অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

ভারতীয় বাঙালি কবি
(আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত থেকে পুনর্নির্দেশিত)

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত (৬ অক্টোবর ১৯৩৩ — ১৭ নভেম্বর ২০২০)[১] একজন বিশিষ্ট বাঙালি কবি ও চিন্তাশীল প্রাবন্ধিক। রচনার প্রাচুর্য এবং বৈচিত্র্যে,মনীষা এবং সংবেদনশীলতায় তিনি বাংলাসাহিত্যের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। [২] তিনি ২০টিরও বেশি কবিতার বই লিখেছেন, বাংলা এবং সাঁওতালি কবিতা ও নাটক ইংরেজি এবং জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছেন, এবং জার্মান ও ফরাসি সাহিত্য থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন। তিনি বেশ কয়েকটি বই প্রবন্ধের প্রকাশ করেছেন। তার স্বতন্ত্র গদ্যশৈলীর জন্য তিনি সুপরিচিত।[৩]

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত
জন্ম (1933-10-06) ৬ অক্টোবর ১৯৩৩ (বয়স ৮৮)
কলকাতা
মৃত্যু১৭ নভেম্বর ২০২০(2020-11-17) (বয়স ৮৭)
হির্শবার্গ জার্মানি
পেশাঅধ্যাপক
ভাষাবাংলা ভাষা
জাতীয়তাভারতীয়
শিক্ষাশান্তিনিকেতন, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
বিষয়মূলত বাংলা
উল্লেখযোগ্য পুরস্কারগ্যেটে পুরস্কার
আনন্দ পুরস্কার
রবীন্দ্র পুরস্কার
সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার
দাম্পত্যসঙ্গীট্রুডবার্টা (মৃ.২০০৫)

শিক্ষাসম্পাদনা

দাশগুপ্ত শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীতে পড়াশোনা করেছেন, ও তারপরে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে, প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়েন এবং অবশেষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ভারতীয় কবিতায় গীতি নিয়ে তার পড়াশুনার জন্য পিএইচডিপ্রাপ্ত হন।[৩] তিনি লিটল ম্যাগাজিনসমূহের সাথে ভীষণভাবে যুক্ত হয়ে মূল জার্মান কাজগুলিকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করতে থাকেন।

কর্মজীবনসম্পাদনা

তার পিএইচডি শেষ করার পরে, দাশগুপ্ত ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে (বুদ্ধদেব বসু প্রতিষ্ঠিত) তুলনামূলক সাহিত্য ও বাংলা পড়িয়েছিলেন। এরপরে তিনি হাম্বোলড ফাউন্ডেশন ফেলোশিপে জার্মানি যান। ১৯৭১ সাল থেকে তিনি জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া ইনসিটিটিউট অনুষদে শিক্ষকতা করছেন। তিনি ভারত ও জার্মানির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সংযোগ প্রচারের জন্য প্রধান একটি প্রতিষ্ঠান, ডয়চে-ইন্দিসচে গেসেলশ্যাফ্টের (ডিআইজি) সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন।[৪]

দাশগুপ্ত এমন একজন কবি, যিনি তার সহকর্মী এবং ভক্তদের দ্বারা অনেক প্রশংসিত, তার কবিতা মূলভাব এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের জন্য পরিচিত। জার্মান সরকার তাঁকে গ্যোটে পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে দুটি ভিন্ন সংস্কৃতিকে একত্রিত করার কাজে তার অবদানের জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছে। তার ছন্দনৈপুণ্য ভাষার কারুকার্য যেমন কাব্য-অবয়বকে একটি স্বকীয়তা দিয়েছে তেমনই বৈদগ্ধ্য বিপ্লবমনস্কতা এবং ঐতিহ্যের পুনরাবিষ্কারের ক্ষমতা তার কাব্য জগতকে দিয়েছে বিশালতা এবং নান্দনিক সৌন্দর্য। এরপর তিনি যে প্রবন্ধ রচনা করেছেন ও জার্মান ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন সেখানে তার ভাষান্তর কুশলতা বাংলা সাহিত্যে বিশেষ ভাবে স্মরণীয়। তার নিজস্ব গদ্যরীতি বর্ণাঢ়্য, প্রতিমাবহুল এবং শব্দের নবায়নে চিহ্নিত।

