আদম ও হাওয়া

আদি পিতা ও মাতা

আদম ও হাওয়া ইব্রাহিমীয় ধর্মাবলম্বীদের মতাদর্শ অনুযায়ী পৃথিবীর প্রথম পুরুষ ও নারী।[১][২] মানব প্রজাতির বিস্তার তাঁদের মাধ্যমেই শুরু হয়েছে বলে ধারনা করা হয়। তাঁদের মাধ্যমেই সমগ্র মানব জাতিকে একই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত করা হয় যেখানে আদম ও হাওয়া আদি পিতা ও মাতা। [৩] এটি মানব পতনের মতবাদ এবং মূল পাপের মতবাদ গুলিরও ভিত্তি হিসেবে ধরা হয় যা খ্রিস্টধর্মে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস, যদিও ইহুদী বা ইসলাম ধর্মে এগুলো অনুপস্থিত।[৪]

হিব্রু বাইবেলের জেনেসিস পুস্তকে, এক থেকে পাঁচ অধ্যায় পর্যন্ত দুটি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি সহ সৃষ্টির বিবরণ রয়েছে। প্রথমটিতে, আদম এবং হাওয়ার নাম নেই। তার পরিবর্তে উল্লেখ আছে, আল্লাহ মানব-জাতিকে তাঁর আকারে সৃষ্টি করেছিলেন এবং তাদের সংখ্যাবৃদ্ধি ও আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার সমস্ত কিছুর উপরে চালক হতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বর্ণনায় বলা হয়েছে, আল্লাহ আদমকে ধূলিকণা থেকে রক্ষা করেন এবং বেহেশতের বাগানে রাখেন। আদমকে বাগানের সমস্ত গাছের ফল খাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছিল কেবল একটি নির্দিষ্ট গাছ ব্যাতিত। পরবর্তীকালে হাওয়াকে আদমের পাঁজরের একটি হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছিল। এভাবে একদা একটি সর্প হাওয়াকে বিভ্রান্ত করে নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ায়, সে আদমকেও ফলটির কিছু অংশ খেতে দেয়। আল্লাহ আদম ও হাওয়াকে তাঁদের কৃতকর্মের জন্য তিরস্কার করেন এবং বেহেশত থেকে তাঁদের কে বিতাড়িত করেন।

পৌরাণিক কাহিনীটি পরবর্তী আব্রাহামিক ঐতিহ্যগুলোতে বিস্তৃতভাবে সংযুক্ত ছিল এবং আধুনিক বাইবেলের পণ্ডিতরা এটির ব্যাপক বিশ্লেষণ করেছেন। আদম ও হাওয়া সম্পর্কিত কাহিনীটির ব্যাখ্যা এবং বিশ্বাস এর সাথে সম্পর্কিত ইব্রাহীমিয় ধর্ম গুলোতে ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ লক্ষণীয়। যেমনঃ ইসলামিক সংস্করণে এই পাপের জন্য হাওয়াকে এককভাবে দোষী সাব্যস্ত করার পরিবর্তে, আদম এবং হাওয়া সমানভাবে দায়ী ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইব্রাহীমিয় ঐতিহ্যেসম্পাদনা

ইহুদীধর্মমতসম্পাদনা

প্রাচীন ইহুদি ধর্মেও স্বীকৃত ছিল যে মানুষের সৃষ্টির জন্য দুটি স্বতন্ত্র বিবরণ রয়েছে। প্রথম বিবরণে বলা হয়েছে "আল্লাহ পুরুষ এবং মহিলা একত্রে সৃষ্টি করেছেন", যা যুগপত সৃষ্টিকে বোঝায়, দ্বিতীয় বিবরণে বলা হয়েছে যে আল্লাহ আদম সৃষ্টির পরবর্তী সময়ে হাওয়াকে সৃষ্টি করেছেন। মিদরাশ রাব্বাহ - আদিপুস্তক অষ্টম: ১ জেনেসিসে উভয় মতবাদকে সংযুক্ত করে বলা হয়েছে যে, "তিনি একজনকেই পুরুষ এবং স্ত্রী আকারে সৃষ্টি করেছেন", যেটি নির্দেশ করে যে আল্লাহ আদম ও হাওয়াকে সৃষ্টির আগে শারীরিকভাবে এবং আধ্যাত্মিকভাবে উভয়লিঙ্গ প্রাণী তৈরি করেছিলেন।[৫] অন্যান্য রাব্বীদের মতে হাওয়া এবং উভয়লিঙ্গ প্রাণীটি পৃথক সৃষ্টি ছিল, যার নাম ছিল লিলথ

ইসলাম ধর্মমতসম্পাদনা

ইসলামে, আদম (;دام; আরবি: آدم), যার ভূমিকা মানবজাতির জনক হিসেবে, মুসলমানরা তাকে শ্রদ্ধার সাথে দেখেন। হাওয়া (Ḥawwāʼ; আরবি: حواء) ​​হ'ল "মানবজাতির জননী"।[৬] কুরআনে আদম ও হাওয়ার সৃষ্টি সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও বিভিন্ন কুরআনের অনুবাদক আসল সৃষ্টির কাহিনী সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন (কুরআন, সুরা আল-নিসাʼ, আয়াত ১)।[৭] কুরআনের মতে আদম ও হাওয়া উভয়েই বেহেশতের বাগানের নিষিদ্ধ ফল খেয়েছিলেন। ফলশ্রুতিতে তাঁদেরকে বেহেশত হতে বিতাড়িত করে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসাবে পৃথিবীতে নামানো হয়। প্রত্যেককে আলাদা পর্বতশৃঙ্গে প্রেরণ করা হয়েছিলঃ আদমকে আল-সাফা পর্বতশৃঙ্গে এবং হাওয়াকে আল-মারওয়া পর্বতশৃঙ্গে। ইসলামী সূত্র মতে আদম ৪০ দিন পর্যন্ত কেঁদেছিলেন যতক্ষণ না তিনি ক্ষমা প্রাপ্ত হন, অতপর আল্লাহ তাঁকে হাজরে আসওয়াদ প্রদান করেন এবং হজের পদ্ধতি শিক্ষাদান করেন। হাদিস অনুসারে আদম ও হাওয়া মক্কার নিকটে আরাফাতের সমভূমিতে পুনরায় মিলিত হয়েছিলেন।[৮] তাঁদের দুটি পুত্র সন্তান জন্মলাভ করে, কাবিল ও হাবিল। রোকাইল নামে তাঁদের অপর একটি সন্তানের কথাও প্রচলিত রয়েছে, সে অসংখ্য মূর্তি সম্বলিত একটি প্রাসাদ এবং সমাধিসৌধ তৈরি করে।[৯] "আসল পাপ" ধারণাটি ইসলামে বিদ্যমান নেই, কারণ ইসলাম অনুসারে আদম ও হাওয়াকে আল্লাহ ক্ষমা করেছিলেন। আল্লাহ যখন ফেরেশতাদেরকে আদমকে সিজদা করার নির্দেশ দেন, তখন ইবলিস প্রশ্ন করেছিল, "কেন আমি মানুষের কাছে মাথা নত করব? আমি খাঁটি আগুনের তৈরি এবং সে মাটি দিয়ে তৈরি।"[১০]

তথ্য সূত্রসম্পাদনা

  1. Womack, Mari (২০০৫)। Symbols and Meaning: A Concise Introduction। Walnut Creek ... [et al.]: Altamira Press। পৃষ্ঠা 81। আইএসবিএন 978-0759103221। সংগ্রহের তারিখ ১৬ আগস্ট ২০১৩Creation myths are symbolic stories describing how the universe and its inhabitants came to be. Creation myths develop through oral traditions and therefore typically have multiple versions. 
  2. Leeming, David (২০১০)। Creation Myths of the World: Parts I-II। পৃষ্ঠা 303। 
  3. Azra, Azyumardi (২০০৯)। "Chapter 14. Trialogue of Abrahamic Faiths: Towards an Alliance of Civilizations"। Ma'oz, Moshe। The Meeting of Civilizations: Muslim, Christian, and JewishEastbourne: Sussex Academic Press। পৃষ্ঠা 220–229। আইএসবিএন 978-1-845-19395-9 
  4. Alfred J., Kolatch (১৯৮৫)। The Second Jewish Book of Why (2nd, revised সংস্করণ)। New York City: Jonathan David Publishers। পৃষ্ঠা 64আইএসবিএন 978-0-824-60305-2  Excerpt in Judaism's Rejection Of Original Sin.
  5. Howard Schwartz (সেপ্টেম্বর ২০০৪)। Tree of Souls: The Mythology of Judaism: The Mythology of Judaism। পৃষ্ঠা 138। আইএসবিএন 978-0195086799। সংগ্রহের তারিখ ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪The myth of Adam the Hermaphrodite grows out of three biblical verses 
  6. Historical Dictionary of Prophets in Islam and Judaism, Wheeler, "Adam and Eve"
  7. কুরআন 4:1:O mankind! Be dutiful to your Lord, Who created you from a single person (Adam), and from him (Adam) He created his wife Hawwa (Eve), and from them both He created many men and women;
  8. Wheeler, Brannon (জুলাই ২০০৬)। Mecca and Eden: Ritual, Relics, and Territory in Islam – Brannon M. Wheeler – Google Books। পৃষ্ঠা 85। আইএসবিএন 9780226888040। সংগ্রহের তারিখ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ 
  9. Godwin, William (১৮৭৬)। Lives of the Necromancers (ইংরেজি ভাষায়)। Chatto and Windus। পৃষ্ঠা 112–113। ১২ জুন ২০০৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৯ জানুয়ারি ২০১৯ 
  10. কুরআন 7:12