পরিমাপের ইতিহাস

ইতিহাসের বিভিন্ন দিক

ওজন ও পরিমাপ ব্যবস্থার প্রাচীনতম নথিবদ্ধ নিদর্শনের উৎপত্তি খ্রিস্টপূর্ব ৩য় বা ৪র্থ শতাব্দিতে। এমনকি সবচেয়ে আদিম সভ্যতাগুলোতেও কৃষি, নির্মাণ এবং বাণিজ্যের নিমিত্তে পরিমাপ ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। শুরুর দিকের আদর্শ এককসমূহ কেবলমাত্র একটি সম্প্রদায় বা ক্ষুদ্র কোন এলাকাজুড়ে প্রচলিত ছিল; প্রতিটি অঞ্চলই দৈর্ঘ্য, ক্ষেত্রফল, আয়তন এবং ভর পরিমাপের জন্য নিজস্ব মাপকাঠি তৈরি করে নিয়েছিল। প্রায়শই এসব একক নির্দিষ্ট কোন একটি ক্ষেত্রের সাথে নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট ছিল, যেমন– শুষ্ক শস্যের আয়তনের পরিমাপ আর তরল পদার্থের আয়তনের পরিমাপের মধ্যে কোন সম্পর্ক ছিল না, আবার এদের কোনটার সাথেই কাপড় বা জমির দৈর্ঘ্য মাপার জন্য ব্যবহৃত এককের কোন সংশ্লিষ্টতা ছিল না। উৎপাদন প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে এবং আন্তঃ সম্প্রদায় ও ক্রমান্বয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব বিবেচনা করে ওজন ও পরিমাপের প্রমিত পদ্ধতি প্রচলন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অষ্টাদশ শতক থেকে শুরু করে আধুনিকায়িত, সরল ও সুষম ওজন ও পরিমাপ ব্যবস্থার বিকাশ ঘটতে শুরু করে, যেখানে পরিমাপবিজ্ঞানের মাধ্যমে মৌলিক এককসমূহকে আরও নির্ভুল পদ্ধতিতে সংজ্ঞায়িত করা হয়। বিদ্যুতের আবিষ্কার এবং প্রয়োগ আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহারযোগ্য প্রমিত এককের প্রচলনকে উদ্বুদ্ধ করে।

ইতালির তুরিন এর মিশরীয় যাদুঘর এ রক্ষিত কিউবিট দণ্ড

তথ্যের সূত্রসম্পাদনা

ইতিহাসের পরিক্রমায় ওজন ও পরিমাপ ব্যবস্থা বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছে, পণ্য বিনিময় প্রথার সরল ঘরোয়া রূপ থেকে রাষ্ট্রীয় এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাসমূহ যার মধ্যে নানাবিধ পরিমাপ অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রাচীনতম সমাজব্যবস্থায় ওজন ও পরিমাপ পদ্ধতির কিছুটা হলেও আভাস পাওয়া যায় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ থেকে, যেগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যাদুঘরে সংরক্ষিত থাকে। সমসাময়িক লেখকবর্গের বর্ণনায় সেই সময়ের দালানকোঠার মাত্রার তুলনাও তথ্যের একটি সূত্র। এর একটি চমৎকার উদাহরণ হচ্ছে প্লুটার্ক এর দেওয়া গ্রীক পার্থেনন এর মাত্রাসমূহের তুলনামূলক বর্ণনা, যেখান থেকে বেশ নির্ভুলভাবেই অ্যাটিক ফুট (প্রাচীন গ্রিসে ব্যবহৃত দৈর্ঘ্যের একটি একক) এর আকার সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়। নিদর্শন ও নথির সংখ্যার তুলনামূলক পার্থক্যের কারণে, বৃহদাকার ও উন্নত সমাজব্যবস্থাসমূহের রাষ্ট্র-অনুমোদিত পরিমাপ পদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান, ক্ষুদ্রতর সমাজ বা আনুষ্ঠানিক পরিমাপ ব্যবস্থার সাথে একই সময়ে চালু থাকা অনানুষ্ঠানিক পরিমাপ পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে জ্ঞানের তুলনায় বেশি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে, আমাদের কাছে কেবল সম্ভাব্য কিছু তত্ত্ব রয়েছে, এবং কখনো কখনো প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের প্রেক্ষিতে আমাদেরকে উপযুক্ত ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে হয়।

সম্ভাব্য সকল উৎস থেকে প্রাপ্ত প্রমাণাদি নিরীক্ষা করে এবং প্রাসঙ্গিক তথ্যাবলির মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করে, আমরা এককসমূহের উৎপত্তি ও বিকাশ সম্বন্ধে কিছু ধারণা লাভ করতে পারি। আমরা জানতে পারি যে, সেগুলো সময়ের সাথে সাথে কম-বেশি ধারাবাহিকভাবে ও নানাবিধ প্রভাবক উপাদানের কারণে ক্রমশই জটিলভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বৃহৎ সমাজের পরিমাপ ব্যবস্থাগুলোকে ঐতিহাসিক ব্যবস্থার মধ্যে দলভুক্ত করা যেতে পারে যেগুলো সময়ের সাথে মোটামুটি অপরিবর্তিত রয়েছে, যেমন – ব্যাবিলনীয় পদ্ধতি, মিশরীয় পদ্ধতি, টলেমির যুগের ফিলেটেরীয় পদ্ধতি, গ্রীসের অলিম্পিক পদ্ধতি, রোমান পদ্ধতি, ব্রিটিশ পদ্ধতি, এবং মেট্রিক পদ্ধতি।

প্রাচীনতম জানা পরিমাপ ব্যবস্থাসম্পাদনা

প্রাচীনতম জানা সুষম ওজন ও পরিমাপ পদ্ধতির সূচনা ঘটে খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ থেকে ৩য় শতকের দিকে, প্রাচীন মিশর, মেসোপটেমিয়া ও সিন্ধু উপত্যকা, এবং সম্ভবত ইলাম (ইরানে অবস্থিত) এর অধিবাসীদের মাধ্যমে।

আদি ব্যাবিলনীয়, মিশরীয় এবং হিব্রু বাইবেল থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, দৈর্ঘ্য প্রথমে বাহু, হাত বা আঙ্গুল দিয়ে মাপা হত এবং সময় মাপা হত সূর্য, চন্দ্র এবং অন্যান্য স্বর্গীয় বস্তুর পর্যায়কালের মাধ্যমে। লাউ, মাটি বা ধাতুর তৈরি পাত্রের ধারণক্ষমতা মাপার দরকার হলে সেগুলো শস্যের বীজ দিয়ে পূর্ণ করে গণনা করা হত এবং এভাবে আয়তন মাপা হত। ওজন মাপার পদ্ধতি আবিষ্কৃত হবার পর শস্য ও পাথরের ওজনকে আদর্শ বলে গণ্য করা হত। যেমন- ক্যারেট, যা এখনো রত্ন পরিমাপের একক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তার উদ্ভব হয়েছিল ক্যারবের বীজ থেকে।

এককের ইতিহাসসম্পাদনা

দৈর্ঘ্যের এককসমূহসম্পাদনা

খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দিতে মিশরীয় কিউবিট, উপরে উল্লিখিত সিন্ধু উপত্যকার দৈর্ঘ্যের একক, এবং মেসোপটেমীয় কিউবিট ব্যবহার করা হত, যা আমাদের জানামতে প্রাচীন মানবগোষ্ঠী কর্তৃক ব্যবহৃত দৈর্ঘ্য পরিমাপের সর্বপ্রাচীন একক। প্রাচীন ভারতে দৈর্ঘ্যের এককের মধ্যে ছিল ধনু, ক্রোশ এবং যোজন।

সাধারণ কিউবিটের দৈর্ঘ্য ছিল বাহুর কনুই থেকে মধ্যাঙ্গুলির অগ্রভাগ পর্যন্ত। এটা আরও বিভক্ত ছিল বিঘত বা কনিষ্ঠাঙ্গুলি থেকে বৃদ্ধাঙ্গুলির মধ্যবর্তী দূরত্ব (অর্ধেক কিউবিট), হাতের তালু বা প্রস্থ (এক-ষষ্ঠমাংশ), মধ্যাঙ্গুলির প্রস্থ (এক-চতুর্বিংশতিতম বা চব্বিশ ভাগের এক ভাগ) হিসেবে। রয়্যাল কিউবিট, একটি আদর্শ কিউবিট যা একটি অতিরিক্ত করতল দ্বারা বর্ধিত – এজন্য লম্বায় ৭ তালু বা ২৮ আঙ্গুল দীর্ঘ – দালান ও সমাধি নির্মাণ, এবং জরিপের কাজে প্রাচীন মিশরে ব্যবহার করা হত। বেশ জটিল রূপান্তরের মাধ্যমে এই এককগুলো হতে ইঞ্চি, ফুট এবং গজ এককের জন্ম হয়, যার ব্যখ্যা এখনো পুরোপুরি বোধগম্য নয়। কারো কারো বিশ্বাস এগুলো ত্রিমাত্রিক (ঘনকাকৃতি) পরিমাপ থেকে উদ্ভূত, আবার কারো বিশ্বাস এগুলো কিউবিট এর কোন সরল অনুপাত বা গুণিতক। যেটাই হোক, গ্রীক ও রোমানরা মিশরীয়দের কাছ থেকে ফুট এককটি গ্রহণ করে। রোমান ফুট (~২৯৬ মিলিমিটার) ১২ unciae (ইঞ্চি) (~২৪.৭ মি.মি.) এবং ১৬ আঙ্গুল (~১৮.৫ মি.মি.) – এ বিভক্ত করা হত। রোমানরা মিলে পাসুস (১০০০ ধাপ) বা দ্বিগুণ ধাপ, যেখানে প্রতি ধাপ পাঁচ রোমান ফিটের সমান (~১৪৮০ মি.মি.)। ইংল্যান্ড দখল হয়ে যাবার পর সেখানে রোমান মাইল একক চালু হয়, যা ৫০০০ ফুট লম্বা (১৪৮০ মিটার)। রাণী প্রথম এলিজাবেথ (রাজত্বকাল ১৫৫৮ থেকে ১৬০৩) মাইলের দৈর্ঘ্য ৫২৮০ ফুটে (~১৬০৯ মিটার) বা ৮ ফার্লং এ পরিবর্তন করেন, প্রতি ফার্লং ছিল ৪০ রড একক (~২০১ মিটার), প্রতি রডের দৈর্ঘ্য ছিল ৫.৫ গজ (~৫.০৩ মিটার)।

দৈর্ঘ্যের একক হিসেবে গজ (০.৯১৪৪ মি.) এর প্রবর্তন ঘটে আরও পরে, তবে এর উৎপত্তি কীভাবে তা নিশ্চিত নয়। কারো কারো বিশ্বাস এর উৎপত্তি ডাবল কিউবিট থেকে, অন্যদের ধারণা এটা ত্রিমাত্রিক পরিমাপ থেকে এসেছে। উৎপত্তি যেভাবেই হোক, প্রাথমিকভাবে গজকে দ্বিমিক পদ্ধতিতে ২, ৪, ৮ এবং ১৬ ভাগে বিভক্ত করে আধা-গজ, বিঘত, আঙ্গুল এবং গিরা বলা হত। কোন ব্যক্তির কোমরের বেড় বা পরিধি অথবা রাজা প্রথম হেনরি’র (রাজত্বকাল ১১০০–১১৩৫) নাকের ডগা থেকে বৃদ্ধাঙ্গুলের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত দূরত্বের সাথে গজ এর সংযোগ স্থাপন সম্ভবত প্রমিতকরণের একটি প্রচেষ্টা ছিল, কেননা ইংল্যান্ডে বেশ কয়েকটা গজ এর প্রচলন ছিল। রড, পোল এবং পার্চ ও দৈর্ঘ্যের একক হিসেবে ব্যবহৃত হত। নিচের ছকে এককগুলোর সমতুল্যতা দেখানো হয়েছে।

পরিমাপ একক
১২ লাইন ১ ইঞ্চি
১২ ইঞ্চি ১ ফুট
৩ ফুট ১ গজ
১৭৬০ গজ ১ মাইল
৩৬ ইঞ্চি ১ গজ
৪৪০ গজ সোয়া মাইল
৮৮০ গজ আধা মাইল
১০০ লিঙ্ক ১ চেইন
১০ চেইন ১ ফার্লং
৮ ফার্লং ১ মাইল
৪ ইঞ্চি ১ হাত
২২ গজ ১ চেইন
৫.৫ গজ ১ রড, পোল বা পার্চ
৪ পোল ১ চেইন
৪০ পোল ১ ফার্লং

ভরের এককসমূহসম্পাদনা

ভরের সর্বপ্রাচীন একক ছিল গ্রেইন (শস্যদানা; grain) এবং ঔষধ প্রস্তুতি (apothecary), অ্যাভোয়ারদুপোয়া (avoirdupois), টাওয়ার, এবং ট্রয় পরিমাপ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ক্ষুদ্রতম একক ছিল এটি। গম বা যবের দানাকে একক হিসেবে ধরে স্বর্ণ বা রৌপ্যের মত মূল্যবান ধাতুসমূহকে ওজন করা হত। বৃহত্তর এককসমূহ সংরক্ষণের জন্য প্রস্তরকে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হত, যা ভরের একক এবং আর্থিক মুদ্রা– উভয় কাজেই ব্যবহার করা হত। প্রাচীন সভ্যতাগুলোতে ব্যবহৃত মিনা (mina unit) একক থেকে উৎপত্তি হয় পাউন্ড (pound) এককের। মিনা থেকে ক্ষুদ্রতর একটি একক হচ্ছে শেকেল (shekel) এবং বৃহত্তর একক হচ্ছে ট্যালেন্ট (talent)। এককগুলোর মান অবশ্য একেক স্থানে একেক রকম ছিল। ব্যাবিলনীয় এবং সুমেরীয়দের ব্যবহৃত ব্যবস্থায় ৬০ শেকেল ছিল ১ মিনার সমান এবং ৬০ মিনা ছিল ১ ট্যালেন্ট এর সমান। রোমান ট্যালেন্ট ছিল ১০০ লিব্রা (পাউন্ড) এর সমান এবং মিনা থেকে ক্ষুদ্রতর মানের। রোমান পাউন্ডের মত ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় আর্থিক লেনদেনের জন্য ব্যবহৃত ট্রয় পাউন্ড (~৩৭৩.২ গ্রাম) আবার ১২ আউন্সে বিভক্ত ছিল, কিন্তু রোমান উন্‌সিয়া (আউন্স) ছিল ক্ষুদ্রতর। রত্নপাথরের পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত একটি একক হচ্ছে ক্যারেট (carat), যার উৎপত্তি ক্যারব বীজ থেকে এবং পরবর্তীকালে ১ আউন্সের ১/১৪৪ অংশ হিসেবে ও পরে ০.২ গ্রামের সমান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

বাণিজ্য পণ্যসমূহ শুরুতে সংখ্যা বা আয়তন হিসেবে লেনদেন করা হত। যখন মালামাল ওজন করার প্রথা চালু হল, তখন শস্যদানা অথবা পানির আয়তনের ওপর ভিত্তি করে ভরের একক নির্ধারণ করা হয়েছিল। শুষ্ক ও তরল পণ্য পরিমাপের জন্য এখনও পর্যন্ত একই নামের ও বিভিন্ন মাত্রার যেসব একক ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাদের উদ্ভব হয়েছিল খুব সম্ভবত বিনিময়কৃত পণ্যসমূহ থেকে। যেমন – বাণিজ্যিক পণ্যের পরিমাপে ব্যবহৃত বৃহৎ একক অ্যাভোয়ারদুপোয়া পাউন্ড এর ভিত্তি ছিল খুব সম্ভবত পানির আয়তন, যার আয়তনিক ঘনত্ব (bulk density) শস্যদানার তুলনায় বেশি।

বড় ওজনের পরিমাপের জন্য ব্রিটেনে স্টোন, কোয়ার্টার, হান্ড্রেডওয়েইট এবং টন একক ব্যবহৃত হত। বর্তমানে প্রচলিত ব্যবস্থায় কেবল স্টোন এককটি মানুষের দৈহিক ওজন পরিমাপে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বর্তমানে ব্যবহৃৎ স্টোন একক ১৪ পাউন্ড (~৬.৩৫ কিলোগ্রাম) এর সমান, কিন্তু আগেকার একক ছিল ১৬ পাউন্ডের (~৭.২৫ কি.গ্রা.) সমান। অন্যান্য এককগুলো ছিল যথাক্রমে স্টোনের ২, ৪, এবং ১৬০ গুণিতক, অথবা পাউন্ডের ২৮, ১১২, এবং ২২৪০ গুণিতক (~১২.৭ কি.গ্রা., ৫০.৮ কি.গ্রা., ১০৬ কি.গ্রা.) এর সমান। হান্ড্রেডওয়েইট প্রায় ২ ট্যালেন্ট এর সমান ছিল। ২২৪০ পাউন্ডের সমান ওজনকে বলা হয় “দীর্ঘ টন” (long ton) এবং ২০০০ পাউন্ডের সমান (~৯০৭ কি.গ্রা.) টনকে বলা হয় “ক্ষুদ্র টন” (short ton)। ১ টন (tonne, t) হচ্ছে ১০০০ কিলোগ্রামের সমান।

সময় এবং কোণের এককসমূহসম্পাদনা

বৃত্তকে ৩৬০ ডিগ্রিতে বিভক্ত করা এবং দিনকে ঘণ্টা, মিনিট এবং সেকেন্ডে ভাগ করার রীতি সেই প্রাচীন ব্যাবিলনীয়দের আমলেই দেখা যায়, যারা ষষ্ঠিক (sexagesimal) সংখ্যা পদ্ধতি ব্যবহার করতো। ৩৬০ ডিগ্রির ব্যবহার ৩৬০ দিনবিশিষ্ট বর্ষের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে। অন্য অনেক পরিমাপ ব্যবস্থা দিনঅকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ভাগ করতো – ঘণ্টা গণনা, দশমিক সময় ইত্যাদি। অন্যান্য পঞ্জিকাও বছরকে ভিন্নভাবে ভাগ করতো।

মেট্রিক পদ্ধতির অগ্রদূতগণসম্পাদনা

মেট্রিক পদ্ধতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে দশমিক সংখ্যা, যেখানে একটিমাত্র ভিত্তি একক থাকে ও এই দশমিক ভিত্তি থেকেই সকল গুণিতক গঠিত হয় যেখানে অংকগুলো একই থাকে। এর ফলে গণনা সহজ হয়ে যায়। যদিও গাণিতিক গণনার কাজে ভারতীয়রা দশমিক সংখ্যা ব্যবহার করতো, সায়মন স্টেভিন নামক এক ব্যক্তিই সর্বপ্রথম ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে তার দে থিন্ডে (De Thiende; দশম) পুস্তিকায় সাধারণ গণনার কাজে দশমিক পদ্ধতি ব্যবহারের পক্ষে সুপারিশ করেন। তিনি আরও ঘোষণা করেন যে, মুদ্রা ও পরিমাপ ব্যবস্থায় দশমিক পদ্ধতির ব্যবহার সময়ের ব্যপার মাত্র। দশমিক ভগ্নাংশের জন্য তার ব্যবহৃত চিহ্নলিপি বেশ বেখাপ্পা ধরনের হলেও দশমিক বিন্দু’র প্রচলন করা হলে সেই সমস্যার নিরসন ঘটে, যার কৃতিত্ব দেওয়া হয়ে থাকে বার্তোলোমিউস পিটিস্কুসকে (Bartholomeus Pitiscus), যিনি তার ত্রিকোণমিতিক ছকে এই চিহ্নলিপি ব্যবহার করতেন।.[১]

১৬৭০ সালে, গ্যাব্রিয়েল মুতোঁ (Gabriel Mouton) একটি প্রস্তাবনা প্রকাশ করেন যা উইলকিন্স এর প্রস্তাবনার মতই ছিল, তবে তার দৈর্ঘ্যের ভিত্তি একক ছিল ভৌগোলিক অক্ষাংশের আর্ক মিনিট (minute of arc) এর ১/১০০০ অংশ (প্রায় ১.৮৫২ মিটার)। তিনি এই এককের নাম প্রস্তাব করেন ভার্গা (virga)। প্রতিটি এককের আলাদা আলাদা নামের বদলে তিনি এস.আই. পদ্ধতির মতই এককের আগে উপসর্গ যুক্ত করে কতগুলো নাম প্রস্তাব করেন।[২]

১৭৯০ সালে, টমাস জেফারসন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে একটি প্রতিবেদন পেশ করেন যেখানে তিনি মুদ্রাব্যবস্থা এবং ওজন ও পরিমাপ পদ্ধতি হিসেবে দশমিক পদ্ধতি প্রচলনের প্রস্তাব করেন। তিনি দৈর্ঘ্যের ভিত্তি একককে “ফুট” হিসেবে নামকরণের প্রস্তাব দেন, যেখানে প্রতি ফুট হবে ১ সেকেন্ড পর্যায়কাল বিশিষ্ট কোন দোলকের দৈর্ঘ্যের ৩/১০ অংশ অথবা ১/৩ অংশ – অর্থাৎ প্রায় এক শতাব্দি আগে উইলকিন্সের প্রস্তাবিত “আদর্শ” মানের ৩/১০ বা ১/৩ অংশ। সেটা ১১.৭৫৫ ইংরেজি ইঞ্চি (২৯.৮ সে.মি.) অথবা ১৩.০৬ ইংরেজি ইঞ্চি’র (৩৩.১ সে.মি.) সমান হতো। উইলকিন্সের মতই তিনি ভিত্তি এককের গুণিতক বা উপগুণিতকের যেসব নাম প্রস্তাব করেছিলেন, সেগুলো তদানীন্তন সময়ে ব্যবহৃত এককগুলোর নামেই ছিল।[৩] এই সময়ে ভূগণিতের প্রতি গড়ে ওঠা আগ্রহ, এবং পরিমাপ পদ্ধতির বিকাশ মহাদেশীর যুক্তরাষ্ট্রের জরিপ ও বিভাজনকে প্রভাবিত করেছিল। জেফারসনের দূরদর্শিতা কীভাবে গুন্টার চেইন (Gunter chain) ও প্রথাগত একর (acre) একক ব্যবস্থাকে সরিয়ে নতুন পরিমাপ পদ্ধতির প্রচলনের কাছাকাছি গিয়েও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় তার পুরো কাহিনী পাওয়া যায় আন্ড্রো লিঙ্কলেটার রচিত মেজারিং আমেরিকা গ্রন্থে।[৪]

মেট্রিক রূপান্তরসম্পাদনা

মেট্রিক পদ্ধতি প্রথম বর্ণিত হয় ১৬৬৮ খ্রিস্টাব্দে এবং ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্স কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। উনবিংশ ও বিংশ শতকজুড়ে এই পদ্ধতি পৃথিবীজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র, চীন, এবং যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ এখনো নিজেদের প্রথাগত একক পদ্ধতিই ব্যবহার করে থাকে।[৫] অসংখ্য প্রচলিত পদ্ধতির মধ্যে অনেকেই মেট্রিক পদ্ধতির পূর্ণ সাংখ্যিক গুণিতকের ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করেছে: স্ক্যানডিনেভিয়ান মাইল বর্তমানে ১০ কি.মি., চৈনিক জিন এখন ০.৫ কি.গ্রা., এবং ডাচ অন্স এখন ১০০ গ্রাম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা

  1. ও'কনর, জন জে.; রবার্টসন, এডমুন্ড এফ. (জানুয়ারি ২০০৪), "পরিমাপের ইতিহাস", ম্যাকটিউটর গণিতের ইতিহাস আর্কাইভ, সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয় 
  2. ও'কনর, জন জে.; রবার্টসন, এডমুন্ড এফ. (জানুয়ারি ২০০৪), "পরিমাপের ইতিহাস", ম্যাকটিউটর গণিতের ইতিহাস আর্কাইভ, সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয় 
  3. জেফারসন, টমাস (৪ জুলাই ১৭৯০)। "Plan for Establishing Uniformity in the Coinage, Weights, and Measures of the United States Communicated to the House of Representatives, July 13, 1790"। নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র। 
  4. লিঙ্কলেটার, অ্যান্ড্রো (২০০২)। Measuring America: How an Untamed Wilderness Shaped the United States and Fulfilled the Promise of Democracy । ওয়াকার এন্ড কো.। আইএসবিএন 978-0-8027-1396-4 
  5. বাখোল্‌য, ক্যাথেরিনা (৬ জুন ২০১৯)। "Only Three Countries in the World (Officially) Still Use the Imperial System"Statista। ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২১ এপ্রিল ২০২০The UK is the country stuck in the middle of both systems, being the birthplace of the imperial system itself. Here, metric is partially adopted but miles persist, and people routinely refer to pints, miles per gallon, pounds and even stone in their everyday lives. 

আরও পড়ুনসম্পাদনা