দায়ভাগ হল জীমূতবাহন রচিত হিন্দুদের একটি আইনগ্রন্থ যা মূলত উত্তরাধিকার পদ্ধতিতে কেন্দ্রীভূত।[১] দায়ভাগ ছিল আধুনিক ব্রিটিশ ভারতীয় আদালতের ভারতীয় বঙ্গ অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ, যদিও ১৯৫৬ সালের হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের গমন এবং আইনে সংশোধন করার কারণে এটি পরিবর্তিত হয়েছে।[২] মিতাক্ষরা সম্পর্কে জীমূতবাহনের সমালোচনার ভিত্তিতে ধারণা করা হয় যে মিতাক্ষরা তাঁর কাজকে অবরুদ্ধ করেছিলেন| এটি অনেক পণ্ডিতকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিয়েছে যে মিতাক্ষরা হিন্দু আইনের গোঁড়া মতবাদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন যখন দায়ভাগ সংস্কারকৃত সংস্করণ উপস্থাপন করছিলেন।[৩]

পাঠ্যগুলির মধ্যে কেন্দ্রীয় পার্থক্যটি দেখা যায় যখন কেউ সম্পত্তির মালিক হয় তার উপর ভিত্তি করে। দায়ভাগ পিতার মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত পিতার পৈতৃক সম্পত্তিতে ছেলেকে কোনো অধিকার দেয়না। মিতাক্ষরা মতে, জন্মমাত্রই পুত্র পূর্বপুরুষের সম্পদে পিতার সমান অংশীদার হয়। সারসংক্ষেপটি এক ডজনেরও বেশি বার মন্তব্য করা হয়েছে|[৪]

অনুবাদসম্পাদনা

হেনরি টমাস কোলব্রোকসম্পাদনা

হেনরি টমাস কোলব্রোক ১৮১০ সালে পাণ্ডুলিপি এবং পন্ডিতদের ব্যবহার করে দায়ভাগ অনুবাদ করেছিলেন। কলিকাতা সুপ্রীম কোর্টের বিচারক কোলব্রোক, এই পাঠ্যটিকে অধ্যায় এবং শ্লোকে বিভক্ত করেছিলেন যা মূল লেখায় ছিল না এবং অনুবাদে অসংখ্য ত্রূটির জন্য প্রায়শই সমালোচিত হন।[৫] রোচার বিশ্বাস করেন যে ভুলগুলি তিনটি কারণের জন্য ছিল:[৬]

  • সংস্কৃত গ্রন্থ গুলোর বিন্যাস
  • গ্রন্থগুলি একটি প্রাচীন সভ্যতার সাথে গভীরভাবে জড়িত ছিল, যার সাথে অনুবাদকরা পরিচিত ছিলেন না
  • ভ্রান্ত ধারণা যে লেখাটি আইনজীবীরা লিখেছিলেন আইনজীবীদের জন্য

কোলব্রোক ভারতে দুটি চিন্তাবিদ্যার বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, ভারতবর্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিচ্ছিন্ন করার জন্য মিতাক্ষরা এবং বঙ্গ অঞ্চলকে অনুসরণ করার চিন্তা করেছিল যা দায়ভাগ ব্যবস্থাকে অনুসরণ করে।

বিষয়গুলো সংক্ষেপে তুলে ধরাসম্পাদনা

  • পিতা ও ঠাকুরদাদার সম্পত্তির বিভাজন
  • পিতার মৃত্যুর পর ভাইদের মধ্যে উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া
  • প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে উত্তরাধিকার থেকে যারা বাদ পড়েছে
  • যে পুত্র ছাড়া মারা যায় তার উত্তরাধিকারের আদেশ

দায়ভাগে উল্লিখিত ঋষিগণসম্পাদনা

দায়ভাগ ও মিতাক্ষরা মধ্যে কেন্দ্রীয় পার্থক্যসম্পাদনা

ছেলের উত্তরাধিকারসম্পাদনা

  • পিতার মৃত্যুর আগে পর্যন্ত পৈতৃক সম্পত্তিতে ছেলের কোনও অধিকার নেই, নইলে বাবার মালিকানা অন্য উপায়ে হারিয়ে যাবে যেমন, বর্ণ থেকে বাদ পড়া বা তপস্বী হয়ে যাওয়া। এটি মিতাক্ষরের সাথে সরাসরি বিপরীত, যা জন্মমাত্রই পুত্র পূর্বপুরুষের সম্পদে পিতার সমান অংশীদার হয়।

বিধবার অধিকারসম্পাদনা

  • স্বামীর মৃত্যুর পরে বিধবা তার স্বামীর সম্পত্তির অধিকার অর্জন করে,[৭] তাদের নিজের অধিকারে নয়, তবে অনেক ক্ষেত্রে তাকে প্রতিনিধিত্ব করতে হয়, যখন স্বামী তার ভাইয়ের সাথে যৌথভাবে সম্পত্তি রাখে।[৮]

পৈতৃক সম্পত্তিসম্পাদনা

  • দায়ভাগ বলেছেন যে পিতা হল সকল সম্পত্তির একমাত্র শাসক, পৈত্রিক এবং ব্যক্তিগত উভয়েরই। মিত্রাক্ষরের মতে, পৈত্রিক সম্পত্তি সাম্প্রদায়িক হিসেবে দেখা যায় না, তাই পৈতৃক সম্পত্তিতে কাজ করার জন্য পিতাকে ছেলের সম্মতির প্রয়োজন হয় না। দায়ভাগ এবং মিতাক্ষরা পরিবারের মধ্যে অপরিহার্য পার্থক্য হল যে দায়ভাগ পৈতৃক এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির উপর পিতার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে কোনও পার্থক্য দেখেনি।[৮]

ব্যক্তিগত সম্পত্তিসম্পাদনা

  • মিতাক্ষরা ও দায়ভাগ উভয় ক্ষেত্রেই পিতার অধিকার রয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিয়ে যেমন ইচ্ছা তেমন করার।

উত্তরাধিকারসম্পাদনা

পারম্পর্যসম্পাদনা

  • পিতার মৃত্যুর পর ছেলেরা পৈতৃক সম্পত্তির অংশের উত্তরাধিকারী হয়। এটি বাবার জীবনকালে করা যেতে পারে তবে শুধুমাত্র যদি তিনি করতে চান। মিতাক্ষরা আর মতে সম্পত্তিটি সাম্প্রদায়িক ভাবে পরিবারের মালিকানাধীন নয়। পিতার মৃত্যুর পরে প্রত্যেক ছেলে তার সম্পত্তির অংশের সাথে যা খুশি করার ক্ষমতা রয়েছে।[৯]

একমাত্র সন্তানসম্পাদনা

দায়ভাগ অনুসারে একমাত্র সন্তানের ক্ষেত্রে পিতার মৃত্যু হওয়ার পর সমস্ত পৈতৃক সম্পত্তিতে একমাত্র সন্তানের অধিকার হবে, যদি পিতার মৃত্যু হওয়ার আগেই মাতার মৃত্যু হয়ে থাকে।

মা জীবিতসম্পাদনা

বাবার মৃত্যুর সময় যদি মা জীবিত থাকলে, একমাত্র সন্তান হওয়া সত্ত্বেও সন্তান সম্পূর্ণ সম্পত্তির অধিকারী হয় না। এক্ষেত্রে অর্ধেক সম্পত্তি সন্তানের এবং বাকি অর্ধেক মাতার অধিকারে যায়।[১০]

ধর্মরত্নসম্পাদনা

  • জীমূতবাহনের বিবেচনা করা তিনটি পুনরুদ্ধারকৃত অংশগুলির মধ্যে একটি হল দায়ভাগ, ধর্মরত্ন। কেবলমাত্র দায়ভাগ সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়েছে|

