কুতুব মিনার

সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবক নির্মিত কুতুব মিনার ও আলোয়াই দ্বার। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মিনার।

স্থানাঙ্ক: ২৮°৩১′২৮″ উত্তর ৭৭°১১′০৭″ পূর্ব / ২৮.৫২৪৩৫৫° উত্তর ৭৭.১৮৫২৪৮° পূর্ব / 28.524355; 77.185248

কুতুব মিনার (উর্দু: قطب منار ক্বুতুব্‌ মিনার্‌ বা ক্বুতাব্‌ মিনার্‌) ভারতের দিল্লিতে অবস্থিত একটি স্তম্ভ বা মিনার, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ ইটনির্মিত মিনার।[১] এটি কুতুব কমপ্লেক্সের মধ্যে অবস্থিত। [২] ভারতের প্রথম মুসলমান শাসক কুতুবুদ্দিন আইবেকের আদেশে কুতুব মিনারের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দে, তবে মিনারের উপরের তলাগুলোর কাজ সম্পূর্ণ করেন ফিরোজ শাহ তুঘলক ১৩৮৬ খ্রিষ্টাব্দে। ভারতীয়-মুসলিম স্থাপত্যকীর্তির গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে কুতুব মিনার গুরত্বপূর্ণ।

কুতুব মিনার
Qminar.jpg
দিল্লির কুতুব মিনার
ধরনসাংস্কৃতিক
নির্ণায়ক
মনোনীত১৯৯৩ (১৭তম অধিবেশন)
সূত্র নং২৩৩
দেশ ভারত
মহাদেশএশিয়া
১৮৫৮ সালে কুতুব মিনার।

এর আশে-পাশে আরও বেশ কিছু প্রাচীন এবং মধ্যযুগীয় স্থাপনা এবং ধ্বংসাবশেষ রয়েছে, যা একত্রে কুতুব কমপ্লেক্স হিসেবে পরিচিত। এই কমপ্লেক্সটি ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান হিসেবে তালিকাবদ্ধ হয়েছে এবং এটি দিল্লির অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন-গন্তব্য। এটি ২০০৬ সালে সর্বোচ্চ পরিদর্শিত সৌধ, পর্যটকের সংখ্যা ছিল ৩৮.৯৫ লাখ যা তাজমহলের চেয়েও বেশি, যেখানে তাজমহলের পর্যটন সংখ্যা ছিল ২৫.৪ লাখ।[৩] প্রখ্যাত সুফি কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকীর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়।[৪]

পূর্বনির্মিত কিছু এজাতীয় মিনার ও কুৎব মিনারে তার প্রভাবসম্পাদনা

আফগানিস্থানে সম্প্রতি মেন্‌রোজ প্রদেশের ‘শাহ্ পোশ্’-এ খননকালে একটি মিনারের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে।[৫] একটি মস্‌জিদের অনতিদূরে সেই মিনারটি নির্মিত হয়েছিল নবম অথবা দশম-শতাব্দীর প্রথম পাদে।[৫] সামানিদ্-ইটের তৈরি এই মিনারের শুধু পাদদেশটুকুই আবিষ্কৃত হয়েছে—কিন্তু তার প্ল্যান কুৎব মিনারের ছন্দে গড়া। একটি করে কোণ এবং একটি করে গোলাকৃতি (বাঁশী) পর-পর সাজানো, ঠিক যেমনটি দেখা যায় কুৎব-এ।[৫] বিশেষজ্ঞ শ্রী আর. সেনগুপ্তের মতে এই মিনারটি[৬] প্ল্যানিং-এ পূর্বযুগে নির্মিত সামানিদ্-বংশের বুখারার শাসক ইস্‌মাইল (৮৯২–৯০৭) নির্মিত একটি মিনারের ছাপ পড়েছে। সেটিও প্রথম নয়—তারও পূর্বে নির্মিত হয়েছিল আফগানিস্থানের প্রাচীনতম মস্‌জিদ একটি মিনার—স্থানীয় লোকেরা যার পরিচয় দিতে বলে বল্‌ক্-এর ‘নাও গাম্বাদ’ (Naw Gumbad—‘নয়া গম্বুজ’)।

