সন্তোষ রানা

ভারতীয় রাজনীতিবিদ

সন্তোষ রানা (১৯৪২– ২৯ জুন ২০১৯) ছিলেন একজন ভারতীয় মার্কসবাদী-লেনিনবাদী রাজনীতিবিদ। ১৯৬০-এর দশকে তিনি ছিলেন চারু মজুমদারের নেতৃত্বে নকশাল আন্দোলনের নেতা, বিধায়ক ও রাজনৈতিক কর্মী। সন্তোষ রানা ২০১৮ সালে তার রাজনৈতিক জীবনে উপর লেখা বইয়ের রাজনীতির এক জীবন-এর জন্য আনন্দ পুরস্কার পেয়েছিলেন।[২][৩]

সন্তোষ রানা
Santosh Rana
সন্তোষ রানা.jpg
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য
কাজের মেয়াদ
১৯৭৭ – ১৯৮২
সংসদীয় এলাকাগোপীবল্লভপুর
ব্যক্তিগত বিবরণ
জন্ম১৯৪২
গোপীবল্লভপুর, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত
মৃত্যু২৯ জুন ২০১৯ (বয়স ৭৬)
রাজনৈতিক দলভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) (১৯৬৯-১৯৭২) PCC, CPI(ML) (1972-2016) [১]
দাম্পত্য সঙ্গীজয়শ্রী
সন্তান
প্রাক্তন শিক্ষার্থীপ্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

ব্যক্তিজীবনসম্পাদনা

পড়াশুনাসম্পাদনা

সন্তোষ রানার জন্ম বর্তমান পশ্চিম মেদিনীপুরের গোপীবল্লভপুর অঞ্চলে। ছয়ের দশকে তিনি পড়তে আসেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে। পদার্থবিদ্যায় এমএসসি-তে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। গবেষণা করতে করতেই সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন নকশাল আন্দোলনে। নকশালবাড়ির কৃষক আন্দোলনের পরে যে সব ছাত্রযুবক ‘গ্রামে চলো’র ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে সন্তোষ রানা ছিলেন অন্যতম।[৪]

বৈবাহিক জীবনসম্পাদনা

সন্তোষ রানার প্রথম স্ত্রীর নাম ছিলো জয়শ্রী রানার। উনার সঙ্গে রাজনৈতিক মতভেদের কারণে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপরে বিয়ে করেন দেবী চট্টোপাধ্যায়কে, যিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যাপনা করতেন। তিনি দীর্ঘ দিন জেলে ছিলেন। ১৯৭৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জেলে বসেই লড়েছিলেন। তিনি গোপীবল্লভপুর আসনে জিতেছিলেন।[৪]

লেখালেখিসম্পাদনা

রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করে গিয়েছেন আজীবন। তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘রাজনীতির এক জীবন’-এর জন্য সন্তোষ রানা আনন্দ পুরস্কার পান ২০১৮ সালে।[৪]

কৃষি বিপ্লবীসম্পাদনা

১৯৬০-এর দশকে সন্তোষ রানা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজের গবেষক ছিলেন। সেই সময় তিনি পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। রাজনৈতিকভাবে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) এর সমর্থক ছিলেন।প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পরে পশ্চিমবঙ্গে ১৯৬৭ এবং ১৯৬৯ সালে সিপিআই (এমএল) একটি নতুন বিপ্লবী দল হিসাবে সূচিত হয়েছিল। সেই সময় বিপ্লবের ডাক সন্তোষ রানাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি তার পিএইচডি গবেষণা অসম্পূর্ণ রেখে গোপীবল্লভপুরে তার নিজের গ্রামে ফিরে যান এবং কৃষি বিপ্লবে যোগ দেন।[৫][৬]

তার নেতৃত্বে ছিলো মেদিনীপুর জেলা ও ডেবরা, গোপীবল্লভপুর, নয়াগ্রাম ও লোধাশুলি ব্লক এবং বিহার (বর্তমানে ঝাড়খণ্ড) ও উড়িষ্যার আশেপাশের অঞ্চলগুলি।

সিপিআই (এমএল) পুনর্গঠনসম্পাদনা

সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে সিপিআই (এমএল)-এর মধ্যে ভাঙন শুরু হয় এবং ১৯৭১-১৯৭২ সালের মধ্যে বিভক্তি দেখা যায়। সন্তোষ রানা ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত চারু মজুমদারের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং পরে সত্যনারায়ণ সিংহের নেতৃত্বাধীন দলে যোগ দেন, তিনি একজন বিশিষ্ট নেতা,যিনি ১৯৭১ সালে চারু মজুমদারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন এবং সিপিআই (এমএল) -এর বিভাজনের দিকে পরিচালিত করেছিলেন। এপ্রিল ১৯৭৪ সালে সত্যনারায়ণ সিংহের দল পুনর্গঠিত করেছিলেন। সত্যনারায়ণ সিংয়ের অনুগত গ্রুপ থেকে পিসিসি, সিপিআই (এমএল) বিবর্তিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে সন্তোষ রানা এই দলের সাধারণ সম্পাদক হন। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে এই দলটি নকশালদের মধ্যে ছিল।[৫]

নির্বাচনী প্রচেষ্টাসম্পাদনা

সন্তোষ রানা স্বতন্ত্র হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, ১৯৭৭ সালে গোপীবল্লভপুর আসনটিতে তিনি জিতেছিলেন, তবে ১৯৮২ সালে তিনি হেরেছিল।[৭]

মাওবাদীসম্পাদনা

সন্তোষ রানা জঙ্গলমহলের মাওবাদীদের পদক্ষেপের সাথে একমত ছিলেন না। তিনি বলেছিলেন, "মূল সিপিআই (এমএল) এবং আজকের সিপিআই (মাওবাদী) এর মধ্যে পার্থক্য অনেক বেশি। চারু মজুমদারের পার্টি লাইন নিতে আমাদের সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও, আমি অবশ্যই এটি বলব যে তিনি কখনই মাওবাদীদের নির্বিচারে হত্যার জন্য বলেননি। ১৯৬৯-৭১ সালে, আমি ডেবরা-গোপীবল্লভপুর অঞ্চলে সক্রিয় ছিলাম, লালগড়ের কাছে এখন যেটা মাওবাদীদের একটি বড় ঘাঁটি। আমরা মেরেছিলাম ১২০ ব্যক্তিকে, তাদের অনেকেই জমিদাররা বা তাদের পোষা গুন্ডার … আজ, আমি মনে করি এই হত্যার বেশিরভাগ অপ্রয়োজনীয় ছিল। তবে সিপিআই (মাওবাদী), সত্তরের দশকে দেবরা-গোপীবল্লভপুরের একটিও আদিবাসী ও দলিত ও দরিদ্র মানুষ কে হত্যা করে নি।"[৮]

মৃত্যুসম্পাদনা

২৯ জুন ২০১৯ শনিবার সকাল ৬ টায় দেশপ্রিয় পার্কের এক নার্সিংহোমে তার মৃত্যু হয়। দীর্ঘ দিন ধরে ক্যান্সারে ভুগছিলেন। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে তার দেহ দান করা হয়েছে।[৪]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "CPI(ML) MLA Santosh Rana quits party"Times of India। সংগ্রহের তারিখ ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ 
  2. "উত্তাল রাজনীতির অকপট স্মৃতিকে আনন্দ-অভিবাদন"anandabazar.com। সংগ্রহের তারিখ ২৮ এপ্রিল ২০১৮ 
  3. "সন্তোষ রাণা: সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক সমাজবিপ্লবী"Indian Express Bangla। ২০১৯-০৭-০১। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৭-৩০ 
  4. নিজস্ব সংবাদদাতা (২০১৯-০৬-২৯)। "নকশালপন্থী নেতা সন্তোষ রানা প্রয়াত"আনন্দবাজার পত্রিকাকলকাতা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১০-১৪ 
  5. Karat, Prakash। "Naxalism Today; At an Ideological Deadend [sic]"The Marxist, Vol. 3, no. 1, January–March 1985। সংগ্রহের তারিখ ২০১১-০৫-১৯ 
  6. "Democracy spells security"। the little magazine। সংগ্রহের তারিখ ২০১১-০৫-১৯ 
  7. "230 - Gopiballavpur Assembly Constituency"Partywise Comparison Since 1977। Election Commission of India। সংগ্রহের তারিখ ২০১০-১২-২০ 
  8. "interview with Santosh Rana"। Seminar, March 2010 (issue on Red Resurgence)। সংগ্রহের তারিখ ২০১১-০৫-১৯