দীনবন্ধু চার্লস ফ্রিয়ার এন্ড্রুজ

ভারতে খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক

দীনবন্ধু চার্লস ফ্রিয়ার এন্ড্রুজ ( ১২ ফেব্রুয়ারি ১৮৭১ – ৫ এপ্রিল ১৯৪০ ) ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একনিষ্ঠ সেবক,বিশ্বভারতীর আদর্শ প্রচারে রবীন্দ্রনাথের একান্ত সহকারী, বন্ধু, খ্রিস্টভক্ত মানবপ্রেমিক, শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক।[১]

দীনবন্ধু চার্লস ফ্রিয়ার এন্ড্রুজ
Charles Freer Andrews 1971 stamp of India.jpg
দীনবন্ধু চার্লস ফ্রিয়ার এন্ড্রুজ ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের স্মারক ডাকটিকিটে
জন্ম১২ ফেব্রুয়ারি ১৮৭১
মৃত্যু৬ এপ্রিল ১৯৪০(১৯৪০-০৪-০৬)
জাতীয়তাবৃটিশ ভারতীয়
পেশাশিক্ষাবিদ, খ্রিস্টভক্ত মানবপ্রেমিক ও সমাজ সংস্কারক।
কলকাতার আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু রোডস্থিত কবরস্থানে এন্ড্রুজের আবক্ষমূর্তি.

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবনসম্পাদনা

চার্লস ফ্রিয়ার এন্ড্রুজ ১২ ই ফেব্রুয়ারি ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের নিউক্যাসল অন টাইনে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন বার্মিংহামের ক্যাথলিক অ্যাপোস্টোলিক চার্চের "এঞ্জেল" ( বিশপ)। এন্ড্রুজের পড়াশোনা বার্মিংহামের কিংস এডওয়ার্ড স্কুলে। ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পেমব্রোক কলেজে ভর্তি হন। " 'মূলধন ও শ্রম' - এই দুয়ের সংঘাতের সঙ্গে খ্রিস্টধর্মের সম্বন্ধ" বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরস্কার "বানি" পুরস্কার লাভ করেন। এন্ড্রুজের জীবনে তাঁর ধার্মিক পিতামাতার প্রভাব ছিল। ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে পেমব্রোক কলেজ মিশনে যাজক হন ও পরে কেমব্রিজের তাত্বিক কলেজ ওয়েস্টকট হাউসের যাজক ও সহ অধ্যক্ষ হন। সাথে সাথে তিনি বিশপ ওয়েস্টকট পরিচালিত ক্রিশ্চান সোস্যাল ইউনিয়নে যোগ দেন। ডারহামে সেই সময় কয়লাখনির শ্রমিকদের অসন্তোষে ধর্মঘট চলছিল। ওয়েস্টকটের মধ্যস্থতায় ধর্মঘটের অবসান ঘটান। এন্ড্রুজ খ্রিস্ট ধর্মের একান্ত বিশ্বাসী হয়ে আনুষ্ঠানিক খ্রিষ্টধর্মের প্রচলিত বিধিগুলি তাঁর পক্ষে একসময় অসম্ভব হয়ে ওঠে। তিনি তাঁর খ্রিস্টিয় সমাজের 'আরভিন আইট' সম্প্রদায়ের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেন। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দ হতে প্রথম তিন বৎসর মিশনারি কাজকর্মে যুক্ত থাকেন ও পরবর্তী চার বৎসর কেমব্রিজে অধ্যাপনা করেন।

মানবসেবায় ভারতেসম্পাদনা

১৯০৪ খ্রিস্টাব্দের ২০ শে মার্চ ভারতে এসে দিল্লির সেন্ট স্টিভেনসন কলেজে দীর্ঘ সময় দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপনার সাথে ধর্মীয় সুসমাচার প্রচারে লিপ্ত থাকেন। এই সময়ে ভারতে ইংরেজ শাসনের প্রত্যক্ষ পরিচয় পান তাতে সাংঘাতিক ভাবে মর্মাহত হন। খ্রিস্টভক্ত তিনি উপলব্ধি করলেন যে, খ্রিস্টান সমাজ, ইংরেজ শাসিত ভারতবর্ষে যে পথ ধরে চলছে সে পথ খ্রিস্টদের প্রদর্শিত পথ নয়। দেশের গরীব মানুষ নিষ্পেশিত হচ্ছে ইংরেজ শাসনে। মানবপ্রেমী তিনি সেই সময় হতেই ভারতবর্ষের জীবনের সাথে নিজের চিন্তা ও ভাবনার যোগস্থাপনের কাজে ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে থাকেন। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংল্যান্ডে যান। সেখানে রোটেনস্টাইনের গৃহেই রবীন্দ্রনাথের সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎটি ছিল তাঁর জীবনের এক ঐতিহাসিক ঘটনা। সব কিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে ভারতের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার সংকল্প গ্রহণ করলেন। ওই সময়ে তিনি কবিকে এক চিঠিতে লিখলেন -

" আমার প্রাণ চায় যথার্থ স্বাধীন ভারতের মূর্তিটি দেখব। অথচ দেশের বর্তমান অবস্থায় সেটি কি সম্ভব ? পরাধীনতার ও দুর্নীতির পাপচক্র কেবলই আবর্তিত হয়ে চলেছে শাসক ও শাসিতের মধ্যে।"

এন্ড্রুজ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের আন্দোলনে যোগ দিলেন এবং ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে মাদ্রাজের বর্তমানে চেন্নাইয়ের তুলো শ্রমিকদের ধর্মঘটের সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

দক্ষিণ আফ্রিকায় গান্ধীকে সহযোগিতার ভূমিকায়সম্পাদনা

পরে ওই ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে এন্ড্রুজ প্রথম শান্তি নিকেতনে আসেন। কিন্তু সেই সময় রবীন্দ্রনাথ বিদেশে। আর ওই বছরেরই সেপ্টেম্বর মাসে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী ভারতীয়দের উপর নিপীড়নমূলক ব্যবস্থাদির প্রতিবাদে গান্ধীজী সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে এন্ড্রুজের অসাধারণ বিদ্যা, বুদ্ধিমত্তা, নৈতিক সততার পরিচয়ে গোপালকৃষ্ণ গোখলে তাঁকে দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়ে ভারতীয় সম্প্রদায়ের সাথে সেখানকার সরকারের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গান্ধীজিকে সহায়তা করতে অনুরোধ করেন। এন্ড্রুজ গোখলের পরামর্শে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের পয়লা জানুয়ারি আফ্রিকার ডারবানে পৌঁছান এবং সত্যাগ্রহ সফল করার জন্য অসুস্থতার মাঝেও অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। তাঁরই চেষ্টায় জেনারেল ইয়ান ক্রিশ্চিয়ান স্মুট এর সাথে গান্ধীজির চুক্তি সম্পন্ন সম্ভব হয়েছিল। আর ঠিক সেই সময় তাঁর পরম ভালোবাসার মা মরণাপন্ন জেনেও গান্ধীজিকে একা ফেলে ইংল্যান্ডে যান নি। ভগ্ন শরীর ও মায়ের মৃত্যুতে ব্যথিত হৃদয় নিয়ে ভারতে ফিরে এসে শুনলেন এদেশের অনেকে তাঁকে 'বৃটিশের চর' বলতে কুন্ঠাবোধ করে নি। তা সত্বেও ভারতবর্ষের প্রতিটি আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর যোগ ছিল অসীম। দেশটিকে আর দেশবাসীকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছিলেন 'ভারতবন্ধু' এন্ড্রুজ। আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে তিনি ও মহাত্মা গান্ধী শান্তি নিকেতনে আসেন। সাক্ষাৎ হয় রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে। দুজনেই দ্বিজেন্দ্রনাথকে "বড়োদাদা" সম্বোধন করতেন। দ্বিজেন্দ্রনাথও এন্ড্রুজকে সহোদর ভ্রাতা হিসাবে গণ্য করতেন।

মানুষে মানুষে বর্ণবৈষম্য আর জাতি ও সম্প্রদায়গত ভেদানৈক্যের বিরুদ্ধে তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন - প্রবল প্রতাপ শক্তিমান শাসকের বিরুদ্ধে - দীনদরিদ্রের পক্ষ নিয়ে। নির্যাতিত ভারতবাসীকে সর্বপ্রকারে রক্ষা করা সান্ত্বনা দেওয়া তাঁর ধর্মের অঙ্গ ছিল। শুধু ভারতে নয় বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়ের সাহায্যে ছুটে গিয়েছেন। ফিজি প্রবাসী ভারতীয় শ্রমিকদের উন্নতিসাধনে কয়েকবার গিয়ে সহায়তা করেছেন এবং তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তারা উপকৃত হয়েছিলেন। আর তারাই ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে প্রথম এন্ড্রুজকে "দ্য ফ্রেন্ড অব দ্য পুওর" বা "দীনবন্ধু" আখ্যায় সম্মানিত করেন। ভারতে বৃটিশ শাসনের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় ছিল ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৩ ই এপ্রিলের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড। সেসময় তিনি শান্তিনিকেতনে ছিলেন। নিপীড়িত,দুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বৃটিশ সরকার তাঁকে যেতে দেয়নি। পরে সামরিক শাসন তুলে নেওয়ার পরই ছুটে গিয়েছেন সেখানে। মানব দরদি মানুষ ইংরেজের কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করতে সেবায় নিয়োজিত করেন আর ইংরেজের এই অপকর্মের জন্য সকল ভারতবাসীর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করেছিলেন। কবিগুরুর শান্তিনিকেতন ছিল তাঁর আপনগৃহ, মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবেসে ছিলেন শান্তিনিকেতনকে। অনেক সময়ই তিনি অতিবাহিত করেন এখানে। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠাকালে এন্ড্রুজ হয়েছিলেন প্রথম উপাচার্য। বিশ্বভারতীতে হিন্দি ভবনটি তাঁর সাহায্যেই খোলা হয়।

প্রভু যিশু খ্রিস্ট ও ভারতের প্রতি তাঁর গভীর অনুযোগ ছিল জীবনচর্চায় আর তাঁর লেখায়। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হল-

  • 'মহাত্মা গান্ধীজ আইডিয়াজ'
  • 'মহাত্মা গান্ধী অ্যাট ওয়ার্ক'
  • 'হোয়াই আই ও (owe) টু ক্রাইস্ট'
  • 'ইন্ডিয়া অ্যান্ড ব্রিটেন'
  • 'ইন্ডিয়া অ্যান্ড দি প্যাসিফিক'
  • 'ট্রু ইন্ডিয়া'

জীবনাবসানসম্পাদনা

দীনবন্ধু চার্লস ফ্রিরার এন্ড্রুজের দেহাবসান ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ৫ ই এপ্রিল কলকাতার তৎকালীন প্রেসিডেন্সি জেনারেল হাসপাতাল বর্তমানের (এসএসকেএম হাসপাতালে) ঘটে।

স্মৃতিরক্ষার্থেসম্পাদনা

মহান মানবদরদী চার্লস ফ্রিয়ার এন্ড্রুজের স্মৃতি রক্ষার্থে কলকাতার গড়িয়াতে ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে দীনবন্ধু এন্ড্রুজ কলেজ স্থাপিত হয়। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্মশতবর্ষে ভারত সরকার স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, আগস্ট ২০১৬ পৃষ্ঠা ১০৫, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৯৫৫-১৩৫-৬