাঠের কোর্স নিয়মিতকরণ।
  • ১৯৯১ - চিত্রবাণী ফটোগ্রাফিক অ্যাসোশিয়েশন গঠিত হয়। অডিও-ভিডিও রিসার্চ সেন্টার (এভিআরসি), টেলিভিশনে সম্প্রচারযোগ্য শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের জন্য এডুকেশনাল মিডিয়া রিসার্চ সেন্টার(ইএমআরসি) মর্যাদায় উন্নীত হয়।
  • ১৯৯২ - চলচ্চিত্র নির্মাণে নিয়মিত প্রশিক্ষণের সূত্রপাত।
  • ১৯৯২ - চিত্রবাণী প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষার জন্য রেডিও ভেরিটাস এশিয়ার ম্যানিলা সহায়তায় “চেতনা” নামের বেতার কার্যক্রমের সূচনা করে। ভারত ও বাংলাদেশের দশ লক্ষের বেশি শ্রোতা উপকৃত হন।
  • ১৯৯৫ - চলচ্চিত্র শিক্ষার কোর্সটির স্বীকৃতির জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন লাভ। সেন্ট জেভিয়ার’স কলেজে যোগাযোগ বিভাগ আরম্ভ হয়।
  • ১৯৯৬ - গ্রামীণ জনগনের জন্য নিয়মিত রেডিও প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়।
  • ২০০৪ - কলকাতা শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের সূচনা হয়।।[১]

কোর্স সমূহসম্পাদনা

সংস্থাটিতে সার্টিফিকেট (১ সপ্তাহ হতে তিন মাসের) ও ডিপ্লোমা (তিন মাস হতে ১ বৎসরের) নিম্নলিখিত বিষয়গুলির চালু আছে -

  • সার্টিফিকেট ৪ টি (১ সপ্তাহ হতে তিন মাস)
  • ইউজিসি ডিপ্লোমা ৩ টি (৩ মাস হতে ১ বৎসর)
সার্টিফিকেট -
  • স্ক্রিপ্ট রাইটিং-এ সার্টিফিকেট
  • সিনেমাটোগ্রাফি
  • ডিজিটাল এডিটিং সার্টিফিকেট
  • রেডিও প্রোগ্রামে সার্টিফিকেট
ডিপ্লোমা-
  • চলচ্চিত্র নির্মাণে সার্টিফিকেট
  • সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ কোর্স
  • অ্যানিমেশনের জন্য ফাইন আর্টস এ ডিপ্লোমা [৪]

আরো দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "About us (ইংরাজীতে)"। সংগ্রহের তারিখ ২০২২-০৪-২২ 
  2. "থেকে গেল 'রূপকথা'র সৌরভ"। সংগ্রহের তারিখ ২০২২-০৪-২৫ 
  3. "কলকাতার কড়চা: আনন্দযাত্রার অর্ধশতক"। সংগ্রহের তারিখ ২০২২-০৪-২৩ 
  4. "Chitrabani Courses & Fees"। সংগ্রহের তারিখ ২০২২-০৪-২৩