পাওলো ফ্রেইরি (ইংরেজি: Paulo Freire) ( ১৯ সেপ্টেম্বর,১৯২১ –২ মে, ১৯৯৭) ছিলেন ব্রাজিলের মানবতাবাদী এক শিক্ষক ও দার্শনিক। ক্রিটিকাল পেডাগোজির অন্যতম সমর্থক ও পথপ্রদর্শক। তিনি তাঁর জগদ্বিখ্যাত বই Pedagogy of the oppressed অর্থাৎ 'নিপীড়িতের শিক্ষাবিজ্ঞান'এর জন্য সুপরিচিত। [১][২]

পাওলো ফ্রেইরি
Paulo Freire 1977.jpg
১৯৭৭ খ্রি.পাওলো ফ্রেইরি
জন্ম(১৯২১-০৯-১৯)১৯ সেপ্টেম্বর ১৯২১
মৃত্যু২ মে ১৯৯৭(1997-05-02) (বয়স ৭৫)
মাতৃশিক্ষায়তনরেসিফে বিশ্ববিদ্যালয়
উল্লেখযোগ্য কর্ম
পেডাগোজি অব দ্য অপপ্রেস্ড (১৯৬৮)
রাজনৈতিক দলওয়ার্কার্স পার্টি ব্রাজিল
দাম্পত্য সঙ্গীএলজা ফ্রেইরি (বি. ১৯৪৪)

জন্ম ও শিক্ষা জীবনসম্পাদনা

পাওলো ফ্রেইরির জন্ম ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের ১৯ শে সেপ্টেম্বর ব্রাজিলের উত্তর-পূর্ব প্রদেশ পারনামবুকোর রাজধানী শহর রেসিফের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। ১৯৩০ শতকে বিশ্বজুড়ে যে গ্রেট ডিপ্রেশন বা মহামন্দা হয়, তার কারণে ছোটবেলা থেকেই দরিদ্রতা ও ক্ষুধার সাথে মানুষের লড়াই দেখেছেন। অভাব ছিল তাদের পরিবারের নিত্যসঙ্গী। অভাবের জন্য ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে তাঁরা রেসিফের পশ্চিমে অবস্থিত মোটামুটি স্বল্প আয়ের শহর 'জবাত পাওডো ডস গুয়ারারপেশস' শহরে চলে যান। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের ৩১ শে অক্টোবর তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। এমতাবস্থায় আরো সমস্যায় পড়লে তাঁর পড়াশোনার অনেক ক্ষতি হয়। সেখানকার অন্য দশটা দরিদ্র কিশোরের মতো তিনি তার বস্তির বন্ধুদের সঙ্গে অলিতে গলিতে ফুটবল খেলে বেড়াতেন। তাঁর সামাজিক জীবনের অনেকটা জুড়েই ছিল বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলার সময়টা। পরবর্তী জীবনে তিনি স্বীকার করেন -

"ক্ষুধার কারণে কোনো পড়াশোনাই আমার মাথায় ঢুকতো না। এমন না যে আমি বোকা ছিলাম, অথবা আমার আগ্রহের কোনো অভাব ছিল। আমার সামাজিক অবস্থা আমাকে শিক্ষা নিতে দেয়নি।"

তবে তাঁর শেখার ক্ষমতা ছিল প্রবল। দারিদ্র্য আর ক্ষুধা তাঁর শেখার ক্ষমতাকে আরো গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ভীষণ অভাবের ওই দিনগুলোই পরবর্তীতে তাঁকে দরিদ্র ও শোষিতদের জন্য কাজ করতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে পাওলো ফ্রেইরি রেসিফে বিশ্ববিদ্যালয়ের ল'স্কুলে পড়ার সুযোগ পান। সেখানে তিনি দর্শন এবং মনোবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন। কিন্তু আইন ব্যবসা না করে এক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে শুরু করেন। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি সহকর্মী শিক্ষয়িত্রী 'এলজা মৈয়া কোস্টা ডি অলিভেরা'কে বিবাহ করেন এবং দুজনেই শিক্ষার কাজে লিপ্ত থাকেন।

কর্মজীবনসম্পাদনা

১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে সাও পাওলো তে শিক্ষা অধিকর্তা হিসাবে তাঁর নিয়োগে পর তিনি শিক্ষা সম্বন্ধীয় তাঁর নিজস্ব তত্ত্ব প্রয়োগের সুযোগ পান। পরীক্ষামূলক ভাবে তিনি তিন শত নিরক্ষর আখ চাষীদের মাঝে প্রয়োগ করে তাদের মাত্র ৪৫ দিনে লেখাপড়া শেখাতে সক্ষম হন। এতে উৎসাহিত হয়ে ব্রাজিল সরকার সারা দেশে কয়েক হাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলে। কিন্তু ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের সামরিক বিদ্রোহে পাওলোর কাজ বন্ধ হয়ে যায় এবং তিনি বিশ্বাসঘাতক হিসাবে ৭০ দিন কারাবাস করেন। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রথম রচনা 'এডুকেশন এজ দি প্র্যাকটিস অফ ফ্রিডম' প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে তিনি পন্টিফিক্যাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব সাও পাওলোতে অধ্যাপনায় যুক্ত হন। তিনি আন্তর্জাতিক জুরি বোর্ডেরও সদস্য ছিলেন। সেন্টার ফর দি স্টাডি অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সোসাল চেঞ্জ-এর ফেলো এবং ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে হার্ভার্ড সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন এডুকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর অতিথি অধ্যাপক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি জেনেভাস্থ অফিস অব দি ওয়ার্ল্ড কাউন্সিল অব চার্চেস-এর উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন। তিনি চিলির ইউনেস্কোর ইনস্টিটিউট অব রিচার্স অ্যান্ড ট্রেনিং ইন এগ্রোরিয়ান রিফর্ম-এর উপদেষ্টা ছিলেন পাঁচ বৎসর এবং চিলি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি ব্রাজিলে বয়স্ক শিক্ষার জাতীয় পরিকল্পনার সাধারণ সমন্বয়কও ছিলেন।

পাওলো ফ্রেইরির শিক্ষাতত্ত্বের মূলকথাসম্পাদনা

পাওলো ফ্রেইরি বাস্তবিক পরিস্থিতির উপর পর্যালোচনা করে দেখেছেন,মানুষের চেতনা রূপ পায় আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর মানুষটির নিজস্ব পারিপার্শ্বিকের প্রভাবে। তারই পরিপেক্ষিতে তিনি যে শিক্ষাচিন্তা পোষণ করতেন তার মূল কথা হল - প্রতিটি মানুষ এক-একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন সত্তা। তিনিই পারেন পৃথিবীকে পরিবর্তন করতে এবং নতুন করে গড়তে। তবে তত্ত্ব-কর্ম-সমন্বয়ী বিশ্লেষণী চেতনা মানুষকে ভাবনা থেকে কাজে অগ্রসর হতে শেখায়। শোষকের নিপীড়ন মানুষকে বঞ্চিত করে, মিথ্যা ভাবনায় আটকে রাখে। সুতরাং জ্ঞানার্জন কেবল অক্ষর জ্ঞান নয়, জ্ঞানার্জন হল জগতকে সংশয়াতীত ভাবে চেনা ও জানা। যেখানে শিক্ষার্থী এবং সেই সঙ্গে শিক্ষকও পারস্পরিক বিনিময়ে তত্ত্ব-কর্ম-সমন্বয়ী বিশ্লেষণী চেতনায়নের (critical consciousness) মাধ্যমে বাস্তব জীবনে মুক্তি অর্জনের পথের সন্ধান পাবেন । [৩] ফ্রেইরি দর্শনের মধ্যে জঁ-পল সার্ত্র, এরিক ফ্রম, লুই আলত্যুসের, হার্বাট মার্কুস কার্ল মার্ক্স প্রমুখ দার্শনিকের চিন্তা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। চিন্তাবিদদের চিন্তার সমন্বয়ে ও তাঁর critical Pedagogy এর দর্শনে ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় জগদ্বিখ্যাত বই নিপীড়িতের শিক্ষা বিজ্ঞান- Pedagogy of the oppressed । এখানে বর্ণিত শিক্ষার দিশাকে তিনি "ব্যাংকিং মডেল অব এডুকেশন" হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন। কেননা এখানে শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থীদেরও জ্ঞানের সহ-স্থপতি বা কো-ক্রিয়েটর হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। এছাড়া তিনি শিক্ষাতত্ব ও শিক্ষা সম্বন্ধীয় নানা বিষয়ে পনেরোটিরও বেশি বই প্রকাশ করেছেন।

রচনাবলীসম্পাদনা

উল্লেখযোগ্য কিছু গ্রন্থ হল -

  • 'এডুকেশন, দ্য প্র্যাকটিস অব ফ্রিডম' (১৯৬৭)
  • 'পেডাগোজির অফ অপপ্রেস্ড'(১৯৬৮)
  • 'পেডাগোজি ইন প্রোসেস'(১৯৭৮)
  • 'পেডাগোজি অব দি সিটি'(১৯৯৩)
  • 'পেডাগোজি অফ হোপ: রিলিভিং পেডাগোজি অফ দি অপপ্রেস্ড'(১৯৯৪)
  • 'পেডাগোজি অফ দি হার্ট'(১৯৯৭)
  • 'কালচারাল অ্যাকশন ফর ফ্রিডম'(১৯৭০)
  • 'এডুকেশন ফর ক্রিটিক্যাল কনসিয়াসনেস' (১৯৭৩)
  • 'দ্য পলিটিকস অফ এডুকেশন: কালচার, পাওয়ার অ্যান্ড লিবারেশন'(১৯৮৫)

সম্মাননাসম্পাদনা

বয়স্ক শিক্ষায় অনন্য অবদানের জন্য জীবদ্দশায় দেশে ও বিদেশে পাওলো ফ্রেইরি বহু পুরষ্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। এদের মধ্যে ১৯৮৬ সালে তার পাওয়া ইউনেস্কো প্রাইজ ফর পিস এডুকেশন অন্যতম। এছাড়া তিনি ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার ২৯টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রি লাভ করেন।

জীবনাবসানসম্পাদনা

১৯৯৭ সালের ২ মে সাওপাওলোতে পাওলো ফ্রেইরি ৭৫ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "The New Observer" (PDF)। Justinwyllie.net। ২০১২-০৯-১৬ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৯-১৭ 
  2. "Paulo Freire and informal education"। Infed.org। ২০১২-০৫-২৯। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৯-১৭ 
  3. "'পাউলো ফ্রেইরি: মুক্তির জন্য সাংস্কৃতিক প্রয়াস'"। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৯-১৮