কুৎব মিনারের সঙ্গে শাহ্-পোশ্ মিনারের কিছুটা সাদৃশ্য থাকলেও তার পরিকল্পনা যেন বেশি করে ছাপ ফেলেছে ‘জাম’-এ নির্মিত গীয়াৎউদ্‌দীন ঘোরীর (১১৫৭–১২০২) অপর একটি মিনার।[৫] বাস্তবিকপক্ষে, ঘোরীরা অনেকগুলি বিজয় মিনার নির্মাণ করেছিলেন আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে। ঘোরী-বংশের অন্যতম নিয়ামক আলাউদ্‌দীন (১১৫১–১১৫৭) প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক জুজ্জানী (Juzjani) লিখেছেন, পরাজিত গজনীর শাহ্-এর হাত থেকে শাসন-ক্ষমতা গ্রহণ করে নিষ্ঠুর আলাউদ্‌দীন রাজধানীকে ভস্মীভূত করে, এবং ‘জাহান-সুজ’ (জাহান: পৃথিবী; সুজ: দগ্ধকারী) খেতাব গ্রহন করে একটি নতুন রাজধানীর করে—‘ফিরোজ কোহ’। সেখানে সে একাধিক মস্‌জিদ এবং মিনার বানায়। সবচেয়ে নৃশংস ও ন্যক্কারজনক সংবাদ হল—ঐতিহাসিক জুজ্জানী বলেছেন—সম্রাটের অভিলাষ অনুসারে ঐ মস্‌জিদ ও মিনার গেঁথে তোলার সময় জল ব্যবহার করা হয়নি—মশল্লা প্রস্তুত করতে জলের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছিল পরাজিত বিধর্মী বন্দীদলের রক্ত!![৭]

এখানেই ধারাবাহিকতায় ছেদ টানা যাচ্ছে না। ফার্গুসন-সাহেব তার অমূল্য [৮] বলেছেন, কুৎব-এর পূর্বযুগে গজনীতে দুটি মিনার গেঁথে তোলা হয়েছিল, যা কুৎবউদ্‌দীন আইবক নিঃসন্দেহে দেখেছেন ভারতে প্রবেশের পূর্বে। প্রথমটির নির্মাতা গজনীর মাহ্‌মুদ (৯৯৭ খ্রীষ্টাব্দ); অপরটি তাঁর পুত্র মা’সুদ এর। মরুপ্রান্তরের মাঝখানে দণ্ডায়মান এ-দুটি নিঃসঙ্গ মিনারও কোনো মস্‌জিদ বা ইমারতের অঙ্গ নয়;—স্বয়ংসম্পূর্ণ মিনার। প্রথমোক্ত মিনারটি ৪২.৭ মিটার (১৪০ ফুট) উঁচু। মিনারটি নীচের দিকে অষ্টভুজ—দুটি বর্গক্ষেত্র একে অপরের কর্ণের সমান্তরালে বসিয়ে বানানো। ঊর্ধ্বাংশ বৃত্তাকার।

কুৎব মিনারের সঙ্গে এই গজনী-মিনারের তুলনামূলক বিচার করলে দেখা যাবে উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে ১৪০ ফুট থেকে ২৪২ ফুটে।[৫] দ্বিতল-পরিকল্পনা বর্ধিত হয়েছে চারতলার বিস্তারে।[৫] নীচেকার দুটি বর্গক্ষেত্রের ‘চার-দুকোনে আট’ কোণার পরিকল্পনা সম্প্রসারিত হয়েছে তিনটি বর্গক্ষেত্রের ‘তিন-চারে বারো’ কোণায়, এবং ঐ বারোটি কোণার মাঝে মাঝে ‘বাঁশী’ সংযোজিত করে।[৫]

গঠনসম্পাদনা

অনুমান করা হয় প্রথম তল পর্যন্ত (২৭.৫ মিঃ) পৌঁছবার অনেক আগেই কুৎবউদ্‌দীন আইবকের ইন্তেকাল হয়;[৫] বাকি তিনটি তলা গেঁথে তোলেন তাঁর দামাদ ইল্‌তুৎমিস্।[৫] উচ্চতা ৭১.২৪ মিটার বা ২৩৪ ফুট। ভূমি-অংশে বৃত্তের ব্যাস ১৪.৩২ মিটার, এবং উপরের অংশে ২.৭৫ মিটার।[৫] সর্বসমেত সোপান সংখ্যা ৩৭৯;[৫] মিনারটি দুবার বজ্রপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়; যথাক্রমে ১৩২৬ এবং ১৩৬৮ খ্রীষ্টাব্দে। প্রথমবার মুহম্মদ তুগলুক এবং দ্বিতীয়বার ফিরোজশাহ্ তুগলুক সেই ক্ষতিগ্রস্ত মিনারের মেরামতি করান। আরও পরে ১৫০৩ খ্রীষ্টাব্দে সিকান্দার লোদী মিনারের সর্বোচ্চ তলটি পুনরায় মেরামতি করান।[৫] প্রাথমিক অবস্থায় এটি চারতলা মিনার ছিল; ফিরোজশাহ্ মেরামতির সময় সর্বোচ্চ তলটি দু’ভাগে বিভক্ত করেন—ফলে বর্তমানে ওটা পাঁচতলা।[৫] প্রাথমিক অবস্থায় সবটাই ছিল লাল-পাথরের গাঁথনি; ফিরোজশাহ্ মেরামতির সময় উপরের দুটি তলা সাদা মার্বেল দিয়ে তৈরী করান।[৫]

কুৎবের নীচের তলায় ছাব্বিশটি পল-তোলা। পর্যায়ক্রমে একটি গোলাকৃতি একটি কোণ-বিশিষ্ট।[৫] মুজ্তবা আলীর ভাষায়—“একটা বাঁশি, একটা কোনা পর পর সাজানো।” তার মানে পর-পর দুটি বাঁশি কেন্দ্রবিন্দুতে ৩০ ডিগ্রি কোণ রচনা করছে। আর তাকেই দু-আধখানা করে কোণগুলি সাজানো। দ্বিতলেও ছাব্বিশটি খাঁজ, প্রতিটি খাঁজ কেন্দ্রে ১৫ ডিগ্রি কোণ রচনা করছে। এবং তারা গোলাকৃতি বা ‘বাঁশি’।[৫] তিনতলাতেও সেই ছাব্বিশ ভাগের ছন্দ, অর্থাৎ ১৫ ডিগ্রির ব্যবস্থাটা পাকা আছে, যদিও এবার বাঁশি খোয়া গেছে, সবই কোণাকৃতি।[৫] এর উপরে তূরীয় অবস্থা—না বাঁশির তান, না কৌণিক অন্তরায়; স্রেফ গোলাকার।[৫] লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এই ছন্দ বদলাবার অনুপ্রেরণাটাও এসেছে গজনীর মাহ্‌মুদী মিনার থেকে, যদিও ব্যাপকতায়, বিন্যাসে, এবং জ্যামিতিক তুলনামূলকভাবে তার পূর্বসূরীকে অনেক পিছনে ফেলে গেছে।[৫]

মিনার যে ক্রমশঃ মোটা-থেকে-সরু হয়ে উঠেছে তার মৌল হেতু নিঃসন্দেহে দৃঢ়তা বা ভারসাম্যের প্রয়োজনে। যে ইমারৎ তলায় চওড়া, উপরে সরু তা দীর্ঘস্থায়ী; যেমন মিশরের পিরামিড—ঝড়ে উল্টে পড়ার সম্ভাবনা সেখানে আদৌ নেই। এখানে কিন্তু স্থপতি ভারসাম্যের প্রয়োজনের চেয়েও এই সরু-মোটার ছন্দটা বেশি প্রকট করেছেন। উদ্দেশ্য: দর্শককে বিভ্রান্ত করা! অর্থাৎ মিনার বাস্তবে যত উঁচু, এজন্য তার চেয়েও সেটা বেশি মনে হয়।[৫] যে ছন্দে দিল্লীর জাম-ই-মস্‌জিদ, বা তাজের মিনারিকা মোটা-থেকে-সরু হয়েছে এখানে সেই ছন্দটা আরও প্রকট।[৫]

কুতুব মিনার বিভিন্ন নলাকার শ্যাফট দিয়ে গঠিত যা বারান্দা দ্বারা পৃথকীকৃত। মিনার লাল বেলেপাথর দিয়ে তৈরি যার গাত্রে পবিত্র কোরআনের আয়াত খোদাই করা রয়েছে। ভূমিকম্প এবং বজ্রপাতের দরুন মিনারটি একাধিকবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু সেটি পরবর্তী শাসকগণ মেরামত করেন। ফিরোজ শাহ-এর শাসনকালে মিনারের দুই শীর্ষ তলা বজ্রপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনি তা মেরামত করেন। ১৫০৫ সালে একটি ভূমিকম্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সিকান্দার লোদী তা মেরামত করেন। কুতুব মিনারের দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে ২৫ ইঞ্চি একটি ঢাল আছে যা “নিরাপদ সীমা” হিসেবে বিবেচিত হয়।

স্থাপত্যসম্পাদনা

গ্যালারিসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Khilnani, N. M. (১৯৯৩)। Socio-political Dimensions of Modern India (ইংরেজি ভাষায়)। M.D. Publications Pvt. Ltd.। আইএসবিএন 978-81-85880-06-8 http://books.google.com/books?id=i7ayFbhJ9GcC&pg=PA132&dq=qutub+minar+world's+tallest&sig=ACfU3U0C__21Dqvt61SBii7ceB5rfSIjgw
  2. World Heritage Monuments and Related Edifices in IndiaPg.107। Google Books। 
  3. "Another wonder revealed: Qutub Minar draws most tourists, Taj a distant second"Indian Express। জুলাই ২৫, ২০০৭। সংগ্রহের তারিখ আগস্ট ১৩, ২০০৯ 
  4. "Qutub Minar Height"। qutubminardelhi.com। ২৯ জুন ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুন ২০১৫ 
  5. নারায়ণ সান্যাল (আগস্ট ১৯৮৫)। অপরূপা আগ্রা। ৬বি, রামনাথ মজুমদার স্ট্রিট, কলকাতা: ভারতী বুক স্টল। 
  6. “দ্য কুৎব মিনার: ওয়াজ় দেয়ার আফ়গান ইনফ়্লুয়েন্স?”—ডঃ আর. সেনগুপ্ত, দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া, রবিবার, জুলাই ৩০, ১৯৭৮.
  7. Quotation from Juzjani, Ibid.
  8. ফার্গুসন, জে.। হিস্ট্রি অফ় ইন্ডিয়ান অ্যান্ড ইস্টার্ন আর্কিটেক্চারI 

বহিঃসংযোগসম্পাদনা