ব্যবহারকারী:Sbshuvo/হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা

পেসাব

হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালাসম্পাদনা

হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা


 
Hameln1
 
Pied piper

একদা এক সময়, এক সুন্দর বিলের পাশে এক চির সবুজ বন ছিল। সেই বনের ধারে এক বিশাল পাহাড়ের পাদদেশে এক ছোট্ট সুন্দর গ্রাম ছিল। গ্রামটির নাম হ্যামেলিন। এটি চমৎকার ছবির মত একটি গ্রাম ছিল। এই গ্রামের বাড়িগুলো উজ্জ্বল রঙ্গে সজ্জিত ছিল। আর এর সড়কগুলি এত মসৃণ পাথরে তৈরি ছিল যে এর চেয়ে আর বেশি মসৃণ সম্ভব নয়।

শহরটি ছিল একটি গ্রামের মত । প্রচুর ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা রাস্তায় হাসাহাসি ও খেলাধুলা করতো। হ্যামেলিন শহরের লোকজন আচার আচরণে অনেক ভাল ও দয়ালু ছিল। কিন্তু তাদের একটি সমস্যা ছিল। তারা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছিল না। যেখানে সেখানে খাবার-দাবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতো। রান্নাঘরগুলোও ছিল অপরিচ্ছন্ন। খাবারের উচ্ছিস্ট যেখানে ফেলত সেখানেই পড়ে থাকতো। তারা প্রচুর অলস ছিল। যাহোক, এমনিতেই দিন যেতে পারতো। কিন্তু একদিন লোকজন এক অবাক করা জিনিস আবিষ্কার করল। ইঁদুর! ঘরের আনাচে-কানাচে ইঁদুর এর অত্যাচার দেখা গেল। খাবারের উচ্ছিষ্টগুলো ইঁদুরগুলোকে আকর্ষণ করতে শুরু করল। ইঁদুরগুলো নানান রকম সমস্যার সৃষ্টি করতে শুরু করল। এভাবে আস্তে আস্তে ইঁদুরগুলো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে লাগল। ছোট, বড়, মাঝারি বিভিন্ন আকারের ইঁদুর দেখা যেতে লাগল।তারা এত পরিমাণে বেড়ে গেল যে ড্রয়ার, টেবিলের নিচে, চুলায় এমনকি চায়ের পাত্রেও দেখা মিলল তাদের। কোথাও এমন কোন জায়গা খুঁজে পাওয়া গেলনা যেখানে ইঁদুর নেই। তারা আকারে এত বড় আর সংখ্যায় এত অধিক যে বিড়ালও ওদের দেখে ভয় পেয়ে পালিয়ে যেতে শুরু করল।

হ্যামেলিনের লোকজন দুঃচিন্তায় পড়ে গেল। ভেবে উঠতে পারল না তারা কি করবে।


শেষ পর্যন্ত সব লোকজন একত্র হয়ে সিদ্ধান্ত নিল তারা মেয়র মল্ডিন এর কাছে যাবে। মেয়র মল্ডিন আচার-আচরনে অনেক ভাল মানুষ। সবাই তাকে অনেক ভাল বাসত। নগরীর লোকজন এত ভাল মানুষ ছিল যে মেয়রের কোন কাজ ছিল না। তাই তার কাজ বলতে যা ছিল তা শুধু তার অফিস কক্ষে বসে থাকা আর ঝিমানো। যখন শহরের লোকজন ইঁদুর এর সমস্যা নিয়ে তার দ্বারস্ত হলো মেয়র বুঝে উঠতে পারল না কিভাবে এই সমস্যার সমাধান দেবে। যখন আর চিন্তাশক্তিতে কুলোচ্ছেনা তখন তিনি হ্যামেলিনের আশেপাশের শহরের মেয়রদের সাথে পরামর্শের জন্য মন স্থির করলেন। তখন এক মেয়র মল্ডিনকে এক অদ্ভুত বাঁশিওয়ালার কথা শুনালো।সে বলল যে সেও এমন এক নোংরা শহরের কথা শুনেছে যেখানে একই রকম সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তখন এক অদ্ভুত বিচিত্র রকমের বাঁশিওয়ালা এসে সমস্যার সমাধান করে দেয়। যাহোক, সেই মেয়র মল্ডিনকে জানালো যে বাঁশিওয়ালাকে একথলে পিতলের মুদ্রা দিলে সে তাদের শহরকেও ইঁদুর মুক্ত করে দেবে। সেই মেয়র তারপর সেই অবাক করা গল্পের কথা তাকে জানাতে লাগল কিভাবে ইঁদুরগুলো নাচতে নাচতে ঘর বাড়ি, ছাদ, নালা- নর্দমা রান্না ঘর এমনকি মেঝেতে পড়ে থাকা খাবারের টুকরার ভেতর হতে জাদুকরী বাঁশির মোহনীয় সুরে শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। ইঁদুরগুলো বাঁশিওয়ালার বাঁশির সুরে নাচতে নাচতে তার পিছু সেই যে চলে যায় তারপর তাদের আর কোনদিনই সেই শহরে দেখা যায়নি। মেয়র মল্ডিন মনোযোগ দিয়ে কথা শুনলেন, এবং তার অদ্ভুত জাদুর বাঁশিওয়ালার কথা ভাবতে লাগলেন।কিন্তু তার তো কোন পিতলের মুদ্রাই নেই! মেয়র মল্ডিন ভাবলেন, আগে তো সমস্যার সমাধান হয়ে যাক তারপর দেখা যাবে। মনে মনে মুদ্রা না দেয়ার কথা চিন্তা করে তিনি সে মেয়রকে সে জাদুকরী বাঁশিবাদককে সংবাদ পাঠাতে বললেন।

