বাংলায় দিল্লির আক্রমণ (১৩৫৩–১৩৫৪)

বাংলায় দিল্লির আক্রমণ দ্বারা ১৩৫৩ সালের নভেম্বর থেকে ১৩৫৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলার বিরুদ্ধে পরিচালিত দিল্লি সালতানাতের আক্রমণকে বুঝানো হয়। ১৩৫৩ সালের নভেম্বরে দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক এক বিরাট সৈন্যবাহিনীসহ বাংলা আক্রমণ করেন। কিন্তু বাংলার সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ এই আক্রমণ প্রতিহত করে দিতে সক্ষম হন। প্রধানত বাংলার সৈন্যদের কঠোর প্রতিরোধ এবং বিরূপ ভৌগোলিক পরিস্থিতির কারণেই দিল্লির এই আক্রমণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল।[১]

বাংলায় দিল্লির আক্রমণ (১৩৫৩–১৩৫৪)
তারিখনভেম্বর ১৩৫৩ – সেপ্টেম্বর ১৩৫৪[১]
অবস্থানবাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ)
ফলাফল

বাংলার বিজয়[২][৩]

  • বাংলায় দিল্লির আক্রমণ ব্যর্থ হয়[১][৩]
  • বাংলার ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষিত হয়
অধিকৃত
এলাকার
পরিবর্তন
কোশি নদী পর্যন্ত বাংলার প্রভাব সম্প্রসারিত হয়[২]
যুধ্যমান পক্ষ
বাংলা দিল্লি সালতানাত
সেনাধিপতি
শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ ফিরোজ শাহ তুঘলক
শক্তি
অজ্ঞাত অজ্ঞাত, তবে বাংলার চেয়ে অনেক বেশি
হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি
অজ্ঞাত অজ্ঞাত, কিন্তু প্রচুর[১]

পটভূমিসম্পাদনা

১৩৪২ সালে শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ লখনৌতির সুলতান হন। তিনি ছিলেন উচ্চাভিলাষী। তিনি সমগ্র বাংলায় তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন, নেপালউড়িষ্যা আক্রমণ করেন এবং ত্রিহুত (উত্তর বিহার), চম্পারণ, গোরক্ষপুর ও কাশী জয় করেন[১][২][৩]। বিহার এসময় দিল্লি সালতানাতের অধীন ছিল এবং বিহার আক্রমণের মাধ্যমে ইলিয়াস শাহ দিল্লির সুলতানদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। ইলিয়াস শাহ কর্তৃক দিল্লির অংশ আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় ১৩৫৩ সালের নভেম্বরে দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক বাংলা আক্রমণ করেন[১][২][৩]

দিল্লির আক্রমণসম্পাদনা

সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক এক বিরাট সৈন্যবাহিনী ও নৌবহরসহ বাংলা আক্রমণ করেন। অযোধ্যা, চম্পারণ ও গোরক্ষপুরের মধ্য দিয়ে কোশি নদী অতিক্রম করে দিল্লির বাহিনী বাংলায় প্রবেশ করে[১]। ফিরোজ শাহের আক্রমণের সংবাদ পেয়ে ইলিয়াস শাহ সীমান্তে দিল্লির বাহিনীকে বাধাদানের কোনো চেষ্টা করেন নি। তিনি ত্রিহুতের দিকে চলে যান এবং পরবর্তীতে বাংলার তৎকালীন রাজধানী পাণ্ডুয়ায় পশ্চাৎপসরণ করেন[১]

দিল্লি বাহিনীর অগ্রাভিযানসম্পাদনা

দিল্লির সৈন্যবাহিনী পাণ্ডুয়ার নিকটবর্তী হলে ইলিয়াস শাহ রাজধানীর প্রতিরক্ষার জন্য কোনোরূপ ব্যবস্থা না করে দুর্ভেদ্য একডালা দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ফলে ফিরোজ শাহ অতি সহজে পাণ্ডুয়া দখল করে নেন। এরপর তিনি একডালা দুর্গ অবরোধ করেন[১][২]

একডালা দুর্গ অবরোধসম্পাদনা

একডালা দুর্গ পশ্চিম দিনাজপুর জেলার ধনজর পরগণার একডালা গ্রামে অবস্থিত ছিল। দুর্গটি ছিল প্রাকৃতিকভাবে দুর্ভেদ্য। দুর্গটি তিন দিকে বালিয়া, চিরামতি ও মহানন্দা নদী দ্বারা এবং অন্যদিকে ঘন অরণ্য দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। তাছাড়া দুর্গটি বিরাট এলাকা জুড়ে কাদামাটির তৈরি দেয়াল দিয়ে পরিবেষ্টিত ছিল[১]। ইলিয়াস শাহ বুঝতে পেরেছিলেন যে, দিল্লির বিশাল বাহিনীকে সম্মুখযুদ্ধে পরাস্ত করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য তিনি অযথা শক্তিক্ষয় না করে একডালা দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং আত্মরক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। একজন নিপুণ সমরবিশারদ হিসেবে তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, জল ও জঙ্গলে ঘেরা একডালা দুর্গ জয় করা দিল্লির সৈন্যদের পক্ষে কষ্টসাধ্য হবে এবং বর্ষাকালে এই অঞ্চলে তাদের সাফল্য অর্জনের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।

