পদার্থবিজ্ঞানরসায়নে, লাইম্যান সারি একধরণের হাইড্রোজেন বর্ণালি সারিহাইড্রোজেন পরমাণুর ইলেকট্রন n ≥ ২ থেকে n = ১ (যেখানে n হলো মুখ্য কোয়ান্টাম সংখ্যা), ইলেকট্রনের সর্বনিম্ন শক্তিস্তরে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট অতিবেগুনি বর্ণালি রেখার সারি। ইলেকট্রনের স্থানান্তরগুলো ধারাবাহিকভাবে গ্রিক লিপি অনুযায়ী নামকরণ করা হয়েছে: n = ২ থেকে n = ১ এর ক্ষেত্রে বলা হয় লাইম্যান-আলফা, ৩ থকে ১ এর ক্ষেত্রে লাইম্যান-বিটা, ৪ থেকে ১ এর ক্ষেত্রে লাইম্যান-গামা এবং অনুরূপ। সারিটির নাম, এর আবিষ্কারক থিওডোর লাইম্যান এর নাম অনুযায়ী রাখা হয়েছে। মুখ্য কোয়ান্টাম সংখ্যার পার্থক্য যত বেশি, তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণের শক্তিও তত বেশি।

ইতিহাসসম্পাদনা

লাইম্যান সারির বর্ণালীরেখার প্রথম রেখা, ১৯০৬ সালে হার্ভার্ডের পদার্থবিদ থিওডোর লাইম্যান প্রথম আবিষ্কার করেন, যিনি উত্তেজিত হাইড্রোজেন গ্যাসের অতিবেগুনী বর্ণালী নিয়ে গবেষণা করছিলেন। বর্ণালিরেখার অবশিষ্ট রেখাগুলো (সবগুলোই অতিবেগুনী অঞ্চলে) লাইম্যান কর্তৃক ১৯০৬-১৯১৪ সালের মধ্যে আবিষ্কৃত হয়েছিলো। হাইড্রোজেন দ্বারা বিকিরীত বর্ণালী অবিচ্ছিন্ন। হাইড্রোজেন থেকে বিকিরিত রেখার প্রথম সারির চিত্র নিম্নরূপ:

 
লাইম্যান সারি।

ঐতিহাসিকভাবে, হাইড্রোজেন বর্ণালীর প্রকৃতি ব্যাখ্যা পদার্থবিজ্ঞানের একটি উল্লেখযোগ্য সমস্যা ছিল। ১৮৮৫ সালে, বামার বিধি দৃশ্যমান হাইড্রোজেন বর্ণালির জন্য গবেষণামূলক সূত্র তৈরীর আগ পর্যন্ত কেউই হাইড্রোজেন রেখার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য সম্পর্কে ধারণা দিতে পারেননি। পাঁচ বছরের মধ্যে রিডবার্গ, একটি এম্পিরিকাল সূত্র নিয়ে আসেন যা সমস্যাটির সমাধান করে, এটি ১৮৮৮ সালে প্রথম ও ১৮৯০ সালে চূড়ান্তরূপে প্রকাশিত হয়। রিডবার্গ, জ্ঞাত বামার সারিতে বিকিরিত রেখার সাথে মিল রেখে একটি সূত্র দাঁড় করাতে এবং অনাবিষ্কৃত রেখাগুলো সম্পর্কে পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হন। রিডবার্গ সূত্রের বিভিন্ন সংস্করণে বিভিন্ন স্বাভাবিক সংখ্যা বসিয়ে বিভিন্ন সারির রেখা তৈরী করা যায়।

২০১১ সালের ১ ডিসেম্বর, ঘোষণা করা হয় যে, ভয়েজার ১, আকাশগঙ্গা ছায়াপথ থেকে উৎপন্ন লাইম্যান-আলফা বিকিরণ প্রথমবারের মত সনাক্ত করেছে। লাইম্যান-আলফা বিকিরণ পূর্বে অন্যান্য ছায়াপথ থেকেও সনাক্ত করা হয়েছিল, তবে সূর্যের প্রতিবন্ধকতার কারণে এর আগে আকাশগঙ্গা থেকে বিকিরণ সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।[১]

লাইম্যান সারিসম্পাদনা

রিডবার্গ সমীকরণের যে সংস্করন থেকে লাইম্যান সারি প্রাপ্ত হয়েছে তা হলো:[২]

 

যেখানে, n একটি স্বাভাবিক সংখ্যা যা ২ এর সমান বা তার বড় (অর্থাৎ, n = ২, ৩, ৪...)।

ফলে, ওপরের চিত্রে দৃশ্যমান রেখাগুলো ডানে n = ২ থেকে বামে n = ∞ এর ক্ষেত্রে তরঙ্গদৈর্ঘ্য। বর্ণালিরেখার সংখ্যা অসীম, তবে n = ∞ এর কাছাকাছি তা এতই ঘন হয়ে যায় যে, শুধুমাত্র প্রথম রেখার কিছু অংশ এবং শেষ রেখাটিই দেখা যায়।

লাইম্যান সারির সকল তরঙ্গ দৈর্ঘ্যই অতিবেগুনী:

n ১০ ১১ ∞, লাইম্যান সীমা
তরঙ্গ দৈর্ঘ্য (ন্যানোমিটার) ১২১.৬ ১০২.৬ ৯৭.৩ ৯৫.০ ৯৩.৮ ৯৩.১ ৯২.৬ ৯২.৩ ৯২.১ ৯১.৯ ৯১.১৮

ব্যাখ্যা ও প্রতিপাদনসম্পাদনা

১৯১৪ সালে, নিলস বোর কর্তৃক বোর মডেল উপস্থাপনের পর, হাইড্রোজেন বর্ণালী রেখা কেন রিডবার্গের সূত্র সমর্থন করে তা বোঝা সম্ভব হয়। বোর দেখতে পেয়েছিলেন যে হাইড্রোজেন পরমাণুর সাথে আবদ্ধ ইলেক্ট্রনে অবশ্যই নিম্নলিখিত সূত্র দ্বারা বর্ণিত কোয়ান্টায়িত শক্তির মাত্রা থাকতে হবে:

 

বোরের তৃতীয় অনুমান অনুযায়ী, যখনই ইলেকট্রন প্রাথমিক শক্তিস্তর Ei থেকে Ef এ পতিত হয়, তখনই পরমাণু নিম্নের তরঙ্গদৈর্ঘ্যবিশিষ্ট বিকিরণ নির্গত করে:

 

ইলেক্ট্রন-ভোল্ট এককে শক্তি এবং অ্যাংস্ট্রম এককে তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের হিসাব করলে আরও সহজ বিবৃতি পাওয়া যায়:

 

উপরের সূত্রে শক্তিকে হাইড্রোজেন পরমাণুর ক্ষেত্রে শক্তির অভিব্যাক্তি, যেখানে প্রাথমিক শক্তি n শক্তিস্তর দ্বারা এবং চূড়ান্ত শক্তি m শক্তিস্তর দ্বারা প্রকাশিত, এর দ্বারা প্রতিস্থাপন করে,

 

যেখানে RH রিডবার্গের চিরচেনা সূত্রে হাইড্রোজেনের জন্য রিডবার্গ ধ্রুবক। এর অর্থ হলো রিডবার্গ ধ্রুবকের বিপরীত রাশি লাইম্যান সীমার সমান।

বোর, রিডবার্গ এবং লাইম্যানের সূত্রগুলো সংযুক্ত করার জন্য, m কে ১ দ্বারা প্রতিস্থাপন করলে পাওয়া যায়,

 

যা লাইম্যান সারির জন্য রিডবার্গের সূত্র। ফলে, বিকিরণ রেখাগুলোর প্রত্যেকটি তরঙ্গ দৈর্ঘ্য, একটি নির্দিষ্ট শক্তিস্তর ( ১ এর চেয়ে বেশি) থেকে প্রথম শক্তিস্তরে ইলেকট্রনের পতন নির্দেশ করবে।

আরও দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. "Voyager Probes Detect "invisible" Milky Way Glow"। National Geographic। ডিসেম্বর ১, ২০১১। সংগ্রহের তারিখ ২০১৩-০৩-০৪ 
  2. Brehm, John; Mullin, William (১৯৮৯)। Introduction to the Structure of Matter John Wiley & Sons। পৃষ্ঠা 156আইএসবিএন 0-471-60531-X