আবুল হাসান আলাউদ্দিন আলি ইবন ইবরাহিম আল আনসারি বা সংক্ষেপে ইবন আশ শাতির বা ইবন আল শাতির (১৩০৪-১৩৭৫খ্রি.) ছিলেন একজন আরব জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও প্রকৌশলী। তিনি দামেস্কের উমাইয়া মসজিদে একজন মুওাক্কিত (সালাতের সময়গুলো নির্ধারণের জন্য নির্ধারিত ব্যক্তি) হিসেবে কাজ করতেন এবং ১৩৭১ বা ১৩৭২ সালে তিনি মসজিদের মিনারের জন্য একটি সূর্যঘড়ি তৈরি করেন।

ইবন আশ শাতির
Ibn-al-shatir2.gif
ইবন আশ শাতিরের চন্দ্র মডেল
জন্ম১৩০৪
মৃত্যু১৩৭৫
পেশাজ্যোতির্বিজ্ঞানী
উল্লেখযোগ্য কর্ম
কিতাব নিহায়াত আল সুল ফি তাসহিহ আল উসুল

জীবনীসম্পাদনা

ইবন আশ শাতিরের বয়স যখন ছয় বছর,তখন তার পিতা মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তার দাদা তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তার কাছ থেকে তিনি বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে আকর্ষিত হন। [১] ইবন শাতির শিক্ষা অর্জনের জন্য কায়রো এবং আলেকজান্দ্রিয়ায় যান । [১] আবু আলি আল মাররাকুশি এর কাছে পড়াশোনা সমাপ্ত করে তিনি দামেস্কে ফিরে যান এবং উমাইয়া মসজিদে মুওাক্কিত হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। [১] তার মুওাক্কিত হিসেবে কাজের মধ্যে ছিলো দৈনিক পাঁচবার সালাতের সময় ও রমজান মাসের শুরু ও শেষ কবে তা নির্ণয় করা। [২] এই কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে তিনি বিভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্র তৈরি করেন। তিনি নানা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন ও গাণিতিকভাবে তা মিলানোর চেষ্টা করেন যা মসজিদের কাজের পাশাপাশি তার নিজের গবেষণাতেও সাহায্যে করছিল। তিনি তার এই গবেষণা একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ছক আকারে লিখে রাখেন। [৩] যদিও এই ছক কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে অবদানসম্পাদনা

জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর লেখা ইবন আশ শাতিরের লেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হচ্ছে ‘আল কিতাব নিহায়াত আল সুল ফি তাসহিহ আল উসুল’ (প্রচলিত নিয়মের সংশোধনের জন্য শেষ অভিজান)। এই বইয়ে তিনি টলেমির মডেলের চাঁদ, সূর্যের ও গ্রহের গতিপথের একটি বিরাট অংশ সংশোধন করেন। এখানে তিনি অতিরিক্ত এপিসাইকেল (Epicycle) সরিয়ে সেখানে তুসি যুগলের ব্যবহার করেন। তার এই মডেলটি ১৬ শতাব্দীর জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাসের মডেলের সাথে অনেকাংশেই মিলে যায়। তার এই কাজটি তার একটি বই ‘জুয আল জাদীদ’ (নতুন গ্রন্থ) –এ প্রকাশ করা হয়। [৩]

পূর্ববর্তী জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সাথে ইবন আশ শাতিরের কিছুটা পার্থক্য ছিল। যেমন, পূর্ববর্তী জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তাদের হিসাব মিলাতে চেষ্টা করছিলেন দর্শনের ভিত্তিতে এবং অ্যারিস্টটলিয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তিতে। অন্যদিকে ইবন আশ শাতির হিসাব মিলাচ্ছিলেন বাস্তব জগৎ থেকে প্রাপ্ত তথ্য হতে। উদাহরণস্বরূপ, ইবন আশ শাতিরের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ফলেই তিনি টলেমির মডেল হতে একটি এপিসাইকেল সরিয়ে দেন। এর ফলে পূর্বে দেওয়া যে কোনো মডেলের তুলনায় ইবন আশ শাতিরের মডেল উন্নত প্রকৃতির ছিল। [৪] এবং এটিই প্রথম মডেল ছিল যা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরীক্ষা করা সম্ভব ছিল। [৫] তার এই কাজ জ্যোতির্বিজ্ঞানের শাখায় একটি বিপ্লব ঘটিয়েছিল যাকে ‘রেনেসাঁ যুগ পূর্ববর্তী বৈজ্ঞানিক বিপ্লব’ বলা যেতে পারে। [৪]

কোপার্নিকাসের উপর সম্ভাব্য প্রভাবসম্পাদনা

যদিও ইবন আশ শাতিরের মডেলকে পৃথিবীকে বিশ্বজগতের মাঝে ধরা হয়েছিল, তবুও এর থেকে ইতালিয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাস দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বলেই অনুভূত হয়। ইবন আশ শাতির যে পদ্ধতিতে টলেমির মডেলকে সংশোধন করেছিলেন, নিকোলাস কোপার্নিকাসের বই ‘De revolutionibus’ ঠিক সে উপায়ই ছিল। [৬] কোপার্নিকাসের দেওয়া চন্দ্র ও শুক্রগ্রহের গতিপথ, ইবন আশ শাতিরের মডেলের সাথে মিলে যায়। [৭] এসকল কারণে কিছুকিছু পণ্ডিত বলে থাকেন, কোপার্নিকাসের কাছে ইবন শাতিরের কাগজগুলো কোনোভাবে পৌছেছিল। কিছুদিন আগে বাইজেন্টাইনদের সময়কালের ইবন শাতিরের কাজের ন্যায় কাজ সমৃদ্ধ একটি পান্ডুলিপি ইতালি থেকে উদ্ধার হয়। এর ফলে ধারণা করা হয়, যখন পূর্ব হতে জ্ঞান ধীরে ধীরে পশ্চিমে যাচ্ছিলো তখন কোপার্নিকাসের হাতে আসে ইবন আশ শাতিরের কাজ। [৮]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Freely, John (২০১৫)। Light from the East: how the Science of Medieval Islam helped to shape the Western Worldআইএসবিএন 978-1784531386 
  2. Freely, John (২০১০)। Light from the East : How the Science of Medieval Islam helped to shape the Western World। London। আইএসবিএন 978-0-85772-037-5 
  3. Abbud, Fuad। ""The Planetary Theory of Ibn al-Shatir: Reduction of the Geometric Models to Numerical Tables"The University of Chicago Press Journal। সংগ্রহের তারিখ ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২১ 
  4. Saliba, George (১৯৯৪)। A History of Arabic Astronomy: Planetary Theories During the Golden Age of Islam। New York University Press। পৃষ্ঠা 233–234। আইএসবিএন 978-0-8147-8023-7 
  5. Faruqi, Y. M. (১৯৮৪)। "Contributions of Islamic scholars to the scientific enterprise"International Education Journal। সংগ্রহের তারিখ ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২১ 
  6. Roberts, V.। "The Planetary Theory of Ibn al-Shatir"JSTOR। সংগ্রহের তারিখ ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২১ 
  7. King, David (২০০৭)। Ibn al‐Shāṭir: ʿAlāʾ al‐Dīn ʿAlī ibn Ibrāhīm। New York: The Biographical Encyclopedia of Astronomers। আইএসবিএন 978-0-387-31022-0 
  8. Roberts, Victor। "The Planetary Theory of Ibn al-Shatir: Latitudes of the Planets"। The University of Chicago via JSTOR