শাশ্বতী সেন, ভারতীয় কত্থক নৃত্যের একজন প্রথমসারির শিল্পী, কত্থক হলো এক ধরনের ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য। তিনি পণ্ডিত বিরজু মহারাজের প্রবীণ শিষ্য। তিনি সত্যজিৎ রায়ের অনুরোধে তাঁর ছবি শতরঞ্জ কে খিলাড়ি (১৯৭৭) -এ নাচ করেন, তখন লখনউ সম্প্রদায়ে তিনি "ভারতের প্যারিস" হিসাবে পরিচিত পান এবং খ্যাতির শীর্ষে অবস্থান করেন।

আইন ও চিকিৎসা পেশাদারদের পরিবারে জন্ম নেওয়া শাশ্বতী খুব অল্প বয়সেই নাচ শুরু করেন। শাশ্বতী বলেন, "আমার মা, রেবা বিদ্যার্থীর অধীনে কত্থক শিখতে আমাকে ভারতীয় কলা কেন্দ্রে ভর্তি করেছিলেন। আমি পানিতে হাঁস যেভাবে যায় সেভাবে কত্থকের কাছে গেলাম। শ্রীমতী রেবা বিদ্যার্থীর অধীনে দিল্লির কত্থক কেন্দ্রে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরে তিনি পরিবেশন শিল্পকালায় জাতীয় বৃত্তি পান এবং পণ্ডিত বিরজু মহারাজের প্রধান শিষ্য হয়ে স্নাতক অর্জন করেন।

পণ্ডিত বিরজু মহারাজের অনুগত শিষ্যা হিসাবে তিনি নিজস্ব সৃজনশীলতার সাথে ঐতিহ্যের সমন্বয়ে যেভাবে কত্থককে উপস্থাপন করেছেন তাতে তিনি তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে থেকে এগিয়ে ছিলেন। শাশ্বতী বর্তমানে বহুমুখী প্রতিভা সম্পন্ন লখনউ ঘরানার অন্যতম সেরা শিল্পী হিসাবে বিবেচিত। তিনি বেশিরভাগ সময়ই তাঁর গুরু বিরজু মহারাজের সাথে তাঁর ইনস্টিটিউট, নয়া দিল্লীর জোড়বাগের কলাশ্রমে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন এবং অভিনয় করছেন। তিনি প্রচুর সংখ্যক ছাত্রকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যার মধ্যে অনেক বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেছে। তিনি তাঁর গুরুর সত্যিকারের শৈলী অর্জন করেছেন এবং কত্থকের গীতির মাধুর্য এবং ছন্দবদ্ধ কত্থক শিল্পের সম্বন্ধে জ্ঞান ও এর প্রতি ভালবাসা উভয়কেই তাঁর নিজের উপস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তার শক্তিমত্তার জায়গা হল অভিনয়, যা সর্বদা ব্যপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

কোরিওগ্রাফি এবং পারফরম্যান্সসম্পাদনা

কত্থকের মান উন্নয়ন করার ক্ষেত্রে শাশ্বতীর অঙ্গীকার তাকে কেবল বিশ্বজুড়ে নয়, ভারতের সমস্ত প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মশালা এবং মাস্টার ক্লাস পরিচালনা করতে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি ভারত এবং বিদেশে বেশ কয়েকটি ওয়ার্কশপে শিক্ষার্থীদের জন্য বেশ কিছু ছোট-বড় প্রযোজনার কোরিওগ্রাফ করেছেন। তরুণ মনকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে তার নেতৃত্ব, বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় ইভেন্ট তৈরিতেও অবদান রেখেছে - যেমন দিল্লি এবং মুম্বাইয়ের 'ওয়াক ফর আর্ট'; সংগীত-নৃত্য-চিত্রকলার জন্য ক্যাম্প; স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের জন্য কুইজ প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষক এবং পারফর্মারদের সাথে তাদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার বিষয়ে প্যানেল আলোচনা। তিনি এমন একটি কার্যক্রমও পরিকল্পনা করে যাচ্ছেন যার মধ্যে বেশ কয়েক ধরনের নৃত্য এবং অন্যান্য সৃজনশীল মাধ্যম একসাথে মঞ্চ ভাগ করে নেয় এবং তাদের স্বতন্ত্র এবং সম্মিলিত মনোভাবকে প্রকাশ করে।

শাশ্বতী নৃত্য-নাটকের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি দলীয় উপস্থাপনা কোরিওগ্রাফ করেছেন। তার কিছু কোরিওগ্রাফিক কাজের অন্তর্ভুক্ত হলোঃ

