রাসেলের চায়ের কেতলি

রাসেলের চায়ের কেতলি বা মহাজাগতিক চায়ের কেতলি বার্ট্রান্ড রাসেল কর্তৃক উদ্ভাবিত একটি রূপক যা ব্যবহার করে তিনি দেখিয়েছিলেন যে দার্শনিক বিতর্কে প্রমাণের দায়ভার সংশয়ীর উপর বর্তায় না। ধর্মীয় বিতর্কেই এই রূপকের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।

বারট্রান্ড রাসেলের ধারা
১৯০৭ সালে রাসেল

রাসেলের মূলভাষ্যসম্পাদনা

ইলাস্ট্রেটেড পত্রিকা দ্বারা কমিশনকৃত কিন্তু অপ্রকাশিত “ইজ দেয়ার এ গড?” শিরোনামের একটি প্রবন্ধে ১৯৫২ সালে রাসেল লিখেন,

আমি যদি বলি যে পৃথিবী ও মঙ্গল গ্রহের মাঝখানে একটি চীনা চায়ের কেতলি, যা এতই ছোট যে আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী দূরবিন দিয়েও দেখা যাবে না, একটি ডিম্বাকার কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করছে তবে কেউই তা ভুল প্রমাণ করতে পারবে না। কিন্তু আমি যদি বলি যে প্রমাণ করা যাবে না বলে এই চায়ের কেতলির অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় পোষণ করা অচিন্তনীয়, তবে আমাকে সঙ্গত কারণেই পাগল হিসেবে অভিহিত করা হবে। এরকম কোন কেতলির কথা যদি প্রাচীন গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হত, প্রতি রবিবারে পবিত্র সত্য হিসেবে শিক্ষা দেওয়া হত, বিদ্যালয়গুলোতে ছোট বাচ্চাদের মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হত, তবে এহেন বস্তুর অস্তিত্বে অবিশ্বাসকে উন্মাদনার সামিল করা হত এবং আধুনিক যুগের মনোবিজ্ঞানী বা প্রাচীন যুগের ইনকুইজিশনকে তলব করা হত।[১]

সমসাময়িক ব্যবহারসম্পাদনা

রিচার্ড ডকিন্স তার ২০০৩ সালের বই “এ ডেভিলস চ্যাপলেইন” এ এই রুপকটি ব্যবহার করে ঈশ্বরের অস্তিত্বের ক্ষেত্রে সংশয়বাদের সমালোচনা করেন।[২] বিজ্ঞান ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব সম্পর্কে কিছু বলতে পারে না। অতএব, একজন ধর্মীয় সংশয়বাদী বিশ্বাস করেন যে বিশ্বাস-অবিশ্বাস মানুষের ব্যক্তিগত রুচির ব্যাপার এবং দু’টোই সমপরিমাণ গুরুত্বের দাবিদার। ডকিন্স এখানেই এই রুপকের অবতারনা করেন: একজন সংশয়বাদী যদি বিশ্বাস-অবিশ্বাসকে একই পাল্লায় মাপতে চান, তবে তাকে চায়ের কেতলীতে বিশ্বাসকেও সমপরিমাণ সম্মান দেখাতে হবে কারণ এটির অস্তিত্ব ঈশ্বরের অস্তিত্বের থেকে কোনক্রমেই বেশি সম্ভাব্য নয়।

পিটার এটকিন্স বলেন যে রাসেলের উপমার মূল প্রতিপাদ্য হল একজন বিজ্ঞানী কোন নেতিবাচকতাকে প্রমাণ করতে পারেন না, তাই অক্কামের ক্ষুরের সাহায্যে একটি সহজতর তত্ত্ব সবসময়ই একটি জটিল তত্ত্বের উপরে প্রাধান্য পাবে।[৩] তিনি লক্ষ্য করেন যে এই যুক্তি ধার্মিকদের উপর ভাল খাটে না, কারণ ধর্মবিশ্বাস ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দ্বারা চালিত, একে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সাথে একই পাল্লায় মাপা যায় না। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী ওসব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাপ্রসূত দাবিসমূহকে সংশয়ী দৃষ্টিতে দেখে।

এরিক রিটান এই উপমার বিরুদ্ধে যুক্তি দেখান যে চায়ের কেতলি একটি বস্তু জাগতিক অবভাস এবং একারণে এটি যাচাইযোগ্য, কিন্তু ঈশ্বর বস্তুজগতের ঊর্ধ্বে। তাছাড়া আমরা বস্তুজগত সম্পর্কে যা জানি, তার আলোকে রাসেলের চায়ের কেতলিতে বিশ্বাস মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়।[৪]

রাসেলের উপমাকে পরবর্তীতে বিভিন্ন ব্যঙ্গমূলক ধর্মে সম্প্রসারিত করা হয়েছে, যেমন- অদৃশ্য, গোলাপী পঙ্খীরাজ ঘোড়া[৫], উড়ন্ত স্প্যাগেটি দানব[৬] এবং গ্যারেজে বসবসকারী ড্রাগন[৭]

আরও দেখুনসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. Bertrand Russell: Is There a God?
  2. Richard Dawkins (২০০৩)। A Devil's Chaplain (ইংরেজি ভাষায়)। Houghton Mifflinআইএসবিএন ISBN 0-618-33540-4 |আইএসবিএন= এর মান পরীক্ষা করুন: invalid character (সাহায্য) 
  3. Atkins, Peter। Clayton, Philip and Simpson, Zachary R., সম্পাদকগণ। "The Oxford handbook of religion and science" (ইংরেজি ভাষায়): 129–130।  |অবদান= উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)
  4. Eric Reitan। Is God a Delusion? (ইংরেজি ভাষায়)। Wiley-Blackwell। পৃষ্ঠা 78–79। আইএসবিএন 1-4051-8361-6  অজানা প্যারামিটার |release_date= উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)
  5. Richard Dawkins (২০০৬)। The God Delusion (ইংরেজি ভাষায়)। Houghton-Mifflin। আইএসবিএন 978-0-618-68000-9 
  6. Wolf, Gary (নভেম্বর ১৪, ২০০৬)। "The Church of the Non-Believers" (ইংরেজি ভাষায়)। Wired News 
  7. Sagan, Carl (জুন ২১, ২০০৭)। "The Dragon in My Garage" (ইংরেজি ভাষায়)। http://www.RichardDawkins.Net।  |প্রকাশক= এ বহিঃসংযোগ দেয়া (সাহায্য)