একনাথ রানাডে বা একনাথ রামকৃষ্ণ রানাডে (ইংরেজি: Eknath Ranade or Eknath Ramakrishna Ranade)(জন্ম: - ১৯ নভেম্বর,১৯১৪ – মৃত্যু :- ২২ আগস্ট, ১৯৮২), "একনাথজী" নামে সুপরিচিত সমাজ সংস্কারক। জাতীয়তাবাদ ও বিবেকানন্দর জীবনাদর্শে ও আধ্যাত্মিক প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ সুমহান দেশপ্রেমিক ও সংগঠক। .[১] ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের বিশিষ্ট নেতা, সমাজকর্মী ও তামিলনাড়ুর কন্যাকুমারীতে বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল বা বিবেকানন্দ শিলা স্মৃতিসৌধ স্থাপনের অন্যতম ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তিত্ব । [২][১]

একনাথ রানাডে
Eknath R Ranade.jpg
জন্ম১৯ নভেম্বর ১৯১৪
মৃত্যু২২ আগস্ট ১৯৮২(1982-08-22) (বয়স ৬৭)
মাদ্রাজ বর্তমানে চেন্নাই, তামিলনাড়ু , ভারত
জাতীয়তাভারতীয়
অন্যান্য নামএকনাথ রামকৃষ্ণ রানাডে
শিক্ষাদর্শনশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ও আইন
মাতৃশিক্ষায়তননাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়
ডঃ হরিসিং গৌর বিশ্ববিদ্যালয় পূর্বতন সাগর বিশ্ববিদ্যালয়
পরিচিতির কারণসমাজ সংস্কারক ও ভারতের আধ্যাত্মিক সংস্কারক
পিতা-মাতারামকৃষ্ণ রানাডে (পিতা)
রমাবাঈ (মাতা)

জন্ম ও শিক্ষা জীবনসম্পাদনা

একনাথ রানাডে'র জন্ম মহারাষ্ট্রের অমরাবতী জেলার টিমতলা নামক এক ছোট্ট গ্রামে। পিতা রামকৃষ্ণ রানাডে ছিলেন রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার ও মাতার নাম রমাবাঈ। এদের চার পুত্র সন্তানের কনিষ্ঠ ছিল একনাথ। অন্যরা যথাক্রমে কাশীনাথ, বিশ্বনাথ ও রঘুনাথ। এদের দুই ভগিনী ছিল তারা কৌশল্যা (আক্কা) ও কৃষ্ণা (তাঈ)। সেসময় সেই গ্রামে শিক্ষার আলো বলতে কিছুই ছিল না। সেকারণে একনাথ নাগপুরে চলে আসেন। নাগপুরে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কাশীনাথের তত্ত্বাবধানে লেখাপড়া করেন। ভ্রাতার বাড়ির কাছেই ছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের শাখা। ছাত্রাবস্থায় সহজাত কৌতূহল নিয়ে শাখার ক্রিয়াকলাপ পর্যবেক্ষণ করতেন। সংযোগবশত সঙ্ঘ প্রধান ডক্টর কেশব বলিরাম হেগডগেওয়ারের সাথে পরিচয় ঘটে এবং সংঘের বালক শাখায় তার দেশসেবার শিক্ষা শুরু হয়। ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাশের পর একনাথ সঙ্ঘপ্রচারক হবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু ডক্টর সাহেব তাকে আরো পড়াশোনা করার উপদেশ দেন। ১৯৩২ সালে নাগপুরে মিশনারি দ্বারা পরিচালিত হিসলপ কলেজে ভরতি হন। ১৯৩৭ সালে দর্শনশাস্ত্রে স্নাতক ও নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ হন এবং সঙ্ঘ-প্রচারক হিসাবে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তার কাজের মূল এলাকা ছিল মধ্যপ্রদেশ। ১৯৩৮ সালে তাঁকে মহাকৌশলের কার্য সমর্পণ করা হয়। মধ্যপ্রদেশে অবস্থান কালে সাগর বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে ডঃ হরিসিং গৌর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পাশ করেন ।

সমাজকর্মী হিসাবে জাতির সেবায়সম্পাদনা

রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের নানা দায়িত্ব গ্রহণ করে জাতির সেবায় আত্ম নিয়োগ করেন। এক সময় সংঘের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও গ্রহণ করেছিলেন। তবে তিনি কংগ্রেসের অধিবেশনে উপস্থিত থেকে সকলের সাথে সদ্ভাব বজায় রেখে গেছেন। ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধীর হত্যার পর রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় তৎকালীন নেহরুর কংগ্রেস সরকার সংঘকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এম এস গোলওয়ালকর সহ কর্মকর্তারা কারারুদ্ধ হন। সেই কঠিন সময়ে তিনি ভিতর থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সত্যাগ্রহে চালিয়ে এবং গোপনে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের সাথে সংযোগ রেখেছিলেন। অতঃপর ১৯৪৯ সালের ১১ ই জুলাই নিষেধাজ্ঞার অবসানে সংগঠনকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে সঠিক পথে কাজ করেছেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাসিত হিন্দুদের পুনর্বাসনের জন্য সংঘ কলকাতায় 'বাস্তুহারা সহায়তা কমিটি' গঠন করে। এই প্রকল্পের সমস্তকাজ একনাথ পরিচালনা করেছিলেন। ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৫২ ক্ষেত্রীয় প্রচারক হিসাবে বাংলা আসাম উড়িষ্যা দিল্লি পাঞ্জাব সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরেছেন। তিনি তার কথার মাধুর্যে মানুষকে প্রভাবিত করতে পারতেন। এ বিষয়ে তার পারদর্শিতা বিদ্যালয়ে পাঠের সময়ে অর্জন করেন।

বিবেকানন্দময় জীবনযাপনসম্পাদনা

স্বামী বিবেকানন্দর জীবনাদর্শ, তার প্রাণস্পর্শী ও উদ্দীপনাময় বাণী, হিন্দুদের অনুসৃত সনাতন ধর্মে র নতুন ব্যাখ্যা তাঁকে প্রভাবিত করেছিল বহুলাংশে। স্বামীজির বিবিধ বক্তৃতা ও রচনা থেকে হিন্দু সংগঠন বিষয়ক উক্তি সমূহের একটি চয়নিকা ইংরাজীতে পুস্তকাকারে ১৯৬৩ সালে বিবেকানন্দর জন্মশতবর্ষে ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাঞ্জলি স্বরূপ প্রকাশ করেন। পুস্তক টির নাম - 'Swami Vivekanada's Rousing call to Hindu Nation.' প্রকাশের সাথে সাথে বইটি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। তামিল, তেলুগু, মালয়ালম, মারঠি গুজরাটিসহ দেশের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। বিবেকানন্দ কেন্দ্র, কলকাতা ১৯৯২ সালে বাংলাতে প্রকাশ করে - 'স্বামী বিবেকানন্দর উত্তিষ্ঠত জাগ্রত' নামে।[৩]

বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল ও তার ভূমিকাসম্পাদনা

নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যে একনাথ রানাডে ভারতের দক্ষিণতম প্রান্তে মূল ভূখণ্ড হতে ৪০০ মিটার দূরে বিবেকানন্দ শিলার উপর অপরূপ সুন্দর 'বিবেকানন্দ শিলা স্মৃতিসৌধ' নির্মাণ করে তিনি নিজ আদর্শের প্রতি তার একাগ্র সাধনা, কঠোর সংকল্প ও সকল কাজে পরম উৎকর্ষের প্রতি তার তীক্ষ্ম আগ্রহের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। স্থানীয় ধর্মান্তরিত খ্রীষ্টান মানুষের আপত্তি, রাজ্য সরকারের বিরোধিতা, কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতিতে দীর্ঘসূত্রতা সহ স্মারক নির্মানের প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান প্রভৃতির জন্য তার মত এক সমন্বয়কারী ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল সেই মুহূর্তে। বিবেকানন্দর জন্মশতবর্ষে স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করে যে প্রভূত খ্যাতি তিনি অর্জন করেছিলেন সেটির সাথে তার রাজনৈতিক অলিন্দে অবাধ বিচরণ,রামকৃষ্ণ মিশনের সান্নিধ্য সর্বোপরি সঠিক কর্মযোগ দীক্ষিত হওয়ার কারণে সব কিছু যেন তার কাছে সহজ হয়ে গিয়েছিল। স্মৃতি সৌধ নির্মাণের জন্য ১.২৫ কোটি টাকার অর্থ সংগৃহীত হয় ও বিবেকানন্দ জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয় ১১৯৭০ সালে সেপ্টেম্বর মাসে। এখন এটি তীর্থক্ষেত্র হিসাবে সমগ্র ভারত ও বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ পর্যটকের কাছে আকর্ষণ স্থল হিসাবে পরিণত হয়েছে। ১৯৭২ সালে বিবেকানন্দ শিলা স্মারক সমিতি আধ্যাত্মিক ভিত্তিতে গঠিত "বিবেকানন্দ কেন্দ্র " এক সেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় এবং স্বামী বিবেকানন্দর ত্যাগ ও সেবার দ্বিবিধ আদর্শকে অনুসরণ করে চলেছে। কালক্রমে, একনাথ রানাডে এই কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৮ সালে সভাপতি হন। তিনি 'বিবেকানন্দ কেন্দ্র ইন্টারন্যাশনল, কন্যাকুমারী' নামে এক সহায়ক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। বিবেকানন্দর সমস্ত ধ্যানধারণাকে মূল শক্তি ভেবে অক্লান্ত প্রচেষ্টায় লক্ষ্যে পৌঁছেছেন তা সে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের ক্ষেত্রে হোক, বাস্তুহারাদের কল্যাণে হোক বা সংঘের কর্মপন্থায় হোক - সর্বত্রই। কেবল কর্মে বিশ্বাস করতেন তিনি। কিন্তু কোন কর্মেই সাফল্যের পিছনে নিজেকে বিখ্যাত করার জন্য ভাবেননি কখনো। তবে বিবেকানন্দময় জীবন-যাপন করে একনাথ রানাডে অমর ও অজেয় হয়ে আছেন একমাত্র কর্মযোগের কারণে।[৩]

অন্যান্যসম্পাদনা

একনাথ রানাডে সংঘের কাজ, সমাজ সেবা মূলক কাজকর্ম ছাড়াও পত্রিকা সম্পাদনার কাজেও নিয়োজিত ছিলেন। বিবেকানন্দ কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত 'যুবভারতী' নামে ইংরাজী মাসিক, 'ব্রহ্মবাদিন' নামে ইংরাজী ত্রৈমাসিক ও 'বিবেকানন্দ কেন্দ্র পত্রিকা' নামে ইংরাজী ষান্মাসিক পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ছিলেন। একসময় তিনি ভারত সরকারের বিদেশ মন্ত্রকের অধীন ইণ্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস এর সদস্য ছিলেন। [৩]

মৃত্যুসম্পাদনা

১৯৬২ সালের ২২ আগস্ট গণেশ চতুর্থীর দিন একনাথ রানাডে প্রয়াত হন।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা