সন্দীপন পাঠশালা

সন্দীপন পাঠশালা হল বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা একটি উপন্যাস। ১৩৫২ বঙ্গাব্দে কৃষক পত্রিকায় এটি উদয়াস্ত নামে প্রকাশিত হয়েছিল।[১] ১৯৪৬ সালে উপন্যাসটি প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।[২] এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য এক গ্রাম্য পাঠশালার গুরুমশাইয়ের জীবনের বিয়োগান্তক কাহিনি।[৩] উপন্যাসের ভূমিকায় তারাশঙ্কর লিখেছিলেন, "বাংলাদেশের শিক্ষক-জীবন অবহেলিত, অনাদৃত। পাঠশালার শিক্ষক বা পণ্ডিতমহাশয়দের তো কথাই নাই। এদের সুখ-দুঃখ অবহেলিত, সমাজ-জীবনে সামান্যতম সম্মান থেকেই এঁরা বঞ্চিত। এঁদের নিয়ে দু-চারটি হাস্যরসাত্মক রচনা আমাদের সাহিত্যে আছে— সেইগুলিই এঁদের প্রতি অবহেলার নিদর্শন। সীতারাম আমার কাছে বাস্তব; তার মনের পরিচয় বহুবার পেয়েছি। তাকে সাহিত্যে রূপদানের বাসনা ছিল, এতদিনে তা সম্ভবপর হওয়ায় আমি নিজে আনন্দিত হয়েছি সবচেয়ে বেশি।"[১] কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন প্রধান অধ্যাপক ড. অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়ের মতে, সন্দীপন পাঠশালা তারাশঙ্করের উপন্যাস রচনার দ্বিতীয় পর্বের (১৯৩৯-১৯৪৬) অন্তর্গত। তাঁর মতে, এই পর্বের উপন্যাসগুলি "আদর্শবাদের চড়া সুরে বাঁধা"। সন্দীপন পাঠশালা-র নায়ক সীতারাম পণ্ডিত সেই কারণেই ভারতের এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে।[৪]

সন্দীপন পাঠশালা
লেখকতারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
কাজের শিরোনামউদয়াস্ত
দেশভারত
ভাষাবাংলা
ধরনউপন্যাস
প্রকাশকমিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা
প্রকাশনার তারিখ
১৯৪৬
মিডিয়া ধরনছাপা (শক্তমলাট)
পৃষ্ঠাসংখ্যা১৯৭

কাহিনি-সারাংশসম্পাদনা

সন্দীপন পাঠশালা উপন্যাসের আখ্যানবস্তুর সূচনাকাল ১৮৯৩-৯৪ সাল। চাষির ছেলে সীতানাথ ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলেও গ্রামে শিক্ষা বিস্তারে জীবন উৎসর্গিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯১৯ সালে সে গ্রামে একটি পাঠশালা খোলে। কিন্তু তার পাঠশালা চালানোর প্রাথমিক প্রয়াসটি উচ্চবর্ণীয় গ্রামবাসীদের ঈর্ষার কারণে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তারা পুলিশকে খবর দেয় যে, সীতানাথ চরকা কাটেন এবং জাতীয়তাবাদী ধ্যানধারণা প্রচার করেন। একজন নিম্নবর্ণীয়ের শিক্ষাদানের প্রয়াস তাদের চোখে ঔদ্ধত্য মনে হয়েছিল। সীতানাথের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন গ্রামের বিধবা জমিদার-পত্নী। তাঁর পুত্র ধীরানন্দ ছিলেন সীতানাথের প্রাক্তন ছাত্র। ১৯২১ সালে ধীরানন্দ গ্রেফতার হন। পুলিশ সীতানাথকে পাঠশালাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য করে। কিন্তু সীতানাথ খোলা আকাশের নিচে গাছের তলায় আর একটি পাঠশালা স্থাপন করে। তাঁর ছাত্ররা ছিল গ্রামের দরিদ্রতম পরিবারগুলির সন্তান। তাঁর একজন ছাত্র বৃত্তিও লাভ করে। বহু বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে এবং তীব্র দারিদ্র্যের মধ্যেও সীতানাথ পাঠশালাটি চালিয়ে যান। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্পূর্ণ উপেক্ষিতই থেকে যায়। ১৯৩০ সালে একটি সম্মেলনে গ্রামে গ্রামে অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে সীতানাথ নিজেকে পুরষ্কৃত মনে করেন। তাঁর চোখের অসুখ ধরা পড়ে এবং তিনি প্রায় অন্ধ হয়ে গেলে অবসর গ্রহণে বাধ্য হন। ইতিমধ্যে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু ঘটে এবং তাঁর একমাত্র কন্যা রত্না বিধবা হয়। সীতানাথ নিজের নিয়তি মেনে নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হল। ধীরানন্দ তখন নামকরা লেখক। তিনি সীতানাথের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। সীতানাথকে কলকাতায় নিয়ে যেতে চাইলেন চক্ষু পরীক্ষা করার জন্য। সীতানাথ যেতে চাইলেন না। বললেন, "কি দেখব চোখ দিয়ে? রত্নার বিধবা মূর্তি? থাক্। অন্ধ চোখে আমি ভগবানকে দেখবার চেষ্টা করব। আপনার মা বলেছিলেন – আমি পাব দেখতে। দেখি পাই কিনা।" ধীরানন্দ তাঁকে প্রণাম করলেন।

চলচ্চিত্রায়নসম্পাদনা

১৯৪৯ সালে পরিচালক অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায় সন্দীপন পাঠশালা উপন্যাস অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন।[৫] এই ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেন সুপ্রভা মুখোপাধ্যায়, মীরা সরকার, সাধন সরকার, অমিতা বসু, ভূপেন চক্রবর্তী ও জীবন মুখোপাধ্যায়।[৬] এই ছবিতে সুচিত্রা মিত্রের নেপথ্যকণ্ঠে "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে" রবীন্দ্রসংগীতটি ব্যবহৃত হয়েছিল।[৭]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. ভূমিকা, সন্দীপন পাঠশালা, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, পৌষ ১৪২৬ মুদ্রণ, পৃ. ৭
  2. মেকার্স অফ ইন্ডিয়ান লিটারেচার: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (ইংরেজি), মহাশ্বেতা দেবী, সাহিত্য অকাদেমি, নতুন দিল্লি, ১৯৭৫ সংস্করণ, পৃ. ৭২
  3. মেকার্স অফ ইন্ডিয়ান লিটারেচার: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (ইংরেজি), মহাশ্বেতা দেবী, সাহিত্য অকাদেমি, নতুন দিল্লি, ১৯৭৫ সংস্করণ, পৃ. ৫৬-৫৮
  4. কালের প্রতিমা: বাংলা উপন্যাসের পঁচাত্তর বছর (১৯২৩-১৯৯৭), অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০১৯ সংস্করণ, পৃ. ৩৬
  5. আইএমবিডি - সন্দীপন পাঠশালা (১৯৪৯)
  6. সিনেস্তান - সন্দীপন পাঠশালা (১৯৪৯)
  7. রবীন্দ্ররচনাভিধান, ১৭শ খণ্ড, অনুত্তম ভট্টাচার্য, দীপ প্রকাশন, কলকাতা, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, পৃ. ২৫৩