প্রধান মেনু খুলুন

মোহাম্মদ মোহর আলী (ইতিহাসবেত্তা)

মোহাম্মদ মোহর আলী (আরবি: محمد مهر علي‎‎) (১৯৩২-২০০৭) বাংলাদেশ ও ভারত-উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইসলামী ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ও স্বনামধন্য লেখক।

মোহাম্মদ মোহর আলী
জন্ম১ জুলাই, ১৯২৯
মৃত্যু১১ এপ্রিল, ২০০৭
জাতিসত্তাবাঙালি
নাগরিকত্ব সৌদি আরব[১]
পরিচিতির কারণইতিহাসবিদ

জন্ম ও শিক্ষাজীবনসম্পাদনা

মোহাম্মদ মোহর আলীর জন্ম ১৯২৯ সালের ১ জুলাই বাগেরহাট জেলাধীন ফকিরহাট থানার শুভদিয়া গ্রামে। তার পিতার নাম মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম আলী ও মাতা আয়াতুন্নেসা বেগম। মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি পিতৃহীন হন। এ সময় তার মা মোহর আলীকে নিয়ে মাতুলালয়ে চলে আসেন এবং মা ও মামার তত্বাবধানে তার লেখাপড়া শুরু হয়।

সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত স্থানীয় মাদরাসা ও স্কুলে অধ্যয়ন করার পর ৮ম শ্রেণীতে তিনি বিখ্যাত ফুরফুরা মাদরাসায় ভর্তি হন। পরবর্তীকালে তিনি হুগলী মাদরাসা ও মহসিন কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করেন। ছোট বেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী মোহর আলী বিভিন্ন পরীক্ষায় সাফল্যের নজীর রাখেন। কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য হুগলী মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তার মাদরাসার বেতন ও হোস্টেল খরচ অবৈতনিক করে দেন। হুগলীতে অধ্যয়ন কালেই তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চিন্তার স্ফুরণ ঘটে এবং তিনি মুসলিম লীগের নেতৃত্বে ভারতবর্ষব্যাপি মুসলমানদের স্বাধিকার আন্দোলন সংগ্রামে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। নেতৃত্বের স্বাভাবিক গুণাবলীর কারণে কিশোর বয়সেই তিনি হুগলী মুকুল ফৌজের সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীকালে তিনি হুগলী ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ও হুগলী মাদরাসার সমন্বিত ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্রলীগের একজন নেতা হিসেবে ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় পাকিস্তানের পক্ষে মুসলিম লীগ প্রার্থীদের পক্ষে জোর প্রচারাভিযান চালান।

ভারত বিভাগের প্রাক্কালে মোহর আলীর বলীষ্ঠ ভূমিকার জন্য তখনকার বিখ্যাত রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী, আবুল হাশিম ও শাহ্‌ আজিজুর রহমানের সাথে তার গভীর হৃদ্যতা গড়ে ওঠে।[২] দেশবিভাগের পর মোহর আলী হুগলী থেকে ঢাকায় চলে আসেন এবং কাজী নজরুল ইসলাম কলেজে ভর্তি হন। অন্যান্য বিষয়ের সাথে তিনি আরবি ও ইতিহাস অধ্যয়ন করেন। কাজী নজরুল ইসলাম কলেজেও তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্স ও এম এ ডিগ্রি নেন।

ছাত্র জীবনের এই সময়টাতেও বরাবর তিনি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে তার স্থান কখনো ম্রিয়মান হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সমাপ্তির পর মোহর আলী বেছে নেন শিক্ষকতা ও মনন চর্চার ঋদ্ধ জীবন। এই কারণেই রাজনীতিক মোহর আলীর বদলে আমরা তার মধ্যে পেয়েছি এক অনন্যসাধারণ ঐতিহাসিককে। কর্মজীবনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন কলেজে তিনি অধ্যাপনা করেন। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজ (১৯৫৪-৫৫), ঢাকা সরকারী কলেজ (১৯৫৫-৫৬), চট্রগ্রাম সরকারী কলেজ (১৯৫৬-৫৭) এবং রাজশাহী সরকারী কলেজ (১৯৫৭) ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে যোগ দেন। ১৯৬০ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন School of Oriental and African Studies (SOAS)-এ পিএইচডিতে ভর্তি হন।[৩] তার পিএইচডি থিসিসের শিরোনাম ছিল The Bengali Reaction to Christian Missionary Activities (1833-1857)।[৪] ১৯৬০ সালে এটি গৃহিত হয়। SOAS এ অবস্থানকালে মোহর আলী তার সুপারভাইজার অধ্যাপক কেন বল হ্যাচেটের (Professor Ken Ballhatchet) বিশেষ অনুমোদন নিয়ে লিংকনস্‌ ইনে আইন অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৬৪ সালে বারএট’ল ডিগ্রী অর্জন করেন। দেশে বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতাকালীন তিনি কয়েকটি বই লেখেন।