কিছুদিন পর। মেয়র মল্ডিন সেই জাদুর বাঁশিওয়ালাকে তার জাদু দেখানোর জন্য হ্যামেলিন শহরে দাওয়াত করলেন। দুই দিন পর জাদুর বাঁশিওয়ালা মেয়রের কথামত তার কিম্ভুতকিমাকার চেহারা নিয়ে মেয়রের কার্যালয়ে উপস্থিত হলেন। তার কাঁধে লম্বা লম্বা চুল ঝুলানো, ধূসর রঙের দাড়ি, সুচালো থুতনি ও ছোট দুটি কান যুক্ত অদ্ভুত মায়াবি তার চেহারা। তার মত এমন অদ্ভুত চেহারার লোক হ্যামেলিন শহরেরবাসী কখনই আগে দেখেনি। তার হাতে সাঁনাই এর মত লম্বা একটা অদ্ভুত রকমের বাঁশি। সে যখন মেয়রকে দেখানোর জন্য এটিতে একটি ফুঁ দিল এটি একটি গাড়ির হুইসেল এর মত হাস্যকর শব্দ সৃষ্টি করল। তার বাঁশির এক ফুঁ তেই তিনটা ইঁদুর ডেস্কের ড্রয়ার থেকে তাদের মাথা উঁকি দিল। এক থলে পিতলের পয়সার বিনিময়ে ইঁদুর তাড়ানোর শর্তে বাঁশিওয়ালা ও মেয়র রাজি হয়ে গেল। মেয়র বাঁশিওয়ালার পিঠ চাপড়ে আশীর্বাদ জানাল। বাঁশিওয়ালা করমর্দন করে মেয়রের কার্যালয় হতে জাদুর বাঁশি হাতে বেড়িয়ে পড়ল। বাঁশিওয়ালা একহাতে তার বাঁশি ধরে বাঁশির প্রান্ত তার ঠোঁটে ধরল। উৎসাহী শহরের লোকজন যার যার বাসা থেকে দম বন্ধ করে মেয়রের অফিসের দিকে তাকিয়ে ছিল কখন জাদুকর তার বাঁশিতে সুর তুলবেন। প্রথমে বাঁশিওয়ালা তার বাঁশিতে মানুষকে দেখিয়ে সুর তুললেন। এই মোহনীয় সুরে সকলে তাদের পায়ের পাতা ও আঙ্গুল নাচাতে শুরু করল। তারপর সে যখন মেয়রের কার্যালয় থেকে বেরিয়ে রাস্তায় আসল তখনই অবাক করা কান্ড অপেক্ষা ঘটে গেল। তার জাদুর বাঁশির সুরে বড়, ছোট, মাঝারি আর বিভিন্ন রঙের ইঁদুর সব দৌড়ে সারি সারি বেড়িয়ে আসতে লাগল। এত অসংখ্য ইঁদুর যে তা কল্পনাতীত। কয়েক হাজারেরও বেশি।

