খাঁচায় মাছ চাষ

খাঁচায় মাছ চাষ নদী বা জলাশয়ে আধুনিক মাছ চাষের একটি পদ্ধতি। ২০০২ সাল থাইল্যান্ডের অনুকরণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক প্রথম বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলার ডাকাতিয়া নদীতে এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ শুরু হয়। তাই বাংলাদেশে এ ধরনের মাচ চাষ ডাকাতিয়া মডেল নামেও পরিচিত।[১] প্রযুক্তির সুবিধাজনক ব্যবহারের ফলে বাণিজ্যিকভাবে খাঁচায় মাছ চাষ নদী নির্ভর ও সমুদ্র উপকূলীয় প্রায় সবদেশেই জনপ্রিয়। এ পদ্ধতিতে খাঁচাকে পুকুরের মতো ব্যবহার করা যায় এবং বিভিন্ন জলাশয়ে অতিরিক্ত মাছ উৎপাদনের কৌশল হিসেবে এটি বেশ কার্যকর।[২][৩]

ডাকাতীয়া নদীতে খাঁচায় মাছ চাষ

ইতিহাসসম্পাদনা

চীন দেশে এই প্রযুক্তি বেশ জনপ্রিয়। -চীনেই প্রথম ছোট খাঁচায় বেশি ঘনত্বে মাছ চাষ শুরু হয়েছিল। সে দেশে সম্পূরক খাবার দিয়ে খাঁচায় তেলাপিয়া এবং কমন কার্প চাষ খুব জনপ্রিয়। পৃথিবীর মৎস্য চাষের ইতিহাসে চীনের ইয়াংঝি নদীতে ১৩শ শতাব্তিতে প্রথম খাঁচায় মাছ চাষ শুরু হয়। [১]

তাইওয়ানসম্পাদনা

তাইওয়ানেও ৫০ থেকে ১০০ গ্রাম ওজনের তেলাপিয়া খাঁচায় চাষ করে ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রামের তেলাপিয়ায় পরিণত করা হয় এবং বিভিন্ন দেশে রফতানি করে। তাইওয়ান ২০০৬ সালেই ২০ হাজার মেট্রিক টন ফ্রোজেন তেলাপিয়া এবং ৩ হাজার ১শ’ মেট্রিক টন তেলাপিয়ার ফিলেট রফতানি করে।[১]

ইন্দোনেশিয়াসম্পাদনা

ইন্দোনেশিয়ার জাভা অঞ্চলে খাঁচায় মাছ চাষের প্রচলন বেশি। জাভা অঞ্চলের ‘সিরাতা’ থেকে প্রায় ৩০,০০০ খাঁচায় মাছ চাষ করা হয়।

 
নরওয়ে খাঁচায় মাছ চাষ (২০১৪)

থাইল্যান্ডসম্পাদনা

থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে অতি সাধারণ জাল দিয়ে তৈরি খাঁচায় বছরজুড়ে কোরাল বা ভেটকি মাছ চাষ করা হয়। এ অঞ্চলের মাছ চাষীরা সমুদ্রে ছোট মাছ ধরে খাঁচায় পালিত মাছের জন্য খাবার হিসেবে ব্যবহার করে। ভিয়েতনামে স্রোতহীন নদীতে খাঁচায় জলজ আগাছা খাদ্য হিসেবে দিয়ে গ্রাসকাপ এবং তেলাপিয়া মাছ চাষ করা হচ্ছে।[১]

বাংলাদেশসম্পাদনা

২০০২ সাল থেকে মাত্র ছয় বছরের মধ্যে চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদী এবং লক্ষ্মীপুর জেলার মেঘনা নদীর রহমতখালি চ্যানেলে প্রায় এক হাজার মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ শুরু হয়। এ থেকে বছরে ৭০০ মেট্রিক টন রফতানিযোগ্য তেলাপিয়া উৎপাদিত হচ্ছে। চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদীতে খাঁচায় মাছ চাষ করে বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে, আর তাই এখানকার ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন মডেলকে খাঁচায় মাছ চাষের ‘ডাকাতিয়া মডেল’ বলা হয়। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক এনজিও ‘হেলডেটাম সুইস ইন্টারকো অপারেশন’ দারিদ্র্যমুক্তির লক্ষ্যে এপ্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। দুই বছরের মধ্যে এদের সাফল্য দেখে অন্য এনজিওগুলো খাঁচায় মাছ চাষে এগিয়ে আসে। জানুয়ারি ২০১০ সালে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নে সুরমা নদীতে ১৮টি খাঁচা তৈরি করে তাতে মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ শুরু হয়। এরপর দিরাই ও শাল্লা উপজেলায় ৭০টি খাঁচা স্থাপন করা হয়। দশটি দলে ভাগ করে ১৪৮টি পরিবারের লোকজনকে খাঁচায় মাছ চাষের সুযোগ করে দেয়া হয়।[১][৪]

সুবিধাসম্পাদনা

ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ করলে পুকুর কিংবা দিঘীর মতো বড় জলাশয়ের প্রয়োজন হয় না। প্রবাহমান নদীর পানিকে ব্যবহার করেও এ পদ্ধতিতে মাছ উৎপাদন করা সম্ভব। মাছের বর্জ্য প্রবাহমান পানির সঙ্গে অপসারিত হয় তাই পানি কিংবা পরিবেশের দূষণ হয় না। মাছের উচ্ছিষ্ট খাদ্য খেয়ে নদীর প্রাকৃতিক মাছ তাদের খাদ্য সরবরাহ করতে পারে। নদীর পানি প্রবাহমান থাকায় প্রতিনিয়ত খাঁচার অভ্যন্তরের পানি পরিবর্তন হতে থাকে ফলে পুকুরের চেয়ে অধিক ঘনত্বে মাছ চাষ করা যায় এবং চাষকৃত মাছ অনেক রোগের আক্রমণ থেকে প্রাকৃতিকভাবে বেঁচে থাকতে পারে। পুকুরে চাষকৃত মাছের চেয়ে খাঁচায় চাষকৃত মাছ তুলনামূলক সুস্বাদু।[৫][৬]

পদ্ধতিসম্পাদনা

এদ্ধতিতে মাছ চাষের জন্য প্রথমেই খাঁচা তৈরি করতে হয়। লোহার পাইপ কিংবা দণ্ড দিয়ে তৈরি প্রতিটি খাঁচার দৈর্ঘ্য ২০ ফুট, প্রস্থ ১০ ফুট ও উচ্চতা ৬ ফুট হতে হয়। [৭] ভাসমান অবস্থায় খাঁচায় দুই পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা যায়। প্রথমে পদ্ধতিতে খাঁচা স্থাপনের জন্যে খাঁচার মাপের লোহার পাইপ বা দন্ড অথবা বাঁশের তরী হাতলের জাল বেঁধে পানিতে ভাসাতে হয়। তারপর খাঁচার চার কানায় পাথর বা ভারি কিছু যা পানিতে ডুবে যায় এমন বস্তু যুক্ত করতে হয়। যাতে জালের নিচের অংশ টান টানভাবে পানিতে সমানভাবে সারা বছর কমপে ৩-৪ মিটার গভীর পানি থাকে এমন স্থানে খাঁচা তৈরি করতে হয়। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে সারিবদ্ধভাবে চারদিকে বাঁশের বনী তরী করে সেখানে জালযুক্ত করে জলাশয়ের পাড় থেকে কিছুটা নিরাপদ্ধ দুরুত্বে রাখতে হবে। যেখানে সারাবছর কমপক্ষে ৩-৪ মিটার গভীর পানি থাকে। আর সেখানে শক্ত খুঁটি দিয়ে খাঁচাগুলো বাঁধতে হবে। তবে খাঁচার মধ্যে লোহা ব্যবহার করলে তা ভাসমান রাখতে প্লাস্টিকের গোলাকার বট ব্যবহার করা যেতে পারে অথবা শক্ত ড্রাম ব্যবহার করা যেতে পারে। [৫][৮]

