কবর

মৃতদেহ মাটিতে পুঁতে রাখার গর্ত

কবর হলো মৃতদেহ মাটিতে পুতেঁ রাখার গর্ত। মৃত মানুষকে কবরে শায়িত করাকে বলা হয় "দাফন করা"। মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদীদের মৃতদেহ নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে মাটিতে দাফন করা হয়। অন্যদিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হিন্দুদের মৃতদেহ আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

খালি কফিন সহকারে একটি কবর
স্যালিনাস কবরস্থানের হ্যামিল্টন প্লটে স্টেইনবেক পরিবারের কবর

প্রকারভেদসম্পাদনা

কবর দুই প্রকার:- যথা "সিন্ধুকী কবর" এবং "বগ্‌লী কবর"। মধ্যপ্রাচ্যের শক্ত মাটিতে বগ্‌লী কবর খোদাই করা হয়। আবার বাংলাদেশের মাটি নরম বিধায় সাধারণত সিন্ধুকী কবর করা হয়। মৃত দেহের উচ্চতা অনুসারে কবরের দৈর্ঘ্য হবে। এর গভীরতা হবে কমপক্ষে মৃতব্যক্তির উচ্চতার অর্ধেক। সাধারণত কোদাল, বেলচা ইত্যাদি দিয়ে মাটি খুঁড়ে কবর তৈরি করা হয়। মাটি কেটে গভীর গর্ত করার পর্যায়ে পানি বের হতে পারে। এই পানি যতটা সম্ভব সেচে ফেলা হয়। তারপর কাফন পরানো মরদেহ (অথবা, ক্ষেত্রবিশেষে, মৃতদেহ সংবলিত কফিন) কবরের মধ্যে স্থাপন করা হয়। লাশের কিছু ওপরে আড়াআড়িভাবে বাঁশ দিয়ে তার ওপর চাটাই বিছিয়ে দেয়া হয়। অতঃপর মাটি দিয়ে কবর ঢেকে দেয়া হয়। লক্ষ্য রাখা হয় এই মাটি যেন মরদেহের গায়ে না-পড়ে।[১]

মুসলমানদের লাশ দাফনের নিয়মসম্পাদনা

মুসলমানদের লাশ দাফনের পদ্ধতি বিশদভাবে ইসলামী শরিয়তে নির্দেশিত আছে। মরদেহকে যথাযথ নিয়মে গোসল দেয়ার পর কাফন পরানো হয়। তারপর তা কবরে নিয়ে যাওয়া হয়। ২-৩ জন ব্যক্তি কবরে নেমে লাশ গ্রহণ করে এবং মাটিতে শুইয়ে দেয়। কবরে লাশ নামানোর সময় বলতে হয়: "বিসমিল্লাহি ওয়ালা মিল্লাতি রাসূলিল্লাহ"।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

বাংলাদেশে লাশের মাথা উত্তরে এবং পা দক্ষিণে রেখে লাশ মাটিতে শোয়ানো হয়। মরহুমের মুখমণ্ডল পশ্চিমমুখী ক'রে দেয়া হয়, চোখ খোলা থাকলে তা চেপে বন্ধ করে দেয়া হয়। কাফনের কাপড় আটকে রাখার জন্য মাথার কাছে, পায়ের কাছে এবং পেট বরাবার লাগানো ফিতায় দেয়া গেরোসমূহ খুলে দেয়া হয়। এরপর আড়াআড়ি ভাবে বাঁশের টুকরা দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। তার ওপর বাশেঁর চাটাই বিছিয়ে লাশের গায়ে মাটি পড়ার সুযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়। এর পর ধীরে ধীরে মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়।

মৃতব্যক্তি নারী হলে তার লাশ কবরে নামানোর সময় ওপরে প্রশস্ত চাদর মেলে ধরা হয় যাতে অন্যান্যদের কাছে কাফন পরানো লাশ দৃষ্টিগোচর না হয়।

কবরস্থান বা সমাধিক্ষেত্রসম্পাদনা

কবরস্থানসমূহ সাধারণত এলাকার বিশেষ স্থানে তৈরি করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে কবর প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দাফনকৃত দেহটির অবস্থা এবং এর সাথে প্রাপ্ত বস্তুসমূহ প্রকাশ করে মৃতব্যক্তির ঐতিহাসিক গুরুত্ব। ব্যক্তিটি কোন যুগে জীবিত ছিলেন এবং কোন সংস্কৃতির ছিলেন তাও নির্দেশ করে।

লাশ দাফনের ব্যয়সম্পাদনা

ঢাকা শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত আজিমপুর কবরস্থানে একটি লাশ দাফন করার জন্য প্রায় ৭-৮ শত টাকা ব্যয় হয়। কবর খোদাই, বাঁশ এবং চাটাইয়ের খরচ বাবদ এই ব্যয়। শিশুদের কবরের জন্য ব্যয় কম হয়। আবার কোন কারণে দীর্ঘ কবর প্রয়োজন হলে ব্যয় ১-২ শত টাকা বৃদ্ধি পেতে পারে। এটি ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের হিসাব।

যা করণীয় নয়সম্পাদনা

কবর ইট-সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো ঠিক নয়।

কফিনসম্পাদনা

মৃতদেহ কাঠের বাক্সে ভরে কবরে রাখা হয়। এই বাক্সকে বলা হয় কফিনখ্রিস্টানরা কফিনে ভরে মৃত দেহ কবরে দাফন করে। মৃত ব্যক্তিকে কাফন পরানো হয় না। কফিন দড়িতে ঝুলিয়ে কবরে নামানো হয়।

জান্নাতুল বাকীসম্পাদনা

মদিনা নগরীতে মসজিদে নববী সংলগ্ন কবরস্থানের নাম জান্নাতুল বাকীহাদীস অনুসারে এই কবরস্থানের কবরবাসীরা বেহেশতী হবে।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] এখানে মুহাম্মাদ(সা)-এর সন্তান ও স্ত্রীদের কবর রয়েছে। ইসলামের তৃতীয় খলিফা উসমান (রা:)-এর কবর পর্যন্ত জান্নাতুল বাকীর সীমানা বিস্তৃত।

কবর জিয়ারতসম্পাদনা

কবরস্থান জিয়ারত কালে মৃত ব্যক্তির মস্তক বরাবর পশ্চিমমুখী হয়ে এই দোয়া পড়তে হয়: "মোমিন ও মুসলমানদের বাসভূমির অধিবাসীদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আমাদের মধ্যে থেকে যারা আগে আগে চলে গেছে এবং যারা পেছনে রয়েছে আল্লাহ তাদের সবার ওপর করুণা বর্ষণ করুন। ইনশাআল্লাহ আমরা তোমাদের সঙ্গে মিলিত হব।‌"

মাজারসম্পাদনা

মাজার শব্দটি আরবি,আর 'রওজা'ও একটি আরবি শব্দ। ফার্সিতে درگاه‎‎ দরগাহ বা درگه দরগাহ । বাংলায় এর অর্থ হচ্ছে জিয়ারতের স্থান।। বাংলাদেশ ও ভারতবর্ষে মাজার বলতে সাধারণত দরবেশ-আউলিয়াগণের সমাধিক্ষেত্র বোঝায়।

মাযার জিয়ারতসম্পাদনা

কোনো মুসলিমকে যেখানে দাফন করা হয় ওই জায়গাকে ‘কবর’ বলা হয়। হাদিস শরিফে আছে, ‘মানুষের কবরটি হয়তো জান্নাতের একটি বাগান হবে অথবা জাহান্নামের একটি গর্ত হবে। ’ বাগানকে আরবিতে ‘রওজা’ বলা হয়।অতএব আম্বিয়ায়ে কেরাম ও সাহাবিরা যেহেতু জান্নাতি, তদ্রূপ নেককার মুমিনরাও ইনশাআল্লাহ জান্নাতে যাবেন, তাই তাঁদের কবরকে সম্মানার্থে ‘রওজা’ও বলা যায়।

আর ‘মাজার’ও একটি আরবি শব্দ। বাংলায় এর অর্থ হচ্ছে জিয়ারতের স্থান। এই অর্থে শরিয়ত মতে সব মুমিনের কবরই ‘মাজার’, কেননা সব মুমিনের কবরই জিয়ারতের স্থান এবং কবরই জিয়ারত করা হয়ে থাকে। তবে আমাদের দেশের অলি-বুজুর্গদের কবরকে ‘মাজার’ বলা হয়, যেহেতু সেখানে মানুষ বেশি জিয়ারত করে থাকে।

উল্লেখ্য, শরিয়তে আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ.), সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ও অলি-নেককারসহ সব মুমিনের কবরেই জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাওয়ার নির্দেশ রয়েছে।


তবে সিজদা করা, সাহায্য চাওয়া ও যাবতীয় কুসংস্কারের উদ্দেশ্যে কবর, মাজার ইত্যাদিতে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং কবর পাকা করা ও তার ওপর কোনো কিছু নির্মাণ করাও নিষিদ্ধ।

সূত্র : তিরমিজি, হাদিস : ২৪৬০, বুখারি, হাদিস : ১৩৩০, মুসলিম, হাদিস : ১৯৭৭, ৯৭০, আবু দাউদ, হাদিস : ২০৪২

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Ghamidi (2001), Customs and Behavioral Laws ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩ তারিখে

বহি:সংযোগসম্পাদনা