তারা বাঁশিওয়ালাকে অনুসরণ করে শহরের পথ, সরু গলি, রাজপথ এবং মাঠঘাটে এমন ভাবে সারি সারি বেড়িয়ে আসল যে শহরের কোথাও পা ফেলার যায়গা পর্যন্ত রইল না।লোকজন সবাই হাঁ করে তাকিয়ে দেখতে লাগল। ইঁদুরগুলো এমনভাবে বাঁশিওয়ালাকে অনুসরণ করছিল যে দেখে মনে হচ্ছিল যেন ইঁদুরগুলোকে বাঁশিওয়ালা কুচকাওয়াজ করাচ্ছেন। যখন বাঁশিওয়ালা বাঁশি বাজিয়ে নাচছিলেন আর ইঁদুরগুলো তাকে অনুসরণ করছিল তখন শহরের লোকজন তাক লেগে তাকিয়েছিল কি ঘটতে যাচ্ছে তা দেখার জন্য। ইঁদুরগুলো তার পিছু পিছু চলতে লাগল যতক্ষণ না তিনি শহরের অদূরেই বিশাল উঁচু এক এক পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছিলেন। তারপর শহরের লোকজন সেই ইঁদুরের ঝাঁকের পিছন পিছন ছুটছিল কি হয় তা দেখার জন্য। তিনি সেখানে পৌঁছা মাত্র বিশাল এক পাথরের গুহাপথ খুলে গেল। বাঁশিওয়ালা সব ইঁদুরসহ সেখানে প্রবেশ করলেন এবং নাচতে শুরু করলেন। তারপর রহস্যজনকভাবে গুহার প্রবেশপথটি বন্ধ হয়ে গেল।

সবাই এটিকে শেষ ভেবে হাসিমুখে বাড়ি ফিরে যাচ্ছিল। তারপর শহরের লোকজন এই অদ্ভুত ব্যাপার নিয়ে আনন্দ ও নাচানাচি করতে লাগল।

কিন্তু আরও যে অদ্ভুত কিছু তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল তা তারা জানত না। তারা সেখান থেকে বাড়ি ফেরার পথে কান্ড দেখে অবাক হয়ে গেল।তারা শহরের গেইট এ সেই বাঁশিওয়ালাকে তাদের জন্য অপেক্ষমাণ দেখতে পেল।

তারপর বাঁশিওয়ালা তাদের সবার কাছে তার এই বিশাল কাজের পারিশ্রমিক চাইল। কিন্তু মেয়র মল্ডিনের প্রকৃতপক্ষে কোন পিতলের মুদ্রা ছিলনা। তিনি শুধু এই বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে এই শর্তে রাজি হয়েছিলেন। মল্ডিন তাকে পরের সপ্তাহে পিতলের মুদ্রার থলে দেবেন বলে আশ্বাস দিলেন। মেয়র এও জানালেন যে ইঁদুরের অত্যাচার আর উত্তেজনায় তিনি মুদ্রার থলেটি কোথায় রেখেছেন তা তার স্মরণ নেই। কিন্তু বাঁশিবাদক এগুলোর কোনটিই বিশ্বাস কিংবা গ্রহণ করতে পারলেন না। বাঁশিবাদক রাগতস্বরে তার পাওনা টাকা চাইলেন। মেয়র তাকে নির্বোধ বলে গালি দিয়ে বললেন যে- সে যা ইচ্ছে করুক,তিনি মুদ্রা দেবেন না। মেয়র ভাবল ইঁদুর তো চলে গেছে তাই বাঁশিবাদকের আর প্রয়োজন নেই। মেয়র তাকে এই নিয়ে মশকরা করল যে ইঁদুর সব পাহাড়ের ভেতর চলে গেছে তারা আর কখনই ফিরে আসবেনা। বাঁশিবাদক ভয়ংকর গলায় তাকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলল যে তাকে এক থলি মুদ্রা না দিলে তাদের চরম মূল্য দিতে হবে। মেয়র তাকে ভেংচি কেটে হাসলেন। সাথে শহরের সবাই হো হো করে হেসে উঠল। তারা সবাই বলল তাদের জ্বালাতন করা ইঁদুরগুলো সব চলে গেছে তাই তারা স্বভাবিক জীবন যাপন করবে। এবার বাঁশিবাদক করুনভাবে মেয়রের দিকে তাকিয়ে বাঁশিতে ভিন্ন সুর তুললেন। সুরটি ছিল অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও জীবন্ত। যুবক, যুবতী ও ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তাদের ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে এই মোহনীয় সুরের সাথে নাচতে শুরু করল। বাঁশিবাদক ঠিক যেমনভাবে ইঁদুরের সাথে শহরের পথ, সরু গলি, রাজপথ এবং মাঠঘাটে বাঁশিতে সুর তুলে নেচেছিল তেমনি একই ভাবে নতুন সুরেও নাচা শুরু করল। এই সুরে বিমোহিত ও মুগ্ধ হয়ে শিশুরা তার পিছু পিছু নাচতে নাচতে ঠিক আগের পাহাড়, যেখানে ইঁদুরগুলো নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেখানেই শহরের শিশুগুলোকে নিয়ে গিয়ে বাঁশিবাদক বাঁশি বাজাতে থাকলেন। এদিকে শিশুদের বাবা মায়েরা তার অভিসন্ধি বুঝতে পেরে আমার বাচ্চা, আমার বাচ্চা বলে চিৎকার শুরু করল। আর বলতে লাগল আমরা কি দোষ করেছি? তারপর একজন চিৎকার করে মেয়র মল্ডিনকে বলতে শুরু করে, পিতলের পয়সা, পিতলের পয়সা। সে মল্ডিনকে সেটা পরিশোধ করা উচিৎ বলে চিৎকার করে জানাতে থাকে। তারপর সত্য ব্যাপারটা বুঝতে পারল। তারা ভয় পেয়ে গেল যখন দেখল কি হারাতে বসেছে। তারা তাকে চিৎকার করে প্রশ্ন করতে থাকে সে এটা কেন করল। তখন মেয়র জবাব দিল, “আমি কি এটা জানতাম? তোমরা চেয়েছ ইঁদুরগুলোর অত্যাচার যেন বন্ধ হয়ে যায়। আমি মেয়র হিসেবে তা সফলভাবে করতে পেরেছি। কিন্তু এতে তার দোষ কি। এই বিপদ থেকে বাঁচতে তিনি চাকরি ছাড়বেন বলে জানালেন।

তারপর সকলে মিলে ভাবতে শুরু করল কিভাবে এই কোমলমতি শিশুদের ফিরিয়ে আনা যায়। অবশেষে মেয়র মল্ডিন একটি বুদ্ধি বের করলেন। তিনি সবাইকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানালেন।

তিনি সবাইকে বললেন “যেহেতু স্বতন্ত্রভাবে আমাদের কারোরই থলে ভর্তি পিতলের মুদ্রা নেই তাই আমরা কি সবাই মিলে সবার পয়সাগুলো একত্র করতে পারিনা?” তারপর তারা সবার পয়সাগুলো একত্র করল। এগুলো থলে ভরার জন্য যথেষ্ট ছিল। যখন থলেটি ভরল ঠিক তখনই বাঁশিওয়ালার আবির্ভাব ঘটল সেখানে। তারপর সেই অদ্ভুত বাঁশিওয়ালা গলার আওয়াজ মোটা করে সতর্ক করে দেয়ার মত করে বলল, “আমি এখন দেখতে পাচ্ছি আপনাদের অনেক পয়সা।আমি জানতাম, আপনারা যদি একত্রে কাজ করার জন্য চিন্তা করতেন তাহলে কাজটি তখনি হয়ে যেত। আমি আপনাদের শহর থেকে ইঁদুর তাড়িয়েছি। আর সবচেয়ে যে জিনিসটি আমি আপনাদের দিলাম সেটা হলো শিক্ষা। মনে রাখবেন, জীবনে দু একটি পয়সা কোন কিছুই নয়। সবচেয়ে বড় যে জিনিস সেটা হল ঐক্য”। তারপর তার কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে হ্যামেলিন শহরের অদূরে সেই বিশাল পাহাড়ের উপর থেকে সব হারিয়ে যাওয়া ছেলেমেয়েরা হৈচৈ করে নেমে আসল। তারা হাসাহাসি করছিল, নাচছিল, গান গাচ্ছিল আর তাদের বাবা মাকে ডাকছিল। তাদের চোখে মুখে হারানো কিংবা ভয়ের কোন চিহ্নমাত্র ছিলনা।

আর দেখুনসম্পাদনা


বহিঃসংযোগসম্পাদনা

টেমপ্লেট:Link FA