শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়

শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় (১৫ আগস্ট, ১৯৩১ — ২১ ডিসেম্বর, ২০২১ ) বিশ শতকের পাঁচের দশকের কাব্য আন্দোলনে সুনীল-শক্তি-সন্দীপন জুটির অন্যতম ছিলেন। এরা চারজন ছিলেন মধ্য রাতের কলকাতা শাসন করা যুবক[১]

শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়
জন্ম(১৯৩১-০৮-১৫)১৫ আগস্ট ১৯৩১
পুরী ওড়িশা বৃটিশ ভারত
মৃত্যু২১ ডিসেম্বর ২০২১(2021-12-21) (বয়স ৯০)
কলকাতা পশ্চিমবঙ্গ
ছদ্মনামনমিতা মুখোপাধ্যায়/ত্রিশঙ্কু
পেশাকবি ও লেখক
ভাষাবাংলা
জাতীয়তাভারতীয়
নাগরিকত্বভারতীয়
শিক্ষাবি-কম, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টান্ট, কম্পানি সেক্রেটারী, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট
সময়কাল(১৯৫৭-২০১৮)
উল্লেখযোগ্য পুরস্কারসাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (২০০৮)
দাম্পত্যসঙ্গীকবি বিজয়া মুখোপাধ্যায় (মৃ.২০২০)
সন্তানসায়ণ মুখোপাধ্যায়

জন্ম এবং সংক্ষিপ্তজীবনীসম্পাদনা

কবি শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই আগস্ট বৃটিশ ভারতের অধুনা ওড়িশার পুরীতে। তবে তাঁর শৈশব বারাণসীতে কাটলেও পড়াশোনা কলকাতায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেসি পাশ করেন যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ ইন্সটিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট তথা চাটার্ড ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট থেকে।[২] বিভিন্ন বেসরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে ছিলেন। সর্বশেষ তৎকালীন Esso নামক এক তেল কোম্পানিতে কর্মরত অবস্থায় বাহান্ন বৎসর স্বেচ্ছাবসর নেন এবং সম্পূর্ণভাবে সাহিত্যজগৎে আত্মনিয়োগ করেন।

সাহিত্যকর্মসম্পাদনা

শরৎকুমার মূলতঃ পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছেন কবিতার সূত্রেই। তিনি  নিজ নামে  প্রথম কবিতা লেখেন ১৯৪৭-৪৮ খ্রিস্টাব্দে কবি নরেন্দ্র দেব সম্পাদিত  "পাঠশালা" পত্রিকায়। তিনি  বুদ্ধদেব বসুর ভক্ত ছিলেন। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে বুদ্ধদেব বসু তার  সম্পাদিত "আধুনিক বাংলা কবিতা" সংকলনের পঞ্চম সংস্করণে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার প্রমুখ কবিদের রচনার সঙ্গে শরৎকুমারের রচিত কবিতার স্থান দেন। তবে প্রথম প্রথম তিনি নমিতা মুখোপাধ্যায় ছদ্মনামে কবিতা লিখে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় পাঠাতেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে "কৃত্তিবাস" পত্রিকায় সাক্ষাতের পর অবশ্য ছদ্মনাম ব্যবহার করেন নি। এই পত্রিকায় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ— সোনার হরিণ প্রকাশিত হয় এবং কবি হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।  আর এই পত্রিকাসূত্রে তার হৃদতা ও শখ্যতা গড়ে ওঠে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়  প্রমুখ অন্যান্য  কবিদের সঙ্গে।  শরৎকুমারের  বোহেমিয়ান জীবনে রচিত কবিতার প্রথম লাইন— রাত বারোটার পর কলকাতা শাসন করে চারজন যুবক। জনপ্রিয়  এই শব্দবন্ধ ধরেই তার বোহেমিয়ান জীবনে লেখা অসামান্য গদ্যগুলির নামকরণ হয়েছে কলকাতা শাসনের জার্নাল। কবির নিজের ভাষায়—

"পাঁচ ছয় বছর অনিয়মিত জীবন যাপন করার পর আমরা একে একে গৃহস্থ হয়েছি। সেই অনিয়মিত জীবনের নানা ঘটনা নিয়ে কিছু লেখালেখি করেছি পরে। আমার কিছু কবিতা আর এই আলোয় কালোয় রচনা তার মধ্যে পড়ে।"

[৩]

মধ্যরাতের কলকাতা শাসনে— অর্থাৎ সন্ধ্যা সাড়ে সাত-আটটার পর পায়ে হেঁটে অথবা রিকশায় গান গেয়ে সারা শহর ভ্রমণ, খানাপিনা করা চার যুবকের মধ্যে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অবশ্যই থাকতেন বাকি দলের ছয়-সাত-আটজনের মধ্যে শরৎকুমার, সন্দীপন থাকতেন।

শরৎকুমার শুধু কবিতা নয়, উপন্যাস ও ছোটগল্পেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তার প্রথম উপন্যাস সহবাস প্রকাশিত হয় বাংলা সাহিত্য দেশ পত্রিকায় এবং বাংলার পাঠকমহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এই আলোড়নের মূলে ছিল দুঃসাহসিক উপস্থাপনা - দুজোড়া দম্পতির ওয়াইফ সোয়াপিং বা স্ত্রী বদলের কাহিনী। স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গিতে যৌনতা ঘিরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর রক্ষণশীলতার গণ্ডীকে ভেঙ্গে দিতে চেয়েছেন।

শরৎকুমারের কবিতার সংকলন ইংরাজী ভাষায় অনূদিত রবার্ট “দ্য ক্যাট আন্ডার দ্য স্টেয়ার্স” শীর্ষক গ্রন্থের ভূমিকা লেখেন- 'দ্য বডি অ্যান্ড দ্য ডে' এবং 'সেকেন্ড ম্যাসেঞ্জার্স' কবিতা সংকলনের রচয়িতা রবার্ট ম্যাকনামারা। তিনি এজরা পাউন্ড,টি এস এলিয়ট, ডি এইচ লরেন্স প্রমুখ পাশ্চাত্যের ইংরাজী ভাষার দিকপালদের বিষয়ে বহু নিবন্ধ রচনা করেছেন। জর্জ অরওয়েলের অ্যানিম্যাল ফার্ম এবং উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের কবিতা ইংরাজী থেকে  বাংলায় অনুবাদ করেছেন।[৪]

তিনি ইন্দিরা গান্ধী রাষ্ট্রীয় মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টিশীল রচনা প্রকল্পের পরামর্শদাতা ছিলেন।[৫] তার রচিত গ্রন্থসমূহ হল—

কাব্যগ্রন্থ
  • সোনার হরিণ
  • ‘র‌্যাঁবো
  • ভের্লেন এবং নিজস্ব (১৯৬৩)
  • আহত ভ্রূবিলাস (১৯৬৫)
  • মৌরির বাগান
  • কিছু নতুন কবিতা’ (১৯৭২)
  • অন্ধকার লেবুবন (১৯৭৫)
উপন্যাস
  • সহবাস
  • আশ্রয়
  • কথা ছিল
  • রেলকামরার যাত্রীরা
  • সৌতি উবাচ সঞ্জয় উবাচ
  • চার পাই ভাই ভাই  
  • নাশপাতির গন্ধ

সম্মাননাসম্পাদনা

২০০৮ খ্রিস্টাব্দে শরৎকুমার “ঘুমের বড়ির মতো দেশ” বইটির জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।[৬]

জীবনাবসানসম্পাদনা

বিগত তিন বৎসর কবি স্নায়বিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তার একমাত্র পুত্র সায়ণ মুম্বইয়ে কর্মক্ষেত্রে থাকতেন। বিগত ২০২০ খ্রিস্টাব্দে কবির স্ত্রী কবি বিজয়া মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণের পর তিনি একলা হয়ে পড়েন। ২০২১ খ্রিস্টাব্দের ২১ ডিসেম্বর রাত দুটোর সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তিনি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।[৭]

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "প্রয়াত শরৎকুমার"। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১২-২৫ 
  2. Dutt, Kartik Chandra (১৯৯৯)। Who's who of Indian Writers, 1999: A-M (ইংরেজি ভাষায়)। Sahitya Akademi। আইএসবিএন 978-81-260-0873-5 
  3. "শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়"। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১২-২৫ 
  4. [The Cat Under the Stairs https://www.amazon.in/dp/1597660396/ref=cm_sw_r_awdo_navT_a_T74ERNVCR67ERJRK2ZTX  "দ্য ক্যাট আন্ডার দ্য স্টেয়ার্স (ইংরেজিতে)"] |ইউআরএল= এর মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১২-২৫  line feed character in |ইউআরএল= at position 25 (সাহায্য)
  5. "Sarat Kumar Mukhopadhyay Archives"Katha Books (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২১ ডিসেম্বর ২০২১ 
  6. "..:: SAHITYA : Akademi Awards ::.."sahitya-akademi.gov.in। সংগ্রহের তারিখ ২১ ডিসেম্বর ২০২১ 
  7. "প্রয়াত কবি শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়"। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১২-২২