নাচ-নাটক-ব্যালেটস

  • কত্থক যাত্রা
  • দশাবতার
  • কার্তিক বিলাস
  • ক্ষুদিতা পাশান
  • রোমিও ও জুলিয়েট
  • ওয়ার্না রঙ
  • মুসাফির
  • গীদ গোবিন্দ
  • জল যজ্ঞ
  • কৃষ্ণ কথা (যৌথ প্রযোজনা)
  • হাব্বা খাতুন (যৌথ প্রযোজনা)

সংক্ষিপ্ত প্রযোজনা

  • দরবার
  • সূর্য প্রণাম
  • আদাব
  • মেহফিল
  • নিয়তি নায়িকা

সস্বতী বিশ্বজুড়ে প্রচুর পরিবেশনা করেছেন এবং ভারতের জাতীয় টেলিভিশন নেটওয়ার্ক দূরদর্শন কর্তৃক জাতীয় নৃত্য অনুষ্ঠানে সেগুলো নিয়মিতভাবে প্রদর্শিত হয়েছে। তিনি অংশ নিয়েছেন এমন কয়েকটি প্রধান উৎসব হলঃ

  • খাজুরাহো উৎসব, খাজুরাহো, মধ্য প্রদেশ।
  • কুতুব উৎসব, নয়াদিল্লি।
  • কোনার্ক উৎসব, কোনার্ক, ওড়িশা
  • লখনউ মহোৎসব, লখনউ, উত্তর প্রদেশ।
  • কত্থক প্রসঙ, জয়পুর, রাজস্থান এবং ভুপাল, মধ্য প্রদেশ।
  • তাজ মহোৎসব, আগ্রা, উত্তরপ্রদেশ।
  • ডোভার লেন সম্মেলন, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ।
  • শ্রী কৃষ্ণ গণ সভা, চেন্নাই, তামিলনাড়ু।
  • রিমপা উৎসব, বারানসী, উত্তর প্রদেশ।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নাইজেরিয়া, অস্ট্রিয়া, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, নেদারল্যান্ডস, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, সুইজারল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ব্যাংকক, মায়ানমার, বুদাপেস্ট, সিঙ্গাপুর সহ আরও অনেক দেশে তাঁর পরিবেশনা ও বক্তৃতার প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বেশ কটি ভ্রমণে অংশ নিয়েছেন। এদের মধ্যে কয়েকটি হল: ইউএসএসআর, চেক প্রজাতন্ত্রে (তৎকালীন চেকোস্লোভাকিয়া) প্রথম ভ্রমণ; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ - ১৯৭৪ এশিয়া সোসাইটি (১৫ টি শহর); সার্ভেন্টিনো উৎসব - মেক্সিকো, ১৯৮৪; ইতালির প্যান-এশিয়াটিক ফেস্ট; এবং পণ্ডিত বিরজু মহারাজের সাথে এডিনবার্গ উৎসব।

কলাশ্রমসম্পাদনা

কিংবদন্তি মহামান্য পদ্ম বিভূষণ পীর বিরজু মহারাজ এবং তাঁর অনুগত শিষ্য শাশ্বতী সেনের পরিচালিত কলাশ্রম, প্রচলিত ভারতীয় শিল্প ও সংস্কৃতির প্রচার ও সংরক্ষণের জন্য ব্যাপকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এর কার্যক্রমগুলির মধ্যে রয়েছে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান, কর্মশালা, মাস্টার ক্লাস, বক্তৃতা-প্রদর্শনী, সেমিনার, পরিবেশনা এবং উৎসব। কলাশ্রম বার্ষিক চারটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব আয়োজন করে; বসন্তোৎসব, সাধনা, দীক্ষান্তোৎসব এবং হোলি উৎসব। এটি মূলত কত্থকের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সাথে সাথে অন্যান্য বিভিন্ন যুক্ত শাখা, যেমনঃ ভোকাল এবং যন্ত্র সঙ্গীত, যোগ-ব্যায়াম, চিত্রকলা, সংস্কৃত, নাটক এবং মঞ্চশিল্পকে গুরুত্ব প্রদান করে।

শাশ্বতী বর্তমানে কার্যনির্বাহক এবং প্রতিষ্ঠানটির পিছনে চালিকা শক্তি হল তাঁর গুরু, পণ্ডিত বিরজু মহারাজের স্বপ্ন। শাশ্বতী, কলাশ্রম কত্থক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বহু বছর ধরে অর্জিত জ্ঞানকে ছড়িয়ে দিতে দেশে এবং বিদেশে প্রচুর ভ্রমণ করেন। তিনি একজন প্রশিক্ষক হিসেবে বেশ জনপ্রিয় এবং ১৯৮০ সাল থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান করছেন।

পুরস্কার ও সম্মাননাসম্পাদনা

শাশ্বতী সেন সম্মানিত হয়েছেনঃ [১]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "Sangeet Natak Akademi Awards 2004 Awards Ceremony & Festival"। Sangeet Natak Akademi website। ২১ জুলাই ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২ এপ্রিল ২০১০ 

বহিঃসংযোগসম্পাদনা