অন্যান্য জীবিত অংশগুলির মধ্যে রয়েছে:

ব্যবহার-মাত্রাসম্পাদনা

ব্যবহার বা বিচারিক পদ্ধতিতে নজর দেওয়া। আইনশাস্ত্রের চারটি ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল তুলে ধরা হল:

  • আরজি
  • উত্তর
  • প্রমাণ
  • রায়

কলা-বিবেকসম্পাদনা

ধর্মীয় দায়িত্ব ও ত্যাগের অবদানের জন্য উপযুক্ত সময়ে নজর দেওয়া।

ভাষ্যসম্পাদনা

দায়ভাগে এক ডজনেরও বেশি ভাষ্য রচিত হয়েছে। পাণ্ডুরঙ্গ বমন কানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভাষ্যকারদের তালিকাবদ্ধ করেছেন যেমন:[১১]

শ্রীনাথ আচার্য চূড়ামণিসম্পাদনা

রামভদ্র ন্যায়লঙ্কারাসম্পাদনা

  • দায়ভাগ-বিবৃতি
  • (১৫১০-১৫৭০)
  • শ্রীনাথ আচার্য চূড়ামণির পুত্র,প্রায়শই তাঁর ভাষ্যগুলিতে চক্রবর্তির সমালোচনার বিরুদ্ধে তাঁর পিতাকে রক্ষা করেছিলেন।

অচুত্যনন্দন চক্রবর্তীসম্পাদনা

  • দায়ভাগ-সিদ্ধান্তকুমুদচন্দ্রিকা
  • (১৫১০-১৫৭০)
  • প্রায়শই বিস্তৃত উদ্ধৃতি ব্যবহারের মাধ্যমে আচার্য চূড়ামণির মন্তব্যের সমালোচনা করেন।

মহেশ্বর ভট্টাচার্যসম্পাদনা

  • দায়ভাগ-টীকা
  • (১৫৩০-১৬০০)

শ্রীকৃষ্ণসম্পাদনা

  • দায়ভাগ-প্রবিধিনি
  • (18 শতকের মাঝামাঝি)
  • সমস্ত দায়ভাগ ভাষ্যকারদের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় হিসাবে বিবেচিত, দায়ভাগের বেশিরভাগ সংস্করণে তাঁর ভাষ্য রয়েছে।

রঘুনন্দন ভট্টাচার্য্যসম্পাদনা

রঘুনন্দন ভট্টাচার্য্য(১৬তম শতাব্দী) ছিলেন দায়-তত্ব এর লেখক| দায়ভাগ ব্যাখ্যায় একজন ভাষ্য হিসেবেও তাকে দায়ী করা হয়।

এই ভাষ্যটি আসলে রঘুনন্দন লিখেছিলেন কিনা তবে অন্য কোনও পণ্ডিত বিতর্কের বিষয় বস্তুতে তাঁর নাম ব্যবহার করছেন। হেনরি টমাস কোলেব্রোক(১৮১০) এবং জুলিয়াস এগজলিং (১৮৯১) সন্দেহ করেছিলেন যে এটি তাঁর দ্বারা রচিত হয়নি| অন্যদিকে, মনমোহন চক্রবর্তী (১৯১৫), রাজেন্দ্র চন্দ্রা হাজরা (১৯৫০) এন্ড পাণ্ডুরং বামন কানে (১৯৭২) স্বীকার করেছেন কাজটি রঘুনন্দনের।[১২]

দিনাঙ্কনসম্পাদনা

হিন্দু আইন ক্ষেত্রে লেখার সময়টি একটি বিতর্কের বিষয়। পূর্ববর্তী অনেক লেখক হারিয়ে গেছেন যাদের জীমূতবাহন উল্লেখ করেছিলেন। রাজকুমার সর্বধিকারীর মতো পণ্ডিতগণ অনুমান করেন তাঁর রচনাটি পঞ্চদশ শতাব্দীতে ঘটেছে, একই সঙ্গে ড: পাণ্ডুরাম বামন কানে বিশ্বাস করেন তিনি ১০৯০ থেকে ১১৩০ এর মধ্যে লিখেছেন।[১৩] দায়ভাগে উল্লিখিত নাম এবং ভাষ্য প্রমাণ করে যে জীমূতবাহন ১১২৫ খ্রিস্টাব্দের আগে স্থাপন করা যাবে না।[১৪] পরবর্তী তারিখ গুলিতে পণ্ডিতদের মধ্যে বিশাল তফাৎ দেখা যায়।

অবস্থানসম্পাদনা

সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কিত নিয়মগুলি অনুসরণ করা হয় পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, পূর্বাঞ্চল, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং আসামে

হিন্দু উত্তরাধিকার আইনসম্পাদনা

  • হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের(১৯৫৬সালের আইন নং ৩০) ফলস্বরূপ মিতাক্ষরা এবং দায়ভাগ উভয় ব্যবস্থায় উত্তরসূচি ও বিভাজন সম্পর্কিত অনেক পরিবর্তন আনা হয়েছিল।

বাংলাদেশে হিন্দু উত্তরাধিকার আইনসম্পাদনা

বাংলাদেশের হিন্দুরাও দায়ভাগ অনুসরণ করেই উত্তরাধিকার পরিচালিত করে থাকে।[১]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. ভৌমিক, দুলাল। "দায়ভাগ"Banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ১৯ এপ্রিল ২০২০ 
  2. Kane, P. V., History of Dharmaśāstra, (Poona: Bhandarkar Oriental Research Institute, 1975), Volume I, Part II, 703.
  3. Rocher,Jimutavahana's Dāyabhāga: The Hindu Law of Inheritance in Bengal, (Oxford University Press, 2002), 23.
  4. Kane, P. V., History of Dharmaśāstra, (Poona: Bhandarkar Oriental Research Institute, 1975), Volume I, Part II, 704.
  5. Rocher,Jimutavahana's Dāyabhāga: The Hindu Law of Inheritance in Bengal, (Oxford University Press, 2002), 33.
  6. Rocher,Jimutavahana's Dāyabhāga: The Hindu Law of Inheritance in Bengal, (Oxford University Press, 2002), 35.
  7. পারভীন, ফারহানা। "BBC Bangla - খবর - হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে সংশোধনীর প্রস্তাব"www.bbc.com। BBC। সংগ্রহের তারিখ ১৯ এপ্রিল ২০২০ 
  8. Robert Lingat, The Classical Law of India, (New York: Oxford UP, 1973), 172.
  9. Robert Lingat, The Classical Law of India, (New York: Oxford UP, 1973), 173.
  10. চট্টোপাধ্যায়, জয়ন্ত নারায়ণ। "দায়ভাগ - Anandabazar"anandabazar.com। সংগ্রহের তারিখ ২০ এপ্রিল ২০২০ 
  11. Kāne, P. V., History of Dharmaśāstra, (Poona: Bhandarkar Oriental Research Institute, 1975), Volume I, Part II, 711.
  12. Ludo Rocher (২০০২)। Jimutavahana's Dayabhaga : The Hindu Law of Inheritance in Bengal: The Hindu Law of Inheritance in Bengal। Oxford University Press। পৃষ্ঠা 16। আইএসবিএন 978-0-19-803160-4 
  13. M. Chakravarti, Part I. Bengal, (J.A.S.B., 1915) 321-327
  14. Kane, P. V., History of Dharmaśāstra, (Poona: Bhandarkar Oriental Research Institute, 1975), Volume I, Part II, 712.

আরও পড়ুনসম্পাদনা

  • Chakravarti, M. (১৯১৫)। Part 1. Bengal। J.A.S.B. Publ। 
  • Lingat, Robert (১৯৭৩)। The Classical law of India। New York: Oxford UP Publ।