প্রধান মেনু খুলুন

স্থাপিত :১৯২৬ অবস্থান : বাগদাদ, ইরাক। সংগ্রহের পরিমান:১৭০০০০-২০০০০ পরিদর্শন:উন্মুক্ত পরিচালক :আহমেদ কামিল মুহাম্মাদ। ওয়েবসাইট :IraqMuseum.org

সংগ্রহঃ মেসোপটেমিয় সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক ঐশর্যসম্পন্ন হবার কারণে এই জাদুঘরের সংগ্রহকে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডিত্যময় প্রদর্শনী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ব্রিটিশ ও ইরাকি সংযোগের কারণে এখানে নিদর্শনগুলো দেখানোর সময় ইংরেজি ও আরবি ভাষা ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও এ জাদুঘরে ২৮টি গ্যালারি ও ভল্টে প্রায় ৫০০০ বছর পুরনো মেসোপোটেমিয় ইতিহাসের সাক্ষ্য বহনকারী বহু গুরুত্বপূর্ণ হস্তনির্মিত নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। এখানে কালজয়ী নিদর্শন হিসেবে সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয়, আক্কাদীয় ও অ্যাসিরিয় সভ্যতার কিছু শিল্পকর্ম ও হস্তনির্মিত নিদর্শন পাওয়া যায়। এছাড়াও এখানে আরবের প্রাক-ইসলামিক ও ইসলামিক সংস্কৃতির অনেক নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। এখানকার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন এর মধ্যেঃ নমরুদের স্বর্ণ সংগ্রহশালা উল্লেখযোগ্য। এই সংগ্রহশালায় স্বর্ণালঙ্কার,৯০০ খ্রিষ্টপূর্ব সময়ের মূল্যবান রত্নের নকশা,খোদাই পাথরের সংগ্রহ, উরুক সভ্যতার শংকু আকৃতির পাথর ফলক অসাধারণ। উরুক সভ্যতার নিদর্শন গুলো আনুমানিক ৩৫০০ থেকে ৩০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ সময়ের।

২০০৩ সালের যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি: ২০০৩ সালে জানুয়ারি মাসে শুরু হওয়া ইরাক যুদ্ধ ও তার পূর্ববর্তী সময়ে তথা ডিসেম্বর মাসে বিভিন্ন পুরাতত্ত্ববিদ, যুক্তরাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক পলিসি কাউন্সিল এর কিছু প্রতিনিধি পেন্টাগন এবং যুক্তরাজ্যের সরকারের কাছে যুদ্ধ ও লুন্ঠন এর হাত থেকে জাদুঘরের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন জানান। কিন্তু কোনো প্রতিজ্ঞা ছাড়াই, সৌভাগ্যক্রমে মার্কিন ফোর্স এই জাদুঘর এর উপর বোমা নিক্ষেপ করে নি।এই স্থান ব্যতীত ইরাকের আরও অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিলো। ৯ই এপ্রিল ২০০৩ সালে বাদবাকি জাদুঘর তত্ত্বাবধায়ক এবং স্টাফ জাদুঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। জাদুঘর থেকে কয়েক ব্লক দূরে নিকটস্থ স্পেশাল রিপাবলিকান গার্ড প্রাঙ্গণে ইরাকি ফোর্স মার্কিন থার্ড ইনফ্যান্টরি ডিভিশনের লেফটেন্যান্ট কর্নেল Eric Schwartz এক ধারণাতীত ঘোষণায় বলেন যে, তিনি জাদুঘর প্রাঙ্গণে গিয়ে সেখানে নিরাপত্তা দিতে পারছিলেন না।ওনারা সকলেই ভবনের দিকে এগিয়ে যাওয়া আগুন এড়াতে যথাসম্ভব চেষ্টা করেছিলেন। পরবর্তীতে ভবনের মধ্যে, স্নাইপার পজিশন, প্রতিহত করা গুলি এবং ১৫ জন ইরাকি সৈনিকের ইউনিফর্ম পাওয়া যায়।এই পজিশন গুলো আসলে জাদুঘর কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা করা বালুর বস্তা,প্রতিরক্ষামূলক ফোম সাপোর্ট এবং প্রশমণ বাঁধ দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে জানা যায় সেই গুলি আর ইউনিফর্মগুলো জাদুঘর তত্ত্বাবধায়ক ও স্টাফদের ছিলো। অবশেষে মার্কিন বিবৃতি অনুসারে জানা যায় যে,জাদুঘর এবং এর পার্শ্ববর্তী চত্বরে কোথাও কোনো গুরুতর আক্রমণ এর চিহ্ন মেলেনি। প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ইরাকি স্টাফরা জাদুঘরের পশ্চিম পার্শ্ব জুড়ে একটি শক্তিশালী দেয়াল গড়ে তোলেন যার গোপন পথ শুধুমাত্র জাদুঘরের সামনের ও পেছনের দিকের এলাকায় গোপন চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হতো।এর মাধ্যমে মার্কিন ফোর্স সাধারণভাবেই এলাকাটিকে চারদিক থেকে বেষ্টন করে এবং পৃথক করে রেখে দুর্বৃত্তদের আনাগোনা প্রতিরোধ করতে পারতেন।১০ থেকে ১২ই এপ্রিল এর মধ্যে বেশ কিছু চুরি ও নাশকতারমূলক ঘটনা ঘটে এখানে। ১২ই এপ্রিল জাদুঘরের স্টাফরা ভবনে ফিরে দুর্বৃত্তদের চক্রান্ত প্রতিহত করে জাদুঘরে প্রবেশ করেন এবং ১৬ই এপ্রিল মার্কিন ফোর্সের জাদুঘরের চারদিকে ছড়িয়ে না পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকেন।মেরিন কর্ণেল Matthew Bogdanos এর নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল এপ্রিল মাসের ২১ তারিখে ঘটনার তদন্ত শুরু করেন। তাদের তদন্ত থেকে জানা যায় যে,তিনটি আলাদা দল চারদিনে আলাদা আলাদা ভাবে তিনটি চুরি করে। যখন স্টাফরা চুরি ও ক্ষয়ক্ষতি বন্ধ করার জন্যে পরিকল্পনা(যা ইরাক ইরান যুদ্ধ ও প্রথম গালফ যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল) বাস্তবায়ন শুরু করেন তখন অনেক বৃহৎ মূর্তি, কেন্দ্রস্তম্ভ ও ছাদের কারুকার্য করা স্থান সাধারণ গ্যালারিতে ফোম দ্বারা সুরক্ষিত করে বালুর বস্তা দিয়ে বেষ্টনী তৈরি করে দেওয়া হয়েছিলো। গ্যালারিগুলো থেকে অতিমাত্রায় মূল্যবান চল্লিশটি নিদর্শন চুরি হয়েছিল। এগুলোর মধ্যে মহামূল্যবান তিনটি নিদর্শন :ওয়ারকা'র পবিত্র অলঙ্কৃত পানপাত্র(১৪টি অংশে ভেঙে গিয়েছিল, প্রথম অভিযান থেকে প্রাথমিক অবস্থায় প্রাপ্ত),ওয়ারকা'র মুখোশ, বাসেটকি মূর্তিসহ ১৩টি নিদর্শন জানুয়ারি ২০০৫ সালে খুঁজে পাওয়া যায়। জাদুঘর দপ্তরের মতে,দূর্বৃত্তরা যেসব নিদর্শন এর দিকে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে : ৫০০০ বছরের পুরনো সুমেরীয় সভ্যতার তৈলস্ফটিক নমুনা যা ওয়ারকা'র পবিত্র অলঙ্কৃত পানপাত্র নামে পরিচিত, আক্কাদীয় যুগের উরুক সভ্যতার ব্রোঞ্জমূর্তি যা ৫০০০ বছর পুরনো ৬৬০ পাউন্ডের ছিলো এবং এন্টেমেনার মস্তকহীন মূর্তি। উরের হার্পটি কিছু দুর্বৃত্ত ছিঁড়ে ফেলেছিল একই সাথে ওটার স্বর্ণবন্ধন ও তারা সরিয়ে ফেলেছিল।চুরি হয়ে যাওয়া হস্তনির্মিত নিদর্শন এর মধ্যে ২৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের আক্কাদীয় সাম্রাজ্যের একটি বড় আকারের যুবমূর্তি যা বাসেটকির ব্রোঞ্জমূর্তি নামে পরিচিত এবং এটা উত্তর ইরাকের বাসেটক নামক এক গ্রামে খুঁজে পাওয়া যায় এবং এর মধ্যে ৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের রাজা Schalmanezar এর পাথুরে মূর্তিও ছিলো। জাদুঘরের নিচতলার জীবন্ত সংরক্ষিত কামরাগুলোতেও চুরি হয়েছিল। প্রত্নতত্ত্ব অভিযান হতে প্রাপ্ত প্রায় ৩১০০ টি নমুনা (পাত্র,বয়াম,মাটির ঠিকরা ইত্যাদি) চুরি হয়।এগুলোর মধ্যে ৩০০০টি নমুনা পুনরায় পাওয়া যায়।দুর্বৃত্তরা পক্ষপাতদুষ্ট ছিল না কারণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো তাক চুরি হয়ে গিয়েছিল আবার তার পাশেই রাখা তার চেয়ে তুলনামূলক মূল্যবান তাক কিংবা তার চেয়েও অনেক বেশি দামি কোনো নিদর্শন সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় ছিল। তৃতীয় চুরির বিষয়টি বেসমেন্টের কামরাগুলোতে ঘটে। দূর্বৃত্তরা খুব সহজে বহন করে নিয়ে যাওয়া যায় এমন সব জিনিস চুরি করার চেষ্টা করে। এসব জিনিস জাদুঘর এর যথাসম্ভব দূরবর্তী বিচ্ছিন্ন জায়গায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। চারটি কক্ষের দূরের কক্ষে দূর্বৃত্তরা লুট করে।সেই কক্ষের কেবিনেটগুলোতে ১০০টি ছোটো বক্সে বেলনাকার সিলমোহর,পুঁতি ও গয়না ছিলো। আরও প্রমানিত হয় যে, দূর্বৃত্তদের কাছে কেবিনেট খোলার জন্য অনেকগুলো বিশেষ চাবি ছিলো যেগুলো অন্ধকারে পড়ে গিয়ে হারিয়ে যায়।তবুও মাটির উপরে থাকা প্লাস্টিকের বাক্স থেকে তারা ১০০০০টি ছোট জিনিস চুরি করে এবং এর মধ্যে শুধুমাত্র ২৫০০টির মতো জিনিস পুনরায় ফেরত পাওয়া যায়। অর্থাৎ চুরি হয়ে যাওয়া নিদর্শন এর মধ্যে সুমেরীয় রাজা Entemena of Lagash এর মস্তকহীন পাথুরে মূর্তি হলো মুল্যবান একটি নিদর্শন। এই মূর্তির বয়স ছিল আনুমানিক ৪৪০০ বছর বয়স।এটি প্রথম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ছিল যেটা ইরাকের বাইরে আমেরিকায় ফেরত পাওয়া গেছে। আমেরিকান অফিসিয়ালরা কিভাবে মুর্তি পাওয়া গেলো সেই ব্যাপারে আলোচনায় অস্বীকৃতি জানান।জাদুঘরে দ্বিতীয় তলায় অর্থাৎ সুমেরীয় হলের মধ্যখানে স্থাপিত রাজার মুর্তিটি যার ওজন ১০০ পাউন্ড এরও বেশি সেটাকে নামাতে দূর্বৃত্তরা সম্ভবত মারবেলের সিঁড়ি দিয়ে টেনে হিঁচড়ে অন্যান্য নিদর্শন এর ক্ষয়ক্ষতি করে নামিয়েছিল এবং এটা জাদুঘরের সবচেয়ে ভারি নমুনা ছিল।US Immigration and Customs Enforcement (ICE) আমেরিকাতে রাজা এন্টেমেনার মুর্তির পুনঃপ্রাপ্তির ঘটনা ২৫শে জুলাই ২০০৬ সালে ঘোষণা দেয়।তারপর এটি ইরাক সরকারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়।নিউইয়র্কের একজন শিল্প ব্যাপারী Hisham Aboutaam এর সাহায্যে এটি আমেরিকায় খুঁজে পাওয়া যায়। চুরির ঘটনার আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াঃ বাগদাদকে অধিষ্ঠিত করার পরও জাদুঘরটিকে রক্ষার কোনো ব্যবস্থা না নেয়ার কারণে মার্কিন সরকারকে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।British Museum এর Dr. Irving Finkel বলেন যে,"ঘটনাটি পুরোপুরি ঘটবার ছিলো এবং এটা আটকানো সম্ভব ছিলো "চুরি প্রতিরোধে মার্কিন ফোর্সের ব্যর্থতার কারণে আন্দোলনের মুখে Martin E Sullivan(US President Cultural Property উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান) ও Garry Vikan,Richard S.Lanier(US State Department Cultural Advisors) পদত্যাগ করেন। ইরাক জাদুঘরে লুটপাট এর পরিমান বিতর্কিত ছিল।ঘটনাস্থলের প্রথম দিকের কর্মীদের মধ্যকার যোগাযোগ এর গন্ডগোলের উপর ভিত্তি করে জানা যায় যে,মূল গ্যালারির খালি হওয়া প্রদর্শনী তাক গুলো তে এমন কিছু বস্তু ছিলো যেগুলো প্রথম গালফ যুদ্ধের আগে জাদুঘর তত্ত্বাবধায়কেরা আত্মসাৎ করে। সংবাদমাধ্যম হতে জানা যায় যে,১৭০০০০ নিবন্ধিত লট (৫০১০০০টি নমুনা) চুরি হয়েছিল। ৫০০০টি অতিমূল্যবান বেলনাকার সিলমোহরসহ প্রকৃত সংখ্যা ১৫০০০টি নমুনার কাছাকাছি। ১২ই এপ্রিল ২০০৩ সালে The Associated Press এর বিবৃতিতে : বিখ্যাত ইরাক জাতীয় জাদুঘর, অসাধারণ ব্যাবিলনীয়, সুমেরীয় এবং অ্যাসিরিয় সংগ্রহ ও দূর্লভ ইসলামিক লিপির আবাসস্থল শনিবার এ শূন্য হয়ে গেছে।এছাড়াও ভাঙা কাঁচের প্রদর্শনী তাক এবং ফেটে যাওয়া গিয়েছে । ১৪ই এপ্রিল National Public Radio এর Robert Siegel সকল বিষয় বিবেচনায় এনে ঘোষণা দেন: যা বোঝা যায়,মার্কিন বাহিনী ছিলো, তবে শতগজ দূরে; আর এই দেশের ঐতিহ্য অনায়াসেই ছিনতাই হয়ে যায়। ক্ষয়ক্ষতির প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তৎকালীন ফ্রেঞ্চ প্রেসিডেন্ট Jacques Chirac ১৬ই এপ্রিল ২০০৩ সালে এ ঘটনাকে মানবতাবিরোধী ঘটনা বলে আখ্যায়িত করেন। যখন জিজ্ঞাসা করা হলো যে সফলভাবে আক্রমণের পরও কেন US Military জাদুঘরটিকে রক্ষার চেষ্টা করেনি তখন Gen. Richard Myers (জয়েন্ট চিফ অফ স্টাফ এর চেয়ারম্যান) বলেন, আপনার হয়তো মনে থাকবে ; যখন চুরির বিষয়টি ঘটে তখন অনেক মানুষ আহত ও নিহত হয় এবং এ ব্যাপারটা অন্যান্য ব্যাপারগুলো থেকে অগ্রাধিকারের। বেসামরিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ William Sumner, যার উপর শিল্প স্মৃতিসৌধ ও আর্কাইভের দায়িত্ব ছিলো তিনি বলেনঃ "অর্থহীন ব্যাপার ঘটেই"। এবং আরও বলেন, " দূর্ভাগ্যবশত ঘটে যাওয়া বিষয়টিকে যুদ্ধ পরিকল্পনার ঘাটতি হিসেবে এড়ানোর চেষ্টা করা আমাকে অনেক ব্যথিত করে।" এবং চুরি হবার পর্যায়কালকে তিনি অপরিচ্ছন্নতা বলে আখ্যায়িত করেন। পররাষ্ট্র সচিব Colin Powell বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর বাধ্যবাধকতা বোঝে এবং সাধারণভাবে প্রত্নতাত্ত্বিক বিষয় এর উপর নেতৃত্ব দান করবে আর বিশেষ ভাবে এই জাদুঘরের বিষয়ে।