কেমব্রিজ, ম্যাসাচুসেটস

কেমব্রিজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের মিডলসেক্স কাউন্টিতে অবস্থিত একটি শহর ও বোস্টন মেট্রোপলিটন এলাকার অংশ। এটি ম্যাসাচুসেটস এর জনসংখ্যায় পঞ্চম বৃহত্তম শহর (বস্টন, উস্টার, স্প্রিংফিল্ড ও লোয়েল শহরের জনসংখ্যা কেমব্রিজ অপেক্ষা বেশি)।[১]২০১০ এর আদমশুমারি অনুযায়ী কেমব্রিজের জনসংখ্যা ছিল ১,০৫,১৬২।[২] ১৯৯৭ সালে মিডলসেক্স কাউন্টির স্থানীয় প্রশাসন অবলুপ্ত করা হলেও এর কার্যক্রম যে দুইটি শহরে অব্যাহত রয়েছে, তাদের একটি কেমব্রিজ। এটি বস্টনের উত্তরে চার্লস নদীর তীরে অবস্থিত। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানে এর নামকরণ করা হয় কেমব্রিজ ।[৩]

কেমব্রিজ শহরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, এমআইটি , লেসলি বিশ্ববিদ্যালয়হাল্ট ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস স্কুল অবস্থিত।[৪]কেমব্রিজের কেন্ডাল সরণি বিশ্বের সবচেয়ে উদ্ভাবনী সরণির স্বীকৃতি পেয়েছে, কেননা ২০১০ সাল হতে এর সংলগ্ন এলাকায় অনেক সফল উদ্যোগ বা স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।[৫]

ইতিহাসসম্পাদনা

১৬৩০ এর ডিসেম্বরে এখানে শহর প্রতিষ্ঠার জন্য স্থান নির্বাচন করা হয়। বোস্টন বন্দর থেকে এর নিরাপদ অবস্থান শত্রু-জাহাজের আক্রমণ থেকে সহজেই একে রক্ষা করতে পারত। শহরের প্রথম বসতিস্থাপনকারীরা হলেন থমাস ডাডলি, তার মেয়ে অ্যান ব্র্যাডশিট ও জামাতা সাইমন। ১৬৩১ এর বসন্তে শহরের প্রথম বাড়িগুলো নির্মাণ করা হয়। শহরটির নাম তখন ছিল "নিউয়ি টাউনে (Newe towne)।[৬]

গভর্নর জন উইনথ্রপের নেতৃত্বে ৭০০ জন সংস্কারপন্থী ম্যাসাচুসেটসে অনেকগুলো শহর প্রতিষ্ঠা করেন। নিউয়ি টাউনে তাদের অন্যতম। থমাস হুকার এর আদি বাসিন্দাদের নিয়ে হার্টফোর্ড ও কানেকটিকাট উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করেন। নিউয়ি টাউনে ছেড়ে যাওয়ার আগে এর প্রাক্তন বাসিন্দারা ইংল্যান্ড থেকে নতুন আগত অভিবাসীদের কাছ থেকে জমি বিক্রি করে যান।

এর আদি অংশটুকু বর্তমানে হার্ভার্ড সরণির অন্তর্ভুক্ত। প্রাচীন আমলে শহরের হাট যেখানে বসত, সেটি এখন জন এফ কেনেডি এবং উইনথ্রপ স্ট্রিটের কিনারায় অবস্থিত ক্ষুদ্র পার্কে পরিণত হয়েছে।

কেমব্রিজের বিভিন্ন এলাকা এখন অন্যান্য শহরের অন্তর্গত। যেমন- কেমব্রিজ ভিলেজ এলাকা নিউটাউন, কেমব্রিজ ফার্মস এলাকা লেক্সিংটন, দক্ষিণ কেমব্রিজ এলাকা ব্রাইটন ও পশ্চিম কেমব্রিজ এলাকা আর্লিংটন শহরের অংশ।[৭] ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে কেমব্রিজ শহরটি বোস্টনের সাথে সংযুক্ত করার একাধিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়, কিন্তু সবগুলোই শেষাবধি প্রত্যাখ্যাত হয়।[৮]