ইলিয়াস শাহের ধারণা সঠিক বলে প্রমাণিত হয়। জলবেষ্টিত কাদামাটি নির্মিত এই দুর্গ জয় করা ফিরোজ শাহের সৈন্যদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ইলিয়াস শাহ একডালা দুর্গের অভ্যন্তরে থেকে প্রতিরোধ ব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে থাকেন। তার উদ্দেশ্য ছিল বর্ষাকাল পর্যন্ত দিল্লির সৈন্যদের ঠেকিয়ে রাখা। তিনি জানতেন, বর্ষাকালের প্রবল বৃষ্টিপাত এবং মশার দংশন দিল্লির সৈন্যদের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হবে না এবং তারা জয়ের আশা ত্যাগ করে ফিরে যেতে বাধ্য হবে[২][৩]

অবরোধ চলাকালে উভয় পক্ষের মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডযুদ্ধ সংঘটিত হয়। কিন্তু এগুলো কোনো নিশ্চিত ফলাফল বয়ে আনতে পারে নি। বর্ষাকাল এসে গেলে দিল্লির সৈন্যরা মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হয়। বাংলার অবিরাম বৃষ্টিপাত এবং মশার কামড়ে দিল্লির সৈন্যরা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এমতাবস্থায় একদিন ফিরোজ শাহ তার সৈন্যদেরকে শিবির তুলে নেয়ার আদেশ দেন। তার আদেশ শুনে সৈন্যরা আনন্দিত হয়ে শোরগোর শুরু করে দেয় এবং নতুন ঘাঁটির জন্য নির্দিষ্ট স্থানের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এতে ইলিয়াস শাহ ধারণা করেন যে, দিল্লির সৈন্যরা পশ্চাৎপসরণ করছে। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি তার সৈন্যবাহিনীসহ একডালা দুর্গের বাইরে চলে আসেন এবং দিল্লির সৈন্যদের পশ্চাদ্ধাবন করেন[১]। ফিরোজ শাহ এসময় একডালা দুর্গ থেকে সাত ক্রোশ দূরে অবস্থান করছিলেন। বাংলার সৈন্যবাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে তিনি তার সৈন্যবাহিনীকে যুদ্ধের কায়দায় সারিবদ্ধ করেন। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর ইলিয়াস শাহ পশ্চাৎপসরণ করতে বাধ্য হন। তিনি আবার একডালা দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন[১]

এরপর ফিরোজ শাহ আবার একডালা দুর্গ অবরোধ করেন। কিন্তু পূর্বের মতো এবারও তিনি দুর্গটি দখল করতে ব্যর্থ হন[১][২]

যুদ্ধের অবসানসম্পাদনা

একডালা দুর্গ দখল করতে ব্যর্থ হয়ে ফিরোজ শাহ হতাশ হয়ে শেষ পর্যন্ত সন্ধির প্রস্তাব করেন। ১৩৫৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলা ও দিল্লি সালতানাতের মধ্যে সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়[১][৩]। সন্ধি অনুযায়ী ফিরোজ শাহ বাংলার বন্দি সৈন্যদেরকে মুক্তি দেন এবং বাংলা থেকে সমস্ত সৈন্য প্রত্যাহার করে দিল্লিতে প্রত্যাবর্তন করেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলায় দিল্লির আক্রমণের অবসান ঘটে[১][২][৩]

ফলাফলসম্পাদনা

ইলিয়াস শাহের সঙ্গে সন্ধি স্বাক্ষরের পর বাংলায় দিল্লির আক্রমণের অবসান ঘটে। বাংলার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন থাকে এবং বাংলার ওপর ইলিয়াস শাহের কর্তৃত্বও অটুট থাকে। ইলিয়াস শাহের জীবিত থাকাকালে ফিরোজ শাহ আর বাংলা আক্রমণ করার সাহস করেন নি। ইলিয়াস শাহের মৃত্যুর পর ১৩৫৮ সালে তিনি আবার বাংলা আক্রমণ করেন[১][২]

আরো দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. ড. মুহম্মদ আব্দুর রহিম (১৯৭৭). বাংলাদেশে ইলিয়াস শাহী শাসন. বাংলাদেশের ইতিহাস. ১৯২–১৯৫.
  2. Tabori, Paul (1957). "Bridge, Bastion, or Gate". Bengali Literary Review. 3–5: 9–20.
  3. Hussain, Syed Ejaz (2003). The Bengal Sultanate: Politics, Economy and Coins, A.D. 1205-1576. Manohar. আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৩০৪-৪৮২-৩.