মাও ৎসে-তুং

গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের চেয়ারম্যান

মাও ৎসে-তুং[ক][খ] (চীনা: 毛泽东; ডিসেম্বর ২৬, ১৮৯৩ – সেপ্টেম্বর ৯, ১৯৭৬) একজন চীনা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী, মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৭৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি চীন শাসন করেন। তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠাতাদের একজন এবং ১৯৪৩ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত দলের ১ম চেয়ারম্যান ছিলেন। মার্কসবাদ-লেনিনবাদে তাঁর তাত্ত্বিক অবদান, সমর কৌশল এবং তাঁর কমিউনিজমের নীতি এখন একত্রে মাওবাদ নামে পরিচিত। তাঁকে প্রায়শই গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের "জাতির জনক" বলা হয়।

মাও ৎসে-তুং
Mao Zedong 1959.jpg
মাও ৎসে-তুঙের ১৯৬০-১৯৬৬ সালের দাপ্তরিক প্রতিকৃতি
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ১ম চেয়ারম্যান
কাজের মেয়াদ
জুন ১৯, ১৯৪৫ – সেপ্টেম্বর ৯, ১৯৭৬
১ম ভাইস-চেয়ারম্যানলিউ শাওচি
লিন পিয়াও
চৌ এন-লাই
হুয়া কুওফেং
পূর্বসূরীনিজেই (কেন্দ্রীয় পলিটব্যুরোর চেয়ারম্যান হিসেবে)
উত্তরসূরীহুয়া কুওফেং
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় পলিটব্যুরোর ১ম চেয়ারম্যান
কাজের মেয়াদ
মার্চ ২০, ১৯৪৩ – এপ্রিল ২৪, ১৯৬৯
পূর্বসূরীচাং ওয়েনথিয়াং
(কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে)
উত্তরসূরীনিজেই (কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে)
কেন্দ্রীয় মিলিটারি কমিশনের ১ম চেয়ারম্যান
কাজের মেয়াদ
আগস্ট ২৩, ১৯৪৫ – ১৯৪৭
সেপ্টেম্বর ৮, ১৯৫৪ – সেপ্টেম্বর ৯, ১৯৭৬
পূর্বসূরীপদ সৃষ্ট
উত্তরসূরীহুয়া কুওফেং
চীনা গণরাজনৈতিক পরামর্শমূলক সভার জাতীয় কমিটির ১ম চেয়ারম্যান
কাজের মেয়াদ
সেপ্টেম্বর ২১, ১৯৪৯ – ডিসেম্বর ২৫, ১৯৫৪
মাননীয় চেয়ারম্যান
ডিসেম্বর ২৫, ১৯৫৪ – সেপ্টেম্বর ৯, ১৯৭৬
পূর্বসূরীপদ সৃষ্ট
উত্তরসূরীচৌ এন-লাই
গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ১ম চেয়ারম্যান
কাজের মেয়াদ
সেপ্টেম্বর ২৭, ১৯৫৪ – এপ্রিল ২৭, ১৯৫৯
প্রিমিয়ারচৌ এন-লাই
ডেপুটিঝু দে
পূর্বসূরীপদ সৃষ্ট
উত্তরসূরীলিউ শাওচি
জাতীয় গণকংগ্রেসের
সদস্য
কাজের মেয়াদ
সেপ্টেম্বর ১৫, ১৯৫৪ – এপ্রিল ১৮, ১৯৫৯
ডিসেম্বর ২১, ১৯৬৪ – সেপ্টেম্বর ৯, ১৯৭৬
সংসদীয় এলাকাBeijing At-large
ব্যক্তিগত বিবরণ
জন্ম(১৮৯৩-১২-২৬)২৬ ডিসেম্বর ১৮৯৩
শাওশান, হুনান
মৃত্যু৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬(1976-09-09) (বয়স ৮২)
বেইজিং
সমাধিস্থলচেয়ারম্যান মাও মেমোরিয়াল হল, বেইজিং
জাতীয়তাচীনা
রাজনৈতিক দলচীনের কমিউনিস্ট পার্টি
দাম্পত্য সঙ্গীলুও ইশিউ (১৯০৭–১৯১০)
ইয়াং খাইহুই (1১৯২০–১৯৩০)
হে ছিচেন (১৯৩০–১৯৩৭)
চিয়াং চিং (১৯৩৯–১৯৭৬)
সন্তান১০
পেশাবিপ্লবী, রাষ্ট্রনায়ক
ধর্মধর্মহীন
মাও ৎসে-তুং
সরলীকৃত চীনা 毛泽东
ঐতিহ্যবাহী চীনা 毛澤東
হান-ইউ ফিনিনMáo Zédōng
[mɑ̌ʊ tsɤ̌tʊ́ŋ]

জন্ম ও শৈশবসম্পাদনা

তিনি চীনের হুনান প্রদেশের শাং তান জেলার শাউ শাং চুং গ্রামের কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মাও ৎসে-তুঙের বাবার নাম ছিল মাও জেন শেং (শুন সেন)। শুন শেং দরিদ্র কৃষক হলেও কয়েক বছর সেনাবাহিনীতে চাকরি করে জমিজমা ক্রয় করে অবস্থার উন্নতি করেন এবং কাঁচামালের ব্যবসা করে রীতিমত মধ্যবিত্ত গৃহস্থ হয়ে ওঠেন। মাওয়ের অন্য দুই ভাইয়ের নাম ছিল সে সেন ও সে তান। মাওয়ের মা ছিলেন শিয়াং শিয়াং জেলার তং শিয়াতো গ্রামের বেন পরিবারের মেয়ে। তিনি ছিলেন দয়ালু। বৌদ্ধ ধর্মে তার খুব ভক্তি ছিল। মাওয়ের বয়স যখন মাত্র সাত তখন থেকে খেতখামারের কাজে লেগে যান।[১]

শিক্ষাজীবনসম্পাদনা

১৯০১ সালে আট বছর বয়সে মাও গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি হন। এবং তেরো বছর বয়স পর্যন্ত ঐ পাঠশালাতে লেখাপড়া করেন। ১৯০৬ সালে মাওয়ের গ্রামের পড়াশোনা শেষ হয়। এরপর তার বাবা তাকে সৈন্যদলে ভর্তি করানোটাকে লাভজনক মনে করেন। তার আগে মাওয়ের সঙ্গে এগারো-বারো বছরের একটা মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে মাও ৎসে-তুং এবিষয়ে লিখেছিলেন- 'এটা ছিল একেবারে নামমাত্র বিয়ে। আমি কখনোই তার সঙ্গে বসবাস করিনি এবং তাকে আমার স্ত্রী বলেও মনে করিনি।'[২]

প্রথম দিকের বিপ্লবী ক্রিয়াকলাপসম্পাদনা

বেইজিং, নৈরাজ্যবাদ এবং মার্কসবাদ: ১৯১৭-১৯সম্পাদনা

মাও বেইজিংয়ে চলে গেলেন, যেখানে তার পরামর্শদাতা ইয়াং চাংজি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি নিয়েছিলেন।[৩] ইয়াং ভেবেছিলেন যে মাও ছিলেন ব্যতিক্রমী "বুদ্ধিমান এবং সুদর্শন",[৪] ইয়াং তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারবিদ লি দাজাওর সহায়ক হিসাবে চাকরি দিয়েছিলেন, উল্লেখ্য লি ছিলেন একজন প্রাথমিক চীনা কমিউনিস্ট। লি রাশিয়ায় অক্টোবর বিপ্লব নিয়ে একাধিক নব তরুণ রচনা করেছিলেন, সেই সময়ে ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট বলশেভিক পার্টি ক্ষমতা দখল করেছিল। লেনিন সামাজিক-রাজনৈতিক তত্ত্ব মার্কসবাদের একজন সমর্থক ছিলেন; এই মার্কসবাদ প্রথমে জার্মান সমাজবিজ্ঞানী কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস দ্বারা বিকাশিত হয়; এবং লি'র নিবন্ধগুলি চীনা বিপ্লবী আন্দোলনের মতবাদগুলিতে মার্কসবাদকে যুক্ত করেছিল।[৫] "আরও বেশি বৈপ্লবিক" হয়ে মাও প্রথমদিকে পিটার ক্রোপটকিনের নৈরাজ্যবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, যা সে সময়ের সবচেয়ে আমূল পরিবর্তনবাদী মতবাদ ছিল। আগের যুগের বিপ্লবীদের দ্বারা সরকারের মাধ্যমে করা সরল আকারের পরিবর্তনের পরিবর্তে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর কাই ইউয়ানপেইয়ের মতো চীনা নৈরাজ্যবাদীরা সামাজিক সম্পর্ক, পারিবারিক কাঠামো এবং নারীদের সমতাতে সম্পূর্ণ সামাজিক বিপ্লব দাবি করতেন।তিনি লি এর পাঠচক্রে যোগ দিয়েছিলেন এবং ১৯১৯ সালের শীতে "মার্কসবাদের দিকে দ্রুত এগিয়ে গিয়েছিলেন এবং গ্রহণ করেছিলেন"।[৬]

মজুরি কম পেলেও মাও অন্য সাতজন হুনানি শিক্ষার্থীর সাথে একটি ছোট ঘরে থাকতেন, কিন্তু বিশ্বাস করেছিলেন যে বেইজিংয়ের সৌন্দর্য তাদেরকে "স্বচ্ছ ও জীবিত ক্ষতিপূরণ" দিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে মাও তার গ্রামীণ হুনানীয় উচ্চারণ এবং নিম্ন অবস্থানের কারণে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের দ্বারা তিরস্কৃত হয়েছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন এবং সাংবাদিকতা সমিতিগুলিতে যোগ দিয়েছিলেন এবং চেন তুসিউ, হু শিহ এবং কিয়ান জুয়ানতংয়ের মতো বক্তৃতা এবং সেমিনারগুলোতে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯১৯ সালের বসন্তে মাওয়ের বেইজিংয়ের সময় শেষ হয়েছিল, তখন তিনি সেসব বন্ধুদের সাথে সাংহাই ভ্রমণ করেছিলেন যারা ফ্রান্স যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।[৭] তিনি শাওশানে ফিরে আসেননি, যেখানে তার মা ছিলেন শারীরিকভাবে অসুস্থ। তার মা ১৯১৯ সালের অক্টোবরে মারা যান এবং তার বাবা ১৯২০ সালের জানুয়ারিতে মারা যান।[৮]

নতুন সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদ, ১৯১৯-২০সম্পাদনা

১৯১৯ সালের ৪ মে বেইজিংয়ের শিক্ষার্থীরা চীনে জাপানি সম্প্রসারণের জন্য তৎকালীন চীন সরকারের দুর্বল প্রতিরোধের প্রতিবাদ জানাতে স্বর্গীয় শান্তির গেটে জড়ো হয়েছিল। এই বিক্ষোভগুলি দেশব্যাপী চৌঠা মে আন্দোলনকে প্রজ্বলিত করেছিল এবং নয়া সংস্কৃতি আন্দোলনকে উজ্জীবিত করেছিল। নয়া সাংস্কৃতিক আন্দোলন চীনের কূটনৈতিক পরাজয়কে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পশ্চাদপতার জন্য দোষ দেয়।[৯]

চাংশায় মাও জিউই প্রাইমারি স্কুলে ইতিহাস পড়ানো শুরু করেছিলেন[১০] এবং হুনান প্রদেশের দুয়ানপন্থী গভর্নর জাং জিঙ্গিয়াওর বিরুদ্ধে বিক্ষোভের আয়োজন করেছিলেন। এই জাং জিঙ্গিয়াও দুর্নীতিবাজ ও সহিংস শাসনের কারণে "বিষধর জাং" নামে পরিচিতি পেয়েছিলেন।[১১] মে মাসের শেষের দিকে, মাও হি শুহেং ও দেং ঝংসিয়ার সাথে হুনানিজ স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন এবং ছাত্র ধর্মঘটের আয়োজন করেন; ১৯১৯ সালের জুন ও জুলাই মাসে জিয়াং রিভার রিভিউ (জিয়াংজিয়াং পিংলুন) নামে একটি সাপ্তাহিক র‌্যাডিক্যাল ম্যাগাজিনের প্রবর্তন শুরু করেন। চীনাদের বেশিরভাগ জনগণের কাছে বোধগম্য হয়ে উঠতে পারে এমন স্থানীয় ভাষাগুলি ব্যবহার করে তিনি "জনপ্রিয় জনতার মহা ঐক্যের" প্রয়োজনের পক্ষে ছিলেন, অহিংস বিপ্লব চালাতে সক্ষম ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে শক্তিশালী করার পক্ষে ছিলেন। তার ধারণাগুলি মার্কসবাদী ছিল না, তবে ক্রোপটকিনের পারস্পরিক সহায়তা সম্পর্কিত ধারণা দ্বারা প্রচন্ডভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন।[১২]

ঝাং স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন নিষিদ্ধ করেছিল, কিন্তু মাও উদারপন্থী ম্যাগাজিন নয়া হুনান (জিন হুনান) এর সম্পাদনা গ্রহণ করার পরে প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছিলেন এবং জনপ্রিয় স্থানীয় পত্রিকা জাস্টিসের (টা কং পো) নিবন্ধ প্রদান অব্যাহত রেখেছিলেন। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি নারীবাদী মতামতকে সমর্থন করেছে, তারা চাইনিজ সমাজে নারীদের মুক্তি দাবি করেছেন।[১৩] ১৯১৯ সালের ডিসেম্বরে মাও হুনানে একটি সাধারণ ধর্মঘট সংগঠিত করতে সহায়তা করেছিলেন, কিছু ছাড়ও পেয়েছিলেন, তবে মাও এবং অন্যান্য ছাত্রনেতা ঝাংয়ের দ্বারা হুমকির মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং মাও বেইজিংয়ে ফিরে এসে শেষ পর্যন্ত অসুস্থ ইয়াং চাংজি'র সাথে দেখা করতে এসেছিলেন।[১৪] মাও দেখতে পেলেন যে তার নিবন্ধগুলি বিপ্লবী আন্দোলনের মধ্যে একটি মাত্রায় খ্যাতি অর্জন করেছে এবং জাংকে উৎখাত করতে সমর্থন তৈরি করতে পেরেছে।[১৫] টমাস কিরকুপ, কার্ল কাউটস্কি, এবং মার্কস ও এঙ্গেলস - বিশেষত কমিউনিস্ট ইশতেহার - রচিত নতুন অনুবাদিত মার্কসবাদী সাহিত্য পড়ে তিনি তাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যে এসেছিলেন, তবে তখনও তার মতামতটিতে উদার-স্বভাবের ছিলেন।

মাও সাংহাই যাওয়ার আগে তিয়ানজিন, জিনান এবং কুফু ভ্রমণ করেছিলেন।[১৬] সাংহাইতে তিনি লন্ড্রিম্যান হিসাবে কাজ করেছিলেন এবং চেন তু সিউয়ের সাথে দেখা করেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে চেনের মার্কসবাদ গ্রহণ "আমাকে সম্ভবত গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল যা সম্ভবত আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল"। সাংহাইয়ে মাও তার এক পুরানো শিক্ষক ইয়ে পেইজি, যিনি একজন বিপ্লবী এবং কুওমিনতাং (কেএমটি) বা চীনা জাতীয়তাবাদী দলের সদস্য ছিলেন, তার সাথে দেখা করেছিলেন। উল্লেখ্য যে তখন কুওমিনতাং ক্রমবর্ধমান সমর্থন ও প্রভাব অর্জন করছিল। ই মাওকে প্রাক্তন কেএমটি জেনারেল টান ইয়ানকাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, যিনি গুয়াংডংয়ের সাথে হুনানিজ সীমান্তে অবস্থানরত সেনাদের কাছে আনুগত্য পোষণ করে রেখেছিলেন। তান জাংকে উৎখাত করার চক্রান্ত করেছিল এবং মাও তাকে চাঙ্গশা ছাত্রদের সংগঠিত করে সহায়তা করেছিলেন। ১৯২০ সালের জুনে, তান তার সেনাদের চাংশায় নিয়ে যায় এবং জাং পালিয়ে যায়। প্রাদেশিক প্রশাসনের পরবর্তী পুনর্গঠনে মাও প্রথম নর্মাল বিদ্যালয়ের জুনিয়র বিভাগের প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন। এখন একটি বড় আয় উপার্জন পেয়ে তিনি ১৯২০ সালের শীতে ইয়াং কাইহুইকে বিয়ে করেছিলেন।[১৭]

চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা: ১৯২১-২২সম্পাদনা

চীনের কমিউনিস্ট পার্টি চেন তুসিউ এবং লি দাজাও দ্বারা ১৯২১ সালে সাংহাইয়ের ফরাসি কনসেশনে একটি গবেষণা সমাজ এবং অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মাও একটি চাংশা শাখা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং সমাজতান্ত্রিক যুব সৈন্যদলের একটি শাখাও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার নতুন কালচারাল বুক সোসাইটির নিয়ন্ত্রণে একটি বইয়ের দোকান খুলেছিলেন, যেটির উদ্দেশ্য ছিল হুনান জুড়ে বিপ্লবী সাহিত্যের প্রচার। [১৮] তিনি হুনান স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনে জড়িত ছিলেন, এই আশায় যে হুনানীয় একটি সংবিধান নাগরিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি করবে এবং তার বিপ্লবী তৎপরতা আরও সহজ করবে। এই আন্দোলন যখন প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠায় সফল হয়েছিল, তখন মাও তার জড়িত থাকার বিষয়টি ভুলে গিয়েছিলেন।[১৯] ১৯২১ সালের মধ্যে সাংহাই, বেইজিং, চাংশা, উহান, গুয়াংজু এবং জিনানে ছোট ছোট মার্কসবাদী গোষ্ঠী বিদ্যমান ছিল; পরে একটি কেন্দ্রীয় সভা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যা জুলাই ২৩, ১৯২১ সালে সাংহাইয়ে শুরু হয়েছিল। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে মাওসহ ১৩ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

কুওমিনতাংয়ের সাথে সহযোগিতা: ১৯২২–২৭সম্পাদনা

১৯২৩ সালের জুনে সাংহাইয়ের কমিউনিস্ট পার্টির তৃতীয় কংগ্রেসে প্রতিনিধিরা কুয়োমিনতাংয়ের সাথে কাজ করার প্রতিশ্রুতি পুনরায় নিশ্চিত করেন। এই অবস্থানকে সমর্থন করে মাও পার্টির কমিটিতে নির্বাচিত হন; এবং সাংহাইয়ে থাকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।[২০] ১৯২৪ সালের গোড়ার দিকে গুয়াংজুতে অনুষ্ঠিত প্রথম কুওমিনতাং কংগ্রেসে, মাও কুওমিনতাং কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বিকল্প সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, এবং নগর ও গ্রামীণ ব্যুরোগুলিতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের জন্য চারটি সঙ্কল্পগ্রহণ করেছিল। কুওমিনতাংয়ের প্রতি তার উৎসাহী সমর্থনের কারণে হুনানের কমরেড লি লি-সান তাঁর সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করে।[২১]

গৃহযুদ্ধসম্পাদনা

নানচাং এবং শরতের ফসল বিদ্রোহ: ১৯২৭সম্পাদনা

সিপিসি উহান কুয়োমিনতাং সরকারকে সমর্থন অব্যাহত রেখেছেল, একটি অবস্থান মাও সেই অবস্থানকে প্রথমে সমর্থন করেছিলেন,[২২] কিন্তু সিপিসির পঞ্চম কংগ্রেসের সময় পর্যন্ত তিনি তার মনোভাব পরিবর্তন করেছিলেন, কৃষক বাহিনীতে সমস্ত আশা জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।[২৩] ১৫ জুলাই যখন উহান সরকার সকল কমিউনিস্টকে কুয়োমিনতাং থেকে বহিষ্কার করেছিল, তখন প্রশ্নটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।[২৩] সিপিসি চিয়াং কাইশেককে মোকাবেলার জন্য চীনের শ্রমিক এবং কৃষকদের রেড আর্মি প্রতিষ্ঠা করেছিল, এটি "রেড আর্মি" নামে অধিক পরিচিতি পায়। জেনারেল চু তে-এর নেতৃত্বে একটি ব্যাটালিয়নকে ১৯২৭ সালের ১ আগস্ট নানচং শহর দখল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যা নানচং বিদ্রোহ হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছিল। তারা প্রাথমিকভাবে সফল হয়েছিল, তবে পাঁচ দিনের পরে তারা পশ্চাদপসরণে বাধ্য হয়েছিল, দক্ষিণে শান্তোর দিকে যাত্রা করেছিল এবং সেখান থেকে তাদের ফুজিয়ানের প্রান্তরে চালিত করা হয়েছিল।[২৩] মাও লাল সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং হুনান জুড়ে কৃষক বিদ্রোহের সূত্রপাতের আশায় শরতের ফসল বিদ্রোহে চাংশার বিরুদ্ধে চারটি রেজিমেন্টের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

চীনের জিয়াংসি সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র: ১৯২৯–১৯৩৪সম্পাদনা

১৯২৯ সালের জানুয়ারিতে মাও এবং চু ২,০০০ লোক এবং পেং দ্বারা সরবরাহিত আরও ৮০০ লোকের ঘাঁটি সরিয়ে নিয়েছিল এবং তাদের সেনাবাহিনীকে দক্ষিণের জিয়াংসি-এর টংগু ও জিনফেংয়ের আশেপাশে নিয়ে যায়।[২৪]

১৯৩০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাও তার নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে দক্ষিণ-পশ্চিম জিয়াংসি প্রাদেশিক সোভিয়েত সরকার তৈরি করেছিলেন।[২৫] নভেম্বরে, কুয়োমিনতাং জেনারেল হে জিয়ান তাঁর স্ত্রী ও বোনকে ধরে এবং শিরশ্ছেদ করার পরে তিনি মানসিক আঘাতের শিকার হন।[২৬][২৭][২৮]

লং মার্চ: ১৯৩৪–১৯৩৫সম্পাদনা

১৪ অক্টোবর, ১৯৩৪-এ রেড আর্মি জিয়াংসি সোভিয়েতের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে জিনফেঙে কুয়োমিনতাং লাইনটি ভেঙে ৮৫,০০০ সৈন্য এবং ১৫,০০০ দলীয় ক্যাডার নিয়ে "লং মার্চ" যাত্রা করেছিল। পালিয়ে যাওয়ার জন্য, আহত এবং অসুস্থ বেশিরভাগ নারী এবং শিশুদের পিছনে ফেলে রাখা হয়েছিল, যাদেরকে কুয়োমিনতাং একদল গেরিলা যোদ্ধা দ্বারা হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল।[২৯][৩০]

চীনের নেতৃত্বসম্পাদনা

গণপ্রজাতন্ত্রী চীন ১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি ছিল দুই দশকেরও বেশি গৃহযুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি। মাও-এর বিখ্যাত উক্তি "চিনা জনগণ উঠে দাঁড়িয়েছে" (চীনা: 中国人民从此站起来了) গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার সাথে যুক্ত, যদিও তিনি ১ অক্টোবর স্বর্গীয় শান্তির দ্বার (তিয়ান'আমেন) থেকে যে ভাষণ দিয়েছিলেন তাতে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন কথাটি ব্যবহার করা হয়নি।[৩১]

উদ্ভববৃত্তান্তসম্পাদনা

পূর্বপুরুষসম্পাদনা

তার পূর্বপুরুষেরা ছিলেন:

  • মাও ইচাং (Máo Yíchāng) (毛贻昌, ১৫ অক্টোবর, ১৮৭০-এ জিয়াংতানে জন্ম, ২৩ জানুয়ারি, ১৯২০ - এ শাওশানে মৃত্যু), মাও এর পিতা, courtesy name মাও শুনশেং (毛顺生) মাও জেন-শেং নামেও পরিচিত।
  • ওয়েন কিমেই (Wén Qīmèi) (文七妹, জিয়াংজিয়াং - এ (জন্মঃ ১৮৬৭ - মৃত্যুঃ ৫ অক্টোবর, ১৯১৯) মা। তিনি অশিক্ষিত এবং ধার্মিক বৌদ্ধ ছিলেন। তিনি ওয়েন তিয়ানজিয়াংয়ের উত্তরাধিকারী ছিলেন।
  • মাও এনপু (Máo Ēnpǔ) (毛恩普, ২২ মে, ১৮৪৬ - এ জন্ম এবং ২৩ নভেম্বর, ১৯০৪ - এ মৃত্যু), পিতামহ।
  • লুও শি (Luó Shì) (罗氏), পিতামহী
  • মাও যুরেন (Máo Zǔrén) (毛祖人), প্রপিতামহ

স্ত্রীরাসম্পাদনা

মাও সে ৎসে-তুঙের চার স্ত্রী আর তাদের মোট সন্তানের সংখ্যা ছিল ১০ জন। তারা হলেন:

  1. লুও ইক্সিউ (罗一秀, ২০ অক্টোবর, ১৮৮৯ - ১৯১০ ) of Shaoshan: ১৯০৭ থেকে ১৯১০ পর্যন্ত বিবাহিত।
  2. ইয়াং কাইহুই (杨开慧, ১৯০১- ১৯৩০) চাংশায় জন্ম : ১৯২১ থেকে ১৯২৭ পর্যন্ত বিবাহিত, ১৯৩০ সালে কেএমটি কর্তৃক বহিষ্কৃত (executed by the KMT in 1930); মাও আনিং, মাও আনকিং এবং মাও আনলং-এর মাতা।
  3. হে যিঝেন (贺子珍, ১৯১০ - ১৯৮৪) জিয়াংশি তে জন্ম: ১৯২৮ থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত বিবাহিত, মাও আনহং, লি মিন, এবং অন্য চার সন্তানের মাতা।
  4. চিয়াং চিং: (江青, ১৯১৪ - ১৯৯১), ১৯৩৯ থেকে মাও-এর মৃত্যু পর্যন্ত বিবাহিত; লি নার মাতা।

উদ্ধৃতিসম্পাদনা

  1. চীনা নামের বানানটি বাংলায় মাও সেতুং বা মাও জেদং হিসাবেও লেখা হয়।
  2. চীনা উচ্চারণ: [mɑ̌ʊ tsɤ̌tʊ́ŋ] মাউ ত্‌সেতুঙ্‌

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. মনির জামান; মাও সেতুং; কথাপ্রকাশ, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ২০১৩; পৃষ্ঠা-১১-১২।
  2. মনির জামান; মাও সেতুং; কথাপ্রকাশ, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ২০১৩; পৃষ্ঠা-১২।
  3. Schram 1966, পৃ. 48; Pantsov ও Levine 2012, পৃ. 47, 56–57.
  4. Feigon 2002, পৃ. 18; Pantsov ও Levine 2012, পৃ. 39.
  5. Schram 1966, পৃ. 47; Pantsov ও Levine 2012, পৃ. 59–62.
  6. Schram 1966, পৃ. 48–49; Pantsov ও Levine 2012, পৃ. 62–64.
  7. Schram 1966, পৃ. 50–52; Pantsov ও Levine 2012, পৃ. 66.
  8. Pantsov ও Levine 2012, পৃ. 66–67.
  9. Pantsov ও Levine 2012, পৃ. 68–70.
  10. Pantsov ও Levine 2012, পৃ. 68.
  11. Pantsov ও Levine 2012, পৃ. 76.
  12. Schram 1966, পৃ. 53–54; Pantsov ও Levine 2012, পৃ. 71–76.
  13. Schram 1966, পৃ. 55; Pantsov ও Levine 2012, পৃ. 76–77.
  14. Schram 1966, পৃ. 55–56; Pantsov ও Levine 2012, পৃ. 79.
  15. Pantsov ও Levine 2012, পৃ. 80.
  16. Pantsov ও Levine 2012, পৃ. 84.
  17. Schram 1966, পৃ. 56–57.
  18. Schram 1966, পৃ. 63; Feigon 2002, পৃ. 23, 28
  19. Schram 1966, পৃ. 63–64; Feigon 2002, পৃ. 23–24, 28, 30
  20. Schram 1966, পৃ. 74–76
  21. Schram 1966, পৃ. 76–82
  22. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; Carter1976 p62 নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  23. Carter 1976, পৃ. 63
  24. Schram 1966, পৃ. 138; Carter 1976, পৃ. 71–72
  25. Schram 1966, পৃ. 149
  26. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; Feigon 2002 50 নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  27. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; Carter1976 p75 নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  28. Schram 1966, পৃ. 153
  29. Schram 1966, পৃ. 180; Carter 1976, পৃ. 81–82
  30. Feigon 2002, পৃ. 57
  31. Cheek T, সম্পাদক (২০০২)। Mao Zedong and China's Revolutions: A Brief History with Documents। New York: Palgrave Macmillan। পৃষ্ঠা 125আইএসবিএন 978-0-312-25626-5The phrase is often mistakenly said to have been delivered during the speech from the Gate of Heavenly Peace, but was first used on September 21, at the First Plenary Session of the Chinese People's Political Consultative Conference, then repeated on several occasions 

আরো পড়ুনসম্পাদনা

বহিঃসংযোগসম্পাদনা

সাধারণসম্পাদনা

ধারাভাষ্যসম্পাদনা