প্রধান মেনু খুলুন

আন্দামানি জাতি

আন্দামান দীপপুঞ্জের অধিবাসী

আন্দামানি জাতি বলতে, ভারতের কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল, দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরের দ্বীপভূমি আন্দামানের প্রাচীন উপজাতিগুলিকে বোঝানো হয়। ধারনা করা হয় কৃষ্ণ বর্ণ এই উপজাতি নেগ্রিটো প্রজাতির। বিচ্ছিন্ন ভাবে এরা শিকার ও সংগ্রহ প্রক্রিয়ার মাধ্যম্যেই জীবিকা নির্বাহ করে হাজার বছর ধরে টিকে আছে। মূলত পাঁচটি শ্রেনীতে আন্দামানী উপজাতিকে বিভক্ত করা যায়। বৃহত্তর আন্দামানে, গ্রেট আন্দামানিস আর জারোয়া জাতিগোষ্ঠী, রুটল্যান্ড দ্বীপে জাঙ্গিল, লিটল আন্দামানে ওংগি এবং বিচ্ছিন্ন সেন্টিনেলি দ্বীপের সেন্টিনেলিস'রা। আঠেরো শতকের শেষভাগে যখন প্রথম বহিঃ জগতের সংস্পর্শে আসে তখন মোট আন্দামানি জাতির জনসংখ্যা ছিল ৭০০০। পরের শতাব্দীতে রোগ ব্যাধি, হিংসা এবং ভুখণ্ডের ধ্বংসের কারনে বিপুল সংখ্যায় কমে যায় আন্দামানিরা। বর্তমানে তাদের সংখ্যা ৪০০-৪৫০। জারোয়া ও সেন্টিনেলিজরা তীব্রভাবে বাইরের জগতকে এড়িয়ে চলে ও স্বাধীনভাবে থাকতে ভালবাসে। আন্দামানিরা ২৬ হাজার বছর আগে এখানে আসতে শুরু করে। সমস্ত আন্দামানিরাই তপশিলী উপজাতি হিসেবে বিবেচ্য।

ইতিহাসসম্পাদনা

বহিরাগত অভিযাত্রী, বিদেশীদের প্রতি বৈরিভাবের কারনে অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ অবদি আন্দামানিদের জীবনযাত্রা, জীনগত ইতিহাস, সংস্কৃতি অজানা ছিল। বিচ্ছিন্ন দ্বীপে হাজার বছর ধরে তারা বসবাস করে এসেছে কোনো বহির্জগতের সাথে যোগাযোগ ছাড়াই। এর মধ্যে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজের বিদেশী যাত্রী হত্যা করেছে, বিভিন্ন উপজাতি পরস্পরের পক্ষে দুরবোধ্য ভাষার ব্যবহার চালিয়ে আসছে। হাজার বছর ধরে যা অব্যাহত।

উৎসসম্পাদনা

চৌবে এবং এন্ডিকটের মতানুযায়ী আন্দামানের আদি বাসিন্দারা ২৬০০০ বছর আগেও বসতি স্থাপন করে এবং এরা সরাসরি আফ্রিকা থেকে দেশান্তরিতদের বংশধর নয়। ওয়াং এটাল এর মতে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জর আধুনিক মানবজাতি সম্ভবত উত্তর - পুর্ব ভারত থেকে এসে বসতি সৃষ্টি করে এবং তারা বর্মা ও আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের ভেতর ভুখন্ডের সেতু দ্বারা আসে লাস্ট গ্লেসিয়াল ম্যাক্সিমাম সময়ে। যে প্রমাণ পাওয়া যায় তা ভাষাগত ও ভূতত্বগত পরীক্ষা নিরীক্ষার সাহায্যে লব্ধ হয়েছে।

আগে এরকম ভাবা হত যে আন্দামানের পূরবপূরুষরা বৃহৎ উপকূলিয় পরিগমনের একটি শাখা যা আফ্রিকা হতে ব্যাপক মানুষের অভিগমন আরব উপদ্বীপের ভেতর দিয়ে এবং ভারতীয় মূল ভুখন্ডের ভেতর দিয়ে। যারা দক্ষিণ পুর্ব এশিয়া জাপান এবং ওশিয়ানিয়া তেও ছড়িয়ে পড়ে। আন্দামানিদের মনে করা হয় নেগ্রিটো উপজাতির আদিমতম দৃষ্টান্ত। যাদের ভেতর দৈহিক সাদৃশ্য দেখে ভাবা হয় এরা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতেই এদের অস্তিত্ব আছে। অবশ্য এযুগে নিরদিষ্টভাবে নেগ্রিটো আদিবাসীর অস্তিত্ব সন্দেহযুক্ত। তাদের জাতির ভেতরে সাধারন গুনাবলী গুলি বিবর্তনজাতও হতে পারে।

জনসংখ্যা হ্রাসসম্পাদনা

১৮৬৭ সালে ব্রিটিশ সরকার আন্দামানিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক অভিযান পরিচালনা করে লিটল আন্দামান অঞ্চলে। আন্দামানিদের এতকালের রক্ষনকারী বিচ্ছিন্নতা পরিবর্তিত হয় উপনিবেশ স্থাপনের কারনে, ফলত বসতি স্থাপন হয় এবং এটা মূলবাসি আন্দামানিদের কাছে খুবই বিপর্যয়কর হয়ে ওঠে। ১৭৮৯ ব্রিটিশ উপনিবেশ গড়ে ওঠার পর পরেই রোগ প্রতিরোধক্ষমতা না থাকায় ইউরোপ ও এশিয়া দেশীয় রোগের প্রাদুর্ভাবের দরুন বিপুল সংখ্যক জারোয়াদের চার বছরের (১৭৮৯-১৭৯৩) ভেতরে জনসংখ্যার তীব্র হ্রাস ঘটে। নিমোনিয়া, হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদি রোগ মহামারী রূপে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল ও বহু মূলবাসী আন্দামানি মারা যায়। ১৮৭৫ নাগাদ আন্দামানীরা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ১৮৮৮ তে ব্রিটিস সরকার তাদের উপহার দেওয়ার নীতি প্রনয়ন করে যা বিংশ শতাব্দি পর্যন্ত চলে আসে।

সাম্প্রতিক ইতিহাসসম্পাদনা

১৯৭৪ সালে নৃতত্ববিদ ত্রিলোকনাথ পন্ডিত উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপে গিয়ে অধিবাসীদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তার সাথে ছিল পাত্র, বাসনপত্র, ফল, শুকর ইত্যাদি। কিন্তু একজন দ্বীপবাসী তাকে লক্ষ্য করে তীর ছোঁড়ে। ইউরোপিয়ান অভিযাত্রীরাও সেন্টিনেলিদের তীরের সম্মুখীন হয়। ১৯৮১ সালের ২ আগস্ট হংকং এর জাহাজ প্রাইমরস নোংগর করে সেন্টিনেল দ্বিপের কাছে। দ্বীপবাসীরা আক্রমনের প্রস্তুতি নিলে দেখে ফেলে একজন নাবিক। এমন অবস্থায় জাহাজের ক্যাপ্টেন বেতারে অস্ত্র সাহায্যের আবেদন করেন কিন্তু কোনো ফল হয়নি, সাহায্য আসেনি। সমুদ্রের ঢেউয়ে যদিও অধিবাসীরা জাহাজের নিকট আসতে পারেনি। এক সপ্তাহ পর ভারতীয় নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার তাদের উদ্ধার করেছিল। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের, ৪ জানুয়ারী ভারতীয় পন্ডিত ও নৃতাত্বিক ত্রিলোকনাথ প্রথম তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন। ১৯৯৬ সাল অবধি জারোয়ারা বহিরাগতদের তিরের ফলায় অভ্যর্থনা জানাতো কারন এর আগে বিভিন্ন সময় তারা চোরাশিকারী দ্বারা আক্রান্ত ও নিহত হয়। জারোয়া অধ্যুষিত অঞ্চল দিয়ে আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড গড়ে তোলার সময় বহু শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে তাদের হাতে। শান্তিপূর্ন বন্ধুত্ব প্রথম তাদের সাথে গড়ে ওঠে ১৯৯৬ সাল নাগাদ। এমমি নামে একটি জারোয়া বালককে কদমতলা শহরের কাছে পা ভাঙ্গা অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় অধিবাসিরা। এমমি জংগলে ফিরে যাওয়ার আগে কিছু হিন্দি শব্দ শিখে যায়। তার পর থেকে জারোয়ারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে সড়কের আশেপাশে আসতে থাকে। সাহস করে তারা খাবার ইত্যাদিও চুরি করে খেত মাঝে মাঝে।

প্রজাতিসম্পাদনা

ইউরোপিয়ান উপনিবেশিক রা আন্দামানিদের পাঁচটি গোষ্ঠিতে ভাগ করে।

১. গ্রেট আন্দামানি- এরা বর্তমানে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জর স্ট্রেইট দ্বীপের বাসিন্দা যাদের সংখ্যা ২০১০ সালে ছিল ৫২ জন।

২. জারোয়া- বৃহত্তম আন্দামানের বাসিন্দা, সংখ্যায় ২৫০ থেকে ৪০০

৩. জাংগিল- রুটল্যান্ড দ্বীপের বাসিন্দা, বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায়

৪. ওংগি - লিতল আন্দামানে থাজে, বর্তমানে ১০০ এরও কম।

৫ সেন্টিনেলিজ- নর্থ সেন্টিনেল দ্বীপে থাকে। সংখ্যায় ১০০ থেকে ২০০

ভাষাসম্পাদনা

সংস্কৃতিসম্পাদনা

সভ্য সমাজের সংস্পর্শে আসার আগে আন্দামানিরা শিকারী ও সংগ্রাহক প্রকৃতির ছিল, কৃষিকাজ করতনা। শুকর, মাছ শিকার, ফলমূল সংগ্রহ করে থাকত তীর, ধারালো হারপুন ইত্যাদি দ্বারা। তাসমানিয়ার এবরজিনিসরা ছাড়া আআন্দামানীরাই উনবিংশ শতকের একমাত্র উপজাতি ছিল যারা আগুনের ব্যবহার জানতনা। এর বদলে তারা এম্বার সংগ্রহ করে রাখত ফাপা গাছের ভেতর যা বজ্রবিদ্যুতের ফলে আগুনের সৃষ্টি করত যার নাম এরা দেয় চাড্ডা।

উপজাতিদের ভেতর কয়েকজনের অলৌকিক ক্ষমতা আছে বলে বাকিরা মনে করে। এদের বলা হয় 'ওকো পাই আদ'। এর অর্থ স্বপ্নদ্রষ্টা। উপজাতির ওপর এদের বিরাট প্রভাব থাকে,যারা এই ক্ষমতাবানকে বিশ্বাস করেনা তারা হতভাগ্য। ভেষজ গাছ গাছাড়া ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করে যারা চিকিৎসা বিদ্যার চর্চা করে তারা। এরা বংশ পরমপরায় করে আসে এই কাজ এবং এযাবৎ ৭৭ জন উপজারি চিকিৎসা বিদ, ১৩২ রকম ভেষজ গাছএর সন্ধান পাওয়া গেছে। গাছের পাতাকে আন্দামানিরা নানাধরনের কাজেই ব্যবহার করে থাকে।

শারিরীক গঠনসম্পাদনা

জিনগত বৈশিষ্ট্যসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা