ভূষণছড়া গণহত্যা

ভূষণছড়া গণহত্যা ১৯৮৪ সালের ৩০শে মে দিবাগত রাত আনুমানিক ৪টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা ৩০মিনিট পর্যন্ত বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে সময়ে সংঘটিত হয়েছিল। এ সময় মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যে রাঙ্গামাটি জেলার বরকল উপজেলার ভূষণছড়া ও তার পাশ্ববর্তী এলাকার নারী-শিশুসহ সাড়ে চারশর বেশি নিরীহ বাঙালিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এর জন্য দায়ী করা হয় জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখা “শান্তিবাহিনীকে” এ হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করা হয়ে থাকে।[১] গণহত্যার খবর প্রচারিত হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে উঠতে পারে এমত আশঙ্কা থেকে তৎকালীন সামরিক সরকার গণহত্যার সংবাদ প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।[৩]

ভূষণছড়া গণহত্যা
স্থানরাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলা
তারিখ৩০ মে, ১৯৮৪ সাল
লক্ষ্যবাঙালি
হামলার ধরনজাতি নির্মূল করা, গণহত্যা
নিহত৪০০[১][২]

প্রেক্ষাপটসম্পাদনা

রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার ভূষণছড়া ও তার পাশ্ববর্তী এলাকার বাঙ্গালীরা এই নির্মম গণহত্যার শিকার। যে ঘটনার মাধ্যমে মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ে হত্যা করা হয়েছে চার শতাধিক মানুষ । এবং আহত করা হয়েছে আরও সহস্রাধিক মানুষ। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে একটি জনপদ। সত্তরের দশকের শেষদিকে জনসংখ্যার সুষম বণ্টন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ সরকার দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দরিদ্র এবং ভূমিহীন মানুষদের চট্টগ্রামের সরকারি খাস জমিতে পূর্নবার্সন করে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং এর সশস্ত্র সামরিক শাখা শান্তিবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের পূনবার্সন মেনে নেয় নি। এর জন্যই ঘটে এই নৃশংসতা।

ভূষণছড়া রাঙামাটি পার্বত্য জেলা থেকে প্রায় ৫৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার পূর্ব ও উত্তরে অবস্থিত একটি দুর্গম জনপদ। রাঙামাটি জেলাসদর থেকে নৌকায় ৭৬ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ছোট হরিণা। সেখান থেকে আরও ৫ কিলোমিটার ভেতরে ভূষণছড়া একটি ক্ষুদ্র পাহাড়ী জনপদ। এ এলাকাটি ভারতীয় সীমান্তবর্তী এবং যে কোনো সন্ত্রাসী কর্ম কাণ্ড করে সহজেই ভারতে পারিয়ে যাওয়া সম্ভব। কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী ভূষণছড়া তিন দিকে পাহাড়ঘেরা। ভৌগোলিক এ সব কারণেই গণহত্যার জন্য সেদিন শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসীরা ভূষণছড়াকে বেছে নিয়েছিল বলে ধারণা করে ভূষণছড়ার মানুষ।য় বাসিন্দারা। মনিস্বপন দেওয়ানের নেতৃত্বে শান্তিবাহিনীর একদল নারী-পুরুষ মিলে গভীর রাতে এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল।[৪][৫]

নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতাসম্পাদনা

মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যে নারী-শিশুসহ সাড়ে চারশর বেশি নিরীহ বাঙালিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। গর্ভবর্তী নারী,ছোট শিশু,বৃদ্ধ কাউকেই বাদ দেয় নি। শিশু, কিশোরী বা সদ্য বিবাহিত তরুণীদের করা হয় গণধর্ষণ, গর্ভবর্তী নারীদের পেট চাকু দিয়ে কেটে বাচ্চা বের করে দেওয়া হয়। সেইসাথে চলে মহিলাদের উপর অমানবিক নির্যাতন।

বুলেটের পাশাপাশি হাত-পা বেঁধে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে, দা-দিয়ে কুপিয়ে, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে, বেয়নেট ও অন্যান্য দেশি অস্ত্র দিয়ে খোঁচিয়ে খোঁচিয়ে নানা ভাবে কষ্ট দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। প্রতিটি লাশকেই বিকৃত করে সেদিন চরম অমানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছিল।[৬]

তদন্ত ও বিচারসম্পাদনা

এ গণ হত্যাকাণ্ডের কোনো কদন্ত ও বিচার হয় নি। অভিযোগ আছে যে সেদিনকার হত্যাকাণ্ডের পর গ্রামের মানুষ মামলা করতে বরকল থানায় গিয়েছিল। কিন্তু মামলা না নিয়ে জেনারেল ডায়েরি করেছিল। ভূষণছড়ার গ্রামবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা এখনও গণহত্যায় নেতৃত্বদানের অভিযোগে মেজর রাজেশের বিচার দাবী করে আসছে। অন্য দিকে অভিযোগ রয়েছে যে ভূষণছড়া হত্যাকাণ্ডের পর শান্তিবাহিনীর যে সকল সদস্য সীমানা পার হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ভারতে পালিয়ে গিয়েছিল সরকার তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে জমি, রেশন, ঘরবাড়ি, চাকরি ও ব্যাংকঋণ দিয়ে বিভিন্নভাবে পুনর্বাসিত করেছে।[৭][৮]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "ঐতিহাসিক ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস আজ"। parbattanews.com। ৩ মে ২০১৪। 
  2. "ঐতিহাসিক ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস আজ"। nayashatabdi.com। ৩১ মে ২০২১। 
  3. "ভূষণছড়ার ৪৫০ বাঙালি হত্যার বিচার হয়নি ৩৭ বছরেও"। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ 
  4. পার্বত্য এলাকার সবচেয়ে বড় গণহত্যা
  5. শোক ও ক্ষোভের অশ্রু গণকবরে
  6. "রাঙামাটির বরকলে ভূষণছড়া গণহত্যা দিবসে মানব বন্ধন করেছে নাগরিক পরিষদ"। dailyprottoy.com। ৩১ মে ২০২১। 
  7. "ভূষণছড়ার ৪৫০ বাঙালি হত্যার বিচার হয়নি ৩৭ বছরেও"। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ 
  8. শোক ও ক্ষোভের অশ্রু গণকবরে