কর্মজীবনসম্পাদনা

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষে দেশে ফিরে মোহর আলী ঢাকা হাইকোর্টে যোগদান করেন। কিন্তু এই ওকালতী পেশা তিনি দীর্ঘদিন আঁকড়ে থাকেন নি। কারণ তার কাছে মনে হয়েছিল এটি তার ভবিষ্যত বুদ্ধিজীবীতার জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে উঠবে। ফলে তিনি পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা জীবনে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি নুফিল্ড ফাউন্ডেশনের (Nuffield Foundation) এর বৃত্তি নিয়ে বৃটেন যান এবং পরবর্তী বছর ফিরে আসেন।

১৯৬৫ সালে তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভ The Bengali Reaction to Christian Missionary Activities, 1833-1857 গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৬৬ সালে The Autobiography and The Other Writings of Nawab Abdul Latif বইটি মোহর আলীর সস্পাদনায় প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ ত্যাগের পূর্বে ১৯৭৫ সালে তিনি তার উল্লেখযোগ্য গবেষণা গ্রন্থ The Fall of Sirajuddawla এর পাণ্ডুলিপি প্রকাশের ব্যবস্থা করে যান। একই বছরে লন্ডনে মুসলিম কাউন্সিল অব ইউরোপের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়ামে মোহর আলী History of the Muslims of Bengal নামে একটি নিবন্ধ পাঠ করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন সৌদি কুটনীতিক নিবন্ধটির বিষয়বস্তুতে চমৎকৃত হন এবং অধ্যাপক আলীকে রিয়াদের ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সৌদ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার ইসলামী ইতিহাস নিয়ে একটি গবেষণা পদ গ্রহণের অনুরোধ করেন। এই ভাবে মোহর আলীর জীবনের নবরূপান্তর ঘটে এবং তিনি সাধারণ ইতিহাস (General History) থেকে ইসলামী ইতিহাসের বিপুল ঐশ্বর্য নিয়ে গবেষণার প্রাসাদে প্রবেশ করেন। রিয়াদে অবস্থানকালে তিনি ভালো মতো আরবী ভাষাও আয়ত্ত করেন।

১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮৬ এই দীর্ঘ দশ বছর তিনি একটানা বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেন, যার ফল হিসেবে প্রকাশিত হয় চারখণ্ডের বৃহদায়তন History of the Muslims of Bengal নামের ধ্রুপদী ইতিহাস গ্রন্থ। ইতিহাসের এই ঋদ্ধ ও প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনার ফলেই মোহর আলীর খ্যাতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে। এরপরে মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে নতুন একটি গবেষণা পদ অফার করা হয়। এখানে তিনি ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত গবেষণার কাজে সম্পৃক্ত থাকেন এবং যার ফল হিসেবে দুই খণ্ডে Sirat-al-Nabi and the Orientalists নামে বৃহৎ গ্রন্থ রচনা করেন। এটি প্রকাশ করেছে মদীনার Center for the Service of Sunnah and Sirah. পরবর্তীকালে তিনি এ ধারার আরো একটি সম্পূরক গ্রন্থ রচনা করেন The Quran and the Orientalist: An Examination of Their Main Theories and Assumptions নামে।[৫][৬]

মোহর আলী মদীনার King Fahad Complex for the Printing of the Holy Quran নামের প্রতিষ্ঠানটির সাথেও এক বছর যুক্ত ছিলেন এবং এই সময়েই তিনি কুরআন অধ্যয়নের দিকে বেশী আগ্রহী হয়ে ওঠেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি লন্ডনে স্থায়ী হয়েছিলেন। এ সময়েই তিনি তিন খণ্ডে রচনা করেন আরবী ভাষার সাথে অপরিচিত পাঠকদের জন্য A Word for Word Meaning of the Quran. মোহর আলী তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি History of the Muslims of Bengal গ্রন্থের জন্য ২০০০ সালে মুসলিম বিশ্বের নোবেল প্রাইজ বাদশাহ ফয়সল আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন।[৭] বইটির মৌলিকত্ব, গভীরতা ও বিশ্লেষণী তাৎপর্যের কারণে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে মুসলিম সমাজ ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার এক অনন্য সাধারণ ইতিহাস রচনার জন্য মূলতঃ তিনি এ পুরস্কারটি পান।

মৃত্যুসম্পাদনা

২০০৭ সালের ১১ এপ্রিল এই ধ্রুপদী ইতিহাসবিদ লন্ডনে ইন্তেকাল করেন।[৮]

রচনাবলীসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "Ali, Muhammad Mohar"Catalogue Général। Catalogue Général। 
  2. Beg, Professor M. A. J. (জুন ২০০৬)। "MUHAMMAD MOHAR ALI" (PDF)The Bengal Muslim Research Institute UK (BMRI) 
  3. "Mohamed Mehr Ali"Comprehensive Library Foundation। ফেব্রুয়ারি ২০১৩। ১২ জুলাই ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  4. "The Bengali reaction to Christian missionary activities 1833-1857"EThOS। The British Library Board। 
  5. Sirat Al-Nabi and the Orientalists
  6. The Qur'an and the Orientalists: An Examination of Their Main Theories and Assumptions. আইএসবিএন ০-৯৫৪০৩৬৯-৭-২
  7. "King Faisal International Prize For Islamic Studies Year 2000"King Faisal Foundation। ১৩ জানুয়ারি ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  8. "Mohamed Mehr Ali"web.archive.org। ২০১২-০৫-২৮। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১০-১১ 

বহিঃসংযোগসম্পাদনা