খ্রিস্টান পুরোহিতদের প্রশিক্ষণ দানের লক্ষ্যে ১৬৩৬ সালে এখানে নিউয়ি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ম্যাসাচুসেটস সাধারণ পরিষদ কলেজ নির্মাণের জায়গা বাছাই করে। ১৬৩৮ সালের মে মাসে[৯] কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানে শহরটির নাম দেওয়া হয় "কেমব্রিজ।"

থমাস হুকার, জন উইনথ্রপসহ অনেকেই কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। ১৬৫০ সালে গভর্নর থমাস ডাডলি একটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করে, যার তত্ত্বাবধানে আজ-ও হার্ভার্ডের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।[১০]

উত্তরে ভার্জিনিয়া থেকে জর্জ ওয়াশিংটন ১৭৭৫ সালের ৩ জুলাই কেমব্রিজ শহরের কমন পার্কে আগমন করেন এবং আমেরিকান বাহিনীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কমন পার্ক "আমেরিকান সেনাবাহিনীর জন্মভূমি" নামে পরিচিত। ১৭৭৬ সালের ২৪শে জানুয়ারি হেনরি নক্স শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন, যার ফলে ওয়াশিংটন সহজেই ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে বোস্টন থেকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হন।

১৭৯২ সালে কেমব্রিজ ও বোস্টন শহর সংযোগকারী পশ্চিম বোস্টন সেতু নির্মাণ করা হয়। ১৮০৯ সালে মিডলসেক্স খালের সন্নিকটে "ক্যানাল ব্রিজ" নির্মাণ করা হয়।

হেনরি ওয়েডসওয়ার্থ লংফেলো, জেমস রাসেল লোয়েলঅলিভার ওয়েন্ডেল হোমস-সহ অনেক প্রথিতযশা কবি এখানে সাহিত্যচর্চা করেছেন।

এসময় শহরে অনেকগুলো টোলসেতু নির্মাণ করা হয়। এছাড়াও শহরটিকে বোস্টন ও মেইন রেলসেতুর সাথে সংযুক্ত করা হয়।

১৮৪৬ সালে কেমব্রিজ স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের অধীনে আনা হয়। হার্ভার্ড সরণি থেকে কেন্দ্রীয় সরণিতে শহরের যাবতীয় কার্যক্রম স্থানান্তরিত হয়। ইটভাটা, বরফ-কর্তন শিল্প ও গৃহনির্মাণ শিল্পের প্রসার ঘটে।

১৮১৮ সালে কেমব্রিজ শহরে নিউ ইংল্যান্ড গ্লাস কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কাচব্যবসায় প্রসিদ্ধি অর্জন করে। ১৮৮৮ সালে এডমন্ড ড্রামন্ড লিবি কাচব্যবসা কেমব্রিজ থেকে ওহাইও অঙ্গরাজ্যের টলেডো শহরে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড স্থানান্তরিত করে।

১৮৯৫ সালে এডওয়ার্ড জিন পুস্তক প্রকাশনা সংস্থা অ্যাথেনিয়াম প্রেস প্রতিষ্ঠা করে।

কেমব্রিজ শহরে কার্টার কোম্পানির কালি তৈরির কারখানা ছিল। কার্টার কালি কোম্পানি বিশ্বের সবচেয়ে বড় কালি তৈরির কারখানা ছিল। কেনেডি বিস্কুট ফ্যাক্টরি, নেককো, পেজ অ্যান্ড শ, ড্যাগেট চকোলেট ফ্যাক্টরি নানা ধরনের মুখরোচক খাবার উৎপাদন করত।

১৯৩৫ সালে কেমব্রিজ গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ শ্বেতাঙ্গদের জন্য নিউটাউন কোর্ট ও কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য ওয়াশিংটন এলমস আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করে।[১১]

মহামন্দার সময় কেমব্রিজের শিল্পকারখানাগুলো হুমকির মুখে পড়ে। তখন শিক্ষাখাতই এর অর্থনীতির প্রাণ হিসেবে আবির্ভূত হয়।

কেমব্রিজে ১৯৬৯ সালে প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান বোল্ট, বেরানেক ও নিউল্যান্ড প্রথম নেটওয়ার্ক রাউটার স্থাপন করে। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭১ সালে এ শহর থেকেই বিশ্বের প্রথম ই-মেইল প্রেরণ করে। কেমব্রিজে অবস্থিত ভিসিকর্পস বিশ্বের সর্বপ্রথম স্প্রেডশিট সফটওয়্যার তৈরি করে। কেমব্রিজ শহরে গুগল, মাইক্রোসফটআমাজন কোম্পানির কার্যালয় রয়েছে।

নোভারটিস, টেভা ও মডার্নাসহ অনেকগুলো ওষুধ কোম্পানি কেমব্রিজ শহরে কার্যক্রম পরিচালনা করে।

১৯৮৫ সাল থেকে কেমব্রিজ শহরটি একটি অভয়ারণ্য শহর (অর্থাৎ যে সকল শহর অভিবাসন বিষয়ে ফেডারেল সরকারের নীতিমালা অনুসরণে বাধ্য নয়)। [১২]

ভূগোলসম্পাদনা

আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, কেমব্রিজের আয়তন ৭.১ বর্গমাইল, যার মধ্যে ৬.৪ বর্গমাইল স্থল ও ০.৭ বর্গমাইল জল।

শহরটি পূর্ব ম্যাসাচুসেটসে অবস্থিত। এর দক্ষিণ ও পূর্বে বোস্টন, উত্তরে সমারভিল, উত্তর-পশ্চিমে আর্লিংটন, পশ্চিমে বেলমন্ট ও ওয়াটারটাউন অবস্থিত।

কেমব্রিজ শহরকে বলা হয় সরণির শহর। এখানে অনেকগুলো সরণি বা স্কয়ার অবস্থিত। যেমন-

  1. কেন্ডাল স্কয়ার
  2. সেন্ট্রাল স্কয়ার
  3. হার্ভার্ড স্কয়ার
  4. পোর্টাল স্কয়ার
  5. ইমমান স্কয়ার
  6. লেখমিয়ার স্কয়ার

জলবায়ুসম্পাদনা

কেমব্রিজ শহরে সাধারণত শুষ্ক মৌসুম দেখা যায় না। এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। জানুয়ারি মাসে তাপমাত্রা কমে ২৬.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটে দাঁড়ায়।[১৩]

জনমিতিসম্পাদনা

২০১০ এর হিসাব অনুযায়ী কেমব্রিজের জনসংখ্যা ছিল ১,০৫,১৬২। এখানে ১৭,৪২০টি পরিবার বসবাস করছিল। বাসিন্দাদের মধ্যে ৬৬.৬% শ্বেতাঙ্গ, ১১.৭% কৃষ্ণাঙ্গ বা আফ্রিকান আমেরিকান, ১৫.১% এশীয় ও ০.২% আদিবাসী আমেরিকান। বাসিন্দাদের ৭.৬% হিস্পানিক অথবা লাতিনো।

শহরটির পরিবারগুলোর গড় আয় ৫৯,৪২৩ মার্কিন ডলার। পুরুষদের গড় আয় ৪৩,৮২৫ মার্কিন ডলার ও নারীদের গড় আয় ৩৮,৪৮৯ মার্কিন ডলার। বাসিন্দাদের মাথাপিছু আয় ৩১,১৫৬ মার্কিন ডলার। শহরের ৮.৭% পরিবার ও ১২.৯% বাসিন্দা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছিল। এদের মধ্যে রয়েছে ১৮ বছরের নিচে ১৫.১% ও ৬৫ বছরের উপরে ১২.৯% বাসিন্দা।

প্রশাসনসম্পাদনা

কেমব্রিজ সিটি কাউন্সিল নয় সদস্যবিশিষ্ট। এছাড়াও শহরে ছয়-সদস্যবিশিষ্ট স্কুল কমিটির কার্যক্রম রয়েছে। একক স্থানান্তরযোগ্য ভোটের মাধ্যমে তারা নির্বাচিত হন।[১৪]

পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতিতে সিটি কাউন্সিলরদের মধ্য থেকে মেয়র নির্বাচিত হন।

তথ্যসূত্রসম্পাদনা