মানুষ সহ বিভিন্ন প্রাণী ও কিছু মাছের ক্ষেত্রে দাঁতের এনামেল হল দাঁত গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রধান চারটি কলার একটি। দাঁতের যে অংশ আমরা বাইরে থেকে দেখতে পাই সেটিই এনামেল। এটা মূলত দাঁতের অন্য তিনটি কলা ডেন্টিন, ক্যমেন্টাম এবং ডেন্টাল পাল্পের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। এটি খুব শক্ত, সাদা, এবং খনিজ সমৃদ্ধ কলা। তবে বিভিন্ন খাদ্য ও পানীয়ের এসিডের কারনে এটি ক্ষয়ে যেতে পারে। ক্যালসিয়াম দাঁতের এনামেল শক্ত করে তোলে। কিছু বিরল ক্ষেত্রে দাঁতের এনামেল গঠিত হয় না, ফলে ভেতরের ডেন্টিন বাইরে বের হয়ে থাকে।

এটি দাঁতের ক্রাউন অর্থাৎ মাড়ি থেকে বহির্গত দাঁতের দৃশ্যমান অংশের বাইরের আচ্ছাদন।

উৎপাটিত মোলার দন্তে এনামেলের অবস্থান

অ্যামেলোব্লাস্ট কোষদের ক্ষরণ, যার মধ্যে এনামেলিন, অ্যামেলোজেনিন ইত্যাদি প্রোটিন থাকে, তা পরে খনিজ লবণ (প্রধানত হাইড্রক্সিঅ্যাপাটাইট) দ্বারা অশ্মীভূত হয়ে দন্ত এনামেল গঠন করে। দন্ত এনামেলের ৯৬%ই কেলাসীভূত খনিজ, তাই এত শক্ত।

বৈশিষ্ঠ্যসম্পাদনা

এটিই মানব শরীরের কঠিনতম কলা। শতকরা হিসেবে সবচেয়ে বেশি খনিজ পদার্থ এনামেলে থাকে (৯৬%)। বাকি ৪% গঠিত হয় বিভিন্ন জৈব উপাদান ও পানি দ্বারা। প্রধান খনিজ হল হাইড্রোক্সিএপাটাইট যেটি মূলত কেলাসীভূত ক্যালসিয়াম ফসফেট। দাঁত বাইরে আসার আগে মাড়ির ভেতরে অবস্থান কালেই এনা মেল গঠিত হয়ে যায়। পরিনত অবস্থায় এনামেলে রক্তনালী বা স্নায়ুতন্ত্র থাকে না। এটা আসলে কোন কোষ দিয়ে গঠিত নয়। এনামেলের সামান্য ক্ষতি হলে পুনঃখনিজায়নের মাধ্যমে শরীর এটা একা একাই ঠিক করে নিতে পারে। কিন্তু, ক্ষতির পরিমান মাত্রাতিরিক্ত হলে সেটা সম্ভব হয় না।

মানুষের ক্ষেত্রে এনামেলের পুরুত্বে ভিন্নতা দেখা যায়। দাতের শিখরে বা সূচাল অংশে এর পুরুত্ব ২.৫ ন্যানমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। পাশের অংশে সেমেন্টোএনামেল জংশনে এর পুরুত্ব সবচেয়ে কম থাকে।

এনামেলের রঙ হালকা হলুদ থেকে সামান্য ধুসর সাদা বা নীলাভ সাদা হতে পারে। দাঁতের ধারে যেখানে এনামেলের নিচে ডেন্টিন নেই সেখানে এনামেলের রঙ সামান্য নীলাভ বা ধূসর সাদা হতে পারে। এনামেল ষদচ্ছ (যার ভেতর দিয়ে আলো সামান্য পরিমান প্রবেশ করতে পারে) বলে ডেন্টিনের রঙ সুস্পষ্ট ভাবে দাতের রঙের উপর প্রভাব ফেলে। কৃন্তনদন্তে এটা স্পষ্ট ভাবে বোঝা যায়। প্রাথমিক ভাবে যে দাঁত ওঠে তার এনামেল তুলনামূলক বেশি স্বচ্ছ স্ফটিকাকার বলে স্থায়ী দাঁতের তুলনায় বেশি সাদা হয়ে থাকে।

অতিরিক্ত খনিজের উপস্থিতির জন্য এনামেল খুব শক্ত এবং একই সাথে ভংগুর। মোস কাঠিন্য স্কেলে এর অবস্থান ৫ম, স্টিল এবং টাইটানিয়ামের মাঝে। এর ইয়াং গুনাংক ৮৩ গিগাপ্যাস্কেল।

হাড় বা ডেন্টিনের মত অন্যান্য কঠিন কলাসমূহে কোলাজেন থাকলেও, এনামেলে কোলাজেন থাকে না। এতে বিশেষ ধরনের প্রোটিন এমিলোজেনিন এবং এনামেলিন থাকে। যদিও এই প্রোটিনগুলোর কাজ কী তা সঠিক ভাবে জানা যায় না, তবে ধারণা করা হয় এগুলো অন্যান্য খনিজ গঠন করে এনামেল গঠন ও এর ক্ষয় পুরন করতে সহায়তা করে।

গঠনসম্পাদনা

এনামেলের মূল অংশকে বলা হয় এনামেল দণ্ড বা এনামেল রড। এর ব্যাস ৪-৮ মাইক্রোমিটার। এটাকে এনামেল প্রিজমও বলা হয়। এটা মূলত হাইড্রোক্সিএপাটাইট স্ফটিকের সুনির্দিষ্ট প্যাটার্নের সমাবেশ।

এনামেলে স্ফটিক গুলো অত্যন্ত জটিল ভাবে সজ্জিত থাকে। এটা হয়ে থাকে এমেলোব্লাস্ট (যে কোষগুলো এনামেল তৈরী শুরু করে) এবং টোমস প্রসেসের কারনে। এনামেল রডের উপরের দিকে স্ফটিক গুলো লম্বা অক্ষটির সাথে সমান্তরালে থাকে এবং এনামেল রডের নিচের দিকে এটি সামান্য পরিবর্তিত হয়ে লম্বা অক্ষটির সাথে ৬৫ ডিগ্রি কোন করে অবস্থান করে।

দন্তের আভ্যন্তরীন গঠনের তুলনায় এনামেল রড বা এনামেল দণ্ডের বিন্যাস সরল। এনামেল রডগুলো দন্তসারি বরাবর সারিবদ্ধ ভাবে থাকে এবং এদের লম্বা অক্ষগুলি ডেন্টিনের সাথে উলম্ব ভাবে থাকে। স্থায়ী দন্তে এনামেল রডের যে অংশটি সেমেন্টোএনামেল জংশনের নিকটে থাকে সেটি ভেতরের দিকে সামান্য বাকানো থাকে। দন্তের রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ক গবেষণায় এনামেলের বিন্যাস খুব গুরুত্ববহ।

এনামেল রডের চারপাশে রডগুলোর ফাকে ফাকে যে এনামেল থাকে সেগুলো ইন্টাররড এনামেল বা দণ্ড-অন্তর্বর্তী এনামেল বলা হয়। এনামেল রড এবং ইন্টাররড এনামেলের গঠন উপাদান একই হলেও এদের স্ফটিক গুলোর ভীন্নতরভাবে সজ্জিত হওয়ার কারনে এদের মধ্যে কলাস্থানিক পার্থক্য রয়েছে বলে ধরা হয়। এই দুটি যেস্থানে মিলিত হয় রতাকে বলা হয় দণ্ডাধার (Rod Sheath).

দাঁতের সুস্থতাসম্পাদনা

দাঁতের এনামেল বা দাঁতের উপরে অবস্থানরত মসৃণ ও কঠিন আচ্ছাদনকে ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে খনিজ সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা উচিত। একই সঙ্গে দৈনিক চিনিজাতীয় খাদ্যগ্রহণও কম করা উচিত। যথাযথ খাদ্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দাঁতের সুস্থতা নিশ্চিত করা যায় ও দাঁতকে সুরক্ষা করার প্রধান উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

টুথব্রাশের ব্যবহারসম্পাদনা

বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই দাঁত ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট দাঁতের এনামেল পরিচর্যা ও পরিষ্কারের জন্য টুথব্রাশের প্রচলন রয়েছে। এর মাধ্যমে দাঁতে অবস্থানরত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে ও খাদ্যকণাকে দূরীভূত করে। কিন্তু শক্ত ক্ষুদ্র বা কুঁচি প্রকৃতির তন্তু দিয়ে তৈরী টুথব্রাশের ঘর্ষণে দন্ত এনামেল নষ্ট হয়ে যায় এবং দাঁতের মাড়িকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে ব্যবহারকারী যন্ত্রণাদায়ক, অসস্তিকর কিংবা বিরক্তিকর অনুভূতিতে আক্রান্ত হতে পারে।[১] অন্যদিকে পিছিয়ে পড়া ও কুসংস্কারে আবদ্ধ সমাজ ব্যবস্থায় এখনও টুথব্রাশের প্রচলন নেই। তবে এর বিপরীতে তাদেরকে বিকল্প জিনিসপত্রাদি যেমনঃ কাঠি ইত্যাদি দিয়ে দাঁত পরিষ্কার রাখা বাধ্যতামূলক।

আরও দেখুনসম্পাদনা

বহিঃসংযোগসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা