প্রবর্তক সংঘ

ভারতের জাতীয়তাবাদী উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান

প্রবর্তক সংঘ একটি হিন্দু সামাজিক জাতীয়তাবাদী প্রতিষ্ঠান যার প্রতিষ্ঠাতা স্বাধীনতা সংগ্রামী মতিলাল রায়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে প্রবর্তক সংঘ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।

প্রবর্তক সংঘ ও মতিলাল রায়ের বাড়ী, চন্দননগর

প্রতিষ্ঠাসম্পাদনা

১৯২০ সালে হুগলী জেলার চন্দননগরে মতিলাল রায় প্রবর্তক সংঘ স্থাপন করেন। ফরাসী অধ্যুষিত চন্দননগরে ভারতীয় বিপ্লবীদের অন্যতম আশ্রয়স্থল ছিল প্রবর্তক সংঘ। মতিলাল, ঋষি অরবিন্দ ঘোষ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। ১৯২৫ সালে তিনি সংঘগুরু ও সংস্থার প্রধান আধ্যাত্মিক ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের যুগে এই সংঘে বিভিন্ন সময় আশ্রয় নিয়েছেন শতাধিক বিপ্লবী। ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সংঘের প্রার্থনা ঘরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। সংঘের মুখপত্র প্রবর্তক পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন প্রবীন বিপ্লবী ও বোমা বিশারদ মণীন্দ্রনাথ নায়েক[১][২]

কর্মকাণ্ডসম্পাদনা

 
প্রবর্তক সংঘ গ্রন্থাগার

প্রবর্তক সংঘ একটি সামাজিক ও জনকল্যাণকর প্রতিষ্ঠান। দেশবাসীর সামাজিক, আধ্যাত্মিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা প্রদান, পত্রিকা প্রকাশ, কুটীর ও ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপন ছিল এই সংঘের কাজ। প্রবর্তক সংঘের একাধিক শাখা প্রতিষ্ঠা ভারতের হয় নানা জায়গায়। ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, বর্ধমান, অবিভক্ত ২৪ পরগনা, হাওড়া, ফরিদপুর এমনকি বার্মারেঙ্গুনেও এর শাখা ছিল। চট্টগ্রাম শাখার দায়িত্বে ছিলেন বিপ্লবী মহিমচন্দ্র দাশগুপ্ত। প্রবর্তক ব্যাংক ও ইনসুরেন্স কোম্পানী, পাট কারখানা, খাদি বস্ত্রবয়ন, স্ব নির্ভর প্রকল্প ইত্যাদির সাথে যুক্ত ছিলেন প্রবর্তক সংঘের নেতারা। মন্দির, গ্রন্থাগার, ছাপাখানা, বৃদ্ধাশ্রম, ছাত্রাবাস স্থাপন করা হয় এই সংস্থার নামে। সারা বাংলা জুড়ে ২১ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে প্রবর্তক সংঘ। সংঘের লাভজনক ব্যবসার আয় থেকে এই বিদ্যালয়গুলির ব্যয় বহন হতো। সংস্থার মুখপত্রের নাম ছিল 'প্রবর্তন'।[২]

পরবর্তী অবস্থাসম্পাদনা

দেশভাগের পরে প্রবর্তক সংঘের কাজকর্ম হ্রাস পায়। ১৯৫৯ সালে মতিলাল রায়ের মৃত্যুর পর অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ হয়ে যায় ও সংঘের কর্মকাণ্ড প্রধান কেন্দ্র চন্দননগর অভিমুখী হয়ে পড়ে। ১৯৬৩ তে সংস্থার ব্যাংক ব্যবসা ইউনাইটেড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাংকের সাথে মিশে কাজ করতে থাকে। ১৯৬৫ সালে জুট কারখানাটি সোহনলাল মিল ও পরে বহুজাতিক সংস্থা অধিগ্রহণ করে।[২] চট্টগ্রাম প্রবর্তক সংঘ বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধকালে আক্রান্ত হয়। ১৯৭১ সালে সংঘের সকল কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনায় প্রবর্তক সংঘের কার্যকলাপ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সংঘের প্রতিষ্ঠিত প্রেস, ব্যাংক, কুটির শিল্প, কৃষি প্রকল্প, ট্রেনিং সেন্টার, চিকিৎসা কেন্দ্র, আবাসন প্রকল্পসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।[৩]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Radhakrishnan, Sarvapalli (১৯৯২)। Rabindranath Tagore: A Centenary, Volumes 1861-1961। দিল্লী: সাহিত্য একাদেমী। পৃষ্ঠা ৪৬৮। আইএসবিএন 8172013329 
  2. প্রথম খন্ড, সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত (২০০২)। বাঙালি সংসদ চরিতাভিধান। কলকাতা: সাহিত্য সংসদ। পৃষ্ঠা ৩৯০, ৩৯১। আইএসবিএন 81-85626-65-0 
  3. "চট্টগ্রাম প্রবর্তক সংঘের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রতিবন্ধকতা"। দৈনিক জনকণ্ঠ। ২৯ আগস্ট ২০১৫। সংগ্রহের তারিখ ৫ মে ২০১৭