পোনা মজুদ ও উৎপাদনসম্পাদনা

খাঁচায় সাধারণত মনোসেক্স তেলাপিয়া উৎপাদন বেশি হয়। প্রথমে প্রস্তুতকৃত খাঁচায় পোনা মাছ মজুদ করতে হবে। পোনাগুলো কমপক্ষে ২০-২৫ গ্রামের হবে এবং জালে ফাঁস ছোটাকৃতির হতে হবে। তবে খাঁচায় ফেলার পূর্বে আলাদা খাাঁচায় কমপক্ষে ১ মাস রেখে যত্ন নেয়ার পরামর্শ দেন গবেষকরা। পোন মাছকে তাদের উপযোগী খাবার ৪-৫ ঘণ্টার পরপর দিতে হয়। [৮]

খাদ্য প্রয়োগসম্পাদনা

খাঁচায় তলািপয়া চাষের ক্ষেত্রে সম্পূরক খাদ্যে শতকরা ২৮ থেকে ৩০ ভাগ প্রোটিন থাকতে হয়। কারখানায় উৎপাদিত বা চাষী নিয়ম মেনে নিজেই এ খাদ্য তৈরি করে ব্যবহার করতে পারে। তবে সব ধরনের খাবার অবশ্যই ভাসমান হতে হয়। কারণ ডুবন্ত খাবার জালের নিচ দিয়ে জলাশয়ে পড়ে যায়। এতে জালের নিচের অংশে খাবার পঁচে রোগ তৈরি হতে পারে। তাই গবেষকরা এক্ষেত্রে ভাসমান জাতীয় খাবার দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এক্ষেত্রে চাহিদা বুঝে দৈনিক দুই থেকে তিন বার খাবার প্রয়োগ করলে উৎপাদনে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। [৮]

মাছ আহরণসম্পাদনা

সাধারণ জলায়শ বা পুকুরের মতো খাাঁচায় চাষকৃত মাছ সংগ্রহ করার প্রয়োজন হয় না। তবে এক্ষেত্রে হাত জাল দিয়ে খুব সহজেই মাছ ধরা যায়। এছাড়া অন্যান্য মাছ ধরার সহজ ফাঁদও ব্যবহার করা যায়। এতে করে চাষীকে মাছ সংগ্রহের জন্যে আলাদা খরচের প্রয়োজন পড়ে না। যা বাণিজ্যিক হিসেবে লাভজনক। [৮]

আরো দেখুনসম্পাদনা

বহিঃসংযোগসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "খাঁচায় মাছ চাষ"গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস)। সংগ্রহের তারিখ ৮ জুন ২০১৯ 
  2. "বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট"http (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৭-২৫ 
  3. "খাঁচায় মাছ চাষ, সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত"jagonews24.com (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৭-২৫ 
  4. "নদীতে খাঁচায় মাছ চাষে দিন বদলের স্বপ্ন"NTV Online। ২০১৯-০৭-২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৭-২৫ 
  5. "খাঁচায় মাছ চাষ, সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত"জাগো নিউজ। ১৫ আগস্ট ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ৮ জুন ২০১৯ 
  6. "নদীতে খাঁচায় মাছ চাষ | কালের কণ্ঠ"Kalerkantho। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৭-২৫ 
  7. "নদীতে খাঁচা করে মাছ চাষ"প্রথম আলো। ১৩ জানুয়ারি ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ৮ জুন ২০১৯ 
  8. "ভাসমান খাঁচায় মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ প্রযুক্তি"বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। সংগ্রহের তারিখ ৮ জুন ২০১৯