সাল্লেখানা, সাল্লেখন (IAST: sallekhanā), সমলেহ, সাঁথার, সমাধি-মরন বা সন্যাসী-মরন নামে পরিচিত, জৈনবাদের নৈতিক আচরণের একটি সম্পূরক ব্রত এটি। এটি খাদ্য এবং তরল গ্রহণের পরিমাণ হ্রাস করে স্বেচ্ছাসেবকভাবে উপোস রাখার ধর্মীয় অভ্যাস। জৈনবাদে, মানবিক আবেগ ও দেহের পতন এবং শারীরিক ও মানসিক ক্রিয়াকলাপগুলি প্রত্যাহার করে পুনর্জন্মকে প্রভাবিত করার অন্যতম উপায় হিসেবে দেখা হয়। জৈন পণ্ডিতরা একে আত্মহত্যা হিসাবে বিবেচিত করে না কারণ এটি আবেগ দ্বারা পরিচালিত নয় এবং এতে বিষ বা অস্ত্রের ব্যবহার নেই। সাল্লেখন ব্রত পালনের পরবর্তী ধর্মীয় আচার বছরজুরে চলতে পারে।

সাল্লেখন ব্রত জৈন সন্যাসী ও সাধারণ গৃহী উভয়েই পালন করতে পারে। ঐতিহাসিক দলিল যেমন 'নিশিধি' শিলালিপি প্রমাণ করে জৈন ইতিহাসে রানী সহ পুরুষ ও মহিলাদের উভয়ই সাল্লেখণ পালন করেছিলেন। তবে, আধুনিক যুগে, সাল্লেখানের চর্চা নেই বললেই চলে।

জীবনের অধিকার এবং ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গির স্বাধীনতার চর্চা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ২০১৫ সালে, রাজস্থান হাইকোর্ট এই অনুশীলনটিকে আত্মহত্যা হিসেবে গন্য করে নিষিদ্ধ করেছিল। সেই বছরই, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রাজস্থান হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত স্থগিত করে এবং সাললেখানার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে।

জৈন ধর্মের অনুসারীরা প্রধানত পাঁচটি মহান ব্রত আনুসরন করেন; অহিংসা, সত্য (মিথ্যা না বলা), চুরি না করা, ব্রহ্মাচার্য, এবং অপরিগ্রহ (অ-দখল)। আরও সাতটি পরিপূরক ব্রত ও আছে, যার মধ্যে তিনটি গুণ ব্রত (মেধার ব্রত) এবং চারটি শিক্ষা ব্রত (শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্রত) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনটি গুণ ব্রত হ'ল: দিগ ব্রত (সীমাবদ্ধ গতিবিধি, কার্যের ক্ষেত্রকে সীমাবদ্ধ করা), ভোগোপাভোগপরিমান (ভোগ্য ও অভোগ্য জিনিসের সীমাবদ্ধ ব্যবহার) এবং অনর্থ-দণ্ডবিরমাণ (উদ্দেশ্যহীন পাপ থেকে বিরত থাকা)। শিক্ষাব্রতগুলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: সাম্যিক (সীমাবদ্ধ সময়ের জন্য ধ্যান ও মনোনিবেশের ব্রত), দেশব্রত (সীমিত সময়ের জন্য আন্দোলন ও সীমাবদ্ধত ক্রিয়াকলাপ), প্রসোধোপাধ্যায় (সীমাত সময়র জন্য উপবাস), এবং অতিথি সংবিভ (অতিথিকে খাদ্য প্রদান করা)।

সাললেখানাকে এই বারোটি মানতের পরিপূরক হিসাবে বিবেচিত হয়। যাইহোক, কিছু জৈন শিক্ষক যেমন কুণ্ডাকুণ্ড, দেবসেনা, পদ্মানন্দিন এবং ভাসুনন্দিন এটিকে শিক্ষাব্রতের অংশ হিসবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সাললেখানা (সংস্কৃত: সল্লিখিতা) এর অর্থ আস্তে আস্তে খাবার এবং পানীয় থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আচ্ছন্নতা এবং দেহকে সঠিকভাবে 'শুকিয়েফেলা', সাললেখান দুটি ভাগে বিভক্ত: কাশায়া সাললেখানা (আবেগকে দমন করা) বা অভ্যন্তরের সাললেখানা (অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ) এবং কায়া সাললেখানা (দেহকে আরও শুকিয়েফেলা) বা বাহ্য সাললেখানা (বাহ্যিক দমন)। এটি অনেকটা "উপবাসের মাধ্যমে স্বেচ্ছায় মৃত্যু গ্রহণ করা”। জৈন ধর্মগ্রন্থ অনুসারে, সাললেখানার অনুসারীরা আবেগকে বশীভূত করনের মাধ্যমে অহিংসা (অহিংসা বা অ-আঘাত) পথে পরিচালিত হয়।

শর্তসম্পাদনা

যদিও সাললেখানা গৃহস্থ এবং সন্যাসী উভয়েরই জন্য উন্মুক্ত, জৈন গ্রন্থগুলি এর উপযুক্ত সময় এবং শর্ত সঠিক ভাবে বর্ণনা করে তথাপি সাধারণ গৃহীর সাললেখানার জন্য, কোনও জৈন সন্যাসী নির্দেশনা ব্যতীত পালন করা উচিত নয়।

সাললেখানা সর্বদা স্বেচ্ছাকৃত, জনসমক্ষে ঘোষণার দিয়ে নেওয়া হয় এবং কোনও রাসায়নিক বা সরঞ্জামের ব্যবহার হয় না। পছন্দের খাবার ও জলের গ্রহণ সীমাবদ্ধ করে এই উপবাস শরীরকে ধীরে ধীরে কমাতে থাকে। মৃত্যু যত আসন্ন হয়, ব্যক্তি তার সহকর্মী এবং আধ্যাত্মিক পরামর্শদাতার জ্ঞাতসারে সহ সমস্ত খাবার এবং জল বন্ধ করে দেয়।কিছু ক্ষেত্রে, দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রন্ত জৈনরা আধ্যাত্মিক পরামর্শদাতার অনুমতিক্রমে সাললেখানা গ্রহণ করে। একটি সফল সালেকখানার জন্য মৃত্যুকে অবশ্যই "অর্থপূর্ণ", স্বেচ্ছাসেবী, পরিকল্পিত, প্রশান্তি, শান্তি এবং আনন্দের সাথে গ্রহণ করা হয়েছে, যেখানে ব্যক্তি শরীরকে ত্যাগ করতে স্বীকার করে এবং আধ্যাত্মিক বিষয়গুলিতে তার মনকে সম্পূর্ণ নিবেশিত করে। সাল্লেখান জৈন ধর্মের স্বীকৃত অন্যান্য ধর্মীয় মৃত্যুর চেয়ে আলাদা। অন্যান্য ক্ষেত্রে মৃত্যুর জন্য সন্ন্যাসীকে তার পাঁচটি মহান ব্রত ভঙ্গ করার চেয়ে মৃত্যুকে উত্তম বলে মনে করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ব্রহ্মচর্য পাঁচটি মানতের মধ্যে একটি, এবং ধর্ষিত হওয়া বা নেতিবাচকভাবে প্ররোচিত হওয়ার চেয়ে বা নিজ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আবমাননার চেয়ে ধর্মীয় মৃত্যুকে উত্তম মনে করা হয়। এই পরিস্থিতিতে বিষ গ্রহণের মাধ্যমে মৃত্যুকে এর চেয়ে ভাল বলে মনে করা হয় এবং মনে করা হয় এটি শুভ পুনর্জন্মের নিশ্চয়তা দেয়।

প্রক্রিয়াসম্পাদনা

সাল্লেখান প্রক্রিয়া কয়েক দিন থেকে শুরু করে কয়েক বছর পর্যন্ত চলতে পারে। Ratnakaranda śrāvakācāra র ষষ্ঠ খণ্ডে সাললেখানা এবং এর পদ্ধতি বর্ণনা করে – “ধীরে ধীরে শক্ত খাবার ছেড়ে দিয়ে দুধ এবং ঘোল পান করা উচিত, এবং ক্রমান্বয়ে তাও ছেড়ে দিয়ে গরম বা মশলাদার জল গ্রহণ শুরু করা। পরবর্তীতে গরম জলও ছেড়ে দেওয়া এবং পূর্ণ মনোযোগে উপবাস পালন করা, নিজের দেহের মায়া ত্যাগ করে পঞ্চ-নমস্কার মন্ত্রটি জপ করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত। — Ratnakaranda śrāvakācāra (127–128)”

জৈন গ্রন্থে ব্রতটির পাঁচটি লঙ্ঘনের (অতীচার) উল্লেখ আছে: মানুষ হিসাবে পুনর্জন্ম লাভের ইচ্ছা, দেবতা হিসাবে পুনর্জন্ম লাভের বাসনা, বেঁচে থাকার ইচ্ছে, দ্রুত মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা এবং পরের জীবনে যৌন জীবন যাপনের আকাঙ্ক্ষা। অন্যান্য সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে: বন্ধুদের জন্য স্নেহের স্মৃতিচারণ, আনন্দের মুহূর্তগুলোকে স্মরণ করা এবং ভবিষ্যতে আনন্দ উপভোগের জন্য আকুলতা।

খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় বা দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রাচীন জৈন ধর্মগ্রন্থ স্বেতম্বর এর আচারঙ্গ সুত্রে সাললেখানার তিনটি রূপ বর্ণনা করা হয়েছে: ভক্তপ্রত্যায়খানা, ইঙ্গিত-মারণ এবং পদপোপগমন। ভক্তপ্রত্যেয়খানায়, যে ব্যক্তি ব্রত পালন করতে চায় সে একটি বিচ্ছিন্ন জায়গা নির্বাচন করে যেখানে সে খড়ের তৈরি বিছানায় শুয়ে থাকে, তার অঙ্গ নড়াচড়া করে না, এবং মারা না যাওয়া পর্যন্ত খাবার ও পানীয় পরিহার করে। ইঙ্গিত-মারণে ব্যক্তি খালি মাটিতে ঘুমায়। সে বসতে, দাঁড়াতে, হাঁটতে বা হাঁটতে পারে, তবে মারা না যাওয়া পর্যন্ত খাবার পরিহার করে। পাদাপোপাগামনা এ, একজন ব্যক্তি তার মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত খাবার ও পানীয় ব্যতীত "গাছের মতো" দাঁড়িয়ে থাকেন। সাললেখানার আর একটি রূপ হ'ল ইতভারা যাতে ব্যক্তি নেজেকে স্বেচ্ছায় নিজেকে একটি সীমাবদ্ধ জায়গায় আবদ্ধ করে এবং আমৃত্যু খাবার ও পানীয় পরিহার করে।

পুস্তকসম্পাদনা

আচারঙ্গ সূত্র (খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দী - খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতাব্দী) এই প্রথার তিনটি ধরন বর্ণনা করে। প্রাথমিক স্ব্বেতম্বর পাঠ শ্রাবকাপ্রজ্ঞাপতিতে উল্লেখ আছে এই প্রথা কেবল সন্ন্যাসীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভাগবতী সূত্রে ও (২.১) সাললেখানার বিশদ বর্ণনা আছে, স্কন্দ কাত্যায়ন নামের মহাবীরের এক তপস্বী এটি পালন করেছিলেন। চতুর্থ শতাব্দীর পাঠ্য রত্নকরন্দ স্রভককার এবং স্বেতম্বর পাঠ নব্যপদ-প্রকারণেও বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। নাভা-পাদ-প্রকারণে "স্বেচ্ছায় নির্বাচিত মৃত্যু" র সতেরটি পদ্ধতির উল্লেখ রয়েছে, যার মধ্যে এটি জৈন ধর্মের শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মাত্র তিনটি পদ্ধতিকেই অনুমোদন দেয়। এই প্রথার কথা দ্বিতীয় শতাব্দীর সংগাম যুগের কবিতা, ‘সিরুপানচামুলামেও’ উল্লেখ করা হয়েছে।

পঞ্চশাক কেবল এই প্রথার একটি অলৌকিক দিক উল্লেখ করেছেন এবং ধর্মবিদুতেও এটির কোন বর্ণনা নেই যারা উভয়ই হরিভদ্রের গ্রন্থ (৫ ম শতাব্দী)। জিনাসেনার নবম শতাব্দীর পুস্তক "আদি পুরাণ" এর তিনটি রূপ বর্ণিত হয়েছে। সোমাদেবের (দশম শতক) Yashastilaka ও এই প্রথার বর্ণনা দিয়েছেন। ভদ্দারধনে (দশম শতাব্দী) এবং ললিতাঘাতে র মত অন্যান্য লেখকরাও এই প্রথার অন্যতম রূপ পদপোপাগমনকে বর্ণনা করেন। হেমচন্দ্র (খ্রি। একাদশ শতাব্দী) গৃহীদের (শ্রাবকচর) পালনের একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেন।