মাহে, যা মায়েঝি নামেও পরিচিত, ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিমাহে জেলার একটি ছোট শহর। এটি মাহে নদীর মোহনায় অবস্থিত এবং কেরালা রাজ্য দ্বারা বেষ্টিত। কান্নুর জেলা তিনদিকে এবং অন্যদিকে কোঝিকোড় জেলা মাহেকে ঘিরে রেখেছে।


স্বাধীনতার আগে, মাহে ছিল একটি ফরাসী উপনিবেশ; ভারতভুক্তির পরে মাহে এখন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরির চারটি জেলার অন্যতম মাহে জেলায় একটি পৌর শহর। পুদুচেরি বিধানসভায় মাহে শহর থেকে একজন প্রতিনিধি রয়েছেন।

নামকরণের ব্যাকরণসম্পাদনা

মাহে নামটি সম্ভবত মায়াঝি শব্দ থেকে এসেছে; এটি মালয়ালাম ভাষায় স্থানীয় নদী এবং অঞ্চলের নাম । ফরাসি দলিলগুলিতে ১৭২০ এর প্রথম দিকে মায়ে বানানটি পাওয়া যায়; উনিশ শতকের গোড়ার দিকে নথি, মানচিত্র এবং ভৌগোলিক মাহে বানানটিই ব্যবহৃত হতে থাকে। যদিও প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে যে এই শহরটির নাম বার্ট্র্যান্ড ফ্রেঁইওয়েস মাহা দে লা বোর্দোনাইস (১৬৯৯-১৭৩) এর সম্মানে দেওয়া হয়েছিল, যিনি ১৭৪১ সালে শহরটি দখল করেছিলেন। তবে মায়াঝি থেকে মায়ে হয়ে মাহে নামের বিবর্তন এই মতবাদ অস্বীকার করে।[১]


নামকরণের আরও একটি প্রচলিত দাবি রয়েছে যে মাহে বানানটি আনুষ্ঠানিকভাবে ১৭২৬ সালের অভিযানের নেতা কর্তৃক গৃহীত হয়েছিল এই সময়ে লা বোর্দোনাইসের ভূমিকার স্বীকৃতি স্বরূপ[২]। এই দাবির স্বপক্ষেও সেরকম তথ্যগত কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। সম্ভবত লা লা বোর্দোনাইসের পারিবারিক নামের সাথে মাহের সাদৃশ্যই পরবর্তীকালে এইসব রটনার জন্ম দেয়।

ইতিহাসসম্পাদনা

ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তি ভারতে প্রবেশের আগে এই অঞ্চলটি কোলাতুনাড়ুর অংশ ছিল যা তুলুনাডু, চিরককাল এবং কদাতনাড়ুর সমন্বয়ে গঠিত ছিল। ভাতাকারার রাজা ভাজুন্নাভার এবং ফরাসী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আন্দ্রে মোল্যান্ডিন এর মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে, ফরাসী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭২৪ সালে মাহেতে একটি দুর্গ তৈরি করেছিল। এরপরে মাহে মারাঠাদের দখলে যায় এবং ১৭৪১ সালে, মাহে দে লা বোর্দোনাইস মারাঠাদের শাসন থেকে মাহে শহরটি দখল করেন।

১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশরা মাহে দখল করে এবং বন্দোবস্তটি কদাথনাদুর রাজার হাতে হস্তান্তর করা হয়। ব্রিটিশরা ১৭৬৩র প্যারিসের সন্ধিচুক্তির অংশ হিসাবে মাহে শহরটি ফরাসিদের কাছে হস্তান্তর করে। ১৭৭৯ সালে, ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, মাহে আবার ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়। ১৭৮৩, ব্রিটিশরা ভারতে তাদের বসতি ফরাসিদের ফিরিয়ে দিতে সম্মত হয়, এবং ১৭৮৫ সালে ফরাসিদের হাতে মাহেকে পুনরায় হস্তান্তর করে।.[৩]

১৭৯৩ সালে ফরাসি বিপ্লব সূত্রপাতের পরে, জেমস হার্টলির অধীনে একটি ব্রিটিশ বাহিনী মাহেকে পুনরায় দখল করে। ১৮১৬ সালে ব্রিটিশরা নেপোলিয়োনিক যুদ্ধের সমাপ্তির পরে ১৮১৪ সালের প্যারিস চুক্তির অংশ হিসাবে মাহেকে ফরাসিদের কাছে ফিরিয়ে দেয়। ১৮১৬ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে মাহের স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত মাহে শহরটি ব্রিটিশ ভারতের অভ্যন্তরে একটি ছোট ফরাসী উপনিবেশ হিসাবে ফরাসি অধিকারের অধীনে থেকে যায়। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরেও ১৯৫৪ সালের ১৩ জুন পর্যন্ত এই অঞ্চলটি ফরাসি শাসিত ছিল, যখন দীর্ঘ lসংগ্রামের মাধ্যমে মাহে স্বাধীনতা লাভ করে এবং ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।

জনমিতিসম্পাদনা

২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে, মাহের জনসংখ্যা হল ৪১,৮১৬ জন। এরা প্রধানত মালায়ালি জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্গত। সাক্ষরতার ৯৭. ৮৭%; পুরুষ ও মহিলাদের সাক্ষরতার হার যথাক্রমে ৯৮.৬৩% এবং ৯৭.২৫%। জনসংখ্যার ১০.৯৯% জনসংখ্যার ছয় বছরের কম বয়সী শিশুদের নিয়ে গঠিত।

ব্লক ভিত্তিক জনসংখ্যার বিস্তৃতিসম্পাদনা

  • মাহে- ১০৬৩০ জন
  • চালাকারা- ৬৮৫৫জন
  • পান্ডাকাল- ৮৯৪৪ জন
  • পাল্লুর - ১৪২৫০ জন
  • চেরুকাল্লাই- ১২৫৫ জন

সংস্কৃতিসম্পাদনা

এই অঞ্চলের সংস্কৃতি এবং ভূপ্রকৃতি প্রায় কেরালার মালাবার উপকূলের সমতুল। এই অঞ্চলের প্রধান উত্সব হল বিশু এবং ওনাম এবং প্রধান ভাষা হ'ল মালায়ালাম। এছাড়া উল্লেখযোগ্য তামিলআরবি ভাষাভাষী মানুষজনও রয়েছেন।

জলবায়ুসম্পাদনা

মাহের জলবায়ু গ্রীষ্মমন্ডলীয় বর্ষার জলবায়ু প্রকৃতির (Köppen Am)। কেরালার এবং কর্ণাটক উপকূলের জন্য আদর্শ। ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত শুকনো মরসুম থাকে, তবে পশ্চিম ঘাটের বায়ুপ্রবাহের অভিমুখে অবস্থানের কারণে পশ্চিমা মৌসুমী বৃষ্টিপাতের সময়ে জুলাই মাসে গড়ে ১০৮০ মিলিমিটার বা ৪৩ ইঞ্চি অবধি প্রচণ্ড ভারী বৃষ্টিপাত হয়।

মাহে, পুদুচেরি,  ভারত-এর আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য
মাস জানু ফেব্রু মার্চ এপ্রিল মে জুন জুলাই আগস্ট সেপ্টে অক্টো নভে ডিসে বছর
সর্বোচ্চ গড় °সে (°ফা) ৩১.৬
(৮৮.৯)
৩২.০
(৮৯.৬)
৩৩.০
(৯১.৪)
৩৩.২
(৯১.৮)
৩২.৭
(৯০.৯)
২৯.৬
(৮৫.৩)
২৮.৩
(৮২.৯)
২৮.৭
(৮৩.৭)
২৯.৫
(৮৫.১)
৩০.৪
(৮৬.৭)
৩১.০
(৮৭.৮)
৩১.৪
(৮৮.৫)
৩১.০
(৮৭.৭)
সর্বনিম্ন গড় °সে (°ফা) ২১.৮
(৭১.২)
২২.৯
(৭৩.২)
২৪.৬
(৭৬.৩)
২৫.৮
(৭৮.৪)
২৫.৭
(৭৮.৩)
২৩.৯
(৭৫.০)
২৩.৪
(৭৪.১)
২৩.৬
(৭৪.৫)
২৩.৭
(৭৪.৭)
২৩.৮
(৭৪.৮)
২৩.৩
(৭৩.৯)
২২.০
(৭১.৬)
২৩.৭
(৭৪.৭)
বৃষ্টিপাতের গড় মিমি (ইঞ্চি)
(০.১)

(০.২)
১৩
(০.৫)
৭৬
(৩.০)
২৯৫
(১১.৬)
৯০৫
(৩৫.৬)
১,০৮৩
(৪২.৬)
৫৩৯
(২১.২)
২৭৪
(১০.৮)
২৩৭
(৯.৩)
১০৬
(৪.২)
২২
(০.৯)
৩,৫৫৭
(১৪০)
উৎস: Climate-Data.org[৪]

পরিবহনসম্পাদনা

মাহের নিকটতম বিমানবন্দরটি হল সম্প্রতি চালু হওয়া কান্নুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যা মাহে থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে মাতান্নুরে অবস্থিত। এর পরের নিকটতম বিমানবন্দরটি করিপুরের কালিকট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যা প্রায় ৮৫ কিলোমিটার (৫৩ মাইল) দূরত্বে অবস্থিত। নিকটতম রেলওয়ে স্টেশন হ'ল মাহে রেল স্টেশন, যেখানে কয়েকটি লোকাল এবং এক্সপ্রেস ট্রেন থামে। নিকটতম প্রধান রেলস্টেশন, যেখানে বেশ কয়েকটি দূরপাল্লার ট্রেন থামে, সেগুলি হল থ্যালাসেরি, কান্নুর, ম্যঙ্গালোর এবং ভাতাকারা।

.

ইমেজ গ্যালারিসম্পাদনা

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. H. Castonnet des Fosses, "L’Inde avant Dupleix", Revue de l’Anjou, Angers, July–August 1886, p. 91, note 1.
  2. The detailed accounts of the expedition barely mention young La Bourdonnais' role.
  3. "History of Mahé"। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৮ এপ্রিল ২০১৩ 
  4. "CLIMATE: MAHE", Climate-Data.org. Web: [১].