রচেস্টার, নিউ ইয়র্ক

রচেস্টার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের একটি শহর ও মনরো কাউন্টির আসন। জনসংখ্যায় এটি নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী এর জনসংখ্যা ২,০৫,৬৯৫। [১] রোচেস্টার শহর যেমন নগর এলাকা নিয়ে গঠিত, তেমনি শহরতলি ও গ্রামীণ এলাকা-ও রোচেস্টারের অংশ।

রচেস্টার শহরটি একসময় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল শহর ছিল। জেনেসি নদী উপত্যকার অংশ হওয়ায় এতে অনেকগুলো ময়দা কারখানা গড়ে ওঠে। বিভিন্ন দ্রব্য উৎপাদনের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠায় রচেস্টারের জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। [২] ইস্টম্যান কোডাক, জেরক্স, বাউশ্চ অ্যান্ড লোম্ব, ওয়েগম্যানস, গ্যানেট, পেচেক্স, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, কনস্টেলেশন ব্র্যান্ডস, রাগুসহ অনেক খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন হয় রোচেস্টারে। এছাড়াও রোচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় ও রোচেস্টার ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির মত বিশ্বখ্যাত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান এ শহরের অহংকার। রোচেস্টারের অর্থনৈতিক বিকাশে এগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। [৩] ক্রীতদাস প্রথার বিলুপ্তি[৪] ও নারী অধিকার আন্দোলনের[৫] অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রোচেস্টারে সংঘটিত হয়। শিল্পকারখানাগুলোর অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলে রোচেস্টারের জনসংখ্যা-ও কমতে শুরু করে। কিন্তু স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন একে নিকটবর্তী পিটসবুর্গবাফেলো শহরের মত অর্থনৈতিক মন্দার মুখে ফেলে দেয়নি।

রচেস্টার শহরটি সাংস্কৃতিক গরিমার জন্যও প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। ইস্টম্যান স্কুল অব মিউজিক ও রচেস্টার আন্তর্জাতিক জাজ উৎসব এর সাংগীতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। [৬] এখানে "স্ট্রং ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব প্লে"ও "জর্জ ইস্টম্যান জাদুঘরের" মত বিশ্ববিখ্যাত জাদুঘর অবস্থিত। জাদুঘরগুলো বিশ্বের বৃহত্তম আলোকচিত্র সংগ্রহশালার স্বীকৃতি পেয়েছে। [৭] জীবনযাত্রার মান ও বসবাসযোগ্যতার দিক দিয়ে রোচেস্টার যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শহর। [৮] এছাড়াও রোচেস্টার বৈশ্বিক শহরের স্বীকৃতি পেয়েছে।[৯]

ইতিহাসসম্পাদনা

আদিবাসী সেনেকা উপজাতি রোচেস্টার শহরের আদি বাসিন্দা। ১৭৯৭ সালে স্বাক্ষরিত বিগ ট্রি চুক্তির ফলে সেনেকারা রোচেস্টারের ভূমির উপর অধিকার হারায়। [১০]

আইরোকুইস উপজাতির মানুষরাও এখানে বসবাস করত। কিন্তু আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধে ব্রিটিশদের সহযোগিতা করার ফলে নিউ ইয়র্ক থেকে তাদের বিতাড়িত করা হয়। ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের কানাডায় প্রচুর জমি দান করা হয়। [১১]

নিউ ইংল্যান্ড থেকে আগত সংস্কারপন্থী খ্রিস্টানরা রোচেস্টার শহর প্রতিষ্ঠা করেন। রোচেস্টারের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল। ১৮০৩ সালের ৮ নভেম্বর কর্নেল নাথানিয়েল রোচেস্টার, মেজর চার্লস ক্যারল ও কর্নেল ফিটজহিউ জুনিয়র নিউ ইয়র্ক সরকারের কাছ থেকে ১০০ একর ভূমি ক্রয় করেন। ১৮১১ সালে তারা রোচেস্টার শহরের ভূমি জরিপ করেন ও শহর নির্মাণেরর কাজ শুরু করেন। ১৮১৭ সালে ব্রাউন ভ্রাতৃদ্বয় ও অন্যান্যরা তাদের সাথে যোগ দিয়ে রোচেস্টারভিল প্রতিষ্ঠা করেন।

১৮২১ সালে রোচেস্টারভিল মনরো কাউন্টির সদর দপ্তর হয়। ১৮২৩ সালে এর আয়তন বেড়ে হয় ৪ বর্গকিলোমিটার ও জনসংখ্যা বেড়ে হয় ১,০১২। রোচেস্টারভিলের নাম পাল্টে হয় "রোচেস্টার।"

রোচেস্টার "পশ্চিমের তরুণ সিংহ" ও "ময়দা শহর"নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৮৩৮ সালে রোচেস্টার যুক্তরাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ ময়দা উৎপাদনকারী শহরে পরিণত হয়। [১২]

১৮৩০-১৮৩১ সালে চার্লস গ্র্যান্ডিসন ফিনি রোচেস্টার শহরে যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কারপন্থী প্রোটেস্টান্ট আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।

ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে রোচেস্টার শহরে অনেকগুলো নার্সারি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে রোচেস্টার "পুষ্প শহরের" অভিধা লাভ করে। জার্মানি হতে আগত জর্জ এলওয়াঙ্গার ও আয়ারল্যান্ড হতে আগত প্যাট্রিক বেরি এখানে শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত নার্সারি প্রতিষ্ঠা করেন। [১৩]

১৮৪৭ সালে ফ্রেডরিক ডগলাস এখানে ক্রীতদাস প্রথাবিরোধী নর্থ স্টার পত্রিকা প্রকাশ করেন। [১৪] ১৮৭২ সালে রোচেস্টার শহরে অবস্থিত ডগলাসের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

নারীর ভোটাধিকার আন্দোলনের নেত্রী সুসান বি অ্যান্থনি রোচেস্টার শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাড়িটি বর্তমানে জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। [১৫]

ঊনবিংশ শতকে নৈরাজ্যবাদী এমা গোল্ডম্যান এখানে শ্রমজীবী মানুষের প্রগতির জন্য কাজ করেন।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে বন্ড ক্লথিং স্টোরস,ফ্যাশন পার্ক ক্লথস, হিকি ফ্রিম্যান ও স্টেইন ব্লকসহ অনেক পোশাকের দোকান এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়াও রোচেস্টারে গাড়ি তৈরির প্রতিষ্ঠান কানিংহ্যামের অগ্রযাত্রার সূচনা হয়।

রোচেস্টারের কৃষ্ণাঙ্গ জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। তারা আর্থিক ও সামাজিকসহ নানা ধরনের বৈষম্যের সম্মুখীন হয়। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গায় এসকল বৈষম্যের ফলে সৃষ্ট ক্ষোভের উদ্গীরণ হয়। দাঙ্গায় চারজন মারা যান ও ৩৫০ জন আহত হন। এক হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হন ও ২০৪টি দোকান লুটপাট হয়।[১৬]

ভূগোলসম্পাদনা

রচেস্টার বাফালো শহরের ১২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ও সিরাকিউজ শহরের ১৪০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। নিউ ইয়র্ক রাজ্যের রাজধানী অলবানি রোচেস্টারের ৩৬০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। জেনেসি নদী শহরটিকে দুই ভাগে বিভক্ত করে।

যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, শহরের আয়তন ৩৭.১ বর্গমাইল। এর ৩৫.৮ বর্গমাইল স্থল ও ১.৩ বর্গমাইল জল।

রচেস্টারে ৮৬৪ কিলোমিটার সড়ক, ৪৪টি যান চলাচলের সেতু, ৮টি পদচারী সেতু, ১১টি গণগ্রন্থাগার ও ২টি পুলিশ স্টেশন রয়েছে। হেমলক হ্রদ রোচেস্টারের পানি সরবরাহের প্রধান উৎস।

জলবায়ুসম্পাদনা

রচেস্টারের জলবায়ু আর্দ্র মহাদেশীয় ধরনের। এর শীতকাল হয় দীর্ঘ ও তুষারাচ্ছন্ন। শীতকালে তাপমাত্রা ০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে নেমে আসে। শরৎকালে বৃক্ষরাজি অদ্ভুত সুন্দর বর্ণ ধারণ করে। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বেড়ে দাঁড়ায় ৮০ থেকে ৮৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট।

জনমিতিসম্পাদনা

২০১০ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী রচেস্টারের জনসংখ্যা ২,১০,৫৬৫, যা ২০১৯-এ কমে দাঁড়ায় ২,০৫,৬৯৫। শহরের জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২২৫০.৫ জন।

রোচেস্টারের বাসিন্দাদের মধ্যে ৪৩.৭% শ্বেতাঙ্গ, ৪১.৭% কৃষ্ণাঙ্গ, ০.৫% আদিবাসী আমেরিকান ও ৩.১% এশীয়। বাসিন্দাদের ১৬.৪% হিস্পানিক ও লাতিনো, যারা পুয়ের্তোরিকান বংশোদ্ভূত। [১৭]

১৯৯৭ সালের এক সমীক্ষায় জানা যায়, মাথাপিছু বধির সংখ্যার দিক দিয়ে রোচেস্টার যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম শহর। [১৮]

রচেস্টারের পরিবারগুলোর আয় ৩১,২৫৭ মার্কিন ডলার। পুরুষদের গড় আয় ৩০,৫২১ ডলার ও নারীদের গড় আয় ২৫,১৩৯ ডলার। শহরের বাসিন্দাদের মাথাপিছু আয় ১৫,৫৮৮ ডলার। ২৩.৪% পরিবার ও ২৫.৯% বাসিন্দা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। এদের মধ্যে ৩৭.৫% এর বয়স ১৮ বছরের নিচে ও ১৫.৪% এর বয়স ৬৫ এর বেশি।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা