ব্যাবিলনিয়া

ব্যাবিলন

ব্যাবিলনিয়া ছিলো দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার একটি রাজ্য, যা আধুনিক ইরাকের অন্তর্গত। সুমের এবং আক্কাদ নামের এলাকা দুইটি ব্যাবিলনিয়ার অংশ ছিলো। খ্রিস্টপূর্ব যাবো ২৩ শতকে আক্কাদের রাজা সারগনের সময়কালের একটি কাদামাটির ফলকে প্রথম ব্যাবিলনিয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। সিরিয়ার মরুভূমি অঞ্চলে অ্যামোরাইট নামের এক জাতি বাস করত। এরা খ্রীষ্টপূর্ব 1894 অব্দে মেসোপটেমিয়ায় এসে সুমের ও আক্কাদ নগরীর মাঝামাঝি ব্যাবিলন নামক স্থানে একটি সভ্যতা গড়ে তোলে। এটিই ব্যাবিলন সভ্যতা নামে পরিচিত। ব্যাবিলন শব্দটির অর্থ "দেবতার নগরী"। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদী দুটি যেখানে সবচেয়ে কাছাকাছি এসেছে সেখানেই গড়ে তোলা হয়েছে এই নগরী। ব্যাবিলনীয় সভ্যতার স্থপতি এবং প্রথম রাজা ছিলেন বিখ্যাত অ্যামোরাইট নেতা সুমুয়াবাম। নগরীর ঘর-বাড়ি গুলো রোদে শুকানো ইট দিয়ে তৈরি করা হয়েছিলো। প্রতিটি নগরে নির্মাণ করা হয়েছিলো জিগুরাট। বরিসিবাপ নগরের জিগুরাটটি ছিলো সাত তলাবিশিষ্ট। 650 ফুট উচু পিরামিডের মতো জিগুরাটে ছিলো বিচার কক্ষ, স্কুল কক্ষ ও সমাধি।

হামুরাবির শাসনামলে ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি

ব্যাবিলন ছিল প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ নগরী। ১৭৭০ থেকে ৩২০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের সময়টিতে ব্যাবিলনই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় শহর। ২ লাখেরও বেশি জনসংখ্যার প্রথম নগরী বলেও মনে করা হয় ব্যাবিলনকে। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকের দিকে ব্যাবিলন নগরীটি সুরক্ষিত ছিল বিশাল আকারের প্রাচীরের আড়ালে। পুরো নগরী বেষ্টন করে ছিল ২ স্তরের প্রাচীর, যেন প্রথম প্রাচীরের পতন ঘটলেও দ্বিতীয়টি দিয়ে শত্রু ঠেকানো যায়। গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাসের মতে এ দেয়ালগুলো ছিল ৩০০ ফুট উঁচু, ৮০ ফুট চওড়া ও ৫৫ মাইল জুড়ে বিস্তৃত। অবশ্য বর্তমানকালের ঐতিহাসিকদের মতে হেরোডোটাস বাড়িয়ে বলেছিলেন। তাদের মতে দেয়ালগুলো ছিলো ৯০ ফুট উঁচু ও ১০ মাইল লম্বা। এ দুই দেয়ালের মাঝে ছিল পরিখা, যা শত্রুপক্ষের জন্য শহরের ভেতরে প্রবেশ করাকে রীতিমতো অসম্ভব করে রেখেছিল। আরও ছিল ওয়াচ টাওয়ারগুলোতে সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারার ব্যবস্থা। এছাড়া ইউফ্রেটিস নদী শহরটির মাঝ দিয়ে প্রবাহিত ছিল। ফলে অবরুদ্ধ থাকাবস্থায় পানির সরবরাহ নিয়েও তাদের চিন্তার কিছু ছিল না। ৫৩৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পারস্যের রাজা ২য় সাইরাস, যিনি ‘সাইরাস দ্য গ্রেট’ নামেই বেশি পরিচিত। তিনি আক্রমণ করে বসেন ব্যাবিলনে। কিন্তু ব্যাবিলনের সৈন্যরা সাইরাসের এ আক্রমণকে পাত্তাই দেয়নি। তারা তখন ফসল কাটার উৎসবে ব্যস্ত ছিল। শহরের নিরাপত্তা নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগা ব্যাবিলনের সৈন্যদের কাছে সাইরাস যেন ছিলেন এক শিশু। কিন্তু চারদিকে প্রাচীর ঘেরা শহরের ভেতর বহমান ইউফ্রেটিস নদীর প্রবেশপথে গেট নির্মাণ করে রাখলেও এদিকে বাড়তি আর কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাখেনি তারা। শহরটির সৈন্যরা কখনও আশা করেনি, পানির নিচে কেউ সেই গেট ভেঙে তাদের শহরে আক্রমণ চালাবে। এছাড়া পানির নিচে কেউ এত দীর্ঘ সময় ধরে দম আটকে রাখতে পারবে বলেও মনে করেনি তারা। আর তাদের ঠিক সেই জায়গা দিয়েই আক্রমণ করলেন সাইরাস। নদীর আশপাশে বিভিন্ন খাল ও অন্যান্য জলাশয় খনন করে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ব্যবস্থা করলেন তিনি। ফলে নদীতে পানির স্তর নিচে নেমে যায়। তখনই দেখা মেলে গেটগুলোর। এরপর এক রাতে গোপনে তার সৈন্যরা সেখানের ফাঁকা জায়গা দিয়ে শহরে প্রবেশ করে এর মূল ফটকটি খুলে দেয়। এরপর মৌমাছির ঝাঁকের মতো শহরের ভেতরে ঢুকে পড়ে সাইরাসের বাহিনী। প্রকৃত অবস্থাটি ব্যাবিলনের সৈন্যদের বুঝতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লেগেছিল। যখন বুঝল ততক্ষণে বেশ দেরি হয়ে গেছে। আর দিনরাত নাচগান ও মদের রাজ্যে ডুবে থাকায় তারা সেভাবে প্রতিরোধও গড়তে পারেনি। সাইরাস দ্য গ্রেটের সৈন্যদলের কাছে কচুকাটা হতে হয়েছিল তাদের।

✒️সমাজ:

ব্যাবলনীয় সমাজ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত ছিলো। উচু শ্রেণীতে ছিলো রাজা, পন্ডিত, পুরোহিত ও সৈন্য। এদের নিজস্ব জমি ছিলো। শিল্পী ও স্বাধীন ব্যবসায়ীরা ছিলেন মধ্য শ্রেণীতে। আর নিন্ম শ্রেণীতে ছিলো কৃষক, সাধারণ শ্রমিক ও দাসরা। ব্যাবলনীয় সমাজে যুদ্ধবন্দীদের দাস করা হতো।

✒️ রাজা হাম্বুরাবি :

ব্যাবিলনীয় সভ্যতার রাজা হাম্বুরাবি একটি উল্লেখযোগ্য নাম। তিনি ছিলেন ব্যাবিলনের ষষ্ঠ রাজা। তিনি খ্রীষ্টপূর্ব 1792 অব্দে ব্যাবিলনের রাজা হন। তিনি খন্ড-বিখন্ড নগররাষ্ট্রগুলোকে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তার শাসনামলকে ব্যাবিলনের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ বলা হয়। ব্যাবিলনের সর্বাধিপতি এ রাজা খ্রীষ্টপূর্ব 1750 অব্দে মৃত্যুবরণ করেন।