কবিজীবনসম্পাদনা

১৩৬৬ বঙ্গাব্দের চৈত্র সংক্রান্তির দিন প্রকাশিত হয় অলোকরঞ্জনের প্রথম কবিতাগ্রন্থ যৌবন বাউল। অর্থাৎ আজ থেকে ষাট বছরেরও বেশি আগে। সে-কাব্যগ্রন্থকে বাংলার কবিতাসমাজ অত্যন্ত সমাদরে বরণ করে নেয়। কিন্তু সেই গ্রন্থ প্রকাশের আগেই অলোকরঞ্জনের কবিতাকে বুদ্ধদেব বসু তাঁর কবিতা পত্রিকায় নিয়মিত ছাপতে শুরু করে দিয়েছেন। পাশাপাশি তরুণ কবিদের প্রধান মুখপত্র কৃত্তিবাস পত্রিকার সম্পাদক কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অলোকরঞ্জনের উপস্থিতি অবধারিত করে তুলেছেন কৃত্তিবাস-এ. শতভিষা কবিতাপত্রের কর্ণধার কবি আলোক সরকার প্রায় প্রতি সংখ্যায় গ্রহণ করতে শুরু করেছেন অলোকরঞ্জনের কবিতাকে। যৌবন বাউল প্রকাশিত হওয়ার প্রায় সাতবছর আগে দেশ পত্রিকার প্রবাদপ্রতিম সম্পাদক সাগরময় ঘোষ দেশ পত্রিকা-এরর পাতায় কবিতা লিখতে আহ্বান করেন অলোকরঞ্জনকে। ১৯৫৪ সালের পুজো সংখ্যা দেশ-এ একুশ বছরের যুবক অলোকরঞ্জন তাঁর কবিতায় লেখেন এমন একটি লাইন: "বৃষ্টি তার চরণের স্বরলিপি অবিকল জানে' এই লাইনটিতে আমরা 'র' বর্ণের এবং 'ন' বর্ণের আশ্চর্য বণ্টনের অনুপ্রাস দেখে বিস্মিত হয়ে যাই। এই অলোকরঞ্জনই পরিণত বয়সে লিখবেন এইরকম লাইন: 'তিসিবনে একা শিশু ভেসে আছে নিশুতি উদাস'— তখন আবার আমরা বিস্মিত হব 'স' ধ্বনির অপরূপ বিতরণের ক্ষমতায়। যেন তিসিবনের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া ফিসফিসে এক বাতাসের স্বর আমরা শুনতে পেলাম। ধ্বনিকে সারাজীবন অলোকরঞ্জনের কবিতায় আমরা বিভিন্নভাবে নতুন করে আবিষ্কার করব। বাংলা কবিতাজগৎ অলোকরঞ্জনের প্রথম যৌবন থেকে সাতাশি বছর বয়সে তাঁর প্রয়াণ-মুহূর্ত পর্যন্ত যে-সম্মানের উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল তাঁর লিখনীকে, তার নানাবিধ কারণ আছে। এর দু-একটি কারণকে মাত্র ছুঁয়ে যাব এ-লেখায়।

অলোকরঞ্জনের কবিতায় ছিল বহুমুখী স্রোতধারা। তার মধ্যে প্রধান একটি দিক হল তিনি অনন্য এক মধুরকে সঞ্চারিত করে দিয়েছিলেন তাঁর অনেক কবিতায়। তাঁর একটি কবিতা এখানে বলি, কবিতাটি তাঁর বালক ভ্রাতাকে নিয়ে লিখেছিলেন অলোকরঞ্জন। কবিতাটি এইরকম:

 ও শিশুমহিলা, আমি এ-পার্কে প্রতিদিনই 
     দেখেছি আমার ভাই পিন্টুর সঙ্গে; 
  ক্রীড়নক হৃদয় যেন তোমার দু'খানি হাতে, 
     ঋণী আমারও তোমার দিঠির কাছে। 
       হালকা গোলাপী হলদে ফ্রক 
  লাল নীল রিবন আর সেলুলয়েডের কুরুবক 
 ব্যবহার করো তুমি। মাঝেমাঝে মিন্টু-রুবি-মিনি খেলায় যোগ দেয়, তুমি বাধা দাও না। হাওয়ায় 
                 অলক 
  সূর্যকেও প্রভাবিত অপ্রতিভ করে, বিজয়িনী! 
 তোমার প্রহরী এক পুরুষ দেখেছি, প্রৌঢ় তিনি।  বাবা কিংবা মেজোকাকা— কীরকম সে-অভিভাবক। 
ও শিশু মহিলা, তুমি কবে হবে পিন্টুর গৃহিণী

কবিতাটির নাম 'শিশুমহল'। সে-সময়ে, রেডিয়োতে প্রতি রবিবার সকালে 'শিশুমহল' নামক একটি অনুষ্ঠান প্রচারিত হত বাচ্চাদের জন্য| সেই নামটিকে লেখার শিরোনামে নিয়ে এসেছেন অলোকরঞ্জন অপূর্ব এই স্নেহের কবিতায়।

আরও একটি কবিতায় চোখ রাখা যাক। এ-কবিতার নাম ‘তীর্থযাত্রী। কবিতাটি এইরকম:

মা আমাকে নিয়ে একদিন, হাত ধরে গিরিবর্ত্রের 
মতো এই বাঁক পার করে দিয়েছিল ক্ষুধার্ত পথ, 
পথের দুরূহ প্রান্ত; কাঁকন-খোয়ানো কালো এই 
গলি দস্যু অধ্যুষিত ফাটল-স্ফারিত প্রকাও ময়দান 
     হাত ধরে পার করেছিল একদিন।

মাকে আমি আজ হাত ধরে ধরে এ-পথ করাব 
পার মা আজ আমার শিশু 
সতর্ক হাতে ঢাকি দু-একটি রূপালি চুলের গুছি
 আপাতত এই ভূষিত পথের ক্ষুরধার চক্রান্ত 
      কামক্রোধমোহমোহান্তব্যবসায়ী
 পার হয়ে যাই, মা কিছু জানে না, মা আজ 
           আমার শিশু।।


এই কবিতায় আমরা মা-কে পেলাম, আগের কবিতায় পেয়েছি ভাইকে। এই কবিতা দেখাচ্ছে পরিণত সন্তানের দায়িত্ববোধকে। সেইসঙ্গে মা যেহেতু বয়স্কা হয়েছেন, মায়ের প্রতিও এক ধরনের স্নেহ বিকশিত হয়ে উঠেছে ছেলের হৃদয়ে। 'মা আজ আমার শিশু' এই অভিব্যক্তিটি আমাদের আনন্দ বিহ্বল করে দেয়। এমন অনবদ্য হৃদয়দীপ্তি আর কার কাছে পাব? মাকে বলা আরও একটি কবিতাকথন আমি এবার উল্লেখ করব যার তুলনা বাংলা কবিতার কোথাও নেই। কবিতাটি এইরকম:

মাকে বলতে সংকোচ নেই, দিন ফুরোলে আমি 
তোমার কাছে গিয়েছিলাম, তোমার পায়ে মুখ 
   রেখে অগাধ শান্তি পেয়েছিলাম।    
   ভ্রূকুটিহীন সন্ধ্যাতারা উঠল যখন     
   নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে উঠে অর্পিত     দেহের দায়িত্ব যে নিয়েছিলাম, সেসব কথা মাকে 
     বলতে বলতে পাগল হয়ে যাব

কবিতাটির নাম 'সত্য'। কবিতাপাঠের অভিজ্ঞতায় এ এক অকল্পনীয় কবিতা! মাকে এরকমভাবে সব বলা যায়? সবকথা? এ-কবিতা আসলে এক বিশুদ্ধ প্রেমের কবিতাই, শুধু তার প্রকাশ-মূর্তিটি অভাবনীয়! প্রেমের কবিতা লেখায় অলোকরঞ্জন এক অসাধারণ মাধুর্যের সঞ্চার করে গেছেন তাঁর সারাজীবনের কাব্যচর্চায়। অনেক সময় সেসব প্রেম প্রায় নিরুচ্চারিত। যেমন এই দু'টি লাইন— 'সকলের ছোটোবোন চলে যায় ছোটো ছোটো হাতে/ কমলালেবুর গুচ্ছ হাতে নিয়ে।' ষাটের দশকের মাঝামাঝি নিষিদ্ধ কোজাগরী বইয়ে লেখা এই কবিতার লাইন দু'টি যখনই ছোটবোনের উল্লেখ করে তখনই এক স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে আমাদের মনে। অন্যপক্ষে, প্রবল অপ্রতিরোধ্য উৎসারণে সমস্ত বাধা সরিয়ে সুস্পষ্ট প্রেমও অলোকরঞ্জনের কবিতায় জায়গা করে নিয়েছে। যেমন এই কবিতাটি:

একমাথা চুল নিয়ে ভালোবাসতে এলে পুরুষ 
আমার 
মুহূর্ত ভেবেছি আমি চারদিকে দেওয়াল তুলে দেব 
ভালোবাসবার

অবকাশ পাবে তুমি। খয়েরি রঙের সূর্য জ্বলে উঠে জলে গলে গেলে তবু

টালির সাধের রাঙা চৌকো বেয়ে তরতরে চাঁদ 
    ছেলেমানুষের মতো নেমে গেলে তবু  
     একমাথা চুল নিয়ে যুবন্ আমার 
     সারাদিন সারারাত দিন সারারাত
 হীরের চিরুনি দিয়ে ওরা যদি তোমার চুলের 
পরিচর্যা করতে আসে, তুমি, শুভ্র দুর্নীতি আমার 
প্রকাশ্যে আমার বুকে মাথা রেখে দাউদাউ কাঁদো


এ-কবিতার নাম ‘নারীর নিজস্ব'। এই কবিতার ভেতর থেকে আবেগদৃপ্ত =অলৌকিকতা বিস্ফোরিত হচ্ছে যেন। 'তুমি, শুভ্র দুর্নীতি আমার' এই প্রয়োগ ভাবা যায় না। আবার, 'সারাদিন সারারাত দিন সারারাত এই লাইনে দিনরাত্রি কতটা দীর্ঘ সে-কথা বোঝাতে হঠাৎ লাইনের মাঝখানে ‘দিন' শব্দটিকে একা ছেড়ে দেওয়াও আমাদের চিন্তার অতীত ছিল। যেমন, ‘দাউদাউ’ শব্দটিকে ‘কাঁদো' কথাটির আগে বসানো মাত্রই এক অপ্রত্যাশিতের আগমন ঘটল। উচ্ছ্বসিত কাম-বাসনার স্ফুরণ পাঠককে অভাবিতের স্বর্গে নিয়ে গেল। পত্রটি। উৎসর্গের পৃষ্ঠায় লেখা ছিল:

         'ট্রুডবার্টা হেসলিঙ্গার'

এই ট্রুডবার্টা-ই পরে অলোকরঞ্জনের ঘরণী হয়েছিলেন। কবিতাটি বলি এইবার। পাঁচ লাইনের ছোট্ট একটি কবিতা:

     কদম্ব দিল আরোগ্য ভোরবেলা 
   আমি তো রুগ্ন হবার আশায় নিজেকে 
            জ্বেলেছিলাম;
রেণুতে জড়ানো সবুজ রৌদ্র আমাকে দিল আরাম
আর আমি ধরা আরোগ্য নিয়ে তোমার কুমারীনাম 
 কেড়ে নিয়ে মুছে দিয়েছি তোমার নিজের সঙ্গে 
              খেলা

ভাইয়ের কথা এল কবিতায়, মায়ের কথা এল, এল প্রেমিকার কথা, প্রেমিকের কথাও। এসব পরিজনরা ঘুরে ঘুরে নিজেদের অবস্থান দেখিয়ে যাবেন অলোকরঞ্জনের সারাজীবনের কবিতায়। যেমন একটি কবিতা বলবে: “আমি যত গ্রাম দেখি/মনে হয়/মায়ের শৈশব/আমি যত গ্রামে যত মুক্তক পাহাড়শ্রেণী দেখি/মনে হয়/প্রিয়ার শৈশব...। পিতার কথাও আসবে কবিতায়। রক্তাক্ত ঝরোখা কাব্যগ্রন্থে একটি কবিতা পাব আমরা, যার নাম: ‘পিতার প্রতিমা'। যে-লেখার প্রথম লাইন হল: 'মালীর অভাবে পিতা বাগানের ভার নিয়েছেন... এর প্রায় এক দশকেরও বেশি পরে ‘জবাবদিহির টিলা' নামক কবিতার বইয়ে প্রথম কবিতাটিরই নাম ‘বাবা”। সে-কবিতার প্রথম স্তবক বলছে:

      তাঁর মাথার চুলগুলো এবার 
           ঘন সবুজ হয়ে আসছে 
 তিনি কোর্তার সঙ্গে মানিয়ে পড়েছেন ট্রাউজার 
       তাঁকে দেখাচ্ছে অবিকল পাড়ার
         এক মস্তানের মতো...

অন্যদিকে লঘুসংগীত ভোরের হাওয়ার মুখে নামক কবিতা-পুস্তকে আমরা অলোকরঞ্জনের কবিতায় আবারও দেখতে পাচ্ছি তাঁর মাকে। দু'টি লাইন মাত্র তুলে দিই:

    চলন্তিকা মা আমার খুব ছোট্ট দেখতে
       ঘুরে যাচ্ছেন তুলসীতলায়...

এইসব কবিতায় বাবা আর মার প্রতি ফুটে উঠেছে এক স্নেহ। এই স্নেহের নির্ঝর অলোকরঞ্জনকে সারাজীবন ছেড়ে যায়নি। আশি বছর বয়স পার করে এসেও তিনি একটি কবিতার বইয়ের নাম দিয়েছিলেন চিবুক ছুঁয়ে আশীর্বাদের মতো। কিন্তু আমরা তাঁর এই সাম্প্রতিক কবিতা বইটির দিকে আজ না হয় নাই বা গেলাম। পরিবর্তে আমার মনে আসছে ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ঝরছে কথা আতসকাচে কবিতাগ্রন্থের একটি কবিতার প্রথম দু'টি লাইনের স্মৃতি: 'যা, ওই পাথরটাকে পাহাড়ের পাশে রেখে আয়/বললেন বকুলপিসি...'। এরপর এ-কবিতাটির মধ্যে আমরা এই বিবরণ পাব যেখানে দেখব কবি তাঁর বকুলপিসিকে মথুরা বৃন্দাবন দেখাতে নিয়ে এসেছেন। এ-কবিতার শেষ দুটি লাইনে পাই আমরা: ‘এসব বলতে চাই, বলা হয় না, তবুও আমার/বকুলপিসির সঙ্গে বচসা, মথুরা প্যাসেঞ্জারে। অর্থাৎ আত্মীয় বকুলপিসিও এসে পড়লেন অলোকরঞ্জনের কবিতায়। যেমন অন্য একটি কবিতায় আমরা পাব শীলামাসির কথা।

এরপর আমরা ১৯৮৮ সালে অলোকরঞ্জনের ধুনুরি দিয়েছে টংকার কবিতাগ্রন্থের 'যুক্তি' নামক একটি কবিতায় দৃষ্টি ফেরাব। কবিতাটি আগে পাঠকদের কাছে উপস্থিত করি:

  ষ্টেশন মাস্টার, আপনি দয়া করে এই 
  লোকটিকে ছেড়ে দিন, বুড়ো লোকটার 
        ত্রিসংসারে কেউ নেই।

 একজন আছে বটে— দূর সম্পর্কের— সে-ও 
            টিকিটবিহীন—
খুড়ো-বলে-ডাকা-সেই- সৌদাসের ছোট্ট ছেলেটা, 
খুড়ো বলে কেন ডাকে ঈশ্বর জানেন। খুব ক্ষীণ

আরও একজন আছে, হয়তো দূরতর সম্পর্কের
অথচ আত্মীয় ওর।।    আমি সেইজন। 
আরও একজন, আপনি, আপনি ছাড়া ওর 
কেউ নেই।

তাছাড়া আপনার নয় একচেটিয়া কানিং স্টেশন।

এই কবিতাটি পড়ে প্রথমে বিস্ময়ে ও মুগ্ধতায় হতবাক হতে হয় । অলোকরঞ্জনের কবিতায় তাঁর ভাইয়ের কথা এসেছে, মায়ের কথা এসেছে, বাবার কথা এসেছে, এসেছে প্রেমিকা ও স্ত্রীর কথাও। লম্বুসংগীত ভোরের হাওয়ার মুখে কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতাখন্ড তুলে যদি দেখি সেখানে বলা হচ্ছে: 'আমরা দুজন দুদিক থেকে আমাদের পিতাকে/ তর্জমা করে দিচ্ছি অন্যভাষার কবিতা/ আমাদের পিতার বয়স বাড়ছে, যেমন সচারচর সবারই বয়স হতে থাকে/ আমাদের দুজনেরও বয়স বাড়ছে, অভিজ্ঞতা অর্থাৎ‍ স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে বৃদ্ধ সেই পিতাকে কবিতা অনুবাদ করে দিচ্ছেন, এ-ও স্নেহের প্রকাশ, সন্তানদের স্নেহ পিতার প্রতি।

তা হলে কী প্রমাণ হচ্ছে? অলোকরঞ্জনের কবিতায় এক এক করে দেখা দিচ্ছেন। পরিজন মানে আত্মীয়। ধুনুরি দিয়েছে টাকার বইয়ের "যুক্তি" কবিতাটি প্রমাণ করে দিচ্ছে, সম্পূর্ণ অচেনা, ট্রেনের টিকিটহীন অবস্থায় ধরা পড়া দরিদ্র বুড়ো লোকটিও কিন্তু অলোকরঞ্জনের পরিজন হয়ে উঠলেন। কবিতাটি স্পষ্ট গলায় বলছে: 'আরও একজন আছে, হয়তো দূরতর সম্পর্কের/ অথচ আত্মীয় ওর। আমি সেইজন।' মুহূর্তের মধ্যে পরিজনদের সীমা বিস্তারিত হতে হতে অচেনা দরিদ্র বৃদ্ধকেও আত্মীয় করে নিল এই কবির মন। কিন্তু শুধু এইখানেই থামল না কবিতাটি। বিশ্বের প্রতিটি মানুষ যে প্রতিটি মানুষের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, সেই বার্তাও এই কবিতা জানিয়ে দিল যখন শেষ লাইনের আগের লাইনটি বলল: 'আরও একজন, আপনি, আপনি ছাড়া এর কেউ নেই।' আশ্চর্যের কথা, এরপর শেষ লাইনটি নীচু গলায় ঘোষণা করল মানুষের সঙ্গে মানুষের এই আত্মীয়তাকে যদি কেউ স্বীকার করতে না চায় তাহলে আমরা রাগ করতেও জানি।

নিজের একান্ত পরিজনদের থেকে অলোকরঞ্জনের হৃদয়ে স্নেহ-সীমান্ত ব্যপ্ত হয়ে পড়ল। সমস্ত পৃথিবীর মানুষকে আপন পরিবারের অন্তর্গত করে নিয়ে। সেই কারণেই অলোকরঞ্জনের বয়স যত বেড়েছে পৃথিবীর সকল দেশের শরণার্থীদের প্রতি উদ্বাস্তুদের প্রতি তাঁর মন ব্যথায় কম্পিত হয়েছে, উদ্বেগে স্পন্দিত হয়েছে। এই আত্মীয়তাবোধ থেকেই বিশ্বের যেখানে যত যুদ্ধ ঘটেছে অলোকরঞ্জনের কবিতায় তার ক্রুদ্ধ প্রতিবাদ দেখা গেছে। এমনকী যুদ্ধের ছায়ায় নামক একটি বইও তিনি প্রকাশ করেছেন যে-গ্রন্থের পশ্চাদপটের বিবরণ আমরা তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনা থেকে জানতে পেরেছি সম্প্রতি। উপসাগরীয় যুদ্ধের বিরুদ্ধে যেমন তিনি কলম ধরেছেন তেমনই এই পশ্চিমবঙ্গে সংঘটিত নন্দীগ্রামের গণহত্যার বিপক্ষেও নিতান্তই ক্ষুদ্র লিটল ম্যাগাজিন বিজল্প থেকে প্রকাশ করেছেন তাঁর কবিতা দ্বারা রচিত প্রতিরোধ পুস্তিকা গোলাপ এখন রাজনৈতিক। এখানে বলে রাখা ভাল, সমস্ত জীবন ধরেই অলোকরঞ্জন বাংলার অজস্র লিটল ম্যাগাজিনে অকৃপণভাবে তাঁরকবিতা ও গদ্য বিলিয়ে দিয়ে গেছেন।

এখানে আরও বলে রাখা ভালো, তাঁর জীবনের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, বিশ্বের সকল কবিও তাঁর পরিজন হয়ে উঠেছেন। শতাব্দ প্রাচীন কবিরাও ধরা পড়েছেন অলোকরঞ্জনের আত্মীয়তাবোধের মধ্যে। কবি শঙ্খ ঘোষকে সঙ্গে নিয়ে অলোকরঞ্জন সম্পাদনা করেছেন অনুবাদের এক মহাগ্রন্থ যার নাম সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত – যেখানে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশের কবিতার বাংলা অনুবাদ স্থান পেয়েছে। বন্ধু আলোক সরকারের সঙ্গে তৈরি করেছেন আরও এক অনুবাদের বই যার নাম ভিনদেশী ফুল। নিজে প্রকাশ করেছেন সোফোক্লিসের আস্তিগনে নাটকের কাব্যানুবাদ, কবি হোল্ডারলিনের কবিতার তর্জমা-গ্রন্থ নিয়তি ও দেবযান। সেইসঙ্গে প্রস্তুত করেছেন ব্রেশটের কবিতা, ব্রেশটের ডাইরি ও ভোলফ বিয়ারমানের কবিতার ভাষান্তর। মহাকবির গোয়েটের লেখা অনুবাদ করেছেন যার নাম প্রাচীপ্রতিচীর মিলনবেলার পুঁথি। পাশাপাশি, আমাদের দেশের সন্ত কবি সুরদাস-কেও নতুন করে তুলে ধরেছেন অলোকরঞ্জন তাঁর সুরদাস সঞ্চয়িতা নামক বইতে।

গ্রন্থপঞ্জীসম্পাদনা

তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল:[২][৫]

  • যৌবনবাউল (১৯৫৯)
  • নিষিদ্ধ কোজাগরী
  • রক্তাক্ত ঝরোখা (১৯৬৯)
  • ছৌ-কাবুকির মুখোশ (১৯৭৩)
  • গিলোটিনে আলপনা (১৯৭৭)
  • দেবীকে স্নানের ঘরে নগ্ন দেখে (১৯৮৩)
  • মরমী করাত (১৯৯০)
  • আলো আরো আলো (২০০৯)
  • সে কি খুঁজে পেল ঈশ্বরকণা (২০১২)
  • নিরীশ্বর পাখীদের উপাসনালয়ে (২০১৩)
  • এখন নভোনীল আমার তহবিল (২০১৪)
  • পাহাড়তলীর বাস্তুহারা
প্রবন্ধগ্রন্থ
  • শিল্পিত সমাজ (১৯৬৯)
  • স্থির বিষয়ের দিকে (১৯৭৬)
অনুবাদ ও সংকলন গ্রন্থসমূহ
  • সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত
  • প্রাচী-প্রতীচীর মিলনমেলার পুঁথি
  • প্রেমে পরবাসে (১৯৮৩)
  • হাইনের কবিতা
  • অঙ্গীকারের কবিতা (১৯৭৭)

তার রচিত অন্যান্য গ্রন্থগুলির মধ্যে আছে শরণার্থীর ঋতু ও শিল্প ভাবনা , আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৯৩। আইএসবিএন ৮১-৭২১৫-১৫৯-৪, ভ্রমনে নয় ভুবনে , আনন্দ পাবলিশার্স। আইএসবিএন ৮১-৭০৬৬-১৪৫-৫, ছায়াপথেরা সান্দ্র সমলাপিকা , আনন্দ পাবলিশার্স। আইএসবিএন ৮১-৭২১৫-২৭৭-৯, এখনো নামেনি, বন্ধু, নিউক্লিয়ারা শীতের গোধূলি , আনন্দ পাবলিশার্স। আইএসবিএন ৮১-৭২১৫-৯৯৬-X, জ্বরের ঘোরে তরাজু কেঁপে আয়, সমবায়ী শিল্পেরা গরজে, তুষার জুড়ে ত্রিশূলচিহ্ন, দক্ষিণ এশীয় ভাষাগুলি থেকে অনুবাদে সমস্যা , (ইউনিভার্সিটিট হাইডেলবার্গ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত দ্বারা), ভারতীয় কবিতায় লিরিক (১৯৬২), দ্য মিস্টিক্যাল স অ্যান্ড আদার পোয়েমস (রোল্যান্ড হিন্দ্মার্শ, সাহিত্য আকাদেমি, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত দ্বারা) (১৯৯৬)

পুরস্কারসম্পাদনা

দাশগুপ্ত অনেক পুরস্কার এবং সম্মান পেয়েছেন। তার মধ্যে আছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সুধা বসু পুরস্কার (১৯৮৩), জার্মানিতে গ্যয়ঠে পুরস্কার (১৯৮৫), আনন্দ পুরস্কার (১৯৮৫), প্রবাসী ভারতীয় সম্মান (১৯৮৫), রবীন্দ্র পুরস্কার (২০০৪), তার কবিতার বই মরমী করাত (অনুবাদ করেছেন দ্য মিস্টিক্যাল স অ্যান্ড আদার পোয়েমস) এর জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৯২)[৩] এবং প্রবাসী ভারতীয় সম্মান (২০০৫)।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "প্রয়াত অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত"কলকাতা টিভি। ২০২০-১১-১৮। ২০২০-১১-১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১১-১৮ 
  2. শিশিরকুমার দাশ সংকলিত ও সম্পাদিত, সংসদ বাংলা সাহিত্যসঙ্গী, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, আগস্ট ২০১৯, পৃষ্ঠা ১৭ আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৯৫৫-০০৭-৯ আইএসবিএন বৈধ নয়
  3. Parabaas.com
  4. "Hindustan Times"। ৩০ মে ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৩ নভেম্বর ২০১৯ 
  5. "'দেশে ফেরা হল না কবি অলোকরঞ্জনের"